স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় নামার আগে

১.

একেবারে ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। ২০০৯-এ, আমার বয়স যখন মাত্র ১৮ বছর, আমার কিছু কাছের মানুষকে দেখতাম আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করতে। এঁরা কেউ লেফটিস্ট বা রাইটিস্ট ছিলেন না, এঁরা সেন্ট্রিস্ট মানুষ, বিএনপির রাজনীতির সমর্থক।

২০১৪ পর্যন্ত এঁদের আওয়ামী লীগ বিরোধিতা দেখেছি। ৫ জানুয়ারির ‘নির্বাচনের’ পরে এঁরা আশা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণঅসন্তোষ তৈরি হবে এবং সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য লক্ষ লক্ষ লোক রাস্তায় নামবে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।

এঁদের সেই আশা এখনো পূরণ হয় নাই। এটা ২০১৭র ফেব্রুয়ারি। ২০১৯ পর্যন্ত টিকতে পারলে এই সরকারের ১০ বছর পূর্ণ হবে, ৫ বছর বৈধভাবে নির্বাচিত হয়ে, আর বাকি ৫ বছর গায়ের জোরে।

আমার সেই কাছের লোকগুলি এখন পুরোপুরি হতাশ। বিএনপির কাছে তাঁরা কিছু আশা করেন না। ঈদের আগেও না এবং ঈদের পরেও না।

এঁরা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ দিয়েছেন। নির্লিপ্তভাবে জীবনযাপন করেন। অনেকে এমনকি আওয়ামী লীগ সরকার আরো অনেকদিন ক্ষমতায় থাকবে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কিভাবে সরকারি লোকজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করা যায় সেই চেষ্টায় রত হয়েছেন।

সব বিএনপি সমর্থক নিশ্চয়ই আশা ছাড়েন নাই। অনেকে আশা করেন একদিন তারেক রহমান আসবেন। এসে এই রাষ্ট্রের শাসনভার নিজহাতে তুলে নেবেন।

তাঁরা তাঁদের আশা নিয়ে থাকেন, তাঁদের ব্যাপার।

২.

সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামছে না কেনো? স্বৈরতন্ত্রী আইয়ুব খান বা লেজেহুমো এরশাদের বিরুদ্ধে তো গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, শেখ হাসিনাও তো তাঁদের পথেই হাঁটছেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কেনো গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে না? এই প্রশ্নটা কি আপনাদের কারো মাথায় আসে?

আমার মাথায় আসে।

এইসব প্রশ্নের জবাব দেয়ার যেহেতু কেউ নেই, তাই, নিজে নিজেই এই প্রশ্নের একটা জবাব খুঁজে বের করেছি। ভুল না সঠিক সেটা বলতে পারবো না। সামাজিক চুক্তিতে ফরাশি দার্শনিক রুশো বলেছিলেন কেউ যখন কোনো মতামত দেয় তখন যেনো শুধু নিজের মতটাই দেয়, অন্যের হয়ে মতামত দিতে না যায়, এই উপদেশটুকু মাথায় রেখে আমি যা ভাবি শুধু সেটাই বলছি।

স্বৈরতান্ত্রিক স্বভাবের জায়গায় আইয়ুব খান আর লেজেহুমো এরশাদের সাথে শেখ হাসিনার বিন্দুমাত্র ফারাক না থাকলেও অন্য কিছু জায়গায় তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাক আছে।

প্রথমত, খান আর এরশাদ দুজনেই সামরিক শাসক ছিলেন, সামরিক বাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও শেখ হাসিনা সিভিলিয়ান শাসক।

দ্বিতীয়ত, খান বা এরশাদের পোষা রাজনৈতিক দল থাকলেও, কনভেনশন মুসলিম লিগ বা জাতীয় পার্টির তেমন কোনো গভীরপ্রোথিত সামাজিক ভিত্তি ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেরকম না। আওয়ামি লিগের গভীরপ্রোথিত সামাজিক ভিত্তি আছে, বিএনপির যেমন আছে, এই দুটি দলই সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন পায়।

অন্য একটা দিক থেকে চিন্তা করা যাক।

আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দুই অংশেই ছাত্র-শ্রমিক বিক্ষোভ এবং সেই সূত্রে গণঅভ্যুত্থান হলেও পূর্ব বাংলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন অনেক বেশি তীব্র ছিল। কারণ পাকিস্তানের পাঞ্জাবকেন্দ্রিক শাসকদের সাথে পূর্ব বাংলার জনগণের আর্থসামরিক স্বার্থের ব্যাপক বিরোধ ছিল। অর্থাৎ জনমানসে একটা জাতীয় শোষণনিপীড়ণের অনুভূতি ছিল।

লেজেহুমো এরশাদের সময় বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। অন্তত কাগজে কলমে। তাই সে যতো নির্মমই হোক না কেনো, কপটই হোক না কেনো, তাঁকে আর যাই হোক ‘জাতির দুশমন’ বলে মনে হয় নি। তদুপরি সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আর পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পড়ো পড়ো দশা, তৃতীয় বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর আগের মতো সামরিক মিত্রের প্রয়োজন নাই, নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় সে তখন ডেমোক্রেসি প্রমোশনের নতুন মিশন নিয়েছে। সামরিক শাসক এরশাদকে সরিয়ে আওয়ামি লিগ ও বিএনপির নেতৃত্বে যে দ্বিদলীয় সংসদীয় ‘গণতন্ত্র’ বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে তা তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে লেফটিস্টরাও ছিলেন, তাঁরা গণমানুষের ক্ষমতায়নের চিন্তা করেছেন, কিন্তু সেটা আন্দোলনের মূলধারায় পরিণত হতে পারে নি। গণমানুষের ক্ষমতায়নের আদর্শ খুব ভালো জিনিশ, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তববাদের একটা নির্মম শিক্ষা হল, ক্ষমতার রাজনীতির মূলধারায় পরিণত হতে না পারলে খুব ভালো আদর্শও কোনো কাজে আসে না।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন একটা যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে পেরেছিল বড়ো দুই দল অপজিশনে থাকার কারণে। আওয়ামি লিগ ও বিএনপি চেয়েছিল দ্বিদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র – এর বেশি কিছু চায় নি – এবং তারা তা পেয়েছিল। যারা বেশি কিছু চেয়েছিলেন কিছুই পান নি, জনগণ কি পেয়েছে, সেই বিবেচনার ভার আপনাদের ওপর তোলা থাকলো।

৩.

শেখ হাসিনা ষাটের দশকের পাকিস্তানি শাসক না। শেখ হাসিনা আশির দশকের সামরিক শাসকও না। তিনি স্বৈরশাসক, হ্যাঁ, কিন্তু ‘বাংলাদেশি ও বেসামরিক’।

তদুপরি তার একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আছে।

শুধু তাই না, কিছুটা ঐতিহাসিক কারণে আর কিছুটা স্বার্থপরতার কারণে, বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতের একটা বড়ো অংশ আওয়ামী লীগপন্থী। অনেকেই হয়তো যে-কোনো পালাবদলে সাইড চেইঞ্জ করবে, সবাই করবে না, সবাই করে না। এঁদের অনেকের কাছে আওয়ামী লীগ করা ধর্ম, আর ধর্ম সবাই টাকাপয়সার জন্য করে না, বিশ্বাসের কারণে করে।

আইয়ুব খান বা এরশাদের পক্ষেও অনেকে ‘সংস্কৃতিচর্চা’ করেছে, কিন্তু সেটার প্রায় পুরোটাই ছিল নিছক স্বার্থপরতা, বিশ্বাস না।

এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা শেখ হাসিনাকে পছন্দ না করলেও ঐতিহাসিক কারণে ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের’ প্রতি অন্ধ মোহ পোষণ করেন, এমনকি এঁদের মৌনতাও আওয়ামী লীগের জন্য সম্মতির লক্ষণ।

শেখ হাসিনার এরকম কিছু এডভান্টেজ আছে, যা তার আগের দুই স্বৈরশাসকের ছিল না।

৪.

সময়ও রাজনীতির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর।

ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকাংশ বাঙালি পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিজেদের শোষিতনিপীড়িত বোধ করেছে, পাশাপাশি বাঙালি বুদ্ধিজীবী রেহমান সোবহান আনিসুর রহমান আখলাকুর রহমান রওনক জাহানরা মিলে টু ইকোনমি তত্ত্ব বানিয়েছেন, এসবেরই রাজনৈতিক ফল ১৯৭১। আইয়ুবশাহির বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দাবিতেই মানুষ নেমেছিলো রাস্তায়, কিন্তু কারো কারো বুকের ভেতরে, স্বাধীনতার আকাঙ্খাও নিশ্চয়ই জন্ম নিচ্ছিল। হয়তো তা তখনো কোনো আকার পায় নি, ভ্রুণ অবস্থায় ছিল, কিন্তু ছিল না এটা বলা যায় না।

তাই আসাদের শাহাদাত কালক্রমে আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে।

আশির দশকে সামরিক শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছিল, কারণ সংসদীয় ‘গণতন্ত্র’ বলতে যা বুঝায়, তাঁর স্বাদও বাংলাদেশের জনগণ তাঁর প্রথম বিশ বছরে পায় নি। একানব্বইয়ের আগে এই দেশে যতো ইলেকশন হয়েছে, সব ভুয়া ছিলো, সব লোকদ্যাখানো ছিল। মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তার সূচনাও অই একানব্বইয়ের নির্বাচনের মাধ্যমেই হয়।

তাই নূর হোসেনের শাহাদাত আমাদের ‘গণতন্ত্র’ দিয়েছে।

আসাদ আর নূর হোসেন জীবন দিয়েছেন, তবে তার বিনিময়ে, তাঁরা পেয়েছেন পোস্টমর্টাল ফেম। আমি চলে যাবো, কিন্তু আমার নাম ইতিহাসে থেকে যাবে, এই আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই থাকে। থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

আজকে আপনি কি পাওয়ার জন্য রাস্তায় নামবেন? আজকে আপনি কি পাওয়ার জন্য জীবন দেবেন? কেনো শহিদ হবেন? আপনি শহিদ হলে জনগণের কি লাভ হবে? জনগণ কি পাবে? তাঁরা ‘স্বাধীনতা’ পাবে? নাকি ‘গণতন্ত্র’ পাবে?

৫.

আমি জানি আমাদের স্বাধীনতার প্রায় পুরোটাই নামকাওয়াস্তে। ইন্ডিয়া আমাদের সীমান্তে ধারাবাহিকভাবে মানুষ মেরে এবং নদীগুলোকে হত্যা করে বাংলাদেশকে ঘেরাও করে রাখছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালনা করছে নিম্ন তীব্রতার যুদ্ধ, মীরজাফরের ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের শাসকরা। আবার বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়া দুই রাষ্ট্রের শাসকদের মাথার ওপরই বসে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমি এটাও জানি বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটা রসিকতা। যেই দেশের বড়ো দলদুটির শাসকরা সমগ্র দেশটাকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করেন, আর তাঁদের পুত্ররা আচরণ করেন যুবরাজের মতো, সেই দেশে গণতন্ত্র একটা হাস্যকর শব্দ। ২০১৪তে আমরা স্রেফ ভোট দেয়ার অধিকার হারিয়েছি। ভোটাধিকার জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, একমাত্র গণতান্ত্রিক অধিকার না, এবং ২০১৪র আগে ভোটাধিকার ছাড়া আর কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার আমাদের ছিল না।

৬.

ধরেন, শুরুতে আমার যেসব বিএনপি সমর্থক কাছের মানুষের কথা বলছিলাম, তাঁদের আশা শেষ পর্যন্ত স্বার্থক হয়ে গেলো। তারেক রহমান বাংলাদেশে এলেন, তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি অভূতপূর্ব এক গণআন্দোলন করলো, এবং আওয়ামি লিগ সরকারের পতন ঘটলো। বিএনপি ক্ষমতায় গেলো। তারপর কি হবে? ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিএনপির কি কর্মসূচি আছে? মার্কিন মাতব্বরির বিরুদ্ধে বিএনপির কি কর্মসূচি আছে? বাংলাদেশের ওপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের আধিপত্য অব্যাহত রেখে শুধু শাসক পাল্টানোর জন্য এই একুশ শতকে বাংলাদেশের জনগণ জীবন দেবে না, দেয়া উচিত না, এবং কেউ যদি বলে দেয়া উচিত তাহলে আমি তাঁকে ঠাণ্ডা মাথার প্রতারক হিসেবে গণ্য করবো।

৭.

আজকে আমরা যদি স্বাধীনতার কথা বলি, গণতন্ত্রের কথা বলি, তাহলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য যে-কোনো আন্দোলনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এবং এদের সহযোগী লীগ-বিএনপির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটা ষাটের দশক বা আশির দশক না। “রাস্তায় নামো রাস্তায় নামো” বলে চেঁচালেই কেউ রাস্তায় নামবে না, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি রূপরেখা যদি সামনে না থাকে, তাহলে শুধুই সরকার ফেলে দিতে কেউ রাস্তায় নামবে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − = 19