“এক নাস্তিকের জবানবন্দী” পর্ব–৬

দেশটাকে কতোটা যে ধর্মান্ধতা গ্রাস করে নিয়েছে, দেশের ভিতরে ভিতরে ধর্মের ক্যান্সার ভাইরাসের মতো কতটা আক্রান্ত করেছে তা বুঝেছি সেদিন। যেদিন পুলিশগুলো আমাকে মুসলমানিত্বের বিশ্বাস থেকে কেটে ফালা ফালা করা উচিত মনে করেছিল। দেশটা পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে মাত্র ৪১ বছর পেরিয়েছে। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্টের জন্য, একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র-ব্যবস্থার জন্য, পাকিস্তানী কট্টর সাম্প্রদায়িক ইসলাম ও মুসলমান প্রেমী শাসকদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শুধু এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে! এই বদ্বীপের মানচিত্রের বধ্যভুমিগুলো খনন করলে আজো সেই শহীদদের কঙ্কাল পাওয়া যাবে। সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ কি করে এতোটা ধর্মান্ধ মৌলবাদ হয়? তাদের ধর্মানুভূতি কি করে পাকিস্তানী শাসকদের মতো এতোটা সহিংস-সাম্প্রদায়িক মনোভাবের হয়?

থানা-হাজতের আতংক—৬

দেশটাকে কতোটা যে ধর্মান্ধতা গ্রাস করে নিয়েছে, দেশের ভিতরে ভিতরে ধর্মের ক্যান্সার ভাইরাসের মতো কতটা আক্রান্ত করেছে তা বুঝেছি সেদিন। যেদিন পুলিশগুলো আমাকে মুসলমানিত্বের বিশ্বাস থেকে কেটে ফালা ফালা করা উচিত মনে করেছিল। দেশটা পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে মাত্র ৪১ বছর পেরিয়েছে। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্টের জন্য, একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র-ব্যবস্থার জন্য, পাকিস্তানী কট্টর সাম্প্রদায়িক ইসলাম ও মুসলমান প্রেমী শাসকদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শুধু এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে! এই বদ্বীপের মানচিত্রের বধ্যভুমিগুলো খনন করলে আজো সেই শহীদদের কঙ্কাল পাওয়া যাবে। সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ কি করে এতোটা ধর্মান্ধ মৌলবাদ হয়? তাদের ধর্মানুভূতি কি করে পাকিস্তানী শাসকদের মতো এতোটা সহিংস-সাম্প্রদায়িক মনোভাবের হয়?

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর দেশটা তো হবার কথা ছিল অসাম্প্রদায়িক। দেশটার নীতি হবার কথা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই দেশের প্রশাসনে কিভাবে ধর্মান্ধ মৌলবাদ ভাবাপন্ন মানুষগুলো পুলিশ হয়? কি করে অসভ্য বর্বর ধর্মান্ধদের দিয়ে পুলিশ প্রশাসন সাঁজানো হয়? সেই স্বাধীন দেশটার সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছে, বাক স্বাধীনতার কথা। মত প্রকাশ করার কথা। আমি তো আমার মত প্রকাশ করেছি মাত্র। তবুও কেন পুলিশ আমাকে ননসেন্সের মতো আচরন করলো? পুলিশ কেন তার আইন-শৃংখলা ভুলে গিয়ে আমার উপর পাশবিক নির্যাতন চালাল? এখানে পুলিশ আমাকে কোন আইনিক অধিকারে নির্যাতন করার অধিকার রাখে? যৌন-বিকৃত ধর্ষকের মতো কোনো মেয়েকে নিরালায় একা পেয়ে বর্বর ও পাষণ্ডভাবে ধর্ষন তো করিনি! কোনো ঘাতকের মতো তো কাউকে হত্যা করিনি! কারো কাছ থেকে চুরি-ডাকাতি করে জোর পুর্বক কিছু ছিনিয়ে তো নিই নি! ভুমিদুস্যের মতো কারো জায়গা তো দখল করিনি! শুধু স্বজ্ঞানে সুস্থ মস্তিষ্কে নবীর সমালোচনা করেছি। নবীকে লুইচ্চ্যা বলেছি। নবীর ১২-১৩টা বিবি থাকার পরও, কেন সেই হাফসাকে মিথ্যে বলে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে, হাফসার শোবার ঘরে দাসী মারিয়াকে নিয়ে সঙ্গম করল? নবীর এই চরিত্রহীনতা জানার পর নবীকে আমার একজন চরম লুইচ্চ্যা বলে মনে হয়েছে। তাই নবীকে লুইচ্চ্যা বলেছি। এ কথাটা এখন একজন ধর্ষক, একজন খুনি, একজন ডাকাতের চেয়ে বেশি অপরাধ হয়ে গেল? আমি তো কারো ক্ষতি করিনি, কারো রক্ত ঝরায়নি, শুধু ফেইসবুকে লিখেছি। কারো ক্ষতি না করে, কারো রক্ত না ঝরিয়ে নিজের ফেইসবুকের দেয়ালে কয়েক লাইনের মন্তব্যই তো করেছি। এটা অপরাধ হয়ে গেল? এটা যদি অপরাধ হয়, তাহলে একজন হত্যাকারী, একজন ধর্ষক, একজন ভুমিদুস্য ঠিক কতো বড়ো মাপের অপরাধী হওয়া উচিত?

থানার হাজতের ভিতরে এক কোণে বসে বসে কথাগুলো ভাবছিলাম। ডান হাতের কব্জিটা ফুলে আছে। বাম পায়ের হাঁটুর নিচে পেছন দিকে ব্যাথা করেছে। জিন্স প্যান্টটা একটু কুঁচকে তুলে বুঝতে পারলাম। শক্ত ডান্ডার বাড়ি এখানেও পড়েছে! ফুলে গেছে নরম জায়গাটা। প্যাকেটে ৩টা সিগারেট ছিল, খাওয়া শেষ। কিছুক্ষন আগে এক কন্সটেবলকে বলেছিলাম আমাকে কিছু খাবার আর এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট এনে দিতে। টাকা দিলাম ৫০০। সেই যে গিয়েছে, তার আর কোনো খবর নেই! তখন ঘড়িতে বোধহয় রাত ১২টা। থানার হাজতের ভিতর আরো ৪জন আসামী। আমি সহ পাঁচজন। কেউ ডাকাতি করেছে, কেউ ধর্ষন করার চেষ্টা করেছে, কেউ ছিনতাই করেছে। কেউ মারামারি করেছে। তারা ৪ জন একপাশে বসে যে যার কুখ্যাত খ্যাতি নিয়ে একজন আরেকজনকে জাহির করছে। নিজেদের অপকর্মের কথাগুলো খুব গর্ব করে জানান দিচ্ছে। আমি এক পাশে বসে আছি একা, নিঃসংগ হয়ে। আমার জন্য আরো আশ্চর্য দর্শন অপেক্ষা করছে….

-এই! এই! এখানে অপ্রিয় কে! অপ্রিয় কে! বলে হাজতের লোহার দরজায় ডাণ্ডা দিয়ে শব্দ করে বাড়ি মারতে থাকে!
আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, -হ্যাঁ আমি।
উত্তেজিত, রাগান্বিত পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া, কোমরে রিভলভার গুজানো হাজতের বাইরের দরজায় দাঁড়ানো ৩০ উর্ধো যুবকটি বলল, -তোমাদের দুর্গাটি, কালিটি, লক্ষী, স্বরসতীটি খুব সুন্দর তাই না? এটা কি তোমাদের ধর্মের দেশ ইন্ডিয়া পাইছো? যেমন খুশি তেমন করবা শালা মাটির মুর্তি বানিয়ে পুজা করে আবার লাত্থি দিয়ে বিসর্জন দিস!

আমি বললাম, -মাটির মুর্তি পুজা, দেব-দেবতা এসব তো আমি বিশ্বাস করিনা। আমি তো কোনো ধর্মই বিশ্বাস করিনা।

-তো তোদের ধর্ম নিয়ে লিখতে পারোস না? আমাদের মহানবীকে নিয়ে কেন লিখছস?
আমি চুপ।
তিনি আবার চিৎকার করে করে বলতে লাগলেন, -আল্লার প্রিয় নবী রসুল এটা কে জানস? এটা আমাদের প্রফেট! এটা আমাদের মহানবী! আমরা আল্লাহর চেয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহুকে বেশি মান্য করি, বেশি ভক্তি করি, বেশি শ্রদ্ধা করি। উনার জন্য আমরা আজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামকে পেয়েছি, সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরাণ পেয়েছি। ইসলাম কিসের ধর্ম জানস? শান্তির ধর্ম! শান্তির ধর্ম! তুই কাফেরের বাচ্চা কোন সাহসে আমাদের আল্লাহর রসুল করিমকে কটু কথা বলিস? শালা খানকির বাচ্চা! চারালের বাচ্চা কোথাকার!

আমি খুব নির্লিপ্তভাবে বললাম, -আপনি আমার মাকে গালি দিচ্ছেন কেন? এতে আমার মায়ের কি দোষ?
তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন, -চোপ খানকির পোলা! কথা কইবি না! তোর মাকে গালি দেব না কি করব? তোর মা’ই তো তোর মতো একটা কুলাঙ্গার জনম দিছে।
আমি বললাম, আপনি এতো অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন কেন? অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছেন কেন? এই শিক্ষা কি আপনার ধর্ম আপনাকে দিয়েছে?

তিনি আরো খুব উত্তেজিত ও রাগান্বিত হয়ে কোমর থেকে রিভলবার বের করে আমার কপালে ঠেকিয়ে বলল,-শালা খানকির বাচ্চা মালাউন! আবার আমার ধর্ম নিয়া বলস? এটা ইন্ডিয়া পায়ছিস মালাউনের বাচ্ছা? আমার গায়ে যদি এই পুলিশের পোশাক না থাকত, তাহলে তোকে এখানেই গুলি করে মেরে ফেলতাম!

ভয় জিনিসটা অনেক আগেই কেটে গেছে। মনে মনে বললাম, মরলে মরব! তবু এই অসভ্য ইতরটাকে কথা বলতে ছাড়ব না! আমি ইউনিফর্মে তার বুকের উপর লাগানো নামটা পড়ে নিলাম। তারপর তার দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে তার নাম ধরে বললাম, -দেখুন শামীম (ছদ্দনাম) সাহেব, আমি তো হেঁদু নই। হিন্দু পরিবারে আমার জম্ম ঠিক, কিন্তু হিন্দু ধর্মের কোনো আচার তো আমি মানি না। বিশ্বাসও করিনা। আমি তো নিজেকে নাস্তিক তথা মানুষ পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করি। তবে হ্যাঁ আজ যদি হিন্দু হতাম তাহলে আমিও বলতে পারতাম…..
আমার কথা শেষ হতে না হতেই গজ গজিয়ে তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, -বল! শালা বল! কি বলতি বল?
-আমি নবীর নামের সাথে সামান্য লুইচ্যা শব্দটা ব্যবহার করায় এতে রাগে ক্ষোভে আপনি আমার মাথায় গুলি করতে চাইছেন, প্রচণ্ড ঘৃণা মিশিয়ে গুলি করে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছেন। যখন এদেশে প্রতিনিয়ত শয়ে শয়ে হিন্দুদের হাজার হাজার মুর্তি ভাঙ্গা হয়, মন্দির ভাঙ্গা হয়, মুসলমান দ্বারা তাঁদের বাড়ি ভিটে দখল করা হয়, তখন হিন্দুদের ঠিক কতোখানি ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত শামীম সাহেব? কতোটা রাগান্বিত হওয়া উচিত বলতে পারেন? মুসলমানরা আজ পর্যন্ত হিন্দুদের যতো মন্দির মুর্তি ভেঙ্গেছে, তাই বলে এদেশের হিন্দুরা কি মুসলমানদের মারতে গেছে? ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলে কাউকে কাটতে গেছে? না যায়নি। কারণ হিন্দুরা মুসলমানদের মতো সহিংস নয়! বর্বর….

আমার কথা শেষ না হতেই শামীমকে একজন পেছন থেকে এসে টানছেন। উনি বলছেন, -শামীম ভাই বাদ দেন তো এসব। তিনি শামীমকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। শামীম পেছনে যেতে যেতে রিভলভার কোমরে রেখে কোনো কথা না বলে নিরবে চলে গেলেন।

মাথাটা পুরো আগুন হয়ে আছে। চেয়েছিলাম কথায় কথায় ইসলামের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে। কিন্তু পারিনি। হাজতের একজন আসামী আমার দিকে চেয়ে বলল, -তোর সাহস তো কম না ভাই! তুই বন্দুকের নলের সামনে তার দিকে চেয়ে চেয়ে কেমনি কথাগুলো বললি? আমি হলে তো পেচ্ছাব করে দিতাম!

আমি বললাম, সত্য বলতে সাহসের প্রয়োজন নেই, নিজের মধ্যে সততা থাকলে, শুধু বন্দুক কেন, মিশাইলের সামনেও বলা যায়।
-তোর দম আছে ভাই!
আমি চুপ।

হাঁটু কুড়িয়ে বসে, হাঁটুর উপর হাত রেখে, তার উপর মাথা রেখে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ঘুম কোনো ভাবেই আসছে না। একদিকে মশার কামড়, আরেক দিকে মশার প্যানপেনানি। সময় তখন রাত দুটো। সিগারেট নেই। এক ধরনের অস্বস্তি লাগছিল। কোত্থেকে একজন এসে বলল, -এই নে সিগারেট। এই নে ডালবাজি আর পরটা।

আমি তাকে দেখে হতবম্ব হয়ে গেলাম! ঘন্টা তিনেক আগে যাকে টাকা দিয়েছিলাম কিছু খাবার আর সিগারেট আনার জন্য। তিনি আনলেন দুটো পরোটা ডালবাজি আর এক লিটার মিনারেল পানি! আরো অবাক হলাম সিগারেটের প্যাকেট দেখে! এটা বেনসন সিগারেটের প্যাকেট নয়, এনেছেন উইলসন! যেখানে বেনসন একটা ৭ টাকা, উইলসন ৮ আনা! যেখানে ২০টা সিগারেটে ভর্তি বেনসনের প্যাকেটের দাম ১৩৫টাকা, সেখানে এনেছেন উইলসন! তাও আবার ৫ টাকার প্যাকেটটা! যেখানে দশটা উইলসন থাকে। এখানে হিসাব করে দেখলাম তার ১০০ টাকা খরচ হয়নি। আমি বললাম, -আর বাকি টাকাগুলো দেন।

তিনি মুখ বেঁকিয়ে বললেন, -এ্যাঁ! শালা আবার টাকা খোঁজো? আমি তিন ঘন্টা ধরে খুঁজে খুঁজে খাবার, সিগারেট আর পানি এনে দিলাম! হাজতের এক আসামীর দিকে তিনি তাকিয়ে আবার বললেন, -দেখ এই শালা আবার টাকাও ফেরত চায়। নতুন মাল তো কিছু বোঝে না। হুহু..

এই থানা-হাজতে আমি নতুন মানুষই বটে। থানা হাজতে কখনো সময় কাটাইনি। পুলিশের ইতরামি ফাতরামি আমার না জানারই কথা। একটা আসামী থানার সেলের ভিতর থাকলে তার দুর্বলতার সু্যোগ নিয়ে তাকে কিভাবে হেনস্তা করা হয়, তা তো স্বচক্ষে দেখলাম।

আরো আশ্চর্য হলাম আমার খাবারের টাকা মেরে দেয়া সেই বৃদ্ধ কনস্টেবলের কথা শুনে। তিনি হাজতের অন্য আসামীদের উদ্দেশ্য করে বলছেন, -এই তোমরা এই পাপীষ্ঠ অপ্রিয়ের সাথে কথা বলো না, তোমাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। শালা একটা নাস্তিক!

হাজারো কষ্টের মাঝে সেই কনস্টেবলের কথা শুনে আমি হাজতের ভেতর শব্দ করে হেসে উঠেছি। তিনি বললেন, -এই হালার পুত হাসছিস কেন? তোর ডর ভয় নেই?
আমি হাসতে হাসতে বললাম, -চাচা আপনার ঈমানের কথা শুনে হাসছি!
-কেন রে?
-আপনি নিজেই আমার ৪শ টাকা মেরে দিয়ে এখন ঈমানের গল্প শেখাচ্ছেন এটা দেখে।
তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, -রাখ তোকে দেখাচ্ছি! তোর যাতে জামিন না হয় সেই ব্যবস্থায় আমি করতাছি। স্যারকে বলবো তোর যাতে জামিন হয় এমন মামলায় দিতে!

তিনি চলে গেলেন। যাবার সময় আমাকে হুমকি দিয়ে গেলেন যাতে মামলায় আমার জামিন না হয়, এমন ব্যবস্থা করবেন বলে। চিন্তা করি এই মানুষগুলো নিজেকে না শুধরিয়ে অন্যকে শুধরানোর জন্য কি সহিংস হয়েই না ঝাঁপিয়ে পড়ে! যেসব ধর্মান্ধ মুসলমানরা নবীকে কুটূক্তি করেছি বলে আজ আমাকে আত্নসমর্পন করার জন্য গোটা থানাকে প্রভাবিত করল, আমাকে ধরার জন্য আমার পরিবারের মা-বাবা-ছোট ভাইকে থানায় এনে টরচার করার জন্য থানাকে বাধ্য করল, তাদের নবী ও ইসলাম নিয়ে এক রত্তি জ্ঞানও নেই। তারা কোরাণ পড়েনা, ইসলামের বিষদ ইতিহাসও জানেনা। অথচ তারাই নির্ধারন করে দেয়, কোনটা নবী অবমাননা, কোনটা ইসলাম অবমাননা। তাদের ইসলামের দাসপ্রথা নিয়ে নুন্যতম জ্ঞাণও নেই। অথচ বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় ইসলামি দাসপ্রথাগুলো বড়ই অনুপস্থিত। যে দাসপ্রথাগুলো ইসলামধর্ম-গ্রন্থের কোরাণ-হাদিসের পাতায় পাতায় লেখা আছে। সেই দিক দিয়ে বলতে গেলে ১৪০০ বছর আগের ইসলাম আর বর্তমান মুসলমানদের জীবন ব্যবস্থা পুরোই বিপরীত! যেগুলো মুসলমানদের জীবন যাত্রার সাথে মোটেও যায় না। আল্লাহ কোরাণে সাত আসমানের কথা বলেছেন। অথচ বিজ্ঞাণ প্রমান করছে সাত আসমান বলতে কিছু নেই। পৃথিবী মহাশুন্যে তার কক্ষপথে সেকেন্ডে শত শত মাইল বেগে ঘুরছে। কোরাণে রুপকথার বেহেস্তের কথা বলা হয়েছে। অথচ কোন ঈমানদার মুসলমান একবারও বেহেস্ত ঘুরে এসে পৃথিবীতে অবতরণ করেছে, এমন প্রমান কোথাও নেই। কোরাণ বলছে, সুর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। অথচ বিজ্ঞাণ বলছে, সুর্য নয়, পৃথিবীই সুর্যের চারিদিকে ঘুরছে। কোরাণ বলছে আকাশটা হল পৃথিবীর ছাদ, আকাশকে সৌন্দর্য্য মন্ডিত করার জন্য আল্লাহ তালা আকাশকে সুন্দর সুন্দর তারা নক্ষত্র দিয়ে সাঁজিয়েছেন। অথচ বিজ্ঞান বলছে, পৃথিবীর উপর আকাশটা কোনো ছাদ নয়, এটা মহাশুণ্য। আর তারা নক্ষত্রগুলো একেকটি গ্রহ-উপগ্রহ। মাঝে মাঝে ওয়াজ মাহফিলে হুজুরদের বয়ানে বেহেস্তের কথা শুনতাম। একবার এক ওয়াজ মাহফিলে শুনলাম, “-বেহেস্ত জান্নাত এমন একটা জিনিস, বেহেস্তকে আল্লাহ এমন এমন ব্যয়বহুল করে বানিয়েছেন যে, একটা বেহেস্তের ইট দিয়ে ৭০ টা পৃথিবী কিনে পাওয়া যাবে!” আমি তো শুনে পুরো অবাক! বেহেস্তের ইটগুলো কি সোনা দিয়ে গড়া? তাও দিয়ে তো পৃথিবীর ইউরোপ আমেরিকার ব্যয়বহুল শহরে একটা বাড়ি কেনা যাবে না! তবে কি বেহেস্তের ইটগুলো কি একেকটা হিরের টুকরো? তাও তো পৃথিবীর মোট হিরের অংশের লক্ষ লক্ষ ভাগের এক অংশ তো হবে না। তো এটা এক ধরণের ইট? পদার্থ দিয়ে তৈরি? এটা একধরণের আজগুবি গল্প নয় কি? আচ্ছা মানুষ এতো ভগবান, আল্লাহ, ঈশ্বর, গডকে ভক্তি করেন, তার প্রার্থনা করেন, আজ পর্যন্ত কেউ কি ঈশ্বরকে দেখেছেন? তার অস্তিত্বের খোঁজ পেয়েছেন? এই পৃথিবীতে তো ধর্ম একটা না, প্রায় সাড়ে চার হাজার ধর্ম। তাদের আলাদা আলাদা ধর্মীয় রীতি। কেন এমন? ধার্মিকদের মতে আল্লাহ ঈশ্বর গড ভগবান যদি এক হয়, তাহলে আলাদা আলাদা হাজার হাজার নিয়ম কানুন কেন? হাজার হাজার ধর্মীয় সংস্কৃতি কেন? ভগবান অনুসারীরা মুর্তি পুজা করলে, আল্লাহ অনুসারীরা বলে মুর্তি পুজা ইসলামে হারাম! মুর্তি ইসলামে শিরক! মুহম্মদ তো ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন, মক্কার কাবা শরীফে অবস্থিত বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ৩৬০ টি মুর্তিকে নির্মমভাবে ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে…..

এমন সময় হাজতের দরজায় তালা খোলার শব্দ পেলাম। দুই কন্সটেবল আমাকে নিতে এসেছে। পুলিশের উর্ধতন মহলের কোন এক বড় কর্মকর্তা এসেছে নাকি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। হাজত থেকে বের করার আগে তারা আমাকে হাতকড়া পড়িয়ে দেয়। দুজন দুদিক থেকে ধরে রেখে আমাকে নিয়ে যায় ওসির রুমে। তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, থানার আশে পাশের কাকগুলো কা কা করে ডাকছে। দুই কন্সটেবল আমাকে এনে সেই বড় কর্মকর্তার মুখোমুখি করে সামনের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। এক কনস্টেবল বলল, -স্যার এর নাম অপ্রিয়। এই শুয়োরের বাচ্ছা আমাদের নবীকে…..
বড় কর্মকর্তা কন্সটেবলের কথা শেষ না হতেই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হাত নেড়ে বললেন, -আচ্ছা তোমরা যাও।
তারা চলে গেলেন। আর আমি চুপ হয়ে বসে আছি বড় কর্মকর্তার সামনে। বড় কর্মকর্তা আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন……

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on ““এক নাস্তিকের জবানবন্দী” পর্ব–৬

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

77 + = 83