তালুক জ্যোতিষীর পানিপরা

আমাদের পাড়াটা নিতান্ত ছোট নয়। মেডিকেল মোড় থেকে উত্তরে শ্মশান, দক্ষিণে মহিলা কলেজ আর পুর্বে সরকারী উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত। গলির মোড়ে মোড়ে দোকান। সেসব দোকানে আমরা কয়েকজনই রাজ করি। এ পাড়ায় মানুষ কম বাস করে না। একজ্যাক্ট সংখ্যাটা বলতে পারব না কারণ প্রায় প্রত্যেকটা বাড়িতেই ভাড়াটিয়া আছে, এরা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ভাড়াটিয়া আসায় অবশ্য আমাদের ভালই হয়েছে। ওদের গোবদা গোবদা ছেলেগুলো আমাদের তোয়াজ করে যখন “ভাই ভাই” বলে ডাকে, খারাপ লাগে না। আর ওদের বোনেরা আমাদের “ভাই” বললে তো, মনে হয় বুক জুড়িয়ে গেল!

সেদিন অমলকা’র দোকানে বসে আছি। তখন দুপুর বারটা হবে। কলেজ বন্ধ, কিছুই করার নেই, বসে থাকা ছাড়া। প্রথম শীতের রোদ, খুব আদরে চুমু খেয়ে যাচ্ছে শরীরে। চুলে, মুখে। আমি সদ্য শেষকরা সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ভাবছি, টেস্ট পরীক্ষার আগে একমাস এনামুল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়লে, স্যার পাশ করিয়ে দেবেন কিনা।
“ভাই, তালুক জ্যোতিষীর কোথায় থাকেন বলতে পারেন?”।

আমি মুখ তুলে তাকালাম। একজন মধ্যবয়সী। নিশ্চয়ই এলাকার কেউ নন। এলাকার কেউ হলে সরাসরি জিজ্ঞেস করতেন, “অমুক কোথায় থাকেন?”। প্রশ্নের শেষে তিনি যে, ‘বলতে পারেন’টুকু লাগিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে, তিনি এলাকার নন।

“না ভাই, পারি না” বলে আবার ভাবতে শুরু করলাম। ভাববার বিষয় বটে। টেস্টে ফেল করলে, এইচএসছি পরীক্ষা দিতে পারব না। আর নিজ যোগ্যতায় পাশ করব, সেটা ভাবতেও কেমন লজ্জা লাগছে। সুতরাং স্যারদের কাছে প্রাইভেট না পড়ে উপায় নেই। কোনকোন স্যার তো আরও খাটাশ। পরীক্ষাপাশের জন্য আলাদা টাকা নেয় শুনেছি। অবশ্য মূল পরীক্ষা নিয়ে কোন টেনসান নেই; নরুল ইসলাম নাহিদের দোয়ায় সে পরীক্ষা আমি ভালই দেব। চাই কি চান্সও হয়ে যেতে পারে ঢাবিতে!
“বুঝলাম না, ভাই”। জিজ্ঞেস করেন লোকটা। খুব ব্যক্তিত্বহীন লোক তো! খুব তো কোট, প্যান্ট, টাই পরে এসেছেন!
“বললাম যে, তালুক জ্যোতিষী কোথায় থাকে বলতে পারি না কারণ জানি না”।
“আচ্ছা ঠিকাছে ভাই”, বলে লোকটা গলিটা ধরে এগিয়ে গেল।

কিন্তু কিছুদিন পর কাকার দোকানে তেস্টানোই দায় হয়ে গেল। পনেরো মিনিট পরপর কেউ না কেউ এসে জিজ্ঞেস করবেই, “ভাই, তালুক জ্যোতিষের থাকেন কোথায় বলতে পারেন?”
অগত্যা কাকার দোকানে বসাই ছেড়ে দিলাম। তাছাড়া এতদিন লাফাঙ্গা হয়ে কম তো ঘুরিনি। পরীক্ষা সামনে, না পড়লে চাঁদে যেমন সাইদিকে দেখা গিয়েছিল, আমিও পরীক্ষার খাতায় আলিয়া ভাটকে দেখব। আমাদের দলের সবাই কানে বালিশ চেপে পড়তে শুরু করেছে। আমিও স্রোতে গা ভাসালাম। মানে পড়া শুরু করলাম।

সারাদিন তো আর পড়া যায় না। মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে মাথাটা জট লেগে যায়, তখন কাকার দোকান গিয়ে, পকেটের আটটাকা পুড়িয়ে, আবার পড়তে বসি।
সেদিনও যাচ্ছিলাম কাকার দোকান। বেলা তখন এগারোটা হবে। দেখি মধ্যমা আর ওর মা কোথায় যেন যাচ্ছে। ওদের দেখলে আমি কনফিউসড হয়ে যাই। কে বেশি সুন্দরী, মা না মেয়ে?
“আন্টি, স্লামালাইকুম, কোথায় যাচ্ছেন আন্টি?”
“ওয়ালাইকুম। এই একটু তালুক জ্যোতিষীর কাছে যাব।”
আজব ব্যাপার স্যাপার। তালুক জ্যোতিষী কি সেলিব্রেটি টেলিব্রেটি হয়ে গেল নাকি?
“হাত দেখাতে যাবেন নাকি?”
এবার মধ্যমা জবাব দেয়, “হাত দেখাতে না। আম্মুর একটু কোমরে ব্যাথা তো, তাই দেখাতে যাবে”।

আমি মধ্যমার দিকে চেয়ে দেখি। আমার এক ব্যাচ জুনিয়র। কিন্তু সিনিয়র হিসেবে আমাকে ও মোটেই সম্মান করে না। তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না। সম্মান করাটা ওর দায়িত্ব। আর জুনিয়র হিসেবে স্নেহ, মায়া, মমতা ইত্যাদি ইত্যাদি করাটা আমার কর্তব্য। ও ওর দায়িত্ব পালন না করতে পারে, কিন্তু আমি আমার কর্তব্যে ফাঁকি কেন দেব? “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?”।

“কোমরে ব্যাথার জন্য জ্যোতিষীর কাছে যাবে কেন? তাছাড়া আমি তো জানি জ্যোতিষীরা হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে। ইনি বুঝি কোমরে হাত বুলিয়ে ভবিষ্যৎ বলেন?”
“কোমরে হাত বুলাবেন কেন? উনি তো কবিরাজও। ঝারফুঁক করবেন”।
ও আচ্ছা! তালুক মশাই তবে জ্যোতিষী কাম কবিরাজ। তাই তো বলি, এতো লোক কেন সেখানে হুমড়ি খেয়ে ছুটছে।
“আচ্ছা আন্টি, যান”। বলে পথ ধরি।

বিকেলে স্বাধীন, সোহেল আর সজীব মিলে তালুক জ্যোতিষের গলিতে গেলাম। দেখি তখনও মধ্যমা আর ওর মা বাইরে বসে আছে। এখনও তবে কোমরে ফুঁ দেয়নি! আরও দুএকজন মহিলাকে দেখলাম বসে আছে। আমি মধ্যমার দিকে তাকালাম একবার। মুখ ফিরিয়ে নিল। মুখ ফিরিয়ে যেদিকে তাকিয়েছে, সেদিকে তালুক সাহেবের বাড়ির দেয়াল। দেয়ালের নিচেই নর্দমা।
আমি কি তবে নর্দমার চেয়েও দেখতে খারাপ?
“কী ব্যাপার আন্টি, এখনও বসে আছেন?”
“এর পরে আমার সিরিয়াল। দেরী করে আসা হয়েছে। আরেকটু আগে আসলে হত”।
“ব্যাটা তো হেবি কাম্মাছে রে!”
“বুদ্ধির দুনিয়া মামা, বুদ্ধি থাকলে সবাই কামায়। লোকটার ক্রিয়েটিভিটি আছে” সজীব বলে।
“তা বটে!”। সায় দেই আমি।

ভাত খাচ্ছিলাম রাতের। দাদি এসে ১০০ টাকার দুটো নোট ধরিয়ে বললেন, “তালুক জ্যোতিষীর কাছে টাকাটা দিয়ে একটু পানিপরা আনিস তো। রাতে কেমন ভয় ভয় লাগে।”
পানিপরা মানে হল, ফুঁ দেয়া। পানিতে সূরাটুরা পড়ে ফুঁ দেয়, সেটাই। আমি বললাম, “পানিতে শুধু একটা ফুঁ দিয়ে দেবে তার জন্য দুইশো টাকা লাগবে! এটা কোন কথা হইল”।
দাদি বললেন, “টাকা তো নেয় না। কিন্তু টাকা দিলে খুশী হবে। খুশী মনে দোয়া করলে সেইটা তো কবুল হবেই”।

টাকাটা নিলাম। পরদিন এক বোতল পানি এনে দাদিকে দিয়ে বললাম, “এই তোর পানিপরা। দেড়শ টাকা দিছি। ৫০ টাকা আমি নিছি”।
“ভাল করছিস”। বলে দাদি বোতলটা নিল। বলা বাহুল্য আমি তালুক জ্যোতিষীর কাছে যাইনি। কাকার দোকানে পানি ভরে নিয়ে এসেছি।
পরদিন সকালে দাদিকে বললাম, “দাদি কাল রাতে ভয় লাগছিলো?”
“নারে বাপ। ভয় লাগে নাই। বড় জ্যোতিষী। খুব কামেল লোক!”
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, “তা তো বটেই!”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “তালুক জ্যোতিষীর পানিপরা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 6