মাহফুজুল বারী কখনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না?

কেন এই শিরোনাম?
কয়েকদিন আগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর মাহফুজুল বারীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে ফেসবুকে একটি ছোট স্মৃতিকথা লিখি। সেটা দেখে আমার এক ঘনিষ্ঠ বড়ভাই, টরেন্টো প্রবাসী, সাবেক বাম-ছাত্র-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন সংগঠক-নেতা আমাকে ইনবক্স করে জানালেন-

“টরিক ভাই, টরেন্টোতে যখন মুক্তিযোদ্ধা আর অমুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চরম বিতর্ক চলছে তখন আপনার এই লেখাটা “স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহ্ফুজুল বারী”, বারী ভাই কখনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, উনাকে মহান করবার যে অপচেষ্টা আপনাদের উদীচী করছে আপনি অন্তত তার সাথে যুক্ত হবেন না, পরে কথা হবে এই ব্যাপারে।”

তাঁর এই বিষয়টি আমি এড়িয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু আমার মনে হলো আমি যদি কোন বিষয় ভুল জেনে থাকি সেটার ঠিকটা কি, তা জানা দরকার। তাকে নিয়ে এ প্রশ্ন কোন প্রতিক্রীয়শীল ঘরাণা থেকে আসেনি, এসেছে আমারই এক অগ্রজের কাছ থেকে! বিধায় এই ছোট আলোচনার সূত্রপাত। কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের ইতিহাস অভিভাবকহীন। কারো কোন ভূমিকার স্বীকৃতির বিষয়টি ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের শর্তে তৈরী হয়। এক্ষেত্রেও কি সেরকম কোন কিছু? কোন বিস্তৃত আলোচনা ও তথ্যপ্রমানে আমি যাব না। কেবল কিছু জিজ্ঞাসার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করব তার এ বক্তব্য কতটা সত্য?

?oh=7f046c30c159a7f5161048543af1de18&oe=590C5919″ width=”500″ />
মাহফুজুল বারী কে?
দীর্ঘ কানাডা প্রবাসী, মাহফুজুল বারীকে যারা চেনেন-জানেন তাদের কাছে তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একজন আসামী, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা।

আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা কি?
১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর দায়ের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাকে বলা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় এই কথিত ষড়যন্ত্রটি হয়েছিল বলে তার নামানুসারে একে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলা হয়। মামলা নিষ্পত্তির ৪ যুগ পর এ মামলার অন্যতম আসামী ক্যাপ্টেন শওকত আলী ২০১১ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থে এ মামলাকে সত্য মামলা বলে দাবী করেন।

কেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ?
এই মামলার আসামীদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তারা, ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশ কে একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গোপন বৈঠক করেছিল। তারমানে তারা প্রত্যেকেই চেয়েছে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। যে ঘটনাটি প্রকাশ হবার পর পাকিস্তানি সরকার তথাকথিত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিব, মাহফুজুল বারীসহ সবাইকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর পরিকল্পনা করছিল।

এই ঘটনা কি ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের কোন অংশ?
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মুল কারণটি ছিল এই মামলা ও শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি! এই মামলার একজন অন্যতম আসামীর মুক্তিযদ্ধে কোন অবদান-ভূমিকা নেই সেটা কি সঙ্গত? এ মামলার একমাত্র আসামী মাহফুজুল বারীকে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্চাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই তার অবদানের জন্য। নয় কি..? এই বিষয়ে অনেক দলিল ও তথ্য নেটেও আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।

?oh=8e218ebcd118cbea16b0d90b897f3662&oe=590659FB” width=”500″ />
মাহফৃজুল বারী ‘কখনো’ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না..?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন কনভেশনাল যুদ্ধ ছিল না, এটা ছিল একটা জনযুদ্ধ। আর জনযুদ্ধের ধারা-প্রকৃতি-অংশগ্রহন-সম্পৃক্ততা তৈরী হয় বিভিন্ন ভাবে। সময়ের চক্রে বিষয়টাকে বাঁধলে শহীদ আসাদ-মতিউর’রা সে সম্মান অর্জনের তালিকা থেকে বাদ পরে যায়। তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরী হলো কার রক্তে, আত্মদান আর আত্মত্যাগে?

বারীভায়ের বিষয়টা শোনার পর আমি খোঁজ নিতে চেষ্টা করলাম। যেহেতু আপাতত আমার কাছে এ বিষয়ক কোন দলিলপত্র নেই, অনলাইন যে সব তথ্য আছে তার ভিত্তিতে জানলাম মাহফুজুল বারীকে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই পরিচয় দিচ্ছেন। এবং কোথাও ওনার এই পদবি নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনি, প্রশ্ন তোলেনি। এবং বাংলাদেশ সরকারও তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। শুধু স্বীকৃতিই নয়, রাষ্ট্রীয় শোক ও সম্মানও দিয়েছেন! এখানে তার কিছু লিংক ও তথ্য দেয়া হলো-

?oh=6416a3f8f6d697755690e93f11f1cc9c&oe=593768DB” width=”500″ />
আসলে কি তাই? কয়েকটি জিজ্ঞাসা..
এক. তাহলে প্রশ্ন, বাংলাদেশের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন মাহফুজুল বারীকে একজন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদায় বিবৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক প্রকাশ করলেন..? এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেয়া হলো? যে সম্মান কেবল জাতির শ্রেষ্ট সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদেরকেই দেয়া হয়..!

দুই. তিনি যদি মুক্তিযোদ্ধা না হন, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাহফুজুল বারীর যে সংবাদ জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলো তার প্রতিবাদ করছে না কেন?

তিন. সরকার এত বড় একটা ভুল করল, একজন অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দিল আপনার/আপনাদের পক্ষ থেকে পাল্টা তথ্যপ্রমান দিয়ে সরকারের ভুলটা ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেন?

চার. একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মহান করলে বা বললে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয় না, বরং মহিমান্বিত করা হয়! সেটা করলে যে কোন স্বাধীনতা প্রিয় মানুষের আনন্দিত হবার কথা! কিন্তু আপনার খারাপ লাগার কারন কি উদীচীর প্রতি ক্ষোভ? সেজন্য একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির অর্জন ও সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কি ঠিক?

পাঁচ. সংগঠনের একজন উপদেষ্টার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও স্মরণসভা হবে এটা স্বাভাবিক। আপনার আপত্তি হচ্ছে উনি আসলে একজন মুক্তিযোদ্ধা না কিন্তু উদীচী তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্টা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে! তাহলে কি বলতে হয় উদীচীর হাত অনেক লম্বা তারা একজন অমুক্তিযোদ্ধাকেও রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে সরকারের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান আদায় করে নিতে পারে? তাহলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর যোদ্ধাদের স্বীকৃতির জন্য কোর্টে যেতে হলো?

ছয়. আমি নিজেকে কোন দল বা মতাদর্শ অন্ধ ব্যক্তি মনে করি না। আমি যে দল করেছি, সে দলের কোন শীর্ষনেতার কোন কর্মকান্ড যদি আমার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় তার সমালোচনা করতে দ্বিধান্বিত হইনি। তার একধিক প্রমান আমার ব্লগ-টাইম লাইনে পাবেন। তবে আপনার দাবীর পক্ষে যদি যথেষ্ট যুক্তি-প্রমান থাকে তাহলে আমি দুঃখ প্রকাশ করে এ বিতর্ক থেকে নিজেক সরিয়ে নেব।

সাত. কেবল ৯ মাস যারা বন্দুক-কামান নিয়ে যুদ্ধ করেছে তারাই কি শুধু মুক্তিযোদ্ধা? সেটাই যদি মানতে হয় তাহলে অনেক শীর্ষনেতাও এই মর্যাদা থেকে খারিজ হয়ে যাবেন! নয় কি? সরকারের প্রেসনোটে বলা হয়েছে সাবেক এই বিমানবাহিনী কর্মকর্তা ২ নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দাবৃত্তিতে যুক্ত ছিলেন। সে তথ্য কি ভুল?

শেষ কথা
মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, পুরানো এবং ধারাবাহিক। খুবই দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক! ক্ষমতাকেন্দ্রীক ও প্রতিহিংসার রাজনীতির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নানা স্বার্থ-সুবিধার কারণ ও সমীকরণ এর অন্তর্গত। এ বিতর্ক দিনদিন জটিল করা হচ্ছে ব্যক্তি ও শাসকদের নানা সুবিধাবাদী চরিত্র ও দূর্বলতার কারনে। সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ও চর্চা ছাড়া এ বিতর্ক বের হয়ে আসা আপাতত আশা করা কঠিন। যার জন্য মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট “ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী”কে মন্ত্রনালয় ও সরকারের অনিচ্ছার কারনে, তাদের অবদানের স্বীকৃতির জন্য- হাইকোর্টে যেতে হয়েছে। এক্ষেত্রেও যদি এ রকম কোন বিষয় ঘটে থাকে, তা আমাদের অসুস্থ পরিধি বিস্তৃতির এক বিপদজনক অশনিসংকেত!

ড. মঞ্জুরে খোদা, লেখক-গবেষক, সাবেক ছাত্রনেতা, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

http://bangla.bdnews24.com/banglade…
http://ekushey-tv.com/etv-news/nati…
http://www.ittefaq.com.bd/print-edi…
https://bn.wikipedia.org/wiki/
http://www.abnews24.com/2017/01/23/…
https://www.facebook.com/faizan.bar…
http://www.banglatribune.com/others…
http://www.abnews24.com/2017/01/23/…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 30 = 36