শরীরের অমর্যাদাঃ শ্রেণীক্ষমতার প্রকাশ

স্কুলের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে ছাত্ররা একটি সেতু বানিয়েছে, নিজেদের শরীর এই সেতুর উপাদান, খুঁটি ও পাটাতন, যার উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়। গল্পের এই সংবাদ আমাকে আশির দশকে বাংলাদেশের গণনাটকের, গ্রামথিয়েটারের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এই সব থিয়েটার আজ প্রায় বিলুপ্ত।

গণনাটক সম্পর্কে যারা জানেন, তাঁরা মনেহয় বাদল সরকারের নামও জানেন। গণনাটক, রাস্তার নাটক, থার্ড থিয়েটার, গ্রামথিয়েটার, নানা নামে, প্রথাগত নাটকের বিপরীতে, বঞ্চনা মুক্তির ও সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে এই ঘরানার সূচনা হয়েছিল, বাদল সরকারের হাত ধরেই।

গণনাটকের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল শরীরের ভাষা বা বডিল্যাংগুয়েজের ব্যাবহার। শরীর দিয়ে নির্মান করা হত কল্পনা করা যায় এমন সবকিছুই। বৃক্ষ, ঘর, আসবাবপত্র, সব কিছুই।

সম্প্রতি, শরীর দিয়ে ছাত্ররা একটি সেতু নির্মান করেছে, সংবাদের এই অংশটুকু আমাকে মুগ্ধ করে। তারপর সেই সেতুর উপর দিয়ে একজন ক্ষমতাধর জনপ্রতিনিধিকে পার করিয়ে দেন একজন প্রধান শিক্ষক। এখানে ক্ষমতা ও রাজনীতি চলে আসে।

গল্পটা শরীর ও ক্ষমতার। অন্যভাবে বললে শরীর-রাজনীতির। আরেকটু বিস্তারিত বললে, শরীর নিয়ে দুই রাজনীতির দ্বন্দ্বের।

এক রাজনীতিতে, শরীর প্রতীক হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত পরাধীনতার, ক্ষমতার কাছে, যে ক্ষমতা শোষকের, হেজিমনিক ও সহিংস। শরীর যখন ধারণ করে লোহার শিকল, চেসটিটিবেল্ট, হিজাব, হ্যান্ডকাফ, তখন আমরা এর রাজনীতি অনুবাদ করতে পারি। দাসত্ব, শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত মানুষ, শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতার কাছে।

দ্বিতীয় রাজনীতি, নক্সালবাড়ির শ্রেণীমুক্তির সংগ্রামের আবহে গড়ে ওঠা থার্ড থিয়েটার, রাস্তার নাটক, শরীর প্রকাশ করছে নান্দনিক শরীরের ভাষায় শ্রেণীশোষণমুক্তির বার্তা, সাম্যের স্বপ্ন। অর্ন্তবাস পোড়ানো, প্রকাশ্যে সন্তানকে স্তন্যপানের অধিকার, কিংবা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গ্রামে এনজিও কর্মীটির সংগ্রাম, ঐ একই সংগ্রাম, শরীরী নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির। মুক্তির রাজনীতি।

হাইমচরের স্কুলের ছাত্রদের নান্দনিক সেতু নির্মান পদ্মাসেতুর আদলে। আওয়ামীলীগের স্থানীয় নেতা এই সেতু প্রথমে পার হবে। প্রধান শিক্ষক তাই চেয়েছেন মাত্র।

এই গল্পের প্রতিক্রিয়া আমরা দেখছি ফেসবুকে, সামাজিক মাধ্যমে, তারপর গণমাধ্যমেও। নিন্দা করা হচ্ছে তীব্র ভাষায়, সংগত কারণেই। কারণ এখানেও একটি শরীরের রাজনীতি ঘটেছে। আপাতভাবে দেখলে “শরীরের অমর্যাদার” প্রতীক হয়ে উঠেছে জুতো পায়ে এই মানবসেতু পেরুনো।

শরীরের অমর্যাদা হলে, এর আগেও আমরা প্রতিবাদ দেখেছি। নারীর শরীর তেঁতুলের সাথে তুলনা করার সোচ্চার প্রতিবাদ। মৌলবাদীরা যতই ওয়াজ করুক নারীর শরীরকে খাদ্যবস্তুতে কিংবা যৌনবস্তুতে অবনমিত করার, বামাতিরা যতই চেষ্টা করুক হিজাব নিয়ন্ত্রণের নয় “ব্যাক্তির পছন্দ” বলে বৈধতা দেয়ার, দিনশেষে, এদেশের মানুষের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কারণে, মানুষ তাঁর আত্মার গভীরে জানে যে, শরীরই পরমাত্মার অধিষ্ঠান, খুবই পবিত্র, মন্দির মসজিদ প্যাগোডার চেয়েও পবিত্র। শরীরকে অসন্মান করা যায়না।

কিন্তু এর পেছনের ক্ষমতার রাজনীতিটাকে না বুঝলে, আমরা কেবল তেঁতুল হুজুরদের দুষব, প্রধান শিক্ষক আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে দুষব।

ছবিতে দেখে ধারনা করতে পারি, মেহেদির রঙয়ে শ্মশ্রু রাঙ্গানো প্রধান শিক্ষক শরীরি ভাষার নান্দনিক প্রকাশে উৎসাহী হয়েছেন কেবল একটি কারণেই। তাঁর স্কুলের প্রতি রাষ্ট্রের নেকনজর লাভের উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র অতিবিকশিত, ক্রমবিস্তারকারী এবং সকল “উন্নয়নের” পুঁজি সরবরাহের একমাত্র মালিক। রাষ্ট্রকে তুষ্ট করতে হলে প্রধান শিক্ষকের কোন না কোন লিভারেজ দরকার। এই লিভারটি আওয়ামীলীগের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। অন্য কোন দল ক্ষমতায় এলেও প্রধান শিক্ষককে এই কাজটিই করতে হবে, সম্পদ নিশ্চিত করার জন্য। পদ্মাসেতুর বদলে সে তখন হয়ত হাওয়াভবন বানাবে।

শরীরের অমর্যাদার পেছনে যে ক্ষমতাকাঠামো রয়েছে, সেই ক্ষমতাকাঠামোকে না চিনলে আমরা উপসর্গ নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হতে পারি, কিন্তু তা কিছুই বদলাবেনা। প্রধানশিক্ষককে নতজানু হতে হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে, তার প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রয়োজনে। এই প্রয়োজনের কাছে তাঁর ছাত্রের শরীরের মর্যাদাবোধ তুচ্ছ হয়ে যায়।

এই শরীরসেতু, বাংলাদেশের শ্রেণীক্ষমতা কাঠামোর সাথে সাধারণ নাগরিকের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি মাত্র। প্রতিনিয়ত এদেশের শ্রমজীবী মানুষ, ফসলের মাঠে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে কি শরীরী অবমাননা নিয়ে বেঁচে আছে, তা কি আমরা সবটা জানি?

মুক্তির রাজনীতি দরকার, অমর্যাদা, বঞ্চনা ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ গতি লাভ করুক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − 34 =