প্রসঙ্গঃ নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি

নির্বাচন কমিশন গঠনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করেছেন বেশ কিছুদিন হলো। বিরোধীরা নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলে সার্চ কমিটির সমালোচনা করলেও, সার্চ কমিটির ‘অনুরোধে’ নির্বাচন কমিশন গঠনে তাদের পছন্দের নাম সার্চ কমিটির কাছে সুপারিশ করবেন বলে জানিয়েছেন। বিরোধীরা বিরোধীতা করলেও অনেক বিজ্ঞ মানুষজন সার্চ কমিটি গঠনের ঘটনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকে একে সঠিক গণতান্ত্রিক পথ বলে অভিহিত করছেন। কিন্তু মূল কথা হলো সার্চ কমিটিই কি নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে সঠিক সমাধান? আদতে সার্চ কমিটির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্দেশনা দেয়া আছে। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। অর্থাৎ আইন মোতাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনধিক পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু দেশের সংবিধান প্রনীত হওয়ার ৪৪ বছর পার হওয়ার পরেও নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে কোন আইন প্রনয়ন করা হয়নি। এদেশে অনেক অপ্রয়োজনীয় আইন পাশ করা হলেও, নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন আইন প্রনয়নে সকল সরকারই উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে! তাই নির্বাচন কমিশন গঠনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে রাষ্ট্রপতির সার্চ কমিটি গঠন।

কিন্তু এই সার্চ কমিটির প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠনের কোন এখতিয়ার বা ক্ষমতা নেই। তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য যে ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করবেন, সেই ব্যক্তিদের নিয়েই যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে তার কোন গ্যারান্টি নেই! অর্থাৎ সার্চ কমিটির সুপারিশকৃত কমিশনের বাহিরে গিয়েও মহামান্য রাষ্ট্রপতি চাইলে নিজের পছন্দমতো (প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশকৃত) ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারবেন। এমন অবস্থায় সার্চ কমিটি গঠন কেবলমাত্র লোক দেখানো নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। যেহেতু সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু সার্চ কমিটির নিকট নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলসমূহের পছন্দসই নাম প্রস্তাব করা অনর্থক! এজন্য নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠন একটি অকার্যকর পদক্ষেপ।

নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি কার্যকরী আইন চলমান সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। যদি আইন করতে সমস্যা হয়, তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সার্চ কমিটিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের কতৃত্ব প্রদান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে, সার্চ কমিটি রাজনৈতিক দলের সুপারিশের ভিত্তিতে অথবা নিজেদের মতানৈক্যের মাধ্যমে অধিকতর নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে সক্ষম হবেন। অবশ্য তখন সার্চ কমিটি কাদের নিয়ে গঠিত হবে, সেই বিষয়েও প্রশ্ন উঠবে। সেক্ষেত্রে সরকারী সুবিধাভোগকারী ব্যক্তিদের এড়িয়ে বাহিরের লোক দিয়ে সার্চ কমিটি গঠিত হলে বিতর্ক কিছুটা কমবে বলে আমার বিশ্বাস।

আইন প্রনয়ন বা সার্চ কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের পদক্ষেপ সফল হবে না, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ে। একথা ঠিক যে এদেশে নিরপেক্ষ লোক পাওয়া কঠিন। কিন্তু এটাও মানতে হবে, এদেশে গ্রহণযোগ্য মানুষের অভাব নেই। তাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। এই দাবি রাজনৈতিক দলসমূহকেই পূরণ করতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − = 85