ভুলে যাওয়া ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম ও বাঙালী মুসলমানের ভাষার গর্ব


ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষী মুসলমানের জন্য গর্ব নয়, এটি তাদের ভুলের খেসারত মাত্র। কিন্তু এই অঞ্চলের ইতিহাস যারা লিখেছেন, তারা ভাষা আন্দোলনকে গর্ব হিসেবে চিহিৃত করেছেন। ‘বাংলা ভাষার জন্য আমার রক্ত দিয়েছি’- এ দাবী অসত্য নয়। একইভাবে চরম সত্য হচ্ছে দেশভাগ না হলে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিছুরই দরকার হতো না। ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ- দুটো লড়াই-ই ঘটেছিল পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালি মুসলমানরা একদিন যার হাত ধরে ঘরে ছেড়েছিল সেই পাঠান-পাঞ্জাবী মুসলমানদের সঙ্গে। তেইশ বছরের এই লড়াই কয়েকশ বছরও লাগতে পারত যদি না ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নামের একজন দেশভাগের পরও দেশ না ছাড়তেন…।

মুসলমানদের জন্য আলাদা করে গঠিত দেশ পাকিস্তানেv সংবিধান সভায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে রাখতে সবাই প্রায় একমত হয়ে গিয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান মুসলিম লীগাররাও একমত উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হোক। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে শেখ মুজিবর রহমান লিখেছেন, বাংলা ভাষাকে বাদ দেয়া নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছিল। কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবী করলেন বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হোক…। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজেও তার লেখায় বলেছেন, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে বাজেট অধিবেশনে তিনি আবার বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী তোলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই দাবী তুলে কিন্তু বেজায় ভয়ে ছিলেন। করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরে দেখেন অনেক তরুণ উনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ভয় পেয়েছিলেন এরা তাকে মারধোর করার জন্য অপেক্ষা করে আছে কিনা! অবশ্য পরে দেখা গেছে সেই যুবকরা তাঁর জন্য ফুল নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। তারা বলেছিল, আপনি আমাদের মান রেখেছেন…। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জানতেন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের বড় একটা অংশ তাঁর এই দাবীকে মুসলমান ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখবে। ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষাকে খৎনা করে যথেষ্ঠ মুসলমান উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। নজরুলের কবিতায় শ্মশানকে ‘গোরস্থান’ বসানো হচ্ছিল। নজরুলের শ্যামা সংগীত বাদ দিয়ে তার ইসলামী কবিতাগুলোর আলোকে তাঁকে একজন মুসলমান কবি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর রচনা প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, মাইকেল… জীবনানন্দ দাস ছিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

একইভাবে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের একটা অংশ যারা বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্য প্রমি প্রগতিশীল- তারা নিষিদ্ধ রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালনের লড়াই শুরু করেন ঢাকাতে। এটাকেও ঢাকার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আজকে গর্ব বলে দাবী করেন। বস্তুত এটিও ছিল ভুল লোকের সঙ্গে ঘর ছেড়ে খেসারত দেয়ার মত। তবু যাই হোক, এই সব কিছুর সংমিশ্রনেই একটা প্রগতিশীল মুভমেন্ট ঘটেছিল, ভাষা আন্দোলনে যার সূচনা, যার নেপথ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। যদি আপনি স্বীকার করেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনাই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বুঝিয়ে দিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের সঙ্গে একত্রে আর থাকা যাবে না- তাহলে মানতেই হবে পাকিস্তানে সে-সময় (১৯৪৮) বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলার মত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া আর কেউ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি চেতনা ফের প্রবেশের অন্যতম কারণ ভাষা আন্দোলন। আর এর সূচনা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর কারণে। এটা পাকিস্তানীরা খুব ভাল করে জানত। সেই ঝালটা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে পশ্চিম পাকিস্তানী ও পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালী মুসলমানদের দ্বারা গঠিত প্যারা মেলিটারিদের হাতে কড়াগন্ডায় পেয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছিলেন, ‘স্রোতকে যেমন আলাদা করা যায় না নদীর থেকে, তেমনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম পৃথক করা যায় না বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে’।… কে বলেছে যায় না? শুধুমাত্র নামগুলো হিন্দু হবার কারণে পাঠ্য বইগুলো থেকে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নামগুলো বাদ গেছে। কিন্তু স্রেফ মুসলমান হওয়ার কারণেই বহু যুদ্ধাপরাধীর নামে রাস্তা প্রতিষ্ঠানের নাম দিব্যি জ্বল জ্বল করে জ্বলছে স্বাধীন বাংলাদেশে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সবাই ভুলে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়াকে সেখানকার লোকজনই এখন ‘বি-বাড়ীয়া’ বলে ডাকে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ‘বড় হুজুরের’ কথা ছাড়া চলে না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগ্রহশালা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তারই রেখে যাওয়া ভাবশিষ্যদের হাতে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নাসিরনগরের মত ঘটনার জন্যই এখন পুরো বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে। ৪৭ সালে যে চেতনায় পাকিস্তান গড়েছিল এখনকার মানুষ- বাংলাদেশ এখন সেই চেতনাকেই ধারণ করে আছে…। ’৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ’- কথার অর্থ সেই চেতনাকে মনে করিয়ে দেয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ভুলে যাওয়া ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম ও বাঙালী মুসলমানের ভাষার গর্ব

  1. আপনি যদি পাকিস্তানের আলাদা
    আপনি যদি পাকিস্তানের আলাদা হয়ে যাওয়াটা ভুল মানুষের সাথে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়া হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করেন, তবে ৭১ এর গণহত্যার দোষটাও অনায়াসে দেশভাগের উপর দেয়া যায়; যারা দেশভাগ চেয়েছিল তাদের দোষী সাব্যস্ত করা যায়। দেশভাগ না হলে তো আর ত্রিশ লাখ লোককে এভাবে পাক বাহিনীর হাতে মরতো হতো না! সে হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনের সব নেতাই সে গণহত্যার অংশীদার।
    যাক গে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম আমার পাঠ্য বইয়ে ছিল। এখন কী অবস্থা জানি না। তবে আনিসুজ্জামানের কথাটা সত্য। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাটলে আমারা তার নামটাই পাচ্ছি সবার আগে।
    বাংলার মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
    তার আত্মজীবনীটার নামটা কী? এখনও বাজারে যায় পাওয়া?

    1. আপনি যদি পাকিস্তানের আলাদা

      আপনি যদি পাকিস্তানের আলাদা হয়ে যাওয়াটা ভুল মানুষের সাথে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়া হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করেন, তবে ৭১ এর গণহত্যার দোষটাও অনায়াসে দেশভাগের উপর দেয়া যায়; যারা দেশভাগ চেয়েছিল তাদের দোষী সাব্যস্ত করা যায়। দেশভাগ না হলে তো আর ত্রিশ লাখ লোককে এভাবে পাক বাহিনীর হাতে মরতো হতো না!

      ইতিহাসের ধারাবাহিকতা কি তাই বলে না? দেশভাগের কোন যৌক্তিকতা আমার কাছে নেই।

      ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’র আত্মজীবনীর নাম ‘আত্মকথা’।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − = 26