যদিবা প্রত্যাবর্তন

…এক মূহুর্তের জন্য চুপ হয়ে রইল শাহেদ হাসান। একবার নজর বুলালো পুরো বাসাটার ওপর। ‘আমার কথাগুলো শুনে আমাকে হয়তো পাগল ভাববেন আপনি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আর দশটা মানুষের মতোই আমিও ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতাম না, যদি না… যদি না ভূত হয়ে ফিরে আসত আমার স্ত্রী।’…


সারাদিনের অসহ্য গরম শেষে বিকেলের দিকে আকাশটা একটু ধরে এল। ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল আহির। বলতে গেলে এই বারান্দার জন্যই পাঁচ তলায় বাসা ভাড়া নিয়েছে ও। শহরগুলোতে আজকাল আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে দালানকোঠা। নিঃশ্বাস ফেলবার উপায় নেই। এর মধ্যে এমন বাড়ী খুঁজে পাওয়াটা সৌভাগ্য। এমন নয় যে এর আশেপাশে কোন আগাছা জন্মায়নি। জন্মেছে, কিন্তু এত উঁচু অবধি এসে পৌছতে পারেনি এখনও। যদি কোনদিন এসে পড়ে, সেদিন এই বাসাটাও ছেড়ে দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে আহির। বদ্ধ পরিবেশ ওঁর মোটেই ভালো লাগে না।
হাতের চায়ের কাপটা নিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারটায় গিয়ে বসল ও। তাকাল আকাশের দিকে। নীল আকাশ এখন অসুস্থ রোগীর মতো কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দক্ষিণ দিক থেকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে কালো মেঘ। থমকে গেছে পরিবেশ, যেন কোন হিংস্র দানবের আক্রমণের প্রহর গুনছে। একটু আগে মাথা দুলিয়ে প্রতিবাদ জানানো গাছগুলোও এখন নিশ্চল। রবীন্দ্রনাথ থাকলে হয়ত কয়েকটা চরণ লিখে ফেলতেন এখনই। কিন্তু আহির কোন কবি নয়, একজন সাইকোলজিস্ট। সহজ কথায় বললে, মাসিক রোগের ডাক্তার। রোগ-বালাই এর সাথে যার নিত্য সখ্যতা, রোমান্টিসিজম তাকে মানায় না।
আয়েশ করে কাপে একটা চুমুক বসালো ও। সাথে সাথে কুঁচকে ফেলল মুখ। কথায় বলে, গাইতে গাইতে গায়েন। কিন্তু এতদিন ধরে চেষ্টা করেও চা বানানোটা শিখে উঠতে পারেনি। শুধু চা বানানোর জন্য একটা কাজের লোক রাখার দরকার। কিন্তু একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যাল পার্টটাইম পড়িয়ে যে বেতন পায় ও, তা দিয়ে আজকের এই দুর্মূল্যের বাজারে একজন কাজের লোক রাখার কল্পনা করাটাও বিলাসীটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতকুটে চায়েই চুমুক দিতে লাগল।
এমন সময় বেরসিকের মতো কলিং বেলটা বেজে উঠল। বিরক্ত হলো আহির। সেই সাথে কিছুইটা কৌতুহলও হলো। সাধারণত ভাড়া আদায়ের কাজে হানা দিতে থাকা বাড়িওয়ালা ছাড়া ওঁর সাথে কেউ দেখা করতে আসে না। কিন্তু অমন মেঘলা দিনে আজ কে এল? অনিচ্ছাসত্ত্বেও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও। দরজার পিপহোল দিয়ে দরজার ওপাশটা দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না ও। নিরাপত্তার তাগিদে মানুষ পিপহোল ব্যবহার করে, দরজার ওপাশে যদি কোনো চোর-ডাকাত দাঁড়িয়ে থাকে এই ভয়ে। আআহিরের সেই ভয় নেই। চোর-ডাকাত ওঁর মতো ছাপোষা কারও বাসায় লুট করতে আসবে বলে বিশ্বাস হয় না ওঁর।
দরজা খুলে একজন তরুণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ও। লোকটা ওঁর সমবয়সী হবে। পোশাক-আশাক দেখে সচ্ছলই মনে হয়। সম্ভবত অফিস থেকে সরাসরি এসেছে। কিন্তু চোখ দেখে লোকটাকে স্বাভাবিক মনে হলো না আহিরের। কালো চোখের তারায় যেন ভয় খেলা করছে।
‘আপনি কি সাইকোলজিস্ট আহির আহমেদ?’ ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল লোকটা।
‘জী, আমি আহির। আপনি?’
‘আমি শাহেদ, শাহেদ হাসান। আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।’
দরজাটা খুলে ধরল আহির। ‘ভেতরে আসুন।’
লোকটাকে সামনের রুমে বসিয়ে ভেতরে চলে গেল আহির। এক গ্লাস পানি এনে দিল। এক মূহুর্তের জন্য চোখজোড়া বিস্ময় নিয়ে আহিরের দিকে তাকিয়ে থাকল শাহেদ হাসান। তারপর ঢকঢক করে গ্লাসটা খালি করে ফেলল। গ্লাসটা নিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল আহির। ফিরে এসে বসল শাহেদ হাসানের একেবারে মুখোমুখি।
‘বলুন, মি. হাসান, কী বলতে চান।’
‘আসলে আপনাকে একটা মিথ্যা বলেছি আমি। আমার নাম শাহেদ হাসান না, কিন্তু আমার আসলে নামটা আপনাকে বলব না আমি। কেন বলব না, সেটা আমার গল্প শুনলেই বুঝতে পারবেন।’
‘নাম বলার সময় আপনার ইতস্তত ভাব দেখে তা আমি আগেই ধারণা করে নিয়েছি। কিন্তু সেটা কোনো বিষয় না। আমার কাছে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই আসল পরিচয় গোপন রাখতে পছন্দ করে।’
‘আচ্ছা, আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন?’ আচমকা প্রশ্ন করে বসল শাহেদ।
এই প্রশ্নের মুখোমুখি অনেক বার হতে হয়েছে আহিরকে। তাই উত্তর দিতে বাওতে হলো না এক মূহুর্তও। ‘আমি নিজ চোখে কখনও ভূত দেখেনি। তাই বিশ্বাসও করি না। যদি কখনও দেখতে পাই, অবশ্যই বিশ্বাস করব।’
‘আমরা তো বাতাসও দেখতে পাই না। তাই বলে কি আপনি বাতাসের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না?’
‘আমরা বাতাস দেখতে পাই না ঠিকই, কিন্তু বাতাসের অস্তিত্ব দেখতে পাই। ঝড়, তুফান এগুলো তো বাতাসেরই অন্য রুপ, তাই না?’
এক মূহুর্তের জন্য চুপ হয়ে রইল শাহেদ হাসান। একবার নজর বুলালো পুরো বাসাটার ওপর। ‘আমার কথাগুলো শুনে আমাকে হয়তো পাগল ভাববেন আপনি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আর দশটা মানুষের মতোই আমিও ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতাম না, যদি না… যদি না ভূত হয়ে ফিরে আসত আমার স্ত্রী।’
‘আপনার স্ত্রী মারা গেছেন?’
‘হ্যাঁ, আমারই স্ত্রী নীলা ফিরে এসেছে ভূত হয়ে,’ আহিরের প্রশ্নটা যেন শাহেদের কানেই ঢুকল না। ‘ছোট্ট এক সংসার পেতেছিলাম আমরা। কিন্তু কী থেকে যে কী হয়ে গেল। মারা গেছে ও এক বছর আগে। তারপর থেকেই সাক্ষাৎ দুস্বপ্নে ভুগছি আমি। মারা গেলেও আমায় ছেড়ে যায়নি ও।’ বলতে বলতে বড় বড় করে নিশ্বাস নিতে লাগল শাহেদ। হাত দুটো মোচড়াচ্ছে ক্রমান্বয়ে।
‘ওঁকে কবর দিয়ে আসার পরদিন আমার ঘুম ভাঙে দেরিতে। ঘুমের মাঝেই টের পাই কে যেন হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়। আচমকা মনে পড়ে যায় আমার বাসায় আমি একাই থাকি। আর এটা বুঝতে পারার সাথে সাথে ভেঙ্গে যায় ঘুম। চোখ খোলার পর মনে হয়েছিল ঘুম না ভাঙলেই যেন ভাল হতো। দেখি, আমার মাথায় বিলি কাটছে নীলা।’
একমনে শুনছে আহির। এ ধরণের কেস কম হলেও নতুন কিছু নয়। সময় আর শোক একে অন্যের সাথে গাঁথা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সময়ের সাথে সাথে মানিয়ে নেয় মানুষ। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেন না অপরজন। তখন তারা হ্যালুসিশনে ভোগেন, কল্পনা করে নেন বেঁচে আছেন তার স্বামী বা স্ত্রী। কিংবা ফিরে এসেছে মৃত্যুর পরে। এধরণের সমস্যা সাধারণত নারীদের ক্ষেত্রেই বেশি ঘটে। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রেও বিরল নয়।
‘এরপর থেকে আমার সাথেই আছে ও,’ বলতে থাকে শাহেদ। ‘ঠিক যেমন থাকত আগে।’
‘ফিরে আসার পর কি কোনো অস্বাভাবিকতা দেখেছেন ওঁর মাঝে?’ জানতে চাইল আহির। আশা করছে উত্তরটা ওঁর মন মতোই হবে।
‘একদমই না। আগের মতোই আছে ও। আমাদের বাসায় কোনও কাজের লোক নেই, ছিলও না। সব কাজ নীলাকেই দেখতে হতো। এখনও আগের মতো রাঁধছে ও, ঘরদোর পরিষ্কার করছে, কাপড় কাঁচছে নিয়মিত।’
যা ভেবেছিলাম, মনে মনে ভাবল আহির। স্ত্রীর প্রেমে মশগুল হয়ে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন ভদ্রলোক। একারণেই আগের মতো কল্পনা করে নিয়েছেন স্ত্রীকে।
‘আপনার পরিবারে আর কেউ আছে শাহেদ সাহেব, যার সাথে আমি কথা বলতে পারি?’
ঝট করে উঠে দাঁড়াল শাহেদ হাসান। ‘আমাকে পাগল ভাবছেন, তাই না? ভাবছেন হ্যালুসিনেশনে ভুগছি? কল্পনা করে নিয়েছি মৃত স্ত্রীকে? ভেবেছিলাম অন্তত আপনি বিশ্বাস করবেন। এখন বুঝতে পারছি ভুল করে এসেছি এখানে।’
গটগট করে দরজা পর্যন্ত চলে গেল শাহেদ হাসান।
পেছন পেছন গেল আহিরও। ‘শাহেদ সাহেব, শুনুন…’
পেছনে ফিরেও তাকাল না শাহেদ হাসান। কোনও কথায় কান না দিয়ে বেরিয়ে গেল দরজা খুলে।
থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল আহির। কী করবে বুঝতে পারছে না। শাহেদ হাসানের এখন থেরাপির প্রয়োজন। এ অবস্থা চললে বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হবেন তিনি।

আহির ভেবেছিল ফিরে আসবে শাহেদ হাসান সাহায্যের জন্য। কিন্তু ওঁকে ভুল প্রমাণিত করে তিন দিনেও ফিরে এল না শাহেদ। তার বদলে চার দিনের মাথায় যে এল, তাকে দেখে কিছুটা বিস্মিতই হলো আহির।
‘আপনি কি সাইকোলজিস্ট আহির আহমেদ?’ জিজ্ঞেস করল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ইউনিফর্ম পরিহিত লোকটা। তার বয়স খুব বেশি হবে না, ত্রিশের ঘরে।
‘জী, আমিই আহির আহমেদ।’
অবাক হয়েছে আহির। ওঁর কাছে পুলিশ কেন আসতে পারে, তা বুঝে উঠতে পারছে না।
‘আমি এসআই ফারহান চৌধুরী। আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। ভেতরে আসতে পারি?’
একটু ইতস্তত করে দরজা মেলে ধরল আহির। ভেতরে ঢুকে পলকেই পুরো রুমে নজর বুলিয়ে নিল ফারহান চৌধুরী। তারপর আহিরের সাথে সোফায় গিয়ে বসল।
‘বলুন, কী বলবেন অফিসার।’
‘আপনার কাছে কি শাহেদ হাসান নামের কেউ এসেছিল কিছুদিনের মধ্যে?’
আহিরের বিস্ময়ের মাত্রাটা বাড়ল আরও একধাপ। ‘জি, এসেছিল দিন তিনেক আগে। কেন বলুন তো?’
আহিরের প্রশ্নকে পাত্তাই দিল না এসআই ফারহান চৌধুরী। ‘কেন এসেছিল বলুন তো।’
‘সাহায্যের জন্য। মানসিক সমস্যায় ভুগছে লোকটা।’
ভ্রু কুচকে আহিরের দিকে তাকাল ফারহান চৌধুরী। ‘কী ধরণের মানসিক সমস্যা?’
‘আচ্ছা, আপনি এতসব জানতে চাইছেন কেন বলবেন কি?’
‘কারণ আছে বলেই জানতে চাইছি। সময় হলে আপনিও জানতে পারবেন। এখন বলুন, কী ধরণের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন শাহেদ হাসান।’
‘স্ত্রীকে হারিয়ে হ্যালুসিনেশনে ভুগছেন উনি। কল্পনা করছেন যে মরেনি তার স্ত্রী, বেঁচে আছে এখনও। সাধারণত তীব্র শোকগ্রস্ত মানুষেরা এমন বিভ্রমে ভুগতে পারে। তবে কয়েকদিন থেরাপি নিলেই আবার ফিরে আসতে পারেন সুস্থ জীবনে। আমি চেয়েছিলাম তাকে সাহায্য করতে। কিন্তু আমার কথা না শুনেই চলে গেলেন তিনি। আচ্ছা, শাহেদ হাসান ঠিক আছেন তো?’
এক দৃষ্টিতে আহিরের দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল অফিসার ফারহান। আহিরের বলা শেষ হলে মুখ খুলল সে। ‘মি. আহির, শাহেদ হাসানের স্ত্রী মারা যাননি, বেঁচে আছেন তিনি।’
মনে মনে অনেক কিছুই ভেবে বসেছিল আহির, কিন্তু এমন কিছু আশা করেনি মোটেও। ‘বলেন কী! তবে সেদিন আমাকে এতগুলো মিথ্যা বললেন কেন তিনি? তাকে দেখে কিন্তু মনেই হচ্ছিল না মিথ্যা বলছিলেন।’
‘আমি এখনও শেষ করিনি। গতকাল রাতে নিজ স্ত্রীকে খুন করার চেষ্টা করেন শাহেদ হাসান।’
বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল আহিরের চোখ। ‘মানে? কী বলছেন এসব?’ এবার ভয় ধরল আহিরের মনে। পুলিশ ওঁকে কোনও কিছু নিয়ে সন্দেহ করছে না তো?
‘গতকাল রাতে ধারালো চাকু দিয়ে স্ত্রী নীলা হাসানকে খুন করার চেষ্টা করেন শাহেদ হাসান। ভাগ্যের জোরে অল্পের জন্য বেঁচে যান নীলা। খবর দেন পুলিশে। তখন আমরা গিয়ে বন্দি করি শাহেদ হাসানকে।’
‘অদ্ভুত তো। ভদ্রলোক আমাকে এসে বললেন মারা গেছেন তার স্ত্রী। আবার ফিরে গিয়ে খুন করতে চাইলেন তার স্ত্রীকে। এমনটা কেন করলেন তিনি?’
‘সেটাই বুঝতে পারছি না আমরা। মুখ খুলছেন না শাহেদ হাসানও। অনেক চেষ্টা করেছি আমরা। কিন্তু একটা ভিন্ন আর কিছু বের করতে পারিনি তার মুখ থেকে।’
‘কী কথা?’
‘আপনার সাথে কথা বলতে চান তিনি।’
‘আমার সাথে?’
‘হ্যাঁ। তার কাছ থেকেই পেয়েছি আপনার ঠিকানা। মি. আহির, এই কেসটার সুরাহা করতে আপনার সাহায্য প্রয়োজন আমাদের। আমার বিশ্বাস আপনার কাছেই মুখ খুলবেন শাহেদ হাসান। তাছাড়া আপনি একজন সাইকোলজিস্ট। এই কেসটার সমাধানের জন্য একজন গোয়েন্দার চেয়ে একজন সাইকোলজিস্টেরই বেশি প্রয়োজন। আমাদের জানা প্রয়োজন, শাহেদ হাসান সত্যিই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন কিনা। নাকি পুরোটাই তার সাজানো নাটক?’

‘আমি জানতাম আপনি আসবেন, আহির সাহেব।’ কথাগুলো বলতে যেন অনেক কষ্ট হলো শাহেদ হাসানের। গত কয়েকদিনে অনেক পরিবর্তন এসেছে লোকটার মধ্যে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে তার চোখে। তার বাম চোখটা ব্যান্ডেজে মোড়ানো।
‘কিভাবে জানতেন?’ প্রশ্ন করল আহির। অফিসার ফারহান চৌধুরির অনুরোধে হাসপাতালে এসেছে সে। কথা বলবে শাহেদ হাসানের সাথে, চেষ্টা করবে আসল রহস্য উদঘাটনের। হাসপাতালের একটা ছোট কামরায় বসে আসে ও এখন। মাঝে একটা টেবিল রেখে ওঁর বিপরীতে বসে আছে শাহেদ হাসান, হাতে হাতকড়া। টিউব লাইটের সাদা আলোয় ভরে আছে রুমটা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান চৌধুরী।
‘মন বলছিল,’ দুর্বল গলায় বলল শাহেদ। ‘আমার মন বলছিল শুধু আপনিই আমার কথা বিশ্বাস করবেন। আমাকে এদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারবেন। এরা কেউ তো আমার কথা বিশ্বাস করত না। কিন্তু আপনিই তো বলেছেন প্রমাণ পেলে ভূতেও বিশ্বাস করবেন। তাই আমি আপনাকে নিয়ে আসতে বলেছিলাম।’
‘তারমানে আপনার কাছে প্রমাণ আছে যে আপনার স্ত্রী নীলা মারা গেছে আর ফিরে এসেছে ভূত হয়ে?’
‘আছে, অবশ্যই প্রমাণ আছে। আমি নিজের হাতেই যে নীলাকে খুন করেছি!’
‘মানে?’ অবাক না হয়ে পারল না আহির। মূহুর্তেই সামলে নিল নিজেকে। ‘কখন? কিভাবে?’
‘বলছি। আমার আর নীলার প্রেমের বিয়ে। আমাদের বিয়েতে নিমরাজি ছিলেন আমাদের দুই পরিবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেনে নেন তারা। বিয়ের পর আমি আর নীলা আলাদা একটা বাসা ভাড়া নেই। সেখানেই গড়ে তুলি আমাদের সাজানো সংসার। সবকিছুই ঠিক ভাবে চলছিল। চোখের পলকে কেটে যায় দু বছর। আর তারপরই শুরু হয় অশান্তি।’
‘কেমন অশান্তি?’
‘আমার বাবা-মা চাপ দিতে থাকেন একটা নাতির জন্য। আমি আর নীলাও চাচ্ছিলাম সেটা, চেষ্টাও করছিলাম। কিন্তু লাভ হচ্ছিল না কোনও। পরে ডাক্তারি পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর ধরা পরে সমস্যাটা আমারই। মানসিক ভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি আমি। নীলার সামনে মুখ দেখাতেও লজ্জা লাগছিল। কিন্তু নিজেকে শক্ত রেখেছিল নীলা। পাশে দাড়িয়েছিল আমার, সান্ত্বনা দিয়েছিল।’
‘তাহলে বলতে হয় আপনার ভালোই চেয়েছিলেন আপনার স্ত্রী। আর সেই স্ত্রীকেই কিনা আপনি…?’
‘আমারও তাই মনে হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো এমনই হওয়া উচিত। পাশে থাকবে তারা একে অপরের সবসময়। তার ওপর আমাদের তো প্রেমের বিয়ে। একে অন্যেকে বুঝি আমরা। কিন্তু সেই ঘোর ভাঙতে আমার সময় নিল না।’
‘কী ঘটল এমন?’
‘একই ছাদের নীচে বাস করছিলাম আমরা দুজন। ঘুমাতাম একই খাটে। কিন্তু আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়ছিল আমাদের মাঝে, তা আমি ভালো করেই টের পাচ্ছিলাম। ততদিনে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি আমি। ভেবেছিলাম, এত বড় একটা ধকল সামলে নিতে একটু একাকিত্ব চাইছে নীলা। আমিও সময় দিচ্ছিলাম ওঁকে, ঠিক যেভাবে আমার পাশে ছিল ও। কিন্তু বুঝতে পারিনি আমায় ধোঁকা দেবে ও।’
‘ধোঁকা দিয়েছিল আপনাকে?’
‘হ্যাঁ, বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ও। আর তাই তো শোধ নিয়েছি আমি। একদিন অফিস থেকে ফিরে বেডরুমে সিগারেটের গন্ধ পাই আমি। অথচ সিগারেট খাই না আমি। আর নীলা খাও্যার তো প্রশ্নই আসে না। নীলাকে জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায় ও। বলে বাতাসের নাকি এসেছে। কিন্তু জানেনই তো, একবার সন্দেহ ঢুকলে মনে, ভেতরটাকে উইপোকার মতো কুড়ে কুড়ে খায় তা। আমার সন্দেহ পোক্ত হয় একরাতে যখন নীলাকে খুঁজে পাই না খাটে। তবে শুয়ে থেকেই শুনতে পাই ওঁর প্রাণখোলা হাসির শব্দ। পা টিপে টিপে এগিয়ে যাই বারান্দায়। বিশ্বাস করুন আহির সাহেব, নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না আমি। পাশের বাসার এক যুবকের সাথে কথা বলছিল ও সেই মাঝরাতে!’
‘তখন আপনি কী করলেন?’
হাসল শাহেদ হাসান। ‘কিছুই করিনি। চুপচাপ এসে শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘুমাতে পারিনি। আসলে তারপর থেকে ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছিল আমার চোখ থেকে। মাথায় শুধু ঘুরে বেড়াত একটা কথাই-প্রতিশোধ নিতে হবে আমাকে, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ।’
‘কিভাবে নিলেন প্রতিশোধ?’ ক্রমেই আগ্রহ বাড়ছে আহিরের।
‘আমার গত বিবাহ বার্ষিকির কথা। প্রতিবার আমাদের বিবাহ বার্ষিকি বেশ ঘটা করে পালন করতাম। ফুল দিয়ে বেডরুম সাজানো, বাইরে গিয়ে খাওয়া আর সারা রাতের উদ্দামতা। কিন্তু গতবার এসবের কিছুই করা হলো না। নীলাও আগ্রহ দেখায়নি, আমিও চাপাচাপি করিনি। আসলে এতে আমারই ভালো হয়েছিল। কারন ঠিক করেছিলাম ওই রাতেই খুন করব নীলাকে। রাতে যখন ঘুমিয়ে পড়ে ও, তখন ধারালো এক চাকু দিয়ে এক টানে চিরে ফেলি ওঁর গলা। তারপর কুচি কুচি করে কেটে ফেলি পুরো দেহ।’
মন দিয়ে শুনে যেতে লাগল আহির। শাহেদ হাসানের বর্ণনার ধরণ অবাক করল ওঁকে। লোকটা এমনভাবে বলছে যেন বাস্তবেই করেছে সে এসব।
‘তারপর রাতের আঁধারেই লাশের টুকরোগুলো বস্তাবন্দি করে ফেলে দিয়ে আসি কর্ণফুলীতে। জানেন, এক স্বররগীয় শান্তিতে ভরে গিয়েছিল মনটা সেরাতে। সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল এক ঝটকায়। অনেক দিন পর ঘুম নেমে এসেছিল ক্লান্ত চোখগুলোইয়। কিন্তু তখনও তো জানতাম না যে কী অপেক্ষা করছিল আমার জন্য পরদিন সকালে।’
‘পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি দেখেন আপনার স্ত্রী বসে আছেন আপনার শিয়রের কাছে-এইতো?’
‘বাকিটুকু তো আপনাকে আগেই বলেছি।’
‘গতকাল রাতে কী হয়েছিল?’ জানতে চাইল আহির।
‘গত একটা বছর আমার কিভাবে কেটেছে তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না, আহির সাহেব। সজ্ঞানে একটা ভূতের সাথে থাকার কথা চিন্তা করতে পারেন? কিন্তু সেটাই ছিল আমার জন্য। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর নয়, এবার ভূতটাকেও পাঠিয়ে দেব পরপারে।’
শাহেদ হাসানের কাছ থেকে আর কিছু জানার নেই আহিরের। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও। এগোতে লাগল দরজার দিকে।
‘একি, আপনি চলে যাচ্ছেন কেন, আহির সাহেব? যাবেন না, প্লিজ। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান…’
রুমটা থেকে বেরিয়ে এল আহির।
***
‘আপনাদের গত বিবাহ বার্ষিকির কথা মনে আছে আপনার, মিসেস হাসান?’ প্রশ্ন করল আহির। শাহেদ হাসানের সাথে কথা বলা শেষ করে এখানে চলে এসেছে ও। সাথে এসআই ফারহান চৌধুরীও এসেছে।
কোলের ওপর রাখা হাতের ওপর মাথা নীচু করে তাকিয়ে আছে নীলা হাসান। তার কনুয়ের ওপরে একটা সাদা ব্যান্ডেজ। মহিলার বয়স বেশি নয়, এখনও তরুণী বলে চালিয়ে দেয়া যায়। চেহারায় কিশোরী ভাবটা রয়ে গেছে এখনও।
‘দেখুন, মি. হাসানের কেসটা সমাধানের জন্য আমাদের কয়েকটা বিষয় জানা খুব দরকার’ বলল ফারহান চৌধুরী। ‘আর একমাত্র আপনিই পারেন সেগুলো আমাদের জানাতে। চুপ করে থাকবেন না, মিসেস হাসান।’
মাথা তুলল নীলা হাসান। ছলছল করছে তার চোখজোড়া।
‘বলুন কী জানতে চান।’ বলল চোখ মুছতে মুছতে।
‘আগে বলুন গতকাল রাতে ঠিক কী হয়েছিল। আপনার যা যা মনে আছে সব বলবেন। অপ্রয়োজনীয় ভেবে বাদ দেবেন না কিছুই।’
‘গতকাল আমাদের বিবাহবার্ষিকি ছিল। আমার আর শাহেদের মাঝে অনেক ধরেই ঝামেলা চলছিল। ঠিক ঝামেলা বলব না, মানে ঠান্ডা সম্পর্ক বলতে যা বোঝায় তেমনই আরকি। একারণে আগে অনেক আয়োজন করে বিবাহ বার্ষিকি উদযাপন করলেও গত বছর তেমনটা আর করা হয়ে উঠেনি। এবারও করার ইচ্ছে ছিল না।’
‘আপনাদের মাঝে সমস্যাটা কী হয়েছিল?’ প্রশ্ন করল আহির। যদিও উত্তরটা শাহেদ হাসান বলেছে ওঁকে, তবুও মিলিয়ে নিতে চায় ও।
একটু ইতস্তত করল নীলা হাসান। তারপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলতে লাগল। ‘সন্তান নিতে চাইছিলাম আমরা। কিন্তু লাভ হচ্ছিল না। পরে ধরা পড়ে শাহেদের কারণেই সম্ভব হচ্ছিল না।’
‘ঠিক আছে, বলে যান।’
‘সাধারণত অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় শাহেদের, কিন্তু গতকাল বিকেল দিকেই চলে এল ও। আমাকে বলল তৈরি হয়ে নিতে, বাইরে ডিনারে যাবে। আমি চাইছিলাম না, কিন্তু জোর করল ও। ডিনার করে ফিরে আসি রাত নয়টার দিকে। ফ্রেশ হয়ে টিভি দেখতে বসি দুজনে। কতক্ষণ কেটে গিয়েছিল জানি না। এক সময় উঠে পড়ে শাহেদ। ফিরে আসে একটু পরেই। মুখে হাসি, ডান হাতটা পেছনে লুকানো। আমি ভেবেছিলাম আমার জন্য কোনও উপ্পহার এনেছে বোধ হয়। খুশি হয়ে এগিয়ে যাই ওঁর দিকে। কিন্তু হাতটা যখবন ও সামনে নিয়ে আসে, দেখি…’
ফুঁপিয়ে উঠল নীলা হাসান। তাকে সময় সময় দিল আহির। একটু পর নিজেকে সামলে নিল নীলা হাসান। ‘দেখি ওঁর হাতে লম্বা একটা চাকু। আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ওঁর কাছে জানতে চাই চাকু কেন এনেছে। তখন ওঁর মুখে যে হাসি দেখেছিলাম, অমন ভাবে ওঁকে আগে কখনোই হাসতে দেখিনি। আচমকা আমার চুলে চেপে ধরে ও। টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে বেডরুমের দিকে। চিৎকার করে উঠি আমি, ব্যথায় আর ভয়ে। সেই সাথে সাহায্যের আশায়ও। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারি লাভ হবে না চেঁচিয়ে। গেল বছর পুরো বাসাটা সাউন্ডপ্রুফ করে নিয়েছিল শাহেদ। অনেক নিষেধ করেছিলাম তখন এসব বাজে খরচায় না যাওয়ার জন্য। পরে বুঝতে পেরেছিলাম কেন এত কাহিনি করেছে ও। একটা বছর ধরে আমাকে মারবার প্ল্যান করছিল ও!’
‘তারপর কী হলো?’
‘বেডরুমে আমাকে ছুড়ে মারে ও মেঝেতে। কাঁদতে থাকি আমি, পাগলের মতো প্রাণভিক্ষা চাইছিলাম। কিন্তু তখন ও আর শাহেদ ছিল না। ওঁকে আমি চিনতে পারছিলাম না যেন। খুন চেপেছিল ওঁর মাথায়। চাকু দিয়ে একটা কোপ বসায় ও আমার হাতে।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন নীলা হাসান। শিউরে উঠছেন বারেবারে। চোখের সামনে ভাসছে যেন শাহেদের সেই খুনে মূর্তি।
‘তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠি আমি। কিন্তু দয়া হয়নি শাহদের মনে। বারবার বলতে থাকে আমি নাকি আগেই মরে গেছি। আর ফিরে এসেছি ভূত হয়ে। ওঁকে বোঝাতে চেষ্টা করি যে আমি বেচেই আছি। কিন্তু শোনার মতো অবস্থায় ছিল না ও তখন। আবার এগিয়ে আসছিল চাকু নিয়ে। ভয়ে খাটের পেছনে গিয়ে লুকাই আমি। কিন্তু ওঁর হাত থেকে পালিয়ে যাব কোথায়? অবলা এক নারী আমি। এগিয়ে আসতে থাকে থাকে শাহেদ। বুঝতে পারছিলাম সময় শেষ হয়ে আসছে আমার। আত্মরক্ষার জন্য আশেপাশে খুঁজছিলাম যেকোনও কিছু। তখনই খাটের কোণায় পড়ে থাকা একটা কলম হাতে ঠেকে। কলমটা হাতে নিয়েই শাড়ির আড়ালে নিয়ে আসি। শাহেদ এসে বসে আমার পাশে। কী যেন বলছিল ও। সম্ভবত আমার মৃত্যু নিয়ে কিছু। সুযোগ খুঁজছিলাম আমি। ভুল করা যাবে না কিছুতেই। বাঁচার সুযোগ এই একটাই। শাহেদ কিছু বুঝে উঠার আগেই কলমটা বসিয়ে দেই ওঁর চোখে। জানেন, একটুও হাত কাঁপেনি আমার, দ্বিধা হয়নি একরত্তি। এখন ভাবলে নিজেই শিউরে উঠি যে কিভাবে অমন একটা কাজ করতে পেরেছিলাম।’

ফারহান চৌধুরীকে বিদায় দিয়ে নিজ বাসায় ফিরে এল আহির। একটু সময় চেয়ে নিয়েছে ও। পরের দিনটা বইয়ের ভেতর মুখ গুজে রাখল আহির। আর রাতের বেলা বারান্দায় বসে বসে ভাবল পুরো কেসটা নিয়ে।
রাত পোহালে ফোন দিল এসআই ফারহান চৌধুরীকে। বিকেল বেলা চলে আসতে বলল ওঁর বাসায়।
‘শাহেদ হাসানের কেসটা নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি,’ বলতে লাগল আহির। ওঁর সামনে সোফায় বসে আছে ফারহান চৌধুরী। ‘অনেক বইপত্রও ঘেটেছি। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, এমন ঘটনার নজির পাইনি কোথাও।’
‘তারমানে পুরোটাই তার সাজানো নাটক?’ বলল ফারহান।
‘আমার তা মনে হয় না। আসলে খুব জটিল আর অদ্ভুত একটা কেসের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। শাহেদ হাসান বাস্তবিকই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে এধরণের সমস্যায় আগে কেউ ভুগেছেন বলে উল্লেখ নেই কোথাও।’
‘বুঝিয়ে বলুন তো।’
‘প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন শাহেদ হাসান। সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে আশা করি ধারণা আছে আপনার। সিজোফ্রেনিয়ার কারণে বিভ্রমের শিকার হয় মানুষ। এই বিভ্রম দেখা, শোনা বা উভয় রকমের হতে পারে। ভেবেছিলাম শাহেদ হাসান কল্পনা করে নিচ্ছেন মৃত স্ত্রীকে। কিন্তু পরে আপনি জানালেন বেঁচে আছেন তার স্ত্রী। অর্থাৎ শাহেদ হাসান কোনও বিভ্রম দেখছেন না, বরং বাস্তবতাকে বিভ্রম ভাবছেন। তার জীবিত স্ত্রীকে মৃত ভাবছে সে, সিজোফ্রেনিয়ার ঠিক উলটো।‘
‘বেশ অবাকই হয়েছিলাম তখন। আরও বিস্মিত হলাম যখন শুনলাম স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করেছেন শাহেদ হাসান। দেখুন, শাহেদ হাসান কিন্তু ভাবছেন তিনি আসলে তার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছেন এক বছর আগেই। আসলে ভাবছেন বললে ভুল হবে, তিনি বিশ্বাস করেন এটা। কিন্তু পরে যখন দেখলেন যে তার স্ত্রী তার আশেপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, এক ধরণের দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন তিনি। ধরে বসলেন যে ভূত হয়ে ফিরে এসেছে তার স্ত্রী। তারপর ভাবতে থাকলেন কিভাবে তাড়ানো যায় এই ভূতটাকে। একারণেই আমার কাছে এসেছিলেন তিনি। সম্ভবত কারও কাছ থেকে জেনেছিলেন যে আমার প্যারাসাইকোলজিতে পড়াশোনা আছে। যাই হোক, এবার আমি আমার ব্যাখা বলি। কটার্ড সিন্ড্রম নামে দুর্লভ এক মানসিক সমস্যার উল্লেখ পাওয়া যায় সাইকোলজিতে। এ সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা মনে করে তারা মারা গেছে। অর্থাৎ নিজেদের জম্বি ভাবে তারা। শাহেদ হাসান এই মানসিক সমস্যারই আরেকটি পর্যায়ে ভুগছেন। নিজেকে মৃত ভাববার বদলে তিনি তার স্ত্রীকে মৃত ভাবছেন।’
‘কিন্তু এমন হওয়ার কারণ কী বলে আপনার ধারণা?’ জিজ্ঞেস করল ফারহান।
‘খুব সম্ভবত দাম্পত্যকলহ। আপনি তো শুনেছেনই তাদের মাঝে ঝামেলা চলছিল। তাছাড়া শাহেদের মতে তার স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত। এটাও কারণ হতে পারে। সব মিলিয়ে নীলার প্রতি বিরুপ হয়ে উঠে শাহেদের মন। প্রচন্ড মানসিক চাপ সইতে না পেরে হয়তো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি’।
ফারহানের দিকে একটা বাদামি খাম এগিয়ে দিল আহির। ‘পুরো ঘটনাটা আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি আমি এখানে। মনে হয়েছে আপনার কাজে লাগতে পারে।’
‘আদালতে লাগতে পারে,’ ধন্যবাদ জানিয়ে বলল ফারহান। ‘সেক্ষেত্রে আপনাকে হয়তো আবারও ডাকা হতে পারে।’
ফারহান চৌধুরী বিদায় নেয়ার বারান্দায় এসে বসল আহির। শাহেদ হাসানের জন্য খারাপ লাগছে। স্ত্রীকে প্রচন্ড ভালবাসত লোকটা। সেই ভালোবাসাই কাল হয়ে দাঁড়ালো তার জন্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 80 = 86