গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লী আপডেট | জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

কেমন আছে ওরা। ৬ই নভেম্বরের পর জল অনেকখানি গড়িয়েছে কিন্তু অবস্থার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান কি রাষ্ট্র করেছে? তাদের প্রতি আইনি হয়রানি কি বন্ধ হয়েছে? কয়টি ফৌজদারি মামলা হয়েছে তা কি আপনারা জানেন? সর্বোপরি কেমন আছেন গোবিন্দগঞ্জের মানুষ?

আমাদের সংবাদ মাধ্যম খুব বেশীদিন একই বিষয়ের উপর তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, তাই ফলোআপ তেমন হয়না বললেই চলে। তাই এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। সাংবাদ মাধ্যম না জানালে সাধারণ নাগরিকের জানার উপায় থাকে না।

উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার আগ্রহ তখনই থাকবে যখন আপনার এই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পুনর্বাসন হল কিনা, মানুষগুলো আদৌ বাঁচলো কিনা, তারা তাদের ভূমির অধিকার ফিরে পাবে কিনা- এসব জানার আগ্রহ থাকবে।

জয়পুর ও মাদারপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো ঢাকা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের দেয়া সাহায্যে এতদিন টিকে ছিলেন বা আছেন। তাদের দেয়া তাবুতে ঘর করে থাকছেন। সরকারের তরফ থেকে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে তাদের জন্যে বাসস্থান নির্মাণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত তারা কিছুই করেনি।

সরকারের কোন একটি মন্ত্রণালয় তাদের আর খোঁজ খবর করেনি। অনেকেরই দুবেলা খাবার জোটেনা।

এ পর্যন্ত মোট আটটি মামলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্বপন মুরমু নামের যে ব্যক্তিকে দিয়ে পুলিশ মামলা করিয়েছিল সেই মামলায় ভূমি অধিকার আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলে আছে। তারমানে নিজেদের মামলায় নিজেরা গ্রেফতার। দুনিয়াতে এরকমও হয় তা সবাই জেনে যেতে পারলেন। আপনারা সমৃদ্ধ হলেন।

প্রথম দিকে করা চারটি মামলায় দ্বিতীয় দফায় মোট ৭১ জনের হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন হয়েছে।

আশে পাশের গ্রামের মানুষগুলো এখনো জয়পুর ও মাদারপুরে আশ্রয় নেয়া মানুষদের শত্রু মনে করে। এম,পি, ভুল বিঝিয়ে এদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অথচ এদেরও দুবেলা খাবার জোটে না। এই এদেরই ভূমি উদ্ধার আন্দোলনকারীদের বন্ধু হওয়ার কথা ছিল। ইংরেজদের বিভাজনের নীতি আমাদের হাড়ে মজ্জায় ঢুকে গেছে। এর সফল প্রয়োগ হয় সব সময়। সমাজের একটি অংশ দাম ঠিক করেই বসে থাকে বিক্রি হওয়ার জন্যে।

এত কিছু খারাপের মাঝে সবচেয়ে ভাল খবর হল- শিশুদের জন্যে একটি স্কুল হয়েছে সেখানে। গোবিন্দগঞ্জের বাইরে থেকে কিছু উৎসাহী তরুণ নিঃস্বার্থভাবে নিরলস শ্রম দিয়ে স্কুলটি দাঁড় করিয়েছে। ঢাকার অনেক বন্ধুরা আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য দিয়েছেন। চিত্র পরিচালক লেনিন তার একটি পুরস্কারের পুরো টাকা তুলে দিয়েছেন স্কুলের জন্যে। স্কুল পরিপূর্ণভাবে চালাতে আরও সাহায্য প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই সাহায্য করছেন।

সর্বোপরি গোবিন্দগঞ্জের মানুষ ভাল নেই। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। তারা ক্ষুধার সাথে, বিরুপ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে না পেরে সেখান থেকে সরে যাক- এটাই এখন ভূমি সন্ত্রাসীদের অন্যতম লক্ষ্য। গোবিন্দগঞ্জের মানুষ লড়তে জানে- সেটা তারা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে। এ লড়াই আমাদের সবার লড়াই। গোবিন্দগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাংক লুট করা লাগবে না, আপনার-আমার ইচ্ছাই যথেষ্ট।

গোবিন্দগঞ্জের ভূমির অধিকার আন্দোলনকারীদের, বিশেষত সাঁওতালদের ভূমির অধিকার নিয়ে নানান কথা বলা হয়েছে কিন্তু একটা বিষয় আমাদের তরফ থেকেও বলা হয়নি, তা হল- State Acquisition and Tenancy Act, 1950 এর ৯৭ ধারা মতে সরকার জমি হুকুম দখল (Requisition) করার কোন এক্তিয়ারই ছিল না। ফেরত দেয়ার প্রশ্ন পরে। নিতে না পারলে ফিরিয়ে দেবেন কি?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 2 =