বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানব সভ্যতা

আজ থেকে প্রায় ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রথম স্থায়ী সমুদ্রের সৃষ্টি হয়। স্থায়ী সমুদ্র সৃষ্টির প্রায় ৭ লক্ষ বছর পর সমুদ্রের তলদেশে কয়েকটি প্রাথমিক উপাদান; বিগ ব্যাং এর পর সৃষ্ট প্রথম মৌল হাইড্রোজেন, নক্ষত্রে সৃষ্ট নাইট্রোজেন, কার্বন, এবং অক্সিজেন মিলে তৈরি করে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা। DNA, যে সর্পিলাকার আণুবীক্ষণিক গঠনে লুকিয়ে আছে প্রাণের রহস্য। এটি ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম মহাবিপ্লব। এরপর DNA থেকে কালক্রমে তৈরি হল প্রথম অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া। যেটি শুধু তখন নয় এখনো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের দেহ সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যাকটেরিয়ার একটা ‘চিড়িয়াখানা’।



‘বিগ ব্যাং’, মহাবিশ্বের সূচনা, মহাবিশ্বের সব কিছুর উৎপত্তি। সকল পদার্থ ও শক্তির সৃষ্টি, সময় ও স্থানের সৃষ্টি যাকে বলা হয় ‘স্পেসটাইম’ বা স্থান-কাল।

আজ থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে পরমাণুর চেয়েও বহুগুণ ক্ষুদ্র প্রায় শূন্য (v→0) আয়তনে ঘটা একটি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি।

‘বিগ ব্যাং’ এর পর সময়ের পরিক্রমায় ধাপে ধাপে এই মহাবিশ্ব বর্তমান অবস্থায় আসে। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি সব কিছুর শুরু ‘বিগ ব্যাং’।

স্বল্প পরিসরে দেখা যাক ‘বিগ ব্যাং’ এর পর কী কী ধাপ পার হয়ে আমাদের পৃথিবী, পৃথিবীতে ‘প্রথম প্রাণ’ এবং প্রাণের বিকাশের ধারায় বর্তমান মানব সভ্যতা।

‘বিগ ব্যাং’ এর পর পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে ‘প্রথম প্রাণ’ সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ গঠিত হবার সময় পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হলো।

  • বর্তমান সময় হতে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে বৃহৎ বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়। তাপমাত্রা প্রায় ১০^২৭ ডিগ্রী সে:।
  • বিগ ব্যাং এর পর ১ সেকেন্ড সময়ের মাঝে প্রায় শূন্য আয়তনের মহাবিশ্ব ছড়িয়ে পরে গ্যালাক্সির চেয়েও বড় এলাকায়। পদার্থ-প্রতিপদার্থ, কোয়ার্ক-প্রতিকোয়ার্ক একে অপরকে ধ্বংস করে শুধু শক্তি হয়ে বিরাজ করে। বাকিরা প্রোটন ও নিউট্রন সৃষ্টি করে। তাপমাত্রা কমে প্রায় ১০^১২ ডিগ্রী সে:।
  • ইলেকট্রন পজিট্রন কে ধ্বংস করে। তাপমাত্রা আরো কমে প্রায় ৩০০ কোটি ডিগ্রী সে: হয় দশ সেকেন্ডের মধ্যে।
  • পরমাণু গঠনের তিন মৌলিক কণা ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন প্রস্তুত হতে সময় নেয় বিগ ব্যাং এর পর তিন মিনিট।
  • এর পর এভাবে সময় বয়ে চলে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতে থাকে। মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রনের দল বিচ্ছিন্ন ভাবে।
  • প্রোটনকে কেন্দ্র করে প্রথম ইলেকট্রন ঘূর্ণন শুরু করে বিগ ব্যাং এর প্রায় ৩ লক্ষ বছর পর। তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রথম পরমাণু, হাইড্রোজেন পরমাণু। এভাবে তৈরি হয় অসংখ্য বিচ্ছিন্ন হাইড্রোজেন পরমাণু। যা বর্তমান কালের সকল বস্তুর, সকল পরমাণুর আদি অবস্থা।
  • এ সময় থেকেই শুরু হয় মহাবিশ্ব গঠনে মহাকর্ষের প্রধান ভূমিকা। হাইড্রোজেন পরমাণু মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে মহাকর্ষের প্রভাবে কাছাকাছি আসা শুরু করে। গঠিত হয় গ্যালাক্সি। বিগ ব্যাং এর পর প্রায় ৩০ কোটি বছর থেকে ৫০ কোটি বছর পর্যন্ত চলতে থাকে বিভিন্ন স্থানে গ্যালাক্সির জন্ম ও পূর্ণতা প্রাপ্তির পথে এগিয়ে যাবার সূচনা।
  • এসব গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে কাছাকাছি থাকা হাইড্রোজেন মহাকর্ষের প্রভাবে আরো কাছাকাছি এসে একটি কেন্দ্রের দিকে এগুতে শুরু করে। তাদের পারস্পারিক ঘর্ষণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে চাপ এবং বাড়ে সামগ্রিক মহাকর্ষ বল যা আশেপাশের হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে কাছ নিয়ে আসে আরো বেশি পরিমাণে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ডিগ্রী ফারেনহাইট হলে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস মিলে গঠিত হতে থাকে ভারী মৌল হিলিয়াম। সেই সাথে ফিউশনের জন্য বিকিরিত হয় শক্তি। এভাবেই তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্র। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্র। আমাদের সৌরজগতের সূর্যও এমনই একটি নক্ষত্র।
  • এখানে তৈরি হল প্রাথমিক ও হাল্কা দুটি মৌল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতেই আছে আরো শতাধিক তুলনামূলক ভারী মৌল। সেগুলোও তৈরি হয় নক্ষত্রেই। নক্ষত্রের আকারের উপর নির্ভর করে তুলনামূলক বড় ও ভারী নক্ষত্র গুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে আর সেই সাথে সকল হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে হিলিয়াম হবার পরেও ফিউশন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ভারী থেকে অতি-ভারী নক্ষত্রে একই ফিউশন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হিলিয়াম থেকে যথাক্রমে, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সবশেষে লোহা। নক্ষত্রের সকল পরমাণু লোহাতে পরিণত হবার পর আর ফিউশন চলতে পারে না। বলা যেতে পারে লোহা হল নক্ষত্র নামক চুলার ‘ছাই’। তখন মৃত্যু ঘটে একটি নক্ষত্রের। ছোট নক্ষত্রে এই মৃত্যু শান্ত হলেও মাঝারি ও বৃহদাকার নক্ষত্রে, ফিউশন বা সংযোজন শেষে এরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বিশাল এক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। আর এই বিস্ফোরণের মাধ্যমেই তৈরি হয় কপার, সীসা এবং ইউরেনিয়ামের মত ভারী মৌল। যেগুলোকে নক্ষত্রের আকার ও ভরের উপর নির্ভর করে বলা হয় ‘নোভা’ ও ‘সুপারনোভা’ বিস্ফোরণ।
  • আজ থেকে প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে সৃষ্টি হয় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। যার অধিবাসী আমরা। এই গ্যালাক্সিতে বারবার নক্ষত্রের জন্ম, মৃত্যু ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্ট ভারী মৌল ও প্রয়োজনীয় হাল্কা হাইড্রোজেন একত্রিত হয় এই সর্পিলাকার গ্যালাক্সির পরিধির কাছাকাছি বর্তমান সৌরজগতের স্থানে।
  • বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৪৫৬ কোটি বছর আগে এই একত্রিত ধুলোর মেঘ তার কেন্দ্রে তৈরি করে একটি নতুন নক্ষত্র। যাকে আমরা বলছি ‘সূর্য’। সৌরজগতের প্রাণ কেন্দ্র।
  • এই সৌরজগতের মোট পদার্থের ৯৯.৯% পদার্থ নিয়েই গঠিত হয় সূর্য। তারপরেও তার আশেপাশে থাকে গ্রহ উপগ্রহ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পদার্থ। যেগুলো সময়ের সাথে মহাকর্ষের টানে কাছাকাছি এসে একত্রিত হয়ে গ্রহের আকার ধারণ করে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং তৈরি করে সৌরজগত। এই গ্রহগুলোর একটি আমাদের পৃথিবী।
  • আজ থেকে ৪৫৪ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবী গ্রহের আকার ধারণ করে যার ভর ছিল বর্তমান ভরের ৮০% । এ অবস্থায় পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ অর্ধ-তরল গলিত লাভার একটি গোলাকার খণ্ড। তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন ছিল বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি। তখন পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর একবার ঘুরতে সময় লাগত মাত্র ৬ ঘণ্টা।
  • দিন অতিবাহিত হতে থাকলো, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ নির্ধারণ করে নিলো। গলিত পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে থাকলো। হালকা পদার্থ তরলের উপরে উঠে এসে ভূপৃষ্ঠের আবরণের তৈরি করতে থাকল আর ভারী পদার্থ ডুবে গিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রে ভারী লোহা ও নিকেলের মিশ্রিত একটি ‘কোর’ তৈরি করলো। এই ধাতব কেন্দ্র থেকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হল যা সূর্য থেকে ধেয়ে আশা আয়নিত কণা থেকে পৃথিবীর জীবজগৎকে এখনো রক্ষা করে চলে প্রতিনিয়ত। তখনো পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ তৈরি হয়নি।
  • ৪৫৩ কোটি বছর পূর্বে প্রায় মঙ্গল গ্রহের সমান একটি বস্তুখণ্ড ঘণ্টায় প্রায় ২৫০০০ কিঃমিঃ বেগে এসে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। এই সংঘর্ষের ফলে আগন্তুকের কিছু অংশ পৃথিবীতে থেকে যায় আর বাকি অংশ ছড়িয়ে পরে মহাকাশে। ছড়িয়ে পরা এই বস্তুর কিছু অংশ মহাকর্ষের টানে একত্রিত হয়ে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। সৃষ্টি হয় পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ।
  • চাঁদ সৃষ্টি হওয়া পৃথিবীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই সংঘর্ষের ফলেই পৃথিবীর উলম্ব অক্ষ খানিকটা বেঁকে যায়। যার ফলে আজ আমরা পাচ্ছি ঋতুবৈচিত্র্য। যেটি প্রাণের উদ্ভব ও জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর আহ্নিক গতি হ্রাস প্রাপ্ত হয়ে ৬ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় আসতে চাঁদের আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া বর্তমানেও পৃথিবীর জলবায়ুর উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চাঁদ। তার চাক্ষুষ উদাহরণ জোয়ার-ভাটা।
  • ৪৫০ কোটি বছর পূর্ব থেকে ৩৮০ কোটি বছর পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবী প্রাণের উদ্ভব ঘটার জন্য পর্যাপ্ত স্থিতিশীল অবস্থায় আসে। পৃথিবীর কক্ষপথ সুনির্দিষ্ট হয়, পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি স্থিতিশীল হয়, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের গতি নির্দিষ্ট হারে এসে পৌঁছায়, চাঁদ অর্ধ-তরল লাভা থেকে ঠাণ্ডা হয়ে কঠিন অবস্থায় আসে।
  • ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে, পৃথিবী কিছুটা শীতল হয়ে ভূপৃষ্ঠ কঠিন আকার ধারণ করে। তবে তখনো ভূপৃষ্ঠে চলছে প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাত। সেসময় পৃথিবীতে তাপমাত্রা এতই বেশি ছিল যে কোন তরল পানি ছিল না, ছিল ‘অত্যন্ত উত্তপ্ত বাষ্প’।
  • ধীরে ধীরে পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে থাকে, জলীয়বাষ্পের দরুণ বৃষ্টিপাত হয়। প্রথমে খুবই অল্প পরিমাণে ও পরে বেশি। ভূপৃষ্ঠ পানি তরল অবস্থায় থাকার মত তাপমাত্রায় আসে। বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হয় জলাধার এবং সমুদ্র।
  • আজ থেকে ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় প্রথমবারের মত স্থায়ী সমুদ্র, যা ছিল প্রথম প্রাণের উৎপত্তিস্থল ও আবাস।
  • আজ থেকে প্রায় ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রথম স্থায়ী সমুদ্রের সৃষ্টি হয়। স্থায়ী সমুদ্র সৃষ্টির প্রায় ৭ লক্ষ বছর পর সমুদ্রের তলদেশে কয়েকটি প্রাথমিক উপাদান; বিগ ব্যাং এর পর সৃষ্ট প্রথম মৌল হাইড্রোজেন, নক্ষত্রে সৃষ্ট নাইট্রোজেন, কার্বন, এবং অক্সিজেন মিলে তৈরি করে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা। DNA, যে সর্পিলাকার আণুবীক্ষণিক গঠনে লুকিয়ে আছে প্রাণের রহস্য। এটি ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম মহাবিপ্লব। এরপর DNA থেকে কালক্রমে তৈরি হল প্রথম অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া। যেটি শুধু তখন নয় এখনো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের দেহ সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যাকটেরিয়ার একটা ‘চিড়িয়াখানা’।
  • এরপর প্রায় একশ কোটি বছর পৃথিবী শুধুমাত্র নানা ধরনের অণুজীবের দখলে ছিল।
  • প্রায় ২৫০ কোটি বছর পূর্বে কিছু ‘বিশেষ’ ব্যাকটেরিয়া সূর্য থেকে আসা শক্তি ব্যবহার করে জীবন ধারণ করা শুরু করলো। জীবন ধারণের এ প্রক্রিয়ায় তারা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্য পদার্থটি উৎপাদন ও নিঃসরণ শুরু করলো, যার নাম ‘অক্সিজেন’। সুতরাং আমরা এখন যে অক্সিজেনের সাহায্যে বেঁচে আছি তা আমাদের আদি-প্রাণের উচ্ছিষ্ট ছাড়া কিছুই নয়।
  • সেসময় সমুদ্রের পানি ছিলো প্রচুর লৌহ উপাদানে পরিপূর্ণ। ব্যাকটেরিয়া নির্গত অক্সিজেন লৌহ উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে তৈরি করে ভারি ধাতব-অক্সাইড যা থিতিয়ে জমা হয় সমুদ্র তলদেশে। শত কোটি বছর ধরে জমতে থাকা অক্সাইডের স্তর তৈরি করে লোহার বিশাল সংগ্রহশালা যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উত্থিত হয়ে এখন আমাদের কাছে “লোহার খনি” নামে পরিচিত। আপনার সুঁই থেকে শুরু করে জুতার পেরেক পর্যন্ত যত স্থানে লোহা রয়েছে তার সবার প্রাথমিক অবস্থান ও রূপান্তর একই।
  • পানিতে থাকা সকল অসম্পৃক্ত লৌহ উপাদান যখন অক্সাইডে পরিণত হলো, তখন অক্সিজেন মিশতে থাকলো সমুদ্রের পানিতে। সমুদ্রের পানি অক্সিজেনে পূর্ণ হবার পর অতিরিক্ত অক্সিজেন উঠে এলো সমুদ্র পৃষ্ঠ ছেড়ে বায়ুমণ্ডলে, বায়ুমণ্ডল পূর্ণ হলো পর্যাপ্ত অক্সিজেনে।
  • এরপর ঘটলো প্রাণের গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ একটি উত্থান। কিছু ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার কায়দা রপ্ত করলো, যাতে পূর্বের যে কোনো পদ্ধতি থেকে প্রায় ২০ গুন দক্ষতার সাথে শক্তির ব্যবহার করা গেলো।
  • অক্সিজেন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার ফলে তাদের জৈবিক পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটতে থাকলো আরও দ্রুত। একাধিক অণুজীব মিলে তৈরি করতে থাকলো আরও ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর জৈবিক প্রাণ।
  • পরবর্তী দু’শ কোটি বছর এভাবেই চলল প্রাণের জটিল থেকে জটিলতর, ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর, আর এককোষী জীব থেকে বহুকোষী জীবে রূপান্তর হবার প্রক্রিয়া।
  • পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে জেগে উঠতে থাকলো দীপ আর বিস্তৃত হল স্থলভূমি। পৃথিবীর বাহ্যিক অংশ পেলো যেমনটি আজ আমরা দেখি তার কাছাকাছি একটা রূপ।
  • সমুদ্রের পানিতে বাড়তে থাকলো জীব বৈচিত্র্য। সৃষ্টি হল অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বহুকোষী উদ্ভিদ ও প্রাণী। এই সময়ের সর্বশেষ তিন কোটি বছরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিবর্তিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক জলজ প্রাণী।
  • বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৫০ কোটি বছর পূর্বে সমুদ্রে বিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হলো প্রথম কাঁটাযুক্ত দেহাভ্যন্তর বিশিষ্ট মাছ। এদেরকেই বলা যায় আমাদের সর্বপ্রথম ‘পূর্বপুরুষ’ যাদের মধ্যে প্রথমবারের মত ছিল বর্তমান জীবের মত দেহাংশ এবং দাঁতবিশিষ্ট চোয়াল সহ মুখ। প্রাণী ও উদ্ভিদ বিবর্তিত হতে থাকলো আরো নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ও জটিল ক্ষমতা সম্পন্ন জীবে।
  • এর মধ্যেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলস্থ অক্সিজেনের একটা অংশ বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে তৈরি করল ‘ওযোন’ গ্যাসের আস্তরণ যা তখন থেকে এখন পর্যন্ত এমনকি ভবিষ্যতেও রক্ষা করে চলবে প্রাণের গতিধারাকে; মহাজাগতিক ও সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি ও বিকিরণের প্রভাব থেকে।
  • ‘ওযোন’ স্তর তৈরির পূর্ব পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো কেবল সমুদ্রের তলদেশের পানিতে। এরপর তা স্থলভূমিতে উঠে আসার পরিবেশ পেল। প্রথমে পানির নিচে থাকা উদ্ভিদরা বিবর্তিত হয়ে স্থলে বাঁচার উপযুক্ত হয়ে উঠে আসলো স্থলজ পৃথিবীতে। শিকড়ের সাহায্যে পানি আর সূর্যালোকের শক্তিতে বেঁচে থাকার শক্তি সংগ্রহ করতে থাকলো। প্রথমবারের মত উদ্ভিদের প্রাণের স্পন্দনে স্পন্দিত হলো পৃথিবী।
  • প্রায় চল্লিশ কোটি বছর পূর্বে জলজ প্রাণীর একটি অংশ বিবর্তিত হয়ে উভচর প্রাণীর সৃষ্টি করলো যা পানি ছেড়ে উঠে এলো মাটিতে। সূচনা হলো সমগ্র পৃথিবীতে চলমান প্রাণের বিচরণ।
  • প্রাথমিক উভচরদের, বর্তমান ব্যাঙের ডিমের মত পানিতে ডিম ছেড়ে বংশবৃদ্ধি করতে হতো। তা না হলে সে ডিম স্থলে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যেতো। এটি ছিল তাদের সমুদ্র ছেড়েও দূরে না যেতে পারার একটি কারণ।
  • বিবর্তন এ সমস্যার সমাধান এনে দিল একদল উভচরের জন্য। তারা সম্পূর্ণ নতুন গঠনের ডিম দিতে শুরু করল যেটা শক্ত খোলসে আবৃত কিন্তু তার ভেতরে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সমুদ্রের আর্দ্রতা’। এই বিবর্তন এধরনের উভচর থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হল সরীসৃপ।
  • স্থলে উদ্ভিদের শুরু থেকে প্রায় ত্রিশ কোটি বছর পূর্ব পর্যন্ত উদ্ভিদ মারা যাবার পর মাটিতে মিশে যায়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাটির নিচে জমা হতে থাকে যা বর্তমানে আমরা কয়লা হিসাবে উত্তোলন করছি।
  • প্রায় ২৫ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে বয়ে যায় এক ভয়াবহ দুর্যোগ। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়গিরির উদগীরণ শুরু হয় দানবীয় আকারে। বায়ুমণ্ডলের অনেকাংশ ভরে ওঠে জীবনের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইডে। পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশের অধিক প্রজাতির জীব মারা যায় এই দুর্যোগে। একে বলা হয় ‘পার্মিয়ন গণবিলুপ্তি’।
  • এরপর আরো কিছু গণবিলুপ্তি সংগঠিত হয়েছে পৃথিবীতে যাতে প্রচুর প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে নতুন প্রজাতির প্রাণীর বিকাশ ঘটে।
  • পার্মিয়ন গণবিলুপ্তির পর আরো কয়েকটি গণবিলুপ্তি কাটিয়ে উদ্ভব হয় ‘ডাইনোসর’দের। উৎপত্তির পর প্রায় ১৬ কোটি বছর পৃথিবী শাসন করে নানা জাতি-প্রজাতিতে বিভক্ত ডাইনোসরের দল। এসময় পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হয় কঠিন কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ভিদের বনভূমি।
  • এসময় চাঁদ সৃষ্টির প্রায় ৪২৫ কোটি বছর পর চাঁদের আকর্ষণ পৃথিবীর আহ্নিক গতি নির্দিষ্ট করে প্রায় ২৪ ঘণ্টার দিবারাত্রি নির্ধারণ করে।
  • ডাইনোসর যুগের শুরুতে পৃথিবীর স্থলভাগ একত্রিত অবস্থায় ছিলো। ডাইনোসর যুগের মাঝামাঝি অংশে এসে স্থলভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকলো। স্থলভাগ সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে কয়েকটি সুবৃহৎ দ্বীপের মত অংশ বিভক্ত হলো। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অংশ আলাদা হলো। মাঝখানে চলে এলো আটলান্টিক মহাসাগর।এভাবেই চলল ডাইনোসর যুগের ১৬ কোটি বছর। ডাইনোসরের যুগে ডাইনোসরের প্রতিপত্তির দাপটে অন্য কোনো বড় প্রাণীর বিকাশ হতে না পারলেও সৃষ্টি হলো নানা প্রজাতির ছোট ছোট স্তন্যপায়ী জীব। এগুলো আকারে ডাইনোসরের তুলনায় ইঁদুরের মত ছোট হওয়াতে ডাইনোসরের প্রভাব এদের উপর তেমন একটা পড়েনি। এতে এরা বিভিন্ন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে বিবর্তিত হয়।

সৌজন্যেঃ বিজ্ঞান পত্রিকা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − 18 =