প্রদীপশিখা

“বাবা, আমাকে কি একটু জানালার পাশে দিবা?” হঠাৎ করেই গলাটা শুনে সাদেক চমকে উঠলো। তিন-চারটে স্টেশন পেরিয়ে আসার পর যখন কেউ ওঠেনি তখন সে ভেবেছিল তার পাশের সিটে মনে হয় কেউ নেই। এখন পাঁকা চুল আর আশির দশকের আদলে ঢিলে শার্ট-প্যান্ট পরা একটা লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সিটটা চাইছে। একটু বিরক্তি বোধ হল তার। কিন্তু লোকটার কণ্ঠে কেমন একটা অনুরোধ ছিল অথচ সেটা করুণা প্রার্থনা নয়।
“জ্বি আঙ্কেল, বসেন।” সাদেক নিজের সিটটা ছেড়ে দিল।
রেললাইন শহর ছেড়ে ধানক্ষেতে এসে পড়ার পর থেকেই লোকটা বিড়বিড় করে কিছু বলছিল। দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল সাদেকের চোখ এড়ালো না। কৌতুহল হল তার মনের মাঝে। তবু চুপচাপ বসে রইল, কিছু বলল না।
“সেই ধানক্ষেত, অথচ সবকিছু কেমন যেন নতুন!” কথাটা লোকটার কান্নাভেঁজা গলার কারণে একটু জোরে হল। চমকে উঠল সাদেক।…

“বাবা, আমাকে কি একটু জানালার পাশে দিবা?” হঠাৎ করেই গলাটা শুনে সাদেক চমকে উঠলো। তিন-চারটে স্টেশন পেরিয়ে আসার পর যখন কেউ ওঠেনি তখন সে ভেবেছিল তার পাশের সিটে মনে হয় কেউ নেই। এখন পাঁকা চুল আর আশির দশকের আদলে ঢিলে শার্ট-প্যান্ট পরা একটা লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সিটটা চাইছে। একটু বিরক্তি বোধ হল তার। কিন্তু লোকটার কণ্ঠে কেমন একটা অনুরোধ ছিল অথচ সেটা করুণা প্রার্থনা নয়।
“জ্বি আঙ্কেল, বসেন।” সাদেক নিজের সিটটা ছেড়ে দিল।
রেললাইন শহর ছেড়ে ধানক্ষেতে এসে পড়ার পর থেকেই লোকটা বিড়বিড় করে কিছু বলছিল। দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল সাদেকের চোখ এড়ালো না। কৌতুহল হল তার মনের মাঝে। তবু চুপচাপ বসে রইল, কিছু বলল না।
“সেই ধানক্ষেত, অথচ সবকিছু কেমন যেন নতুন!” কথাটা লোকটার কান্নাভেঁজা গলার কারণে একটু জোরে হল। চমকে উঠল সাদেক।
“আঙ্কেল আপনি কোথা থেকে এলেন?” সাদেক আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না।
“আমার পরিচয় জানতে চাও?” লোকটা ভেঁজা চোখ নিয়ে সাদেকের দিকে তাকিয়ে বলল।
“জ্বি, মানে, একটু কৌতুহল হচ্ছিল আপনার attitude দেখে। By the way, আমি সাদেক। ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ছি। ছুটি চলছে তাই বাড়ি যাচ্ছি।”
“ইউনিভার্সিটিতে পড়? ভাল,” লোকটা আপন মনেই হেসে বলল। “আমি আসগর আলী। আমিও বাড়ি যাচ্ছি। কুমিল্লায় বাড়ি। কোথা থেকে আসছি সেইটা জানতে চেও না। শুনে তোমার রাগ ওঠবে আর আমার ওজন কমবে।”
বৃদ্ধের কথা শুনে সাদেক একটু দমে গেল। পরিস্থিতি সামলে নেয়ার জন্য স্টেশন থেকে কেনা পত্রিকার দিকে নজর দিল সে।
পত্রিকার ভেতরের পাতার একটা বড় ছবিতে চোখ আটকে গেল সাদেকের। আসগর আলীর ছবি। নিচে ছোটখাটো শিরোনাম, তবে বেশ আকর্ষণীয় এর শব্দগুলো। শিরোনামটা এরকম-
“ত্রিশ বছর আঁধারে,
অবশেষে ন্যায়বিচার”
সাদেক অবাক হয়ে তাকালো আসগর আলীর দিকে। তিনি এতক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলেন ব্যাপারটা। মুঁচকি হেসে উঠলেন সাদেকের হতবুদ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে।
“বলছি সবকিছু,” তিনি কেমন করে যেন সাদেকের মনোবাসনা বুঝতে পারলেন। “ছোট্ট ঘটনা। এই তো দুই-তিন মাসের। দেখো, জীবনটাই পাল্টে দিল!

শীতের শিশিরভেজা রোদ হালকা হয়ে আসা কুয়াশার বুক চিড়ে ধানক্ষেতটির মাঝে এসে পড়ছে। দিনের প্রথম রোদ। সিক্ততা, স্নিগ্ধতা, কোমলতা মেশানো রোদ। আলের মাঝে দাঁড়িয়ে বুক ভরে গ্রাম বাংলার পরিচ্ছন্ন, হিমেল বাতাস বুক ভরে টেনে নিল আসগর আলী। বি,এ, পাস করে ছোটবেলার স্বপ্ন অনুযায়ী এই অজপাড়াগায়ে শিক্ষকতা করতে এসেছে সে। তার এক শিক্ষক ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এই চাকরির।
দশ-পনের দিন গিয়েছে, এর মাঝেই হাঁফিয়ে উঠেছে আসগর। এখানে পড়াতে গেলে উঁচু-নিচু ভেদ মানতে হয়। একই পড়া সৈয়দবাড়ির ছেলেমেয়েদের আলাদা করে পড়াতে হয়। গ্রামের প্রতিটি মানুষ উঠে-বসে এদের কথায়। বংশই তাদের এই ক্ষমতা এনে দিয়েছে, যেটা দেখলে আসগরের গাঁ গুলিয়ে যায়। এই তো সেদিনও এ নিয়ে বাক-বিতণ্ডা হয়েছে সৈয়দ শাহেদের সাথে। সবাইকে একসাথে পড়ানোর কথা বলেছিল আসগর। কথাটা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল শাহেদ। তার কথা হল আল্লাহ তাদের যে সম্মান দিয়ে পাঠিয়েছেন সেটাকে মানুষ অমান্য করার কে? আসগর বলেছিল সম্মান কখনো উত্তরাধিকার সূত্রে আসে না, সম্মান অর্জন করতে হয়। এ নিয়ে প্রায় আধ-ঘণ্টা ঝগড়া করার পর এবং নিজের বাবা-মা সম্পর্কে যাচ্ছেতাই শুনার পর আসগর সৈয়দবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। এতোকিছু হয়, বারবার মনে হয় শেষ এবার ফিরতে হবে। কিন্তু এরপরও সে থেকে যায়। আর দশটা মানুষের মত সেও ভাবে, আরেকটু দেখা যাক।
শীত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সূর্য এক-আধটু দাপট দেখাচ্ছে আজকাল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে সেরকম কষ্ট এখন আর হয়না।
শুক্রবার। সকালবেলা উঠে তাই হাঁটতে বের হল আসগর। চারপাশ দেখে দেখে হাঁটছিল সে। হঠাৎ করেই চোখ আটকে গেল। ধান ঝারছিল সে সকালের রোদে দাঁড়িয়ে। কোমরের মাঝে গোঁজা শাড়ির আঁচল, শ্যামলা গায়ের রং আর কখনো কারো প্রেমে না পড়া নিষ্পাপ চেহারার অধিকারী এই ষোড়শীকে দেখলে মনে হয় এই তো কবিদের বলা গ্রামবাংলার মেয়ে। আসগর মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল। চারপাশের পাখির ডাক তার কানে ঢুকছে না, গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ যে ধীরে ধীরে তার কোমলতা হারাচ্ছে সেটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তার সমস্ত চেতনা আটকে আছে কুলো হাতে মেয়েটির দিকে, তার দৃষ্টি আটকে আছে শ্যামলা গোল মুখটির দিকে।
“কি মাস্টার, কি দেহো?” হঠাৎ জমির উদ্দিনের গলা শুনে বাস্তবে ফিরল আসগর। জমির বর্গা চাষী। সৈয়দদের জমিতে চাষ করে সে। তার মত আরো অনেকেই আছে এরকম। আবার নিজস্ব জমিও আছে অনেকের। উচ্চবংশীয় ছাড়া কেউ সামর্থ্য থাকলেও জমি কিনতে পারে না। মূল কথা নিবাস প্রাপ্তি যখন অন্যায় পথে হয় তখন বাঘও সেটা ইঁদুরের হাতে হারানোর ভয় পায়। এই ভয়টা স্রষ্টা সবার মাঝেই দিয়েছেন। এ এক সহজাত অনুভুতি।
আসগরের এই গ্রামে বন্ধু বলতে জমিরই। আসগর আর জমির গ্রামের মানুষকে গোপনে সৈয়দবাড়ির বিরোদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য বুঝাচ্ছে। এ পর্যন্ত বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে চেষ্টাটা। যুবকরা একমত হয়েছে এ ব্যাপারে আর বৃদ্ধরা ইতস্তত করছে। অর্থ্যাৎ ব্যাপারটা ঠিক বলেই মেনে নিয়েছে তারা। জমিরকে দেখে আসগরের মনে হল এটা যে তার বাড়ি। লজ্জা পেয়ে গেল সে।
“কিছু না,” লজ্জার হাসি মুখে নিয়ে বলল সে। “তোমার কি খবর জমির ভাই?” আসগর প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলল।
“আমার বইন,” জমির আগের কথার জের ধরেই বলল। “এই মাঘে পনরোয় পড়ল। মাইয়ার মেলা পড়ার সখ। ওরে একটু পড়াইবা মাস্টার? বেশি না হপ্তায় একদিন হইলেই হইবো।”
“পড়াবো।” কথাটা বলার আগে বিন্দুমাত্র ভাবলো না আসগর। লজ্জার হাসি মুছে গিয়ে তার বদলে এলো উজ্জ্বল হাসি।
আসগর অবাক হয়ে ভাবে এই গ্রামের মানুষগুলো তাকে এতো বিশ্বাস করছে কেন। মোটে আড়াই মাস হয়েছে সে এখানে এসেছে। আড়াই মাস কখনোই পর্যাপ্ত নয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরোদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য, এতো বড় বিশ্বাস অর্জনের জন্য। সে বুঝতে পারে, মানুষ যখন দীর্ঘ গভীর অন্ধকার রাতে বাস করে তখন ক্ষুদ্র প্রদীপ শিখাকেও দিনের আলো বলে ভাবে। আসগর প্রদীপ হয়ে জ্বলেছিল। তার সাথে আজ জ্বলে উঠেছে অনেকগুলো তরুণ প্রদীপ।
প্রথমে শুধু সৈয়দরা হলেও এরপর যাদের নিজস্ব জমি আছে তাদেরকেও আলাদা পড়াতে হচ্ছিল আসগরকে। কয়েকদিন হল সে আলাদা পড়াতে পারবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে এবং পড়াচ্ছেও না। সৈয়দরা জানে আসগর তাদের বিরোদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চিন্তা-ভাবনা করছে। কিন্তু ব্যাপারটা যে এরকম পর্যায়ে পৌছেছে সেটা তারা জানতো না।
আসগরের না পড়ানোর সিদ্ধান্তটার পর থেকে গ্রামের চেহারা দ্রুত পাল্টে যেতে লাগলো। দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল পুরো গ্রাম। আসগররা ভেবেছিল সৈয়দরা তেমন একটা সমর্থন পাবে না। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে সৈয়দদের দল ততোই ভারী হচ্ছে। আসলে ক্ষণিকের উন্মাদনায় মানুষ সবকিছুকেই সমর্থন করে, কিন্তু যতদিন যায় সেই উন্মাদনা কমে আর আদি শৃঙ্খলের দাপট বাড়তে থাকে।
আসগর ভাবে সে পড়ানোর জন্য এসেছিল এখানে অথচ এখন সে একটা বিপ্লবের চিন্তা-ভাবনা করছে। সে বুঝতে পারে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছে। জমিরের বোন রাহেলাও বলে সে কথা। এই মেয়েটা আসগরের পিছুটান। রাহেলাকে দেখলে আসগরের মনে হয়, “একে দেখার জন্য আরেকটু বাঁচি।” গ্রামের মানুষ ইতোমধ্যেই রাহেলার সাথে তার সম্পর্কের কথা জেনে নিয়েছে। জমিরও জানে, কিছু বলে না। রাহেলা আসগরের সামনে এলে মুঁচকি হাসে সে।
গ্রামের ছেলেগুলো দিনেরবেলা ক্ষেতে কাজ করে। তাই তাদেরকে রাতেরবেলা পড়ায় আসগর।
বিশ-ত্রিশটি প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে ঘরটি। বাইরে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার। ছেলেদের লেখা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল আসগর। কেমন এক অস্বস্তি হচ্ছিল তার। বারবার মনে হচ্ছিল এরকম অন্ধকার থাকা উচিত নয়। দম বন্ধ হয়ে আসছিল তার তবু তাকিয়ে রইল। কারণ অন্ধকার দূর করতে গেলেও কিছুক্ষণ অন্ধকারে হাঁটতে হয়।
“মাস্টার সাব, মাস্টার সাব,” শফিক হঠাৎ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো। “মতিন জমিররে মাইরা লাইছে।”
স্তব্ধ হয়ে বসে রইল আসগর। জমিরের পরেই তাদের দলে সবাই মতিনকে অগ্রাধিকার দেয়। সে কেন এই অন্তিম মুহুর্তে এসে জমিরকে মারলো?
“মতিন কোথায়?” আসগর কোনরকমে বলল।
“সৈয়দবাড়ি।”
আসগর বুঝতে পারে মতিন বিক্রি বসেছে। সে জানেনা আরো কজন এভাবে বিক্রি বসেছে। কারণ দারিদ্রতার কাছে নীতির মাহাত্ত্ব নেই, আছে কেবল টাকার মাহাত্ত্ব।
পুলিশ এলো পরেরদিন। মতিনকে ধরে নিয়ে গেল। সৈয়দরা দারোগাকে জানালো তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। মতিন আসগরের লোক। রাহেলার সাথে আসগরের সম্পর্কটা জমির মানতে পারছিল না দেখে মতিনকে দিয়ে সে এই কাজটা করিয়েছে।
খালি ঘরে বসে আছে আসগর। কাল চূড়ান্ত আঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আসগর ভাবছিল জমিরের কথা। শক্ত-সামর্থ্য-সুন্দর যুবক। শুধুমাত্র একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সে আসগরকে সমর্থন দিচ্ছিল। অনেক স্বপ্ন দেখতে পারতো লোকটা। প্রায়ই আসগরের পাশে বসে বলতো, “স্বপ্ন দেহো মিয়া স্বপ্ন দেহো। বিনা পয়াসায় আনন্দ পাইবা। এই যে আমি, পত্তেকদিন ঘুমানির আগে ভাবি, কাইলকের দিনডা সুন্দর অইবো। কাইল আর আয় না। তাও আমি স্বপ্ন দেহি।” এরপর সে আসগরের কাঁধে হাত দিয়ে বলতো, “আমার স্বপ্ন ভাঙ্গে, তাও আমি দেহি। এর লাইগাই তো আইজতক বাইচা আছি মিয়া।” বলে হাসতো জোরে জোরে। স্বপ্ন দেখতে থাকা এই মানুষটা আজ নেই। আনমনেই নীরব ঘরে কেঁদে উঠলো আসগর। নীরব কান্না। যেন শান্ত সাগরের নিয়মিত ঢেউ।
নীরবতাকে খান খান করে বাইরে থেকে দারোগার গলা ভেসে এলো। চোখ মুছে বেরিয়ে এলো আসগর। গ্রামের সবাই দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই বিমল আসগরের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।
“তুমারে নিয়া গেলে আমগো কি হইবো গো মাস্টারদা?” হাউমাউ করে উঠলো সে।
“তোরা তো আছিস। আমি নেই তো কি হয়েছে?” তোরা তো আছিস,” আসগর বিমলকে বুকে জড়িয়ে বলল। এরপর দারোগার দিকে তাকালো, “চলেন দারোগা সাহেব।”

অনেকক্ষণ দ্রুত চলার পর ট্রেনটা গতি কমাতে শুরু করল। কুমিল্লা স্টেশন এসেছে।
“সৈয়দদের কি হল?” সাদেক জিজ্ঞেস করল।
আসগর আলী মুঁচকি হাসলেন, “চারপাশ দেখে তুমি বুঝতে পারনা বাবা? আমার ইস্টেশন এসেছে। গেলাম। ভাল থেকো।”
সাদেক তাকিয়ে রইল আসগর আলীর পথের দিকে। অন্ধকার মানুষটাকে ষাটের আগেই কুঁজো বানিয়ে দিয়েছে। বয়স যেন বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ধান ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে চলতে শুরু করেছে ট্রেনটা। সাদেক জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাবে, ত্রিশ বছর আগে এরকমই একটা ধানক্ষেতের ওপারে থাকা গ্রামের অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলেন আসগর আলী। দূর হয়নি অন্ধকার। হয়ত কোথাও কোথাও পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু আজো মানুষ অনেক জায়গায় উত্তরাধিকার সূত্রেই সম্মান পায় তা সে যতই কুৎসিত মস্তিষ্কের অধিকারী হোক না কেন অথচ অনেকেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্মান পায়না। অন্ধকার আগের মতই রয়েছে শুধু আসগর আলীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ত্রিশটি বছর চলে গেছে।
রাহেলা হয়ত আজ অন্য কারো ঘরে। মুখের মাঝে হাসি নিয়ে সে হয়ত তার নাতি-নাতিনদের সাথে খেলছে। হয়ত সে এখন আর পথের দিকে আসগর আলীর অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে না। কিন্তু মনটা নিশ্চয় আজো তাকিয়ে আছে সেদিকে। আসগর-এর মনটাও হয়ত আরেকবার সেই শ্যামলা মুখটা দেখতে চায়। মন অনেককিছুই চায় পারেনা শুধু মাঝখানে থাকা বাস্তবতার দেয়ালের জন্য।
এমনই হয়। আঁধারের মাঝে কেউ একজন আলো জ্বালতে চেষ্টা করে। দুষ্ট বাতাস সেটা নিভিয়ে দেয়। উড়িয়ে নিয়ে যায় যে আলো জ্বালিয়েছিল তাকে। বারবার এমন হয়, প্রতিবারে বেড়ে চলে প্রদীপের সংখ্যা। অতঃপর জ্বলে ওঠে সহস্র প্রদীপ। ভেসে যায় অন্ধকার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

58 − = 51