গান্ধী জিন্নাহর ফাঁকা বুলি (পর্ব ০২)

গান্ধীবুড়োর ভারতে আগমনের আগে পর্যন্ত জিন্নাহ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি জিন্নাহ একনিষ্ঠ কিন্তু গান্ধীর রাজনৈতিক কর্মসূচি ও খেলাফত আন্দোলনে সে মোটেও আগ্রহ দেখায় নি। ১৯৩৪ শে দেশফেরত জিন্নাহকে মুসলিম রাজনীতির হাল ধরতে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে কবি ইকবাল! মুসলিম প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন ও তার নামকরণ ‘পাকিস্তান’ এর পেছনে ইকবালের বিরাট ভূমিকা ছিল পরবর্তীতে যা ‘লাহোর প্রস্তাব’ হিসেবে বহির্প্রকাশ করে। আর এই ১৯৩৪ শেই গান্ধি কংগ্রেসের ভার তুলে দিলো লম্পটশ্রী নেহেরুর হাতে আর নেহেরু নিলো মুসলিম লীগের দায়িত্ব । শুরু হলো নেহেরু-জিন্নাহর দ্বৈরথ!



জিন্নাহ সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের ৫টা স্তর যথাক্রমে :

১.অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলের পূর্বকাল
২.অসহযোগ-খিলাফত থেকে সরে গিয়ে নেহেরু রিপোর্ট ও ১৪ দফা
৩.রাজনীতি থেকে সরে বিলেতে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ
৪. বিলেত থেকে ফিরে রক্তরঞ্জিত সাম্প্রদায়িক ভারতভাগ
৫. জাতীয়তাবাদে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা।।

অবিভক্ত ভারতে হিন্দু-মুসলিম ভিত্তিক রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল কুলাঙ্গার সৈয়দ আহমেদ খাঁ , ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে। আগা খাঁ তার পথ অনুসরণ করে আরো এগিয়ে গেলো। মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবিতে সে লর্ড মিন্টোর কাছে আবেদন ও করে। জিন্নাহ সমর্থন দেয়নি!

গান্ধীবুড়োর ভারতে আগমনের আগে পর্যন্ত জিন্নাহ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি জিন্নাহ একনিষ্ঠ কিন্তু গান্ধীর রাজনৈতিক কর্মসূচি ও খেলাফত আন্দোলনে সে মোটেও আগ্রহ দেখায় নি। ১৯৩৪ শে দেশফেরত জিন্নাহকে মুসলিম রাজনীতির হাল ধরতে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে কবি ইকবাল! মুসলিম প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন ও তার নামকরণ ‘পাকিস্তান’ এর পেছনে ইকবালের বিরাট ভূমিকা ছিল পরবর্তীতে যা ‘লাহোর প্রস্তাব’ হিসেবে বহির্প্রকাশ করে। আর এই ১৯৩৪ শেই গান্ধি কংগ্রেসের ভার তুলে দিলো লম্পটশ্রী নেহেরুর হাতে আর নেহেরু নিলো মুসলিম লীগের দায়িত্ব । শুরু হলো নেহেরু-জিন্নাহর দ্বৈরথ!

দেশ ফেরত জিন্নাহ ১৯৩৪ এ সৈয়দ আহমেদ খাঁ র দ্বিজাতিতত্বে উদ্ভাসিত,আগা খাঁ ও ইকবালে নিমজ্জিত| গান্ধীবুড়ো তাকে লিখল:

“In your speeches I miss the old Nationalist. when in 1915 I returned from self-imposed exile in South Africa, everybody spoke of you as one of the staunchest nationalists and the hope of both Hindus and Muslims. Are you still the same Mr. Jinnah? ( If you say you are, in spite of your speeches, I shall accept your word .”

জবাব মিললো জিন্নাহর দেশভাগের দাবি সম্বলিত লাহোর প্রস্তাবে:

১. মুসলিমলীগ মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি মেনে নিতে হবে|
২.মুসলমানদের সাথে কংগ্রেসের জন সম্পর্কনীতি ত্যাগ করতে হবে|
৩.ব্রিটিশ সরকার আইন সভাসমূহে মুসলমানদের সংখ্যানুপাতে প্রাপ্য আসনের চেয়েও যে বেশি আসন স্থির করে দিয়েছে, তা বজায় রাখতে হবে|
৪.চাকরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের এক ত্রিতিয়াংশ সংরক্ষণ ।
৫.মুসলমান সদস্যদের অনুমোদন ছাড়া বিল পাস হবে না|
৬.’বন্দে মাতরম ‘ গাওয়া চলবে না|
৭.ত্রিবর্ণ পতাকা পরিবর্তন করতে হবে|
৮.গো-হত্যা বন্ধ করা যাবে না|
৯.মসজিদের সামনে দিয়ে বাজনা বাজিয়ে ধর্মীয় শোভাযাত্রা চলবে না|
১০. উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি|
১১. মুসলমানদের পারিবারিক ও ধর্মীয় আইনে কোনো হস্তক্ষেপ চলবে না|

যে কিনা দেশভাগ করে এক অংশের নেতা হওয়ার নিশ্চয়তা ব্রিটিশদের কাছে পেয়েই গেছিলো, তার কাছে গো-হত্যা ও দেশ হত্যা এক ই !!

তাই নয়?

——-
মুসলিম লীগের পৈশাচিক দাঙ্গার কথা ভুলে যারা তৎকালীন নেতাদের, বিশেষ করে ‘হিন্দু’ নেতাদের দায়ী করেন, তারা ‘ভাবের ঘরে চুরি’ করেন। তাদের সামনে দাঙ্গার চালচিত্র একটু তুলে ধরা যাক:

“যাহারা খুন হইয়াছে তাহাদের যেসব শিশু ছেলে ছিল তাহাদের পা দুটি ধরিয়া দেওয়ালের গায়ে আছড়ে মারা হইয়াছে। আর মেয়েদের ঐভাবে মারিবার আগে ধর্ষণ কোরিয়া নেওয়া হইত। আর তাহারা যদি কিশোরী বা তরুণী হইতেন তাহলে, তাহাদের ধর্ষণ করিবার পর তাহাদের স্তন কাটিয়া ফেলা হইত । যদি এদের মধ্যে কেউ সন্তানসম্ভবা থাকিত, তাহলে ধর্ষণের পর তাহাদের পেট চিরিয়া ফেলা হইত ।”— (Last Days of British Raj-Leonard Mosley)

চেলাচামুণ্ডার এ হেন্ নারকীয় আচরণ জিন্নাহ সাহেবের কোন বিকার ঘটেনি বরং সে বলেছিলো পাকিস্তান না মানলে এ ধরণের ঘটনা চলতেই থাকবে!!
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিরা আওয়াজ তোলার আগেই পাঞ্জাবের হিন্দু-শিখেরা দেশভাগের দাবি তুলেছিল।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহর ইন্তেকাল সময় এর এক বিখ্যাত ছড়া :

“কাশ্মীরে হানাদার
হায়দ্রাবাদে রাজাকার
পূর্ববঙ্গে আনসার
জিন্নার হলো ক্যানসার ।”

লাহোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধীবুড়োর প্রতিক্রিয়া ছিল:’ যারা নিজেদের অন্য জাতি মনে করে ও দেশভাগের পক্ষে, তাদেরকে আমার মতে আনতে আমি জোর খাটাব না।’
জিন্নার বাড়িতে গান্ধিবুড়ো ১৮ দিন ধর্ণা দিয়েছিলো, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, তার সেই এক আবদার-‘পাকিস্তান’।

১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন মুসলিম লীগ ও প্রস্তাবিত ‘পাকিস্তান’ এর হাতেই দেশ শাসনের ভার রাখলো এবং কংগ্রেসও তার নিজের ব্যাখ্যায় সমর্থন করলো ও জিন্নাহকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহবান জানালো।

প্রত্যুত্তরে জিন্নাহ ডাক দিলো ‘ডাইরেক্ট আকশন’ এর যা কিনা হিন্দুদের উপর ঝাঁপিয়ে পরার আহবান!!

১৬ ই অগাস্ট ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ ও ১০ই অক্টোবর নোয়াখালির নরমেধ যজ্ঞ দিয়ে শুরু করা নারকীয়তায় বিলীন হয়ে গেলো অখন্ড ‘ভারত’ এর স্বপ্ন!! ইন্ধন জোগালো সীমান্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাবের হিন্দু-শিখ নিধন যজ্ঞ।

এই নারকীয়তার মাঝে মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে অনেক শিখ বাবা তার নিজের কন্যার শিরোচ্ছেদ করলো, অনেক শিখ নারী পাতকুঁয়ো তে ঝাঁপিয়ে পরে মৃত্যু বরণ করে নিজের ইজ্জত বাঁচালো!! কিন্তু জিন্নাহর দেন হাত লিয়াকত আলী খান বললো:’ পাঞ্জাবে যা ঘটানো হয়েছে, পাকিস্তান না পেলে সারা ভারতেই তা ঘটানো হবে!’

পাঞ্জাবের গভর্নর অবশেষে বলতে বাধ্য হলো: ‘এই পৈশাচিক বর্বরতা মুসলিম লীগের পরিকল্পিত।’ কিন্তু তাতে হবে কি? জিন্নাহর বিষের বাজি বেজেই চললো।…….
সে প্রকাশ্যেই বলতে শুরু করলো:’পাকিস্তান বিরোধীরা ইসলামের শত্রু’!! তার চোখে হিন্দুরা মনুষ্যতর জীব, একসাথে বসবাসের অযোগ্য!!

এই বিকৃত মনোভাবের পরিচয় পেয়ে লর্ড ইজমে লিখেছে:

“The dominating feature in Mr. Jinnah’s mental structure was his loathing and contempt of the Hindus. He apparently thought that all Hindus were sub-human creatures with whom it was impossible for the Muslims to live.”

অথচ প্রচলিত আলোচনাতে আমরা বহুলাংশেই দেখি আমাদের মডারেট , ও প্রগতিশীলরা জিন্নাহর ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলে ধরে!!

হায় রে!!

(চলবে…….) প্রথম পর্ব দেখতে ক্লিক করুন এখানে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 37 =