প্রেমের রূপান্তর : যৌনতার তেপান্তর

মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা গুণগত, পরিবর্তন এসেছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরিবার, বিয়ে, শ্রেণী, ধর্ম, এবং প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যবোধ এবং প্রত্যাশার পরিবর্তন ঘটেছে। সমাজের সকল প্রাচীন ও প্রথাগত সম্পর্কের বন্ধন শিথিল হয়ে এসেছে। আবার মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধ প্রবল হয়েছে। অথচ এতোদিনের প্রচলিত সম্পর্কের বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে একধরনের অনিরাপত্তাবোধও কাজ করে। যে সময়ে এসে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে সেই সময়টাকে সমাজবিজ্ঞানী Zygmunt Bauman নামকরণ করেছেন Liquid Modernity. সময়টাকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য দিয়ে। অর্থাৎ এই সময়ের ব্যক্তিজীবন খুবই তরল,তাই অতিমাত্রায় প্রবহমান। তার কোন স্থিরতা নেই। আগে যেমন ব্যক্তি জীবনব্যাপী একটা নির্দিষ্ট দেশে, নির্দিষ্ট অঞ্চলে, প্রায় অপরিবর্তনীয় সমাজব্যবস্থার মধ্যে এবং স্থির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বসবাস করেছে এখন আর সেটা হচ্ছে না। মানুষ এখন বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠেছে। যাযাবরের মত আজ এদেশে, এখানে কাল সেদেশে, সেখানে বসবাস করছে। তার আইডেন্টিটি স্থির নয়, পেশা নির্দিষ্ট নয় , কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে তার মূল্যবোধ রাজনৈতিক আদর্শ, এমনকি স্বামী- স্ত্রী কিংবা অন্যসব সম্পর্কের বন্ধন। এইজন্যই এই আধুনিকতাকে তিনি বলছেন লিকুইড। আরো একটু এগিয়ে গিয়ে তরল আধুনিক সময়ের সম্পর্ককে তিনি বলছেন ” Liquid Love.” এই তরল আধুনিক সময়ে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইন্টারনেট কানেকশানের মধ্য দিয়ে। সবাই এখানে নেটওয়ার্কের মধ্যেই বাস করে। “Stay in touch” মানে এখন বোঝায় নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা। ইন্টারনেট কানেকশনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে বলা হচ্ছে Virtual relationship যেটা প্রথাগত Pure relationship থেকে যথেষ্ঠ ভিন্ন।Bauman এর ভাষায় “Unlike ‘real relationships’, ‘virtual relationships’ are easy to enter and to exit. They look smart and clean, feel easy to use, when compared with the heavy, slow -moving, messy real stuff.”

ঠিক যে কারনে সময়টাকে তরল বলছেন, ঠিক তেমনি কারনেই ভালোবাসাটাকেও তরল বলছেন। তরল আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তরলতা। এখন নারী বা পুরুষের কারো কোন নির্দিষ্ট এবং স্থায়ী সম্পর্কের বন্ধন নেই। অথচ তারা সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তুু কোন সম্পর্কই যে দীর্ঘস্থায়ী হবে এমন নিশ্চয়তা সে পায়না। তাই তাকে নিরন্তর নতুন নতুন সম্পর্কের সন্ধান করতে হয়। তার বুদ্ধি, দক্ষতা আর আন্তরিকতা দিয়ে নতুন সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করতে হয়। কারণ এই সম্পর্কের বন্ধন তাকে খানিকটা স্থিরতা ও মানসিক সুখ দেয়। অথচ সে জানে সম্পর্কটা ভঙ্গুর। এই ভঙ্গুরতার ভয়ই তার মধ্যে নিরাপত্তার অভাববোধ সৃষ্টি করে। এই গেলো একটা দিক। অন্য আর একদিকে আছে Freedom, স্বাধীনতা। বাউম্যানের মতে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মানুষ পতিত হয় আরেক অগ্নি পরীক্ষায়। সেই পরীক্ষাটা হচ্ছে Security vs Freedom. সম্পর্কে জড়ালে নিরাপত্তা হয়তো একটু আসে, কিন্তুু বিসর্জন দিতে হয় ব্যক্তিস্বাধীনতা। real relationship হয় খুবই suffocating. সেখানে থাকে কমিটমেন্ট এবং এই কমিটমেন্টই ব্যক্তিকে আটকে ফেলে একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। তাই কেউ প্রাচীন আমলের মতো কোন কমিটেড রিলেশনশিপে থাকতে চায়না। কারণ সেখানে easy exit নেই। এই সম্পর্কের ধরণটাকে লেখক প্রতিতুলনা দিয়েছেন “top -pocket relationship’ বলে। আমরা যেমন বুক পকেটে রুমাল জাতীয় কিছু একটা রাখি, প্রয়োজন হলে বের করি, আর প্রয়োজন ফুরালে আবার গুজে রাখি পকেটে, এখনকার সম্পর্ক জিনিসটাও নাকি তেমন।আরেকটা উমপা তিনি ব্যবহার করেছেন : relationships are like Ribena (এক ধরনের ফ্রুট ড্রিংক): imbibed in concentration, they are nauseating and may prove dangerous to their health. Like Ribena, relationships should be diluted when consumed. অর্থাৎ কোন কমিটেড রিলেশনশিপে কেউ আটকা পড়তে চায়না। সবাই একটু মুক্ত থাকতে চায়। কারণ একটা কমিটেড রিলেশনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া মানেই অন্য আরেকটা রিলেশনশিপের সম্ভাবনা নষ্ট করে ফেলা যে রিলেশন থেকে হয়তো সে আরো বেশি পরিপূর্ণতা পেতে পারতো। এজন্যই যে কোন রিলেশনশিপে একটু ভেজাল মিশিয়ে সেটাকে পিচ্ছিল রাখা হয় যেন প্রয়োজন মতো সটকে পড়া যায়।আজকাল যে কোন সম্পর্ক তৈরী হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এই commitment.

…so, if you wish “to relate”, keep your distance; if you want fulfilment from your togetherness, do not make or demand commitments. Keep all doors open at any time.

এজন্যই আজকাল semi -detached couple এবং Live together পন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা কিছু সুন্দর সময় উপভোগ করছে একসঙ্গে, আবার তারাই emotional complexity এড়ানোর জন্য পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নও থাকছে।

এইখানে এসে আমরা Anthony Giddens সাহেবের শরণাপন্ন হতে পারি।পরিবর্তিত Intimet relationship এর এই পর্যায়ে যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠছে বা যে ধরনের সম্পর্ক মানুষ গড়ে তুলতে চাচ্ছে সেটাকে তিনি বলছেন ” Pure Relationship “. কেমন সেটা? সেটা এমন একটা সম্পর্ক যেটা একই সাথে মানসিক নিরাপত্তা দেওয়ার মতো শক্ত আবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে না এমন শিথিল বন্ধন। এই পিওর রিলেশনের ভিত্তি হচ্ছে সমতা ও সমঝোতা। এটা এমন একটা ফ্লুইড রিলেশন যে যতক্ষন পর্যন্ত দুইপক্ষই সম্পর্ক দ্বারা মানসিক পূর্ণতা পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পর্ক থাকবে। যখনই পরিপূর্ণতার ঘাটতি দেখা দেবে তখন যেকোন পক্ষ নিজেকে সম্পর্ক থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে।

প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌনতা একটা প্রায় অপরিহার্য বিষয়। আগেই বলেছি তরল আধুনিকতায় যৌনসঙ্গীও তরল। শুধু তাই নয়, sexual Orientation এ বৈচিত্র্য এসেছে এবং তা সমাজস্বীকৃত। আমরা দেখছি Lesbian, Gay, Bisexual, Transsexual মানুষদেরকে। এটাকে বলা হয় Sexual Fluidity বা Flexible Sexuality. গিডেন্স ব্যবহার করছেন ” Plastic Sexuality ” . যে যৌন সম্পর্ক সন্তান উৎপাদনের প্রাচীন দায় থেকে মুক্ত সেই যৌন সম্পর্ককেই এই নামে অভিহিত করা হচ্ছে। Plastic Sexuality হচ্ছে পূর্বেকার Fixed Sexuality এর বিপরীত। আগে যৌন সম্পর্ক ছিলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে নির্দিষ্ট ব্যক্তির এবং হয় Homosexual নয়তো Heterosexual. বর্তমানের তরল আধুনিক সময়ে সেই নির্দিষ্টতার বাঁধ ভেঙে গেছে। Plastic Sexuality কে সম্ভব করে তুলেছে কন্ট্রাসেপটিভ বা জন্মনিরোধক উপকরণ। ইন্টিমেট রিলেশনের পরিবর্তন এবং দায়দায়িত্বহীন, অনাবিল সুখানুভূতি পাবার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের কাছে তাই বিরাট ঋণ। প্লাস্টিক যৌনতা নারী ও পুরুষ উভয়কেই মুক্তি দিয়েছে প্রাচীন বাধা ও দায়দায়িত্ব থেকে। যৌনতা থেকে প্রজনন ব্যাপারটাকে বিযুক্ত করতে পারার ফলে শুধুই সুখলাভ এবং নারী পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা হয়েছে বা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে অন্তত যৌনতার ক্ষেত্রে।

লেখাটি নিম্নোক্ত তিনটি বইয়ের উপরে ভিত্তি করে রচিত :

Zygmunt Bauman, Liquid Modernity (2000 )

Anthony Giddens, The Transformation of Intimacy ,Sexuality, Love, and Eroticism in Modern Societies (1992)

Zygmunt Bauman, Liquid Love(2003)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 − 69 =