প্রাচীন গ্রীস টু আজকের বাংলাদেশ ভায়া উপনিবেশিক বেঙ্গল : শিল্প ও রাজনীতি

প্রাচীন গ্রীকের ট্র্যাজেডির চাইতে আজকের ট্র্যাজেডি কোন অংশে কম নয়। সফোক্লিসের ট্র্যাজেডি Oedipus Rex, যার কাহিনী আজকের মূল্যবোধের পাল্লাতে খুবই বিতর্কিত,সেটা যখন এথেন্সে মঞ্চস্থ হয় সেই খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, তখনও তা ব্যাপক দর্শকনন্দিত হয়।ভাগ্যিস তখন এথেন্সে কোন পুলিশি ব্যবস্থা ছিলো না।থাকলে সফোক্লিস কোন বইই লিখতে পারতেন না। তাঁরই সমসাময়িক সক্রেটিসের নামে ঈশ্বর বা দেবী অবমাননার অভিযোগ এনেছিলো তিন কুচক্রী।তবে সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো এবং জেনোফেনের লেখার পাশাপাশি আধুনিককালের গবেষকদের লেখা মিলিয়ে পড়লে বোঝা যায় যে সক্রেটিসের মৃত্যুর কারণ যতটা নিহিত রয়েছে “দেবী অবমাননা” এবং ” যুবকদের মস্তিষ্ককে কলুষিত করা” র মধ্যে তার চাইতে অধিকতর শক্তিশালী কারণ নিহিত রয়েছে সক্রেটিসের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, নিজের সহজাত বিচারবুদ্ধি ও বিশ্বাসের কথা সরলভাবে প্রকাশ করা,যুক্তিশীলতার প্রতি ঝোঁক এবং সত্য ও জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসায়। সক্রেটিসের চরিত্রের এইসব প্রবণতা গ্রীসের তখনকার উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাও মেনে নিতে পারেনি।তাঁর শিক্ষা এস্টাব্লিশমেন্ট বিরোধী বলে মনে হয়েছিলো তখনকার শাসকদের কাছে। সেই সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিলো। বিচার শেষে জুরিদের ২৮০-২২০ ভোটের বিভক্ত রায়ে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সক্রেটিসের এই মৃত্যুর কারণ সরাসরি দার্শনিকতাপ্রসূত নয়,বরং রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা প্ররোচিত।

দুটো ভিন্ন ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে আড়াই হাজার বছর আগেও গ্রীসের নাগরিকেরা শিল্প বুঝতে শিখেছিলো যার প্রমাণ পাওয়া যায় সফোক্লিস, এ্যরিস্টোফেন, এস্কাইলাস,ইউরিপিডিসের জনপ্রিয়তায়। আবার ওই একই সময়ে বা গ্রীসের স্বর্ণযুগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও সেই গণতান্ত্রিক শাসক এবং শাসনব্যবস্থা সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারা, শিল্পরসিক গ্রীক নাগরিকদের মতো অতো উদার ও সহনশীল নয়। অর্থাৎ রাজনীতি ব্যাপারটা মানবিকতায় এবং নন্দনচর্চায় পিছিয়ে থেকেছে শিল্পের থেকে। শিল্প, শিল্পী এবং শিল্পরসিকেরা এগিয়ে থেকেছে রাজনীতি, রাজনীতিক আর রাজনীতিজীবীর চেয়ে।

উপমহাদেশের বাংলা ভূখণ্ডে এক সময়ে যারা স্বাধীন চিন্তা করেছেন, ধর্মের সমালোচনা যারা করেছেন, ধর্মের ভেতরকার কুসংস্কার, অমানবিকতা, হৃদয়হীনতা, যুক্তিহীন অবৈজ্ঞানিক বিষয়াদির বিরুদ্ধে যারা লিখেছেন,অদৃষ্টবাদ আর রহস্যময়তার কুহকে ডুবে ছিলো যেসব মানুষ,তাদেরকে বিজ্ঞান আর যুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত করে সুস্থ জীবনের সঠিক পথে উত্তরণের জন্য যারা চেষ্টা করেছেন, তাদেরকেও লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। ষোড়শ শতক থেকে বাংলায় জন্ম নিতে শুরু করেছেন মানবিক দার্শনিকেরা। একজন শ্রীচৈতন্য জন্মেছিলেন বাংলায়। তার ধর্মীয় দিকটা বাদ দিলাম। মানবিক দিকটি বিবেচনায় নিই। হিন্দু ধর্মের বেদস্বীকৃত বর্ণ আর জাতপাতের বিভেদটাই ভেঙে গেল চৈতন্যের প্রেম আর ভক্তিমূলক ধর্মদর্শনের দ্বারা। চৈতন্যের এই প্রচেষ্টা কিন্তুু হিন্দু শাস্ত্র বা পুরাণের বিধিবদ্ধ নিয়মের স্পষ্ট ব্যত্যয়। ওই ব্যত্যয়ের মধ্যেই নিহিত ছিলো মানবিকতা। তাই চৈতন্য নিজেই ইতিহাস হয়ে গেছেন। মানবিক ধর্মদর্শনের, মানুষ ও ভগবানের মৈত্রী তত্ত্বের উজ্জ্বল স্রষ্টা হয়ে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন। আমাদের এখানে জন্মেছিলেন একজন লালন। মানুষইতো ছিলো তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে। আঠারো ও উনিশ শতকের আরো দুজন বিখ্যাত ব্যতিক্রমী ব্যক্তি আছেন। একজন রামমোহন রায়, অন্যজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর তো শেষ জীবনে নিরীশ্বরবাদী হয়ে গিয়েছিলেন। এই দুইজন হিন্দু ধর্মের মধ্যকার কুসংস্কার আর অমানবিক দিকগুলোকে কি তুলোধুনাটাই না করেছেন! বলে কিনা মূর্তিপূজা মূর্খতা! বলে কিনা সতীদাহ শাস্ত্রসম্মত না! কি ভয়ানক ধর্মবিরোধী কথাবার্তা ! শুনলেই কামদণ্ড উত্তেজনায় ফেটে পড়ে! তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই অপেক্ষাকৃত অনুন্নত, পশ্চাৎপদ সমাজে কেউ ওদেরকে হত্যার ফতোয়া দেয়নি। ওদের লেখার জবাব লেখা দিয়েই দিয়েছিলেন। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার কলম ধরেছিলেন, চাপাতি নয়। সেটা ব্রিটিশ আমল ছিলো। খুনখারাবি করলে হয়তো বিচারের সম্ভাবনা ছিলো। এখন সে সম্ভাবনা নেই। তাই কলম চালানোর মতো এতো কষ্ট কেউ করতে রাজি নয়। ডাইরেক্ট এ্যকশানে যায়। চাপাতি চালায়। উনিশ শতকের আর এক কাণ্ড দেখুন। ইয়ং বেঙ্গল। কি উজ্জ্বল এক একটা নাম তাঁরা। ধর্মের বিরুদ্ধে ওরাও তো গিয়েছিল। সেকালে সমাজ সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপই ছিলো ধর্মসংস্কার। আর একটা উদাহরণ হলো “ব্রাহ্ম ধর্ম “। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তো শাস্ত্র কিছু কম জানতেন না। ভেবে দেখুন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবল প্রতাপশালী যুগে নগর কলকাতায় তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদকে পাশ কাটিয়ে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর থেকে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। সংস্কারের পর সংস্কার চলতে থাকে স্বয়ং ব্রাহ্ম ধর্মের ভেতরে। শেষ সংস্কার আনলেন কেশব সেন। পুরো এক শতাব্দী জুড়ে হিন্দু ধর্ম নিয়ে তর্ক চলেছে। কলকাতার কলেজগুলোতে বিতর্ক হয়েছে ঈশ্বর সাকার না নিরাকার এই প্রসঙ্গে। না, উপমহাদেশের রাজনীতি হয়তো এগোয়নি, কিন্তুু প্রাচীন গ্রীসের মতই এখানকার শিল্প সাহিত্যও এগিয়ে ছিলো রাজনীতি থেকে।

কিন্তু আমাদের বর্তমান অবস্থানটা কোথায়? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে যায়।কোন চিন্তা করারই সুযোগ নেই আজ আমাদের এখানে। যারা স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত কথা বলবে বা লিখবে তারাই বিপদে পড়বে।তাদেরকে রাস্তায় বা নিজ গৃহে নৃশংসভাবে মরতে হবে,অথবা যেতে হবে জেলে, তাদের বই বাজেয়াপ্ত হয়ে পড়ে থাকবে সরকারি ভাগাড়ে। কোন বইকে জনসম্মুখে প্রদর্শন ও বিক্রয়ের জন্য পাশ করে আসতে হবে মধ্যযুগীয় চিন্তায় পরিপূর্ণ সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর অবজারভেশন। এ কোন সময়? এ কোন সমাজ? শিল্প বোঝেনা, স্বাধীনতা বোঝেনা, চিন্তা করতে দেয়না, লিখতে দেয়না, পড়তে দেয়না। এখানে সসবটাই রাজনীতির রাহুগ্রাসে আচ্ছাদিত। এই সময়, এই সমাজ কিভাবে উন্নত মানুষ জন্ম দেবে? এই সাময়িক ঊষরতা কি আগামীকালের সূর্যোদয়ে দুরীভূত হয়ে ফলবান বৃক্ষের জন্ম দেবে নাকি ঘূর্ণি মেঘ এসে কালকের আকাশে আমাদেরকে দিয়ে যাবে চিরস্থায়ী বন্ধ্যাত্ব?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − 56 =