এক প্রবাসীর আত্মকথন

বাংলাদেশের প্রবাসীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। কেউবা মধ্যপ্রাচ্যে অথবা কেউ ইউরোপ আমেরিকায়। কেউবা জীবন সংগ্রামের যুদ্ধ করছেন অথবা কেউ কেউ পড়াশুনার জন্য প্রবাসে আছেন। আমি নিজেও একজন প্রবাসী। এই প্রবাসীদের নিয়েই নিজের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বাস্তবতা লিখেই ফেললাম।

প্রবাসীদের জীবন অনেকটা ভারবাহী গাধার মত। না চাইলেও ভার বহন করতেই হয় ইচ্ছা থাকুক অথবা নাই থাকুক। অনেক কষ্টে জমানো টাকা অথবা ধার দেনা করে কিংবা জায়গা জমি বিক্রি করে ভাল ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান। বাবা মা আত্মীয় স্বজন আশায় বসে থাকেন কবে সেই ছেলে ডলার পাউন্ড ইনকাম করবে আর দেশে সেই টাকা পাঠাবে। ছেলের পাঠানো সেই টাকায় পাকা দালান উঠবে, প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা পাঠাবে, আর কোন দুঃখ কষ্ট থাকবে না। পাড়া প্রতিবেশীকে বড় মুখ করে বলা যাবে আমার ছেলে অমুক দেশে থাকে, আমার ছেলে এত এত টাকা পাঠায়।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন প্রবাসী বিদেশে যাওয়ার সাথে সাথেই সে অনেকগুলি সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাসা পাওয়া, চাকরী খোঁজা, নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা, নতুন খাদ্যাভ্যাস, নতুন নিয়ম কানুন। এইসব সমস্যার সাথে খাপ খাওয়াতে অনেক সময় লেগে যায়। অনেকেই এত নতুন কিছুর মধ্যে মানিয়ে নিতে পারেন না। আবার অনেকেই পারেন। যারা পারেন না তারা দেশের ধার দেনার কথা চিন্তা করে, মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ বুজে জোর করে মানিয়ে নেন।

মধ্যপ্রাচ্যে হয়তবা অনেকে চাকরি নিয়েই যায় কিন্তু তাদেরও অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। চাকরির কথা বলে নিয়ে গেলেও তাদের পাসপোর্ট রেখে দিয়ে তাদেরকে দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয় নুন্যতম মজুরী দিয়ে। তারপরেও এই প্রবাসী ভাইয়েরা দিনের পর দিন কষ্ট করে যাচ্ছেন পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটাবার জন্য। তারাই কিন্তু রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে রাখছেন সচল।

প্রবাসীদের সব কাজ নিজেদের করতে হয়। কাপড় ধোয়া থেকে রান্না বান্না পর্যন্ত। সারাদিন কাজ করে বাসায় ফিরে কারো ইচ্ছা করে না এত কিছু করতে। তারপরেও সব করতে হয়। বিদেশে তো মা নেই। যেই ছেলে নিজের হাতে ভাত তুলে খেতো না, সেই ছেলেকে আজ সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত অবস্থায় হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হয়। যেই ছেলে পাশের দোকানে কিছু কিনতে যেতে চাইতো না তার আজ বাসা থেকে অনেক দূরে গিয়ে কাজ করতে হয়। যেই ছেলে সবসময় ফ্যাশনেবল জীবনযাপন করত তার আজকে নিজের জন্য টাকা খরচ করতে দুইবার ভাবতে হয়। অনেকের ঠিকমত খাবার সময় পর্যন্ত হয়ে ওঠেনা, কিন্তু মা ফোন দিয়ে যখন জিজ্ঞেস করে, ” বাবা, খাইসো?”, চোখের পানি আটকে রেখে বলতে হয় ,” মা, খেয়েছি”। অনেক কষ্ট থাকার পরেও মায়ের সাথে যখন কথা হয়, মাকে বলি ”অনেক ভাল আছি, মা। তোমার ছেলে অনেক ভাল আছে।” ফোন কাটার পরে ফোনের দুই প্রান্তেই দুইটি মানুষ কেঁদে ওঠে। কারন মা ছেলের সব কথা বুঝতে পারে, এই জন্যই তো তিনি মা।

প্রবাসে বেশিরভাগ মানুষ কষ্টে থাকে। এমনও দেখেছি, এক রুমে ৭-৮ জন গাদাগাদি করে থাকে। খাওয়া দাওয়ার কোন হিসাব নেই। কখনো বাইরে থেকে কিছু একটা খেয়ে নিয়েই কাজ থেকে এসে ঘুমিয়ে পড়ে আবার সকালে কাজে চলে যাওয়া। ছুটির দিন গুলিতেও অন্য কোন কাজ করে কিছু অতিরিক্ত টাকা জমানো, যাতে ঈদে ভাই বোনদের জন্য কিছু পাঠানো যায়। প্রিয়জনকে খুশি রাখতে অবিরাম নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়ে যাওয়া।

বিদেশের মাটিতে প্রবাসীদের সমস্যার অন্ত নেই। ভাষা সমস্যা, কাজের সমস্যা, বাসস্থান সমস্যা, ভিসা জটিলতা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপরেও মুখে এক চিলতে হাসি লেগেই থাকে। অনেকেই এমন জায়গায় থাকে যেখানে কোন বাঙ্গালি নেই। কারো সাথে প্রান খুলে বাংলা বলা যায় না। বাংলাদেশী খাবার খেতে মন চাইলেও সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা। বাংলাদেশে পরিবারের সাথে কথা বলে বাংলাদেশের যতটুকু ছোঁয়া পাওয়া যায় তাতেই শান্তি। কেউ কেউ বাংলাদেশী চ্যাটরুম গুলিতে গিয়ে বাংলাদেশী মানুষদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠেন, অথবা কোনদিন সময় করে বাংলাদেশী বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যান। কাজ শেষ করে এসে দেশে রেখে আসা স্ত্রীর সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলেন। এটুকুতেই তাদের আনন্দ। কেউ দেশ থেকে আসলে আগ্রহভরে দেশের গল্প শোনেন। প্রবাসীরা দেশকে নিয়ে যতটা ভাবেন, দেশের মানুষও এতটা ভাবেন না।

প্রবাসীদের একমাত্র সুখের সময় যখন তারা দেশে যান। পরিবার পরিজনের জন্য কেনাকাটা করতে থাকেন, কার কি লাগবে লিস্ট করেন, দেশে গেলে কি করবেন তার প্ল্যান করেন। হয়তবা সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা, তারপরেও ধার দেনা করে হলেও সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টার কোন কমতি থাকেনা।

এত কিছুর পরেও প্রবাসীরা সবচেয়ে উপেক্ষিত। এয়ারপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের হেনস্থা করা হয়। দেশের এম্বাসিতে তাদের সাথে পশুর মত আচরন করা হয়। ছোট কাজ করেন বলে অনেকেই তাদের কাজ নিয়ে হাসাহাসি করে হয়। দেশে টাকা পাঠাতে না পারলে তার সাথে খারাপ আচরন করা হয়। সবার এটাই ধারনা বিদেশে একটি টাকার গাছ আছে, প্রবাসীরা গিয়ে ওই গাছে ঝাঁকি দেন এবং সেই টাকা দেশে পাঠান। কত কষ্ট করে যে প্রবাসে টাকা ইনকাম করতে হয়, দেশের মানুষের সেই ধারনাও নেই। মরুভুমির ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১০ ঘণ্টা কাজ করে নুন্যতম মজুরী পান। অনেকেই রেস্টুরেন্টে থালা বাসন ধুয়ে, অথবা ক্লিনারের কাজ করে জীবনযাপন করেন। ছাত্ররা পার্ট টাইম জব করে নিজেরাই চলতে পারেন না, দেশে কি টাকা পাঠাবেন? তারপরেও প্রবাসীদের উপর অভিযোগের শেষ নেই।

প্রবাসীদের সম্মান করুন। প্রবাসীদের কষ্টের টাকায় গড়ে উঠেছে আজকের উন্নত বাংলাদেশ। প্রবাসীরা আছেন বলেই বিদেশে বাংলাদেশের মাথা আজ উঁচু হয়ে আছে। প্রবাসীরা বাংলাদেশের একেক জন জীবনযোদ্ধা, যারা যুদ্ধ করছেন বলে আজ বাংলাদেশের এই শক্ত অবস্থান।

পৃথিবীর সকল প্রবাসীদের আমার শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্যালুট।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “এক প্রবাসীর আত্মকথন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =