হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০৬

“অন্তবিষঃ ময়া-হোতা…বহির্ভাগে মনোরমাঃ।
গুঞ্জাফল সমাকারা ঘোষিতঃ সর্বদৈবহি”। – স্কন্ধপুরাণ নাগরখণ্ড শ্লোক নং ৬১।

অর্থাৎ নারী জাতি সর্বদাই গুঞ্জাফলের ন্যায় বাইরে মনোহর। নারীর অধরে পীযুষ আর হৃদয়ে হলাহল, এ জন্যই তাদের অধর (ঠোঁট) আস্বাদন এবং হৃদয়ে পীড়ন (প্রহার) করা কর্তব্য।

নারীর শুধু হৃদয়ে পীড়ন করাই নয়,শতপথ ব্রাহ্মণের ৪/৪/২/১৩ নং শ্লোকে : নারীকে শারীরিক নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে।
“বজ্র বা লাঠি দিয়ে মেরে নারীকে দুর্বল করা উচিৎ, যাতে নিজের দেহ বা সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার থাকতে না পারে”।

বৃহদারণ্যকোপনিষদে ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলেন :

“স্ত্রী স্বামীর সম্ভোগকামনা চরিতার্থ করতে অসম্মত হলে প্রথমে উপহার দিয়ে স্বামী তাকে ‘কেনবার’ চেষ্টা করবে, তাতেও অসম্মত হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে নিজের বশে আনবে।” (দ্রষ্টব্য : ৬/৪/৭, ১/৯/২/১৪)।

মনুসংহিতাতে মনু ঘোষণা দেন (৯:৩) :

“পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি”।

অর্থাৎ স্ত্রীলোককে কুমারী জীবনে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করে; স্ত্রীলোক (কখনও) স্বাধীনতার যোগ্য নয়।
আবার একটু পরেই বলা হয়েছে (৯:৮৮) :

“উৎকৃষ্টায়াভিরূপায় বরায় সদৃশায় চ/
অপ্রাপ্তামপি তাং তস্মৈ কন্যাং দদ্যাদ্ যথাবিধি।”

অর্থাৎ কুলে আচারে উৎকৃষ্ট, স্বজাতি ও স্বরূপী বর পাইলে কন্যা বিবাহযোগ্য না হলেও তাকে যথা-বিধানে সম্প্রদান করিবে।(হিন্দু ধর্মে মনু বাল্য বিবাহ জায়েজ করে দিয়েছেন।)

‘সম্প্রদান’ মানে কি? মানে হচ্ছে বস্তু বা মালের মালিকানা বা স্বত্বাধিকার বদল। নারী প্রথমে তার পিতার মাল এবং বিয়ের পরে তার স্বামীর মাল। বিবাহিত নারীর ওপর তার স্বামীর আজীবন মালিকানা থাকে। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরেও সে তার মৃত স্বামীর সম্পদ থেকে যায়।নারী যে মাল বা জিনিষ বা সম্পদ তা আমরা আগেই জেনেছি পঞ্চপান্ডবের কাছ থেকে। তারা দৌপদীকে ঘরে নিয়ে এসে তাদের মাকে বলেছিলেন ‘দেখো মা কি জিনিষ নিয়ে এসেছি। বাল্যবিবাহ বিধিসম্মত কিন্তু বিধবা নারীর দ্বিতীয় বিবাহ হিন্দু-শাস্ত্রমতে মহাপাপ।

মনুর দৃষ্টিতে নারী ছিল গাভীর মতো। মনু বলেন

(৯:৫০) : “যেমন গবাদি গর্ভে উৎপন্ন বৎস গো-স্বামীর (গাভীর স্বামী) হয়, তেমন পর পুরুষে উৎপাদিত সন্তান উৎপাদকের হয়না, ক্ষেত্রীরই হয়।”

পরবর্তী শ্লোকে মনু বলেন :

“তথৈবাক্ষেত্রিণো বীজং পরক্ষেত্রপ্রবাপিণঃ
কুর্ব্বন্তি ক্ষেত্রিণামর্থং ন বীজী লভতে ফলম্”।

অর্থাৎ, যদি কোনো স্ত্রীর স্বামী পরস্ত্রীতে বীজ বপন করে ঐ স্ত্রীর পতির অর্থ সৃষ্টি করে; যার বীজ সে ফল লাভ করে না।

কারণটা পরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শ্লোক (৫২ নং)তে বলা হয়েছে :

“ফলন্ত্বনভিসন্ধায় ক্ষেত্রিণাং বীজিনাং তথা
প্রত্যক্ষং ক্ষেত্রিণামর্থো বীজাদ্ যোনির্গরীয়সী”।

অর্থাৎ, নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে এই স্ত্রীতে উৎপন্ন সন্তান ক্ষেত্রী ও বীজ উভয়ের হবে বলে অভিসন্ধি না থাকলে উৎপাদিত সন্তান প্রত্যক্ষরূপে ক্ষেত্রীরই হবে, কারণ বীজ অপেক্ষা যোনিই প্রধান।‘বীজ অপেক্ষা যোনিই প্রধান’ কথাটার দ্বারাই বুঝা যায় মনুর দৃষ্টিতে নারীর মুল্যায়ণ।

‘নিয়োগ প্রথা’ কী? ‘নিয়োগ প্রথায়’ স্বামীর মৃত্যুর পর বিবাহ ছাড়া দেবর অথবা অন্য পুরুষ দ্বারা সন্তান উৎপাদন করানো মনুসংহিতাসহ হিন্দু ধর্মের আরেক ধর্মগ্রন্থ মহাভারত অনুযায়ী বৈধ। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে (৯:৫৯) :

“দেবরাদ্বা সপিণ্ডাদ্বা স্ত্রীয়া সম্যঙ্ নিযুক্তয়া
প্রজেস্পিতাধিগন্তব্যা সন্তানস্য পরিক্ষয়ে।”

অর্থাৎ, সন্তানের অভাবে স্ত্রী,পতি বা গুরুজন কর্তৃক নিযুক্ত হইয়া দেবর অথবা অন্য যেকোনো সপিণ্ড হইতে অভিলাষিত সন্তান লাভ করিবে। এর একটি উদাহরণ আছে কাশিরাম দাস কর্তৃক অনুবাদিত মহাভারতের আদিপর্বে:

“শান্তনু রাজার পুত্র বিচিত্রবীর্য যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। ফলে তার মাতা মৎস্যগন্ধা (পরবর্তীকালে সত্যবতী) বংশরক্ষার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় তিনি স্বপত্নী গঙ্গার পুত্র ভীষ্মদেবকে আহ্বান করেন এবং কনিষ্ঠ পুত্র বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা স্ত্রী যথাক্রমে অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে পুত্রোৎপাদনের প্রস্তাব করেন। ভীষ্মদেব ইতিপূর্বে কোনো কারণে জীবনে বিবাহ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তাই পুত্রোৎপাদনে ভীষ্মদেব অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। অনন্যোপায় হয়ে সত্যবতী অবিবাহিত অবস্থায় পরাশর মুণির ঔরসে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন (আরেক নাম বেদব্যাস) নামে যে তার (জারজ?) সন্তান হয়েছিল তাকে আহ্বান করেন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন মায়ের আদেশ পালনার্থে তাতে সম্মতি জানান এবং তার দুই ভ্রাতৃবধু ও তাদের দাসীর গর্ভে একটি একটি করে মোট তিনটি পুত্রের অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুরের জন্ম দান করেন’।

অন্যত্র মনু ভ্রাতৃবধূকে দেবরের মা এবং দেবরকে ভ্রাতৃবধূর ছেলে হিসেবে সম্মান দেখাতে বলেছেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর কিংবা ভাইয়ের সন্তান না থাকলে ভাতৃবধুর সাথে পুত্রোৎপাদনের জন্য সঙ্গম করার কথাও বলা হয়েছে। (৯:৫৯)। মনুর ভাষ্যানুযায়ী তাহলে তো পরোক্ষভাবে মায়ের সাথেই সঙ্গম করা। আর এ কাজটি চলতে থাকবে, পুত্রোৎপাদনে যতদিন সময় লাগে ততদিন পর্যন্ত। মনু বলছেন (৯:৫৭):

“ভ্রাতুর্জ্যষ্ঠেস্য ভার্য্যা যা গুরুপত্ম্যনুজস্য সা।
যবীয়সস্তু ভার্য্যা যাষা জ্যেষ্ঠস্য সা স্মৃতা”।

অর্থাৎ জ্যেষ্ঠ সহোদর ভ্রাতার স্ত্রী হলো, কনিষ্ঠ ভ্রাতার গুরুপত্নী অর্থাৎ মাতৃতুল্য, এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পুত্রবধূতুল্য’।

এবার পুত্রোৎপাদনের জন্যে কনিষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গম হবে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী মাতৃতুল্য বিধবার সঙ্গে আর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গম হবে পুত্রবধূতুল্য কনিষ্ঠ ভ্রতার বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে। বিষয়টি উল্টোভাবেও করা যায় যেমন, একজন সন্তানহীন বিধবা পুত্রোৎপাদনের জন্যে তার পুত্রতুল্য দেবরের সাথে এবং একজন সন্তানহীন বিধবা পিতৃতুল্য তার স্বামীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সাথে সঙ্গমের প্রস্তাব করতে পারবেন। এ বিশেষ সঙ্গমটি কীভাবে হবে তাও ভগবান মনু বলে দিয়েছেন (৯:৬০) :

“বিধবায়াং নিযুক্তস্তত্ ঘৃতাক্তো বাগ্যতো নিশি
একমুৎপাদয়েৎ পুত্রং ন দ্বিতীয়ং কথঞ্চন।”

অর্থাৎ বিধবাতে নিযুক্ত হইয়া ঘৃতাক্ত-শরীরে, মৌনতা অবলম্বন করতঃ, রাত্রিবেলা, একটিমাত্র পুত্রোৎপাদন করিবে।কদাচ দ্বিতীয় পুত্রোৎপাদন করিবে না।

গভীর অন্ধকারে পুত্রোৎপাদন করার জন্যে নিশিথ রাতের অর্থ বুঝা গেল, কিন্তু নারীকে মৌনতা অবলম্বন আর তার শরীরকে ঘৃতাক্ত করার মা’নেটা কি? মা’নে হতে পারে, নিঃসংকোচে যৌনকার্য চালিয়ে নিখুত সন্তান লাভ করা। তাইতো মহাভারতে আমরা দেখতে পাই :

“বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে পুত্রোৎপাদনের জন্যে যখন মহাপুরুষ বেদব্যাসকে নিয়োগ করা হয় তখন অম্বিকা ভয়ে চক্ষু মুদ্রিত করেছিল এবং অম্বালিকার অন্তর ভীত-সন্ত্রস্থ হয়েছিল। ফলে অম্বিকার গর্ভে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের এবং অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডুরোগগ্রস্ত পাণ্ডুর জন্ম হয়। নবজাত পুত্রদ্বয়ের এই অবস্থা দেখে সত্যবতী খুবই দুঃখ পেলেন। তিনি পুত্র বেদব্যাসকে অম্বিকা অথবা অম্বালিকার গর্ভে গন্ধর্বের মতো সুন্দর পুত্রোৎপাদনের জন্যে অনুরুধ করেন। কিন্তু অম্বিকা ও অম্বালিকা উভয়েই তাতে অসম্মতি জানান এবং উভয়ে পরামর্শ করে নিজেদের জনৈক শূদ্রাণীকে (দাসী) রত্নালঙ্কারে সুসজ্জিতা করতঃ অম্বিকার বিছানায় শয়ন করান। যেহেতু বেদব্যাসের সাথে সঙ্গমের সময় এই দাসীর মনে কোনো দ্বিধাসংকোচ বা ভয় ছিল না অতএব তার গর্ভে এক সুন্দর পুত্রের জন্ম হয়। যার নাম রাখা হয় ‘বিদুর’’।

এখানে রাতের পর রাত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্তৃক কনিষ্ঠ ভ্রাতার বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে রতিক্রিয়ার পরেও সে হয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ‘পুত্রবধূ’, আর ওদিকে নবী মুহাম্মদ তার পালক পুত্র জায়েদ জীবিত থাকাকালেই ‘আল্লাহর অনুমতি’ নিয়ে এসে পুত্রবধূ জয়নাবকে বিয়ে করে তার সাথে আজীবন রতিক্রিয়া করেন। (সুরা ৩৩, আহজাব, আয়াত ৩৭ দ্রষ্টব্য)। অবশ্য নবী মুহাম্মদের পরে তাঁর কোনো উম্মত অদ্যাবধি এই ধরনের কাজ করেছেন বলে কখনো জানা যায়নি।

সুহৃদয় ভগবান মনু বিধবা নারীদের দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি দিয়েছেন একটি শর্তে। শর্তটি হলো স্বামীর মৃত্যুকালে যদি তার (নারীর) যোনি অক্ষত থাকে। (৯:১৭৬) কীভাবে সম্ভব? সম্ভব এভাবেই যদি ঐ নারীর কোনো নপুংসক পুরুষের সাথে বিয়ে হয়, অথবা বাগ্দত্তা কন্যার পতি মৃত হয়, কিংবা বিয়ের সাথে-সাথেই স্বামী মারা যায়, বা মৃত ব্যক্তির সাথে বিয়ে হয়। মৃত ব্যক্তির সাথে বিয়ে! হায় ধর্ম, কিন্তু বিধি বাম। বিধবাদের এই সুখটুকুও পরাশর মুনির সইলো না। নিয়োগ প্রথা বা দেবরাদির দ্বারা সন্তানোৎপাদনের কাজ যতই ঘৃণ্য, অশ্লীল এবং ন্যাক্যারজনক হোক না কেন, তা চালু থাকায় হতভাগিনী বিধবাদের স্বাভাবিক শারীরিক যৌন চাহিদা নিবারণের কাজ চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মহামুনি পরাশর সেটাও সহ্য করতে পারলেন না, তিনি তাঁর আইনে (পরাশর সংহিতা) ঘোষণা দিলেন, ‘অশ্বমেধ, গোমেধ যজ্ঞ, সনড়বাস অবলম্বন, মাংস দ্বারা পিতৃশ্রাদ্ধ এবং দেবরের দ্বারা পুত্রোৎপাদন এই পাঁচটি কলিকালে বর্জন করতে হবে’।

নারীকে ভোগের ব্যাপারে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য পরিষ্কার। ‘পুরুষ যখন যেভাবে চাইবে নারীকে ভোগ করবে।’ সঙ্গমাসন কেমন হবে তাও নির্ধারণ করবে পুরুষ, এখানে নারীর পছন্দ অমার্জনীয় পাপ। পুরুষের লিঙ্গ জীবন্ত-সক্রিয় বীজ আর নারীর যোনি প্রাণহীন আবাদভূমি। চাষী তার জমিতে চাষ করবে তার ইচ্ছেমত যখন-তখন। নারীর যোনি যে পুরুষের চাষক্ষেত্র, এ ব্যাপারে ভগবান মনুর সাথে নবি মুহাম্মদের মতের মিল আছে, কোরানে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মনুর চোখে নারী জাতী পুরুষের উপভোগ্য ‘সম্পদ’ বই কিছু নয় এবং নারীগণ কেবলই মিথ্যা পদার্থ।

মনুসংহিতা্র ৯ম অধ্যায় শুধু নয় এ ধর্মের প্রতিটি গ্রন্থের পাতায় পাতায় রয়েছে নারী অপমানের সাক্ষী। বিভিন্ন কুৎসিত বিশেষণে তারা আখ্যায়ীত করেছেন নারীকে। মনুসংহিতা পর্ব শেষ করার আগে আমাদের প্রয়াত মুক্তমনা লেখক অনন্ত বিজয় দাশের ‘সনাতন ধর্মে’র দৃষ্টিতে নারী’ শিরোনামের লেখাটির উপর কিছুটা আলোচনা করতে চাই। অনন্ত বিজয় দাশ লিখেছেন;

“সনাতন হিন্দু ধর্মের তথাকথিত প্রগতিশীল লোকেরা সময়-সুযোগ পেলেই বড়াই করে বলে বেড়ান,হিন্দু ধর্মে নাকি নারীদের যথেষ্ট স্বাধীনতা-সম্মান দেয়া হয়েছে; নারীদের মাতৃজ্ঞানে এ ধর্মে পূঁজা করা হয়; হিন্দু নারীরা অন্যান্য ধর্মের তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল! এ ধরনের বক্তব্য প্রচারের কারণ আছে; পশ্চিমা সামাজ্যবাদের বর্তমান চক্ষুশুল ইসলামি মৌলবাদ নিয়ে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো ব্যস্ত থাকায় ফাঁক দিয়ে সুযোগ বুঝে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের ধর্মকে প্রগতিশীল, যুগোপযুগী, নারী স্বাধীনতার পক্ষে—ইত্যাদি তকমা ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন”।

অনন্ত বিজয় দাশ লেখাটি লিখেছিলেন ২০১০ সালে, তখনই বুঝতে পেরেছিলেন মডারেইট হিন্দুদের দুরভিসন্ধি। তারা নিজের ধর্মগ্রন্থের দিকে চেয়ে দেখেন না, অথচ অন্যের ধর্মের সরা-শরিয়ত, রীতি নীতি, বিধি বিধান, নিয়ম কানুন সব তাদের নখদর্পনে। কোরানের কোন আয়াত নারীকে প্রহার করতে বলেছে, হাদিসের কোন বিধানে ধর্ষণের কী শাস্তি আর জিনার কি শাস্তি সব তাদের মুখস্ত। কিন্তু নিজের কিতাবগুলোর দিকে একবার তারা তাকিয়ে দেখলেন না। তাকালে নিশ্চয়ই দেখতে পেতেন তাদের ধর্মগ্রন্থের বিধি বিধান সমুহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে আমানবিক। অনন্ত বিজয় দাশ লিখেছেন;

“শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে তুলনা করা হয়েছে এভাবে, ‘সে ব্যক্তিই ভাগ্যবান, যার পশুসংখ্যা স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশি” (২/৩/২/৮)। শতপথ ব্রাহ্মণের এ বক্তব্যকে হয়তো দরদী ধর্মবাদীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে যৌক্তিকতা দিতে চেষ্টা করবেন, কিন্তু পরের আরেকটি শ্লোকে পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান; “বজ্র বা লাঠি দিয়ে নারীকে দুর্বল করা উচিৎ, যাতে নিজের দেহ বা সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার না থাকতে পারে” (৪/৪/২/১৩)। এর থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্যের আর প্রয়োজন আছে? বৃহদারণ্যকোপনিষদে ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলেন,

“স্ত্রী স্বামীর সম্ভোগকামনা চরিতার্থ করতে অসম্মত হলে প্রথমে উপহার দিয়ে স্বামী তাকে ‘কেনবার’ চেষ্টা করবে, তাতেও অসম্মত হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে নিজের বশে আনবে” (৬/৪/৭, ১/৯/২/১৪)।

দেবীভাগবত-এ নারীর চরিত্র সম্পর্কে বলা আছে

(৯:১): “নারীরা জোঁকের মত, সতত পুরুষের রক্তপান করে থাকে। মুর্খ পুরুষ তা বুঝতে পারে না, কেননা তারা নারীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। পুরুষ যাকে পত্নী মনে করে, সেই পত্নী সুখসম্ভোগ দিয়ে বীর্য এবং কুটিল প্রেমালাপে ধন ও মন সবই হরণ করে।”

বাহ্! হিন্দুরা না-কি মাতৃজ্ঞানে দেবীর (দূর্গা, কালি, মনসা, স্বরসতী, লক্ষী) পূজা করে? ‘নারী’ সম্পর্কে যাদের ধর্মীয় বিধানে এমন হীন বক্তব্য রয়েছে, তারা দেবীর পূজা করলেই কী আর না-করলেই কী”?

বৃহদারণ্যকোপনিষদের(৬/৪/৭) এ বাক্যটি হুবহু কোরানের ৪নং সুরা নিসার ৩৪ নং আয়াত হয়ে গেলোনা? স্ত্রীকে প্রহার করার আয়াত নিয়ে দুনিয়া তোলপাড় করার আগে নিজের ধর্মে কী লেখা আছে তা জানবেন না? ‘পত্নী সুখসম্ভোগ দিয়ে বীর্য এবং কুটিল প্রেমালাপে ধন ও মন সবই হরণ করে’ এমন আশ্লীল বাক্যও কোনো ধর্মগ্রন্থে থাকতে পারে? অনন্ত বিজয় দাশ তার প্রবন্ধে আরো লিখেন;

“হিন্দু আইনের মূল উৎস হচ্ছে এই ‘মনুসংহিতা’ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচ্য। এই ধর্মগ্রন্থে নারীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে,“বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদিকঃ স্মৃতঃ/পতিসেবা গুরৌ বাসো গৃহার্থোহগ্নিপরিক্রিয়া॥” (২:৬৭), অর্থাৎ স্ত্রীলোকদের বিবাহবিধি বৈদিক সংস্কার বলে কথিত, পতিসেবা গুরুগৃহেবাস এবং গৃহকর্ম তাদের (হোমরূপ) অগ্নিপরিচর্যা; আবারও বলে দেয়া হয়েছে নারীর কর্তব্য গৃহকর্ম এবং সন্তান উৎপাদন (৯:২৬)। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যই নারী এবং সন্তান উৎপাদনার্থে পুরুষ সৃষ্টি হয়েছে (৯:৯৬)। যে সকল নারী একদা বৈদিক মন্ত্র-শ্লোক পর্যন্ত রচনা করেছিলেন, তাদের উত্তরসূরীদের জন্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত-অমন্ত্রক (২:৬৬); নারী মন্ত্রহীন, অশুভ (৯:১৮)। কন্যা, যুবতী, রোগাদি পীড়িত ব্যক্তির হোম নিষিদ্ধ এবং করলে নরকে পতিত হয় (১১:৩৭)! স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে (৫:১৫৪)“বিশীলঃ কামবৃত্তো বা গুণৈর্বা পরিবর্জিতঃ/উপচর্যঃ স্ত্রিয়া সাধ্ব্যা সততং দেববৎ পতিঃ॥” বাংলা করলে দাঁড়ায়, স্বামী দুশ্চরিত্র, কামুক বা নির্গুণ হলেও তিনি সাধ্বী স্ত্রী কর্তৃক সর্বদা দেবতার ন্যায় সেব্য। পরবর্তী শ্লোকে রয়েছে, কোনো নারী (স্ত্রী) যদি স্বামীকে অবহেলা করে, ব্যভিচারিণী হলে সংসারে তো নিন্দিত হবেই সাথে-সাথে যক্ষা, কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়, শুধু তাই নয় পরজন্মে শৃগালের গর্ভে জন্ম নিবে সেই নারী (৫:১৬৩-১৬৪)। স্ত্রীদের জন্য স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো ব্রত বা উপবাস নেই, শুধু স্বামীর সেবার মাধ্যমেই নারী স্বর্গে যাবে (৫:১৫৫)। সাধ্বী নারী কখনো জীবিত অথবা মৃত স্বামীর অপ্রিয় কিছু করবেন না (৫:১৫৬)।

এ যেন কোনো মুফতির লেখা ‘স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য’ কিংবা মকসুদুল মুমেনিন বা বেহেস্তের কুঞ্জি’ জাতীয় কোনো ইসলামিক বই পড়া হলো। একই কথা একই দৃষ্টিভঙ্গী। নারীর কোনোই গুন নেই সকল গুনের অধিকারী একমাত্র পুরুষ, তবে শুধু ব্রাহ্মন পুরুষ। অনন্ত বিজিয় দাশ পরতবর্তিতে লিখেন;

“নারীর গুণাবলী নিয়ে মনু বলেন, নারীর কোনো গুণ নেই, নদী যেমন সমুদ্রের সাথে মিশে লবনাক্ত (সমুদ্রের গুণপ্রাপ্ত) হয়, তেমনই নারী বিয়ের পর স্বামীর গুণযুক্ত হন (৯:২২)। নারীর স্বাধীনতা সম্পর্কে মনুর সংহিতাতে বলা আছে : “অস্বতন্ত্রাঃ স্ত্রিয়ঃ কার্য্যাঃ পুরুষৈঃ স্বৈর্দ্দিবানিশম্/ বিষয়েষু চ সজ্জন্ত্যঃ সংস্থাপ্যা আত্মনো বশে॥” (৯:২), অর্থাৎ স্ত্রীলোকদের স্বামীসহ প্রভৃতি ব্যক্তিগণ দিনরাত পরাধীন রাখবেন, নিজের বশে রাখবেন…; নারী সম্পর্কে ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে আছে সমগ্র মনুসংহিতা জুড়েই; নারীনিন্দায় মনুসংহিতা শ্লীলতার সীমা অতিক্রম করে গেছে। মনুর দৃষ্টিতে নারী স্বভাব ব্যভিচারিণী, কামপরায়ণা; কাম, ক্রোধ, পরহিংসা, কুটিলতা ইত্যাদি যত খারাপ দোষ আছে, সবই নারীর বৈশিষ্ট্য, এসবই দিয়ে নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে! তবু সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এসব কিছুই নজরে আসে না, তাঁরা উদয়-অস্ত খুঁজে বেড়ান ইসলামধর্ম, খ্রিস্টানধর্ম, বৌদ্ধধর্ম নারীদের কোন্ অধিকার দিয়েছে, আর কোন্ অধিকার দেয়নি! আলোচনায় মশগুল কোথায় কোন মুসলিম দেশে নারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার ফতোয়া দেয়া হল, বোরকা চাপিয়ে দেয়া হল, কিংবা কোথায় হিল্লা বিয়েতে নারীকে বাধ্য করা হল! এ নিয়েই তাদের মাথা-ব্যাথা! হিন্দুধর্মের এমন স্ববিরোধী, মানবতাবিরোধী, নারী-বিদ্বেষী চরিত্র জানার পরও কোন্ যুক্তিতে হিন্দুধর্মকে আধুনিক-প্রগতিশীল দাবি করা হয়? নারীর প্রতি এতো বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা আর কোনো ধর্মে আছে কি-না আমার জানা নেই? ধর্মগুরু, ঈশ্বরতুল্য মনু ঠিক কী পরিমাণ নারী-বিদ্বেষী হলে বলতে পারেন : “নৈতা রূপং পরীক্ষন্তে নাসাং বয়সি সংস্থিতিঃ/সুরূপং বা বিরূপং বা পুমানিত্যেব ভুঞ্জতে॥“ (৯:১৪), অর্থাৎ “যৌবনকালে নারী রূপ বিচার করে না, রূপবান বা কুরূপ পুরুষ মাত্রেই তার সঙ্গে সম্ভোগ করে।”

এতোটুকু পড়ার পর পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইসলাম ধর্মের শরিয়তের মসলা মাসায়েল ও বিধান সম্পর্কিত কিতাবাদী আর হিন্দু ধর্মের কিতাবগুলোর মধ্যে মূলত কোনোই পার্থক্য নেই। সেই নারীকে প্রহার করা, নারীকে পর্দা করা, নারীকে গৃহবন্ধী করে রাখা সবই তো আছে এই গ্রন্থে। আধুনিক মুসলমান নামের একদল মুসলমানের আবির্ভাব হয়েছে তারা হাদিসগ্রন্থ সমুহের অনুপুযোগীতা, অসামঞ্জস্যতা বুঝতে পেরে কোরানকেই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ ও বিধান বলে নিজেদেরকে ‘কোরান অনলি’ বলে দাবী করেন। হিন্দুদের মধ্যেও একদল আধুনিক ধর্মবাদী নাজিল হয়েছেন তারা শুধু বেদকেই মানেন মনুসংহিতা মানেন না। আর মহাভারত রামায়ণ ও গীতাকে ধর্মগ্রন্থ নয় বরং ভারতবাসীর জীবন দর্শন বা লোকগাঁথা বলে প্রচার করতে সচেষ্ট হন। এ ব্যাপারে অনন্ত বিজয় দাশ লিখেন;

“ হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে আরেকটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে মহাভারত; যদিও ইদানীং অনেকে একে মহাকাব্য হিসেবে বিবেচনা করেন, তবে বেশিরভাগ ধর্মাবলম্বীদের কাছে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান’ বিবেচিত হয়। মহাভারতেও নারী সম্পর্কে মনুসংহিতার প্রভাব পড়েছে তীব্রভাবে, এসেছে নারী সম্পর্কে অনেক হীন বক্তব্য; যার সামান্য কয়েকটি আগ্রহীদের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে : মহাভারতের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে ভীষ্ম, তাঁর মধ্যেও স্পষ্টরূপে মনুর ছায়া পরিলক্ষিত হয়, তিনি বলেন (১৩/৩৮), ‘উহাদের (স্ত্রীলোকদের) মত কামোন্মত্ত আর কেহই নাই। … কাষ্ঠরশি যেমন অগ্নির, অসংখ্য নদীর দ্বারা যেমন সমুদ্রের ও সর্বভূত সংহার দ্বারা অন্তকের তৃপ্তি হয় না, তদ্রুপ অসংখ্য পুরুষ সংসর্গ করিলেও স্ত্রীলোকের তৃপ্তি হয় না’। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও গুরু ভীষ্মের মতোই, তাঁর মুখেও শোনা যায় তীব্র নারীনিন্দা, ‘উহারা (নারীরা) ক্রিয়া-কৌতুক দ্বারা পুরুষদিগকে বিমোহিত করে। উহাদিগের হস্তগত হইলে প্রায় কোনো পুরুষই পরিত্রাণ লাভ করিতে পারে না। গাভী যেমন নূতন নূতন তৃণভক্ষণ করিতে অভিলাষ করে, তদ্রুপ উহারা নূতন নূতন পুরুষের সহিত সংসর্গ করিতে বাসনা করিয়া থাকে’ (১৩/৩৯)। আবারো পঞ্চপাণ্ডবের মহাজ্ঞানী পিতামহ ভীষ্মের উপলব্ধি, ‘মানুষের চরিত্রে যত দোষ থাকতে পারে, সব দোষই নারী ও শূদ্রের চরিত্রে আছে। জন্মান্তরীয় পাপের ফলে জীব স্ত্রীরূপে (শূদ্ররূপেও) জন্মগ্রহণ করে’ (ভীষ্মপর্ব ৩৩/৩২); ‘স্ত্রীগণের প্রতি কোন কার্য বা ধর্ম নেই। (কারণ) তারা বীর্যশূণ্য, শাস্ত্রজ্ঞানহীন। (মনু, ১৩/৩৯) এরপরেও নাকি মহাভারতের কথা অমৃত সমান! (সূত্র : মনুসংহিতা ও নারী, পৃষ্ঠা ৭২-৭৬) ‘তুলাদণ্ডের একদিকে যম, বায়ু, মৃত্যু, পাতাল, দাবানল, ক্ষুরধার বিষ, সর্প ও বহ্নিকে রেখে অপরদিকে নারীকে স্থাপন করিলে ভয়ানকত্বে উভয়ে সমান-সমান হবে’ (অনুশাসনপর্ব ৩৮)।

মনু পড়লাম, মহাভারত পড়লাম নারী আর মানুষ বলে স্বীকৃতি পেলোনা। পবিত্র গীতা কী বলে দেখা যাক। অনন্ত বিজয় দাশ লিখছেন-

“ব্রাহ্মণ্যধর্মের ‘সম্পূর্ণ ধর্মগ্রন্থ’ রূপেই এখন গীতার স্থান; এবং কারো কারো কাছে আধুনিক ধর্মগ্রন্থ! গীতাকে বলা হয়, শ্রীভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী, ভগবদগীতা। কিন্তু এই গীতাতেও দেখি ভগবানের কণ্ঠে মনুর বক্তব্য! শ্রীমদ্ভগবদগীতায় পঞ্চপাণ্ডবের শ্রেষ্ঠ বীর শ্রীমান অজুর্নের মুখে শুনি—“অধর্মাভিভাবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ/স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ॥” (গীতা, ১:৪০) অর্থাৎ ‘হে কৃষ্ণ, অধর্মের আবির্ভাব হলে কুলস্ত্রীরা ব্যভিচারিণী হয়। হে বার্ষ্ণেয়, কুলনারীগণ ব্যভিচারিণী হলে বর্ণসংকরের সৃষ্টি হয়’। এর পরেই বর্ণসঙ্কর সৃষ্টি হলে কি হয়, তারও উত্তর রয়েছে : ‘সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘœানাং কুলস্য চ/পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ’॥ (গীতা, ১:৪১) অর্থাৎ ‘বর্ণসঙ্কর, কুলনাশকারীদের এবং কুলের নরকের কারণ হয়। শ্রাদ্ধ-তর্পণাদি ক্রিয়ার লোপ হওয়াতে ইহাদের পিতৃপুরুষ নরকে পতিত হয়’। এই উক্তিগুলো পঞ্চপাণ্ডবের এক ভাই অর্জুনের; মেনে নিচ্ছি ভগবদগীতায় শ্রী ভগবানের উক্তিই প্রামাণ্য, অর্জুনের নয়। কিন্তু এ প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের বক্তব্য খণ্ডন তো করেনই নি, বরঞ্চ সে বক্তব্যকে পুরোপুরি সমর্থন করে এবং অর্জুনকেও ছাড়িয়ে গিয়ে নারীদের ‘পাপযোনি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন : ‘মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেহ্যপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ/স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেপি যান্তি পরাং গতিম্॥‘ (গীতা, ৯:৩২) অর্থাৎ ‘আমাকে আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য, শূদ্র এসব পাপযোনিরাও পরম গতি লাভ করে থাকে’।
(সুত্র-অনন্ত বিজয় দাশ, মুক্তমনা, ‘সনাতন ধর্মে’র দৃষ্টিতে নারী’)

গীতায় বর্ণীত ৯:৩২ শ্রীকৃষ্ণের উক্তিটি অত্যন্ত নোংরা, চরম আপত্তিকর। কৃষ্ণ বলছেন এমন কথা ভাবতেও অবাক লাগে। নারী জাতির প্রতি ভগবান কৃষ্ণের এইরকম নোংরা দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই অগ্রহযোগ্য ও নিন্দনীয়? অথচ এই নারীরাই প্রভাত-স্নান সেরে পবিত্র হয়ে প্রতিদিন ভক্তি ভরে গীতা পাঠ করেন। তারা কৃষ্ণের নামে কীর্তন করে চোখের জলে বুক ভাসান। হিন্দু নারীরা কি জানেন এই গীতায় কৃষ্ণ তাদেরকে কি বিশ্রী ভাষায় অপমান করেছেন?

চলবে…

আগের পর্ব দেখুন এখানে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০৬

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 31 =