ভাল্লাগে না সিনড্রোম

বেশ কিছুদিন আগে পাওলো কোহেলোর ‘দি আলকেমিস্ট’ বইয়ে একটি চমৎকার কথা পড়েছিলাম।তিনি লিখেছেন,“পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলঃ জীবনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে আমারা নিজেদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলি এবং ভাগ্য সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।”প্রথমবার যখন বইটি পড়েছিলাম তখন কথাটি ভাল লাগলেও ধারণ করতে পারি নি। এরপর যত দিন গিয়েছে কথাটির তাৎপর্য তত ধরা দিয়েছে একটু একটু করে।

এখন কাজের কথায় আসি।আমরা প্রায় সবাই জানি, বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোর এবং তরুণ-তরুণীদের সার্বজনীন সমস্যা হলঃ ‘ভাল্লাগে না সিনড্রোম’।কিন্তু আমরা কী এটা জানি, এই সমস্যার মূল কোথায়?এটা বলার আগে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই।আমাদের দেশের কতিপয় চিকিৎসকের মাঝে একটা প্রবণতা আছে।তারা রোগ নির্ণয় করতে পারুন আর নাই পারুন তাদের কাছে গেলেই গাদা গাদা ঔষধ প্রেসক্রাইব করেন এবং এর ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়।যে রোগের বীজ শরীরে ছিলই না তারই প্রতিষেধক খাওয়ায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো হয়ই জটিলতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।এমনকি তারা মনগড়া নানা কথা বলে আতঙ্ক ছড়াতেও ভোলেন না।আর আমরাও তাদের পথই অনুসরণ করি।তাই কেউ অসুস্থতার কথা বললে নিজের অজান্তেই আমাদের হাতটি চলে যায় অসুস্থ ব্যক্তির কপালে। জিজ্জেস করি, ‘জ্বর হয়েছ?’যেন জ্বর নামধারী এই অসুখটি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন অসুখ নেই।আর শুধু তাই নয়।এক্ষেত্রে আমরা চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞের মত প্যারাসিটামল প্রেসক্রাইব করতেও ভুলি না।এতসব বলার কারণ একটাই।এটা বোঝানো যে,আমরা কোন সমস্যার মূল খুঁজে তার স্থায়ী সমাধান করতে অভ্যস্ত নই।বরং যেন তেন ভাবে তার একটা সাময়িক সমাধান করতেই আমরা স্বস্তি পাই।

এসব তো গেল অফটপিক।বলছিলাম,বর্তমান প্রজন্মের ‘ভাল্লাগে না সিনড্রোমের’ কথা।প্রথমেই আসি বর্তমান প্রজন্মের বেড়ে ওঠার পরিবেশের কথায়।একুশ শতকের যুগ হওয়ায় এখন মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে অনেকগুণ। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী এবং যৌথ পরিবারও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।তাই শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশও বদলে গেছে।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের বেড়ে উঠতে হয় একা একা।মাও একা সব দিক সামলাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যান।আর তাই আশ্রয় নিতে হয় প্রযুক্তির।হতে পারে সেটি স্মার্ট ফোন, টিভি, কম্পিউটার অথবা গেমিং ডিভাইস।এসবের কোন একটি শিশুটির হাতে তুলে দিলেই নির্বিঘ্নে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শান্ত রাখা যায়।তাই খুব ছোটবেলা থেকেই সে আশেপাশের মানুষের তুলনায় স্ক্রিনের অপরপাশের জগতের সাথে থাকতে বেশী স্বচ্ছন্দ্য বোধ করে।এমনকি এমনও লক্ষ্য করা যায়,একটি শিশু যখন গল্পের বই পড়ে বা বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে তখন বাবা-মায়ের ব্যাপক আপত্তি থাকে।খুব কম বাবা-মা আছেন যারা নিজে থেকে ছেলেমেয়েদের বই কিনে দেন এবং বই পড়তে উৎসাহ দেন। অনেকক্ষেত্রেই বাবামায়েরা বই পড়াকে দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করেন।ফলাফলস্বরূপ এই প্রজন্ম একটি বিপুল আনন্দের উৎস,সুন্দর কল্পনার জগৎ,মননশীল চিন্তার জগৎ থেকে বঞ্চিত হয়।আর খেলাধুলার কথা বলতে গেলে বলতে হয়,আমাদের দেশের বাবামায়েরা প্রকৃতিগতভাবেই অতিরিক্ত স্নেহপ্রবণ হন এবং এই স্নেহের ভাণ্ডার শুধুমাত্র নিজের সন্তানের জন্যেই সঞ্চিত থাকে।যেহেতু বাইরের পৃথিবীতে ধূলাময়লা আর আবর্জনার পরিমাণ দিনিদিন বাড়ছে তাই তাদের প্রচেষ্টা থাকে নিজের সন্তানদের এথেকে বাঁচিয়ে রাখার।কিন্তু তারা এটা ভুলে যান,যখন ধূলাময়লা আর আবর্জনার মাঝেই বাস করতে হয় তখন চাইলেও এথেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।এর ঝাপটা এসে লাগবেই।

প্রতিযোগিতার এই যুগে সবারই প্রচেষ্টা থাকে কীভাবে অন্যকে হারিয়ে সামনে যাওয়া যায়।সবসময় সবচেয়ে ভাল জিনিসটা ‘আমাকেই’ পেতে হবে-এই বোধটা খুব ছোটবেলায় সূক্ষভাবে শিশুদের মাঝে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।আর তখন থেকেই তাদের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা দানা বাঁধতে থাকে।এরপর তারা বড় হতে থাকে আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আত্মকেন্দ্রিকতা।নিজেদের ভাল-মন্দ ছাড়া অন্য কিছু ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।মূল্যবোধ,নৈতিকতা,অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা-এ জাতীয় ভাবনাগুলোর সমাধিও হয় এরই রেশ ধরে।আত্মকেন্দ্রিকতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল এর ফলে মনুষের চিন্তার জগতটা খুব ছোট হয়ে যায়।কোন সামগ্রিক চিন্তা করতে অনভ্যস্ত হওয়ায় নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডির মাঝের প্রতিটা সমস্যাই অনেক বড় মনে হয়।এর ফলে খুব সামান্য কারণেই হতাশ হওয়ার প্রবণতাটাও বেশী হয়।

প্রযুক্তি নির্ভর যুগ হওয়ায় এখন অনুভূতি প্রকাশের পথগুলো খুব সহজ হয়ে গেছে।চাইলেই প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে যে কেউ। এর ফলে অনুভূতিগুলো গভীর হওয়ার সুযোগ পায় না।পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকায় অন্যের ভিন্ন ধারার মতামতকেও গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।ফলে বাড়তে থাকে ব্যক্তিত্বের সংঘাত।

এছাড়াও বাস্তবতা আর ভার্চুয়াল জগৎ এ দুটির মাঝে যে বিস্তর পার্থক্য আছে এটিও অনুধাবণ করতে পারে না অনেকেই।আর এর ফলে চাওয়া-পাওয়ার মাঝে ব্যবধান বাড়তে থাকে।ক্রমাগত এই ব্যবধান বাড়তে বাড়তে হতাশার পর্যায়ে চলে যায়।

কোন একটা সমস্যা সমাধানের জন্যে যে জিনিসটি প্রথমেই দরকার তা হল সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা-এটি তো প্রথমেই বলেছি।যাই হোক ‘ভাল্লাগে না সিনড্রোমের’ কিছু কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।এখন প্রশ্নটা হলঃ ভাল থাকা বা না থাকা কী শুধুই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে নাকি আমাদেরও কিছু করার আছে এক্ষেত্রে ?!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1