বইমেলা আসে, বইমেলা যায়, আমি প্রতীক্ষায় থাকি!

আজ ৩রা ফেব্রুয়ারি। এই মাস আসলে হৃদয়টা কেঁপে উঠে। মন বিষাদে ভরে উঠে। এবারও বুঝি ফেব্রুয়ারি মাস চলে যাবে, কিন্তু আমি বই বের করতে পারবো না। জীবনে প্রথম বইটি প্রকাশ করেছিলাম ১১ সালে। মনের মধ্যে সেই কি উত্তেজনা! এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম প্রতি বছর অন্তত একটি করে হলেও বই বের করব। এরপর ১২ সালে বই বের করার কথা ভাবলাম। যে হাতের পাণ্ডুলিপিগুলো লিখেছিলাম ৫-৬ সালের দিকে।

একদিকে দেশে বাংলা ভাই নামক নগ্ন জঙ্গিবাদের উত্থান, আরেক দিকে দেশে বুদ্ধিজীদের বেছে বেছে হত্যা। গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি, আহসান উল্লাহ মাস্টার, শাহ এম এস কিবরিয়াকে হত্যা, হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, পুর্নিমাকে গনধর্ষন, এসব আমাকে কাঁদিয়েছিল। বিবেককে দারুনভাবে নাড়া দিয়েছিল। এসব নিয়ে আমার মুল গল্প ও প্রবন্ধ।

তাছাড়া সেই পাণ্ডুলিপিতে নাস্তিক্যবাদের উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে গল্পের মধ্যে। তখন আঞ্চলিক কয়েকজন প্রকাশক আমার লেখা পড়ে বলে দিয়েছিল, আমার বই প্রকাশ করার সাহস তাদের এখনো হয়নি। তাছাড়া দেশের পরিস্থিতি সহায়কও নয়। সেই বছরও আমার বইটি ছাপা হয়নি। এরপর ১২ সালের মাঝামাঝি এসে তো আমার আর আমার পরিবারের জীবনে পুরো অন্ধকার নেমে এসেছিল। শুধু আমার জন্য।

ফেইসবুকে নবীর চরিত্র নিয়ে কথা বলায়। জেল জুলুম হল। তার ঘটনাবলী তো এখানের অনেকেই জানে। প্রায় দশ মাস দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আবার ১৩ সালের আগষ্টের দিকে দেশে ফিরি। তখন তো এদেশে নাস্তিকদের বেঁচে থাকার পরিবেশ আরো প্রতিকুলে। একদিকে হেফাজতের উত্থান, আরেক দিকে গনজাগরন মঞ্চের। রাজীব হায়দারকে হত্যার খবরটা বাংলাদেশে এসে প্রথম শুনি। তখন মুমিনরা তার ক্ষতবিক্ষত লাশের ছবিটা ফেইসবুকের পোস্ট করে পৈশাচিক উল্লাস করতো। “দেখ নাস্তিকের বাচ্চারা! নাস্তিক্যবাদ চোদাবি, তোদের পরিনতি এই থাবা বাবার মতো হবে!” ১৩ সালে দেশে এসেই পুরো দমে আবার ফেইসবুকে লেখালেখি শুরু করি।

সরকার সম্ভবত ১৩ সালের শেষের দিকে আস্তে আস্তে ইসলামিস্টদের সাথে সন্ধি করা শুরু করলেন। শফী হজুরকে সরকার ৩২ কোটি টাকার জমি দান করলেন। ওলামালীগ পুরো নেংটো হয়ে ইসলামিক প্রচার-প্রসার চালাচ্ছেন। সেই সময় এমনিতে মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত ছিলাম। ১৪ সালে বই বের করব এই কথা মাথায়ও আসেনি। ১৫ সালটা ছিল আমাদের অনেক কিছু হারানোর সাল। ফেব্রুয়ারি মাস আসল, এর কয়েকদিন পর আবুল হাশেম আর সৈকত চৌধুরীর অনুবাদ “মুহম্মদের ২৩ বছর” বই মেলায় মৌল্লাদের সহিংসতা আর তান্ডবের কারনে বইটি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। মেলায় র‍্যাব-বিজিবি মোতায়েন করা হল। সেই সাথে রোদেলা প্রকাশনীকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করল বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ।

সেই বছর অনলাইন বন্ধু অনন্য আজাদ আর রাহাত মুস্তাফিজের বই বের হয়। পারভেজ আলমের বের হয় “জিহাদের সিলসিলা”। পারভেজ আলম তখন প্রতিক্রিয়াশীলদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। সেই সময় শফিউর রহমান ফারাবীর হুমকিতে রকমারী.কম”এর মালিক অভিজিত রায়, হুমায়ুন আজাদের বই স্টল থেকে সরিয়ে নেয়। এর প্রতিবাদ হিসেবে স্নিগ্ধা, লুক্স, আসিফ মহিউদ্দিনরা “রকমারি.কম”কে বর্জনের জন্য অনলাইনে ইভেন্ট খুলে। আমিও তাদের সঙ্গে সেই প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলাম। কিন্তু শুদ্ধস্বরের প্রকাশক টুটুল আর জাগৃতি প্রকাশক দিপন ঠিকই অভিজিৎ রায়ের পাশে ছিলেন। ঐদিকে অভিজিৎ রায় প্রকাশ্যে ঘোষনা দেয় দেশে আসার। আরেক দিকে আমাদের “তসলিমা পক্ষ”-এর উদ্যেক্তা ইতু ইত্তিলা ঘোষনা দেয় বই মেলায় তসলিমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদ সভা। সেই সময় “তসলিমা পক্ষ”-এর বন্ধুদের একাত্ন ও প্রতিবাদী করার করার জন্য আমি তসলিমাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম—
কি অপরাধ ছিল তসলিমার?
======================

কি অপরাধ ছিল তসলিমার? কেন তাঁকে আজ বিশ বছর ধরে দেশের বাইরে বাইরে নির্বাসন জীবন কাটাতে হচ্ছে?
সেই কি স্বাধীন দেশে জিয়ার মতো গনহত্যা করেছিল?
মোশতাকের মতো বিশ্বাসঘাতকা করেছিল?
গনতন্ত্রকে গনধর্ষন করে এরশাদের মতো রাষ্টধর্ম ইসলাম বানিয়ে ছিল?

সেই কি খালেদা জিয়ার মতো দেশদ্রোহী রাজাকারের সাথে ঘাটছড়া বেধেছিল?
আন্দোলনের নামে পেট্রোল বোমায় শতাধিক মানুষ মেরেছে?
কাউকে গ্রেনেড হামলা করেছিল?
সেই কি শেখ হাসিনার মতো জামাতের সাথে আঁতাত করেছিল?
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নাম করে জনগনকে ধোকা দিয়েছে?
সেই কি কাউকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করেছিল?
সেই কি কোনো নির্লজ্জ পুরুষের মতো কাউকে ধর্ষন করেছিল?
সেই কি খালেদা হাসিনার মতো ইসলামের সাথে ভন্ডামী করেছিল?
সেই কি কারো রক্তাক্ত লাশ চেয়েছিল?
সেই কি সরকারী আমলা-প্রশাসনের মতো দুর্নীতি করেছিল?
সেই কি কাউকে গুলি করে বা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল?
সেই কি কারো সাথে প্রতারণা করেছিল?
সেই কি প্রকাশ্যে জনসভায় মৌলবাদীদের মাথার দাম ঘোষনা করেছিল?

না, এসব তসলিমা নাসরিন কিছুই করেননি।

তসলিমার অপরাধ ছিল, সেই সত্য বলত।
তসলিমার অপরাধ ছিল , সেই নারীর স্বাধীনতা চেয়েছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল , সেই সংখ্যালঘুর উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে লজ্জা লিখেছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল , সেই নারীকে সচেতন ও স্বাবলম্বী হবার দীক্ষা দিয়েছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল , সেই পুরুষতন্ত্রের কড়া সমালোচনা করেছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল, সেই রাষ্টের অব্যবস্থাপনাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল, সেই ধর্মব্যবসায়ী পীরদের মুখোশ দিয়েছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল, সেই ধর্মের কুসংস্কার, মৌল্লাদের অনৈতিক ফতোয়ার বিরূদ্ধে ক্লান্তিহীন লিখেছিল
তসলিমার অপরাধ ছিল, সেই একজন মেয়ে হয়ে পুরুষ লেখকদের মতো ধাপিয়ে লিখেছিল
কিন্তু এদেশের অসভ্য মানুষদের তা সহ্য হয়নি। তাই মুর্খ রাষ্টচালকরা তাঁকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিল।

আমি একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হয়ে তসলিমার এতোগুলা বছর নির্বাসন দন্ড মেনে নিতে পারছিনা। আমার বিবেক কোনো ভাবেই তা সায় দিচ্ছেনা। এটা তসলিমার উপর চরম অন্যায় করা হয়েছে! আমি তাঁর প্রত্যাবর্তন চাই। আমি তাঁর স্বদেশে জীবন যাপন করার অধিকার চাই।

২১–০২–১৫ইং
এর আগে ১৯–২–১৫তে লিখেছিলাম–

আমাদের সমাজে যদি নারী পুরুষের সমান অধিকার
থাকতো, বা সাম্য বজায় থাকতো, তাহলে একজন
নারীবাদী লেখক তসলিমার জম্মই হতোনা। তাকে নারীর পক্ষে গলা ফাটিয়ে চিৎকার
করতে করতে অধিকার চাইতে হতো না। নারীবাদের উৎপত্তি হয়েছে মুলত পুরুষতান্ত্রিকতার বিরূদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে।
নারীবাদ নারীবাদ শব্দের অনেক ব্যবহার দেখি কিন্তু পুরুষবাদ শব্দটার ব্যবহার দেখিনা। এই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞানময় সময়ে এসে এখনো যে নারীবাদ নিয়ে বলতে হচ্ছে, লিখতে হচ্ছে, সেটা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার!

১৯-০২-১৫

এর চারদিন পর আমাদের মাথায় বাজ পড়ে! আমরা অনেকটা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম! তসলিমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদ থমকে যায় আমাদের! ২৬ই ফেব্রুয়ারি রাত ১০ টার (সময়টা সঠিক মনে করতে পারছিনা) দিকে অভিজিৎ আর তাঁর স্ত্রী বই মেলা থেকে ফেরার পথে চাপাতিধারী ইসলামিস্টরা অভিজিৎ ও তাঁর স্ত্রী বন্যা আহম্মেদকে টিএসসির গেটে কুপিয়ে ফেলে রেখে গেছে। প্রথম খবরটা পায় আসিফ মহিউদ্দিনের ওয়ালে। তার ওয়ালে জানতে পারলাম, অভিজিৎ দা আর বন্যা আহম্মেদ ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হল। এরপর ঢাকার বন্ধুদের উদ্দেশে লেখা পোস্ট করলাম, ” আমার বন্ধুরা, যে যেখানে থাকেন না কেন, যেন এই অভিজিৎ দাকে ঢাকা মেডিকেল দেখতে যায়। তাঁর রক্তের প্রয়োজন হতে পারে….” এর পরক্ষনে জানতে পারলাম, কে যেন পোস্টে মন্তব্য করেছিল, -অপ্রিয় দা অভিজিৎ দা আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এটা শুনে আমার শরীরের রক্তগুলো বিদ্যুৎ বেগে ছোটাছুটি করছিল। অবাধ্য বালকের মতো রাগে আমার চোখ ফেটে অশ্রু বেরুছিল। সেদিন আমি রাতে লিখি—–

অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুতে অনেক কেঁদেছি আর কাঁদবো না। শপথ নিলাম, এই পৃথিবীতে যতদিন বাঁচবো ইসলামের মতবাদের কঠোর সমালোচনা করে যাবো। ধর্মের সমালোচনা করলে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষরা তাকে হত্যা করে বলে আমার জানা নেই। আমার অনেক হিন্দুবন্ধু, আত্নীয় সজ্জন জানে যে আমি নাস্তিক। আমি পুজো পাবন ঈশ্বর ভগবান এগুলো মানিনা। কই তারা তো আমাকে হত্যার হুমকি দেয়নি? আমাকে তো চাপাতি হাতে কোপাতে আসেনি? আমাকে তো কখনো অপছন্দও করেনি? কোনোদিন কুটু কথাও শোনায়নি। কারন কেউ ধর্মের সমালোচনা করলে তাকে হত্যা করতে হবে এমন শিক্ষা হিন্দুধর্ম তাদের দেয়নি। আর বৌদ্ধ খ্রিস্টান ধর্মের সমালোচনা করলে, তারা ধর্মানুভূতিতে আহত হয়ে কাউকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে আমার জানা নেই। শুধু মাত্র ইসলাম ধর্মের মুসলিমরা তাদের ধর্মের কেউ সমালোচনা করলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে! বুকে হাত দিয়ে বলছি, ইসলামকে আমি ছাড়ব না! আমার নিশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত বর্বরধর্ম, খুনিধর্ম, অসভ্যধর্ম ইসলামের বিরূদ্ধে লড়ে যাবো!

এই কবিতাটা ইসলামি মৌলবাদীদের আক্রমনে প্রয়াত অভিজিৎ রায়কে উৎসর্গ করলাম—-

বর্বরদের ধর্ম ইসলাম!
খুনিদের ধর্ম ইসলাম!
সন্ত্রাসীদের ধর্ম ইসলাম!
অসভ্যদের ধর্ম ইসলাম!
নারী পরাধীনতার প্রতীক ইসলাম!
চরিত্রহীনতার প্রতীক মোহাম্মদ!
লুইচ্যার আদর্শ মোহাম্মদ!
নিকৃষ্ট মতবাদ ইসলাম ধর্ম!
ইতর মতবাদ ইসলাম ধর্ম!

যে ইসলাম ধর্ম বেহেস্তের ৭২ হুরীর লোভ দেখিয়ে মানুষকে খুনি বর্বর ঘাতক বানায়, সেই ইসলামের বাণীর উপর আমি দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করি!
সেই ইসলাম ধর্মের বুকে আমি লাত্থি দি!

২৬-২-১৫ইং

এরপর কবিতা লিখি—-

২৬ এ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
================

২৬ এ ফেব্রুয়ারি একটি কলঙ্কের দিন
বাংলাদেশের একটি লজ্জার দিন!
ইসলাম ও ধর্মান্ধ মুসলমানদের একটি বিজয়ের দিন
মুক্তমনা প্রতিষ্ঠাতার একটি মৃত্যুর দিন

এই দিনে মোহাম্মদের যোগ্য অনুরাসীরা একটা উজ্জল নক্ষত্রকে ধবংস করেছিল।
সেদিন রাতে নবী-ভক্তরা টিএসসির সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে একটি বিরল মস্তিষ্ককে থেঁতলে দিয়েছিল!
তারা জানত, এই বিরল মস্তিষ্কের মানুষটি বেঁচে থাকলে ধর্মজীবিদের বড় অসুবিধে হয়ে যাবে।
মোহাম্মদের সৃষ্ট মিথ অস্তিত্বের সংকটে ভুগবে!
মানুষকে আর অন্ধকারে রাখা যাবেনা
ধর্মের রাজনীতি মুখ তুবড়ে পড়বে!
তাই তারা সেদিন অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে থামিয়ে দিয়েছে!

অবশেষে মৃত্যু দিয়ে “মুক্তমনা” নির্মাণ করে গেলেন,
মুক্তমনের লেখক অভিজিৎ রায়।
২৬ এ ফেব্রুয়ারিকে আমি শুধুই ‘মুক্তমনা দিবস’ বলে স্বীকার করলাম।

আর বলছি,
আমিই অভিজিৎ!

২৬–২–১৫ইং

এর পরের দিন সকালে কবিতা লিখেছিলাম—-

অভিজিৎ রায়কে ঘিরে আমার চাওয়া ও প্রত্যাশা
=======================

যারা ইসলাম ধর্মের আফিম খেয়ে অভিজিৎ রায়কে নৃসংশভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে,
আমি তাদের লাশ চাই না,
আমি তাদের মানবিক শিক্ষা চাই।

যেসব আঁধারের জীবগুলো অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে আনন্দে উল্লাস করছেন,
তাদেরকে আমি ঘৃনা করতে চাইনা,
আমি তাদেরকে জ্ঞাণ-আলোর পথ দেখাতে চাই।

যারা মধ্যযুগীয় বর্বর ধর্মে দীক্ষিত হয়ে অভিজিৎ রায়কে
হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে,
আমি তাদের ফাঁসি চাইনা,
আমি তাদের বর্বর ধর্মের বিলুপ্তি চাই!

যেসব মাদ্রাসাগুলোয় ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চাদের মস্তিষ্কের কোষে কোষে ইসলামের ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ জঙ্গি তৈরি করা হয়,
আমি তাদের মৃত্যু চাইনা,
আমি তাদের মাদ্রাসা শিক্ষার অবসান চাই।

যে রাষ্টধর্ম “ইসলাম” অভিজিৎ রায়কে হত্যার জন্য মুর্খ মানুষদের মন-চেতনা উজ্জীবিত করেছে, তাদের মদদ যুগিয়েছে,
আমি তাদের কঠোর শাস্তি চাইনা,
আমি রাষ্টধর্ম “ইসলাম”-এর শিকড় সহ উচ্ছেদ চাই!

যেসব হত্যাকারীরা অভিজিৎ রায়কে খুন করে বীরত্বের হাসি হাসছেন, বুক ফুলিয়ে প্রেত্মার গর্ব করছেন, ইসলাম ও নবীর জয় বলে ভাবছেন,
আমি তাদের রক্ত মৃত্যু লাশ বিচার শাস্তি কোনোটাই চাইনা।

আমি চাই, তাদের মস্তিষ্কে
অভিজিৎ রায়ের চেতনার বিকাশ ঘটাতে
আমি চাই, তাদের হাতে হাতে অভিজিৎ রায়ের বই পৌঁছে দিতে
আমি চাই, তাদের মাঝে অভিজিৎ রায়ের জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে
আমি চাই, তাদের অনুর্বর চিন্তার পলিতে বিজ্ঞান যুক্তিবাদী ও মানবিক বীজ বুনতে

তাঁর জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার পর আগামীতে সেই হত্যাকারীদের মুখে বা তাদের সন্তানের মুখে শুনতে চাই-
আমরাও মানববাদী, বিজ্ঞানবাদী, যুক্তিবাদী নাস্তিক “অভিজিৎ রায়” হতে চাই।

২৭–২–১৫ইং

এর পরের দিন লিখি—-

দাবী
====

মাননীয় সরকার,
আমি একজন অভিজিৎ রায়ের লেখার পাঠক।
না আমি অভিজিৎ রায়ের খুনিদের ফাঁসি চাইতে আসিনি
তাঁর খুনীদের গ্রেপ্তারের দাবী জানাতেও আসিনি
আমি জানি তা আপনারা কখনো করবেন না।
তাই ঘাতকদের বিচার চেয়ে আমি আপনাদের লজ্জিত করবো না।

আমি একটা ছোট্ট দাবী নিয়ে এসেছি,
আপনারা অভিজিৎ রায়ের বই পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করুন,
এই আমার দাবী।

সত্যি বলছি,
তিনি তাঁর বইয়ে কাউকে হত্যা করার কথা বলেনি
বলেনি কারো কল্লা ফেলে দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিতে
বলেনি মন্দির মসজিদ ভাঙ্গতে
তিনি কল্পিত জান্নাতের গালগল্প করেনি
বলেনি বিধর্মীদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে
বলেনি বোমা মেরে নগরী জ্বালিয়ে দিতে
বলেনি মুসলিমদের বিদ্ধেষ করতে

তিনি সৃজনশীল, মননশীল, যুক্তিশীল, বিজ্ঞানশীল, অবিশ্বাসের দর্শন, বিশ্বাসের ভাইরাস, আর মানবিক কথাই বলেছেন।
তিনি কাউকে মিথ্যে বেহেস্তের লোভ দেখাননি।
অমানুষিক বর্বতার শিক্ষা দেননি।
কাউকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করেননি।
তিনি অন্ধকারে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন।

মাননীয় সরকার,
আমার দাবী একটাই,
তাঁর লেখা প্রতিটি শিক্ষা শ্রেনীর
পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

অভিজিতের রচণাবলী পড়ে
আগামীতে যাতে আর কোনো অভিজিৎ ঘাতক জম্ম না নেয়।

২৮–২–১৫ইং

এর দুদিন পরে লিখি—-

এখনো দুঃসহ কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। আর্তনাতগুলো যেন বুক চিরে বেরুতে চায়। ক্ষনে ক্ষনে নিউজ ফিড দেখলে অশ্রু জমে চোখ ঝাপসা হয়। প্রিয় অভিজিৎ দার এই নিঃসংশ মৃত্যু মেনে নিতে পারছিনা। এই অন্যায় মৃত্যু আমার বিবেককে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। আজ চার দিন হলো, প্রিয় অভিজিৎ দার মৃত্যুর ঘটনা এখনো আমার পিছু ছাড়েনি। আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে! আমি চাইলেও তা এড়াতে পারছিনা।
শুধুমাত্র পুরোনো জঞ্জালে ভরা ত্রুটিযুক্ত ধর্ম নিয়ে আলোচনা করায়, একজন মুক্তচিন্তার মানবিক মানুষকে যদি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তাহলে সেই খুনি ধর্মান্ধদের সভ্যযুগে বসবাস করার অধিকার আছে কি? সেই মুর্খ বর্বরদের ধর্ম ও তাদের ধর্মগ্রন্থ নিষিদ্ধ করার দাবী কি এখনো আসে নাই? যদি আসে, তাহলে কেন ইনিয়ে বিনিয়ে সেই মধ্যযুগীয় বর্বর ধর্মকে টিকিয়ে রাখা? আর কতো হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায় বলি হলে আপনারা সেই ধর্মকে প্রশ্নের সম্মুখীন করবেন? রাষ্ট থেকে ইসলামধর্ম নামাবেন? যে যাই বলুন না কেন, আপনারা চাইলেই এঁদের হত্যার দায় এড়াতে পারেননা!

একদিকে মধ্যযুগীয় আরবের মদিনা সনদের কথা বলে, আরেকদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথা বলে কোন ধরনের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আপনারা? ১৪০০ বছর আগের পুরোনো কোরানিক নিয়মের সাথে বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক নয় কি? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবাদ সাংঘর্ষিক নয় কি? আপনারা রাখেন এইসব ভন্ডামী! হিন্দু ললনার মতো পার্লারে ভ্রু প্লাক করে, দামী দামী সুন্দর সুন্দর শাড়ি পড়ে, সাংবাদিকের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কোন ইসলাম ধর্ম রক্ষা করার কথা বলছেন আপনারা? কোন নারী নের্তৃত্বের কথা বলছেন আপনারা? ইসলামে তো ছবি তোলা ও নারী নের্তৃত্ব দুটোই হারাম! এই কোন ইসলামের তরিকা আপনাদের? এটা ইসলামের সাথে রীতিমত পরিহাস করা নয় কি? ভন্ডামী আর মিথ্যা কথা বলার একটা সীমা আছে, আপনারা সেই সীমাটুকুও অতিক্রম করেছেন!

উপদেশঃ আপনারা দুই নেত্রী যখন প্রতিযোগিতা করে ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, তো ইসলামের রক্ষাকবচ শরীয়া আইন চালু করে দিন না। এটাই তো ইসলামকে রক্ষা করতে পারে। তখন দেখব আপনাদের মতো দুমুখো নেত্রীদের রাষ্টের নের্তৃত্ব দেয়ার দম আছে কিনা! বা নারীরা নের্তৃত্ব আদৌ দিতে পারেন কিনা? আর আমরাও ভাববো এদেশে এখন শরীয়া আইন চলছে, মুক্তচিন্তা টিন্তা এগুলো করা যাবেনা। আমরাও মস্তিষ্কের কপাটে তালা দিয়ে ইসলামি জীবন যাপন করবো। তখন এই শরীয়া আইনের দেশে অভিজিৎ রায়রা ও আর জম্ম নেয়ার সাহস পাবেনা। আমাদেরও চাপাতির কোপে অভিজিৎ রায়দের মৃত্যুর কষ্ট আর বয়ে বেড়াতে হবেনা।

৩–৩–১৫ইং

সেই বছরটা শোক আর আতংকে কাটল আমার। এর এক মাস পর ওয়াশিকুর বাবুকে হত্যা করা হল। এর দেড় মাস পর অনন্ত বিজয়কে হত্যা করা হল। এরপর নিলয়কে। এরপর জাগৃতির প্রকাশক দিপনকে। একই দিন শুদ্ধস্বর প্রকাশকের মালিক টুটুলকে কুপিয়ে আহত করা হল। বন্ধুরা অনেক বলতো, শুধু যেন সাবধানে থাকি। ১৫ সালটা পথে ঘাটে চলার সময় সামনের চেয়ে পেছনে থাকাতাম বেশি। এই বুঝি পেছনে চাপাতি নিয়ে কেউ কোপাতে আসছে না তো! কারন এই সালে ব্লগারদের হত্যার প্রতিবাদে আমি অজস্র লেখালেখির কারণে হেফাজত আর বাঁশেরকেল্লার টার্গেটে পরিনত হয়েছিলাম। এই অপ্রিয় কথাকে মারার জন্য বাঁশের কেল্লায় আলোচনা হতো। এর মাঝে কিছু কিছু প্রকাশক বই বের করার পরামর্শ দিতো। লেখা চাইতো বই বের করার। যেই প্রকাশনীর নাম কখনো শুনিনি। তাছাড়া আমার সাহস হতো না আমার লেখা প্রকাশ করে তাদের বিপদে ফেলার। আমি বলতাম, যদি বেনামে বই ছাপতে পারেন, তাহলে প্রকাশ করুন। আমার নাম ঠিকানা কিছুই দিতে পারবনা। লেখক হিসেবে “অপ্রিয় কথা” নামটাই দিতে পারবেন। তারা শুনে আর আগ্রহ দেখাতো না।

ইসলাম প্রীতির সরকার দেখে আর বই বের করার কথা ভাবতেই পারিনা। ১৬ সালেও ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তচিন্তার প্রকাশকদের উপর এক ঝড় বয়ে গেল। গত বছর বই মেলা থেকে বদ্বীপ প্রকাশনীর মালিক শামসুজ্জেহা মানিককে ৫৭ ধারায় গেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর অপরাধ তিনি “ইসলাম-বিতর্ক” একটি বই প্রকাশ করেছেন। যা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের শামিল! তাই বাংলা একাডেমী বদ্বীপ প্রকাশনীকে মেলায় নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। তিনি বোধহয় এখনো জেলের গ্লানি টানছেন। ১৬ সালেও বই বের করার কথা ভাবতে পারিনি। আমার বিভিন্ন সময়ের ঘটনাকে নিয়ে লেখা শত শত কবিতা নোটবুকে খাঁচার বন্দি পাখির মতো পড়ে আছে। শত শত লেখা পড়ে আছে। এগুলোকে বড় পরিসরে মুক্তি দিতে পারিনা বলে দুঃখ হয়।

এখন ফেব্রুয়ারি মাস, ২০১৭ সাল। আজ ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ ঢুকে গেল। এবারও বই বের করার কথা মাথায় আসছে না। কারণ এবারের বই মেলায় বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ চক্ষুলজ্জাহীনভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী বইকে খোঁজ করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশকে। পুলিশও বৈঠকে কথা দিয়েছে, তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী প্রকাশক, লেখক, বই বিক্রেতাকে যে কোনো মুল্যে গ্রেপ্তার করবেন। আমিও এবার চুপসে গেলাম। এবারও বই বের করার কথা ভাবব না। আমি তো আর রাষ্ট্রের, সরকারের, মুসলমানদের মন জুগিয়ে লেখা রচনা করিনা। অর্থহীন প্রেমালাপ আর তৈল মর্দনে ঠেসে দিয়ে গল্প কবিতা উপন্যাস লেখার রুচিও আমার নেই। যারা রাষ্ট্রের এসব প্রচলিত নিয়ম নীতিকে নমো নমো করে ভৃত্যের মতো মেনে নিয়ে বই বের করতে চায় করুক। যারা বাণিজ্যের আশায় অর্থহীন হাস্যকর দুচার লাইন লিখে, বইয়ের মলাটে রঙ ঢং চড়িয়ে শিশুর জন্য লিখে শিশু সাহিত্যিক হতে চায় হোক, যারা এখনো সুবিধা নিতে মুক্তিযুদ্ধের পঁচা গলা হাড়কে নিয়ে আলোচনা করে লেখক হতে চায় হোক, এসব দাসত্ব সেইসব বুদ্ধিবেশ্যাদেরই মানায়। প্রচলিত রাষ্ট উপযোগী, প্রচলিত সমাজ উপযোগী, সন্ধি করে লেখালেখি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিশোর বেলায় যখন নতুন নতুন ছড়া কবিতা লিখতাম, তখন ভাবতাম এই মহান একুশে বই মেলায় বই রচনা করে প্রকাশ করার মতো যোগ্যতা বোধহয় আমার নেই। বা আদৌ হয়নি। আর এখন আমার নির্দ্বিধায় বলতে ইচ্ছে করে যে, আমার লেখা ধারন করার ক্ষমতা সোহরাওদি উদ্যানে জুড়ে বসা গোটা গ্রন্থ মেলার নেই। যেই বইমেলার কর্তৃপক্ষ বাংলা একাডেমী মুর্খ অশিক্ষিত অসভ্য ধর্মান্ধদের কাছে হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়ে বসে আছে, সেই বইমেলা আমাদের মতো নাস্তিক অবিশ্বাসী যুক্তিবাদীদের বই ধারণ করার যোগ্যতা রাখে না! কারন বইমেলা এখন ইসলামিস্ট বর্বর ধর্মান্ধদের হাতে বন্দি। বইমেলা আসে বইমেলা যায়, আমি প্রতীক্ষায় থাকি আমাদের বই প্রকাশ করার মতো উপযুক্ত এই বই মেলার কবে হবে? দিন দিন এই মেলা এখন নির্বোধ, সুবিধাবাদী, তেল মারা লেখকদেরই দখলে যাচ্ছে। যে লেখকদের পুরোনো জঞ্জালে ভরা অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজ আর ধর্মের শৃঙ্খলকে ভাঙার কোনো দায় নেই….

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

91 − = 87