“কেউ একজন” থেকে “অন্য কোন একজন”

“আগামীকাল মিলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে … ব্যাপারটা ঠিক এমন না যে মিলির বাবা-মা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে … বিয়েতে মিলির মত আছে … খুব ভালো রকমের মত আছে … প্রশ্ন জাগে, তবুও কেন বলা হলো “মিলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে” ?? … অবশ্যই বলা উচিত ছিল “আগামীকাল মিলির বিয়ে”!!
মিলির চেহারার দিকে তাকালেও “বিয়ে হয়ে যাচ্ছে” এর লক্ষণ দেখা যায় না … সে হাসছে … মোটামুটি আনন্দিত সে … তার হাত ভরা মেহেদি … খুব যত্ন করে চুল আচড়াচ্ছে সে !!
খুব ধুমধাম করে মিলির বিয়ে হচ্ছিল … বিশাল খাওয়া-দাওয়া … হাজার লোকের সমাগম … মিলিকে সুন্দর লাগছিল … বিয়ের সাজে সব মেয়েকেই সুন্দর লাগে !!
বিয়ে হয়ে গেলো … বছর কেটে গেলো … মিলির ঘরে একটা ছেলে সন্তান আসলো … মিলি এখন ভীষণ সুখী একটা মেয়ে !!
… … …
পুরো ১৩ বছর পর মিলির ডায়রিটা পাওয়া যায় … ডায়রিতে যে কয়টা লেখা ছিল, সবগুলোই বিয়ের আগের … যতদূর জানা যায়, মিলির এই বিয়েটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিল … কিন্তু ডায়রির লেখাগুলো পড়ে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল, মিলির একটা রিলেশন ছিল !!
ছেলেটাকে মিলি প্রচন্ড ভালোবাসতো … প্রত্যেকটা লেখার মাঝে অনেক বেশি আবেগের ছাপ ছিল … ডায়রির বিভিন্ন পাতার ফাঁকে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের পাপড়ি ছিল … খুব সুখী ছিল তারা !!
মিলি খুব ভালো ছবি আঁকতো … ডায়রির বেশিরভাগ পাতায় দুইটা হাতের ছবি আঁকা ছিল … খুব শক্ত করে ধরে রাখা দুইটা হাত … একটা ছবির নিচে লিখা ছিলঃ
“সে সবসময় আমার হাত ধরে রাখে … খুব শক্ত করে ধরে রাখে … আমি বললাম, “এমনভাবে হাত ধরে রাখো যেন হাত ছাড়লেই আমি চলে যাবো ??”
সে কপাল কুঁচকে বললো, “হু, ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে যাবা !!”
আমি হেসে ফেলি … দিনের বাকি সময়টা আমার হাত খালি খালি লাগে … প্রচন্ড শূন্য লাগে !!”
মিলির ডায়রির বাকি লেখাগুলা গোপন থাকুক … শেষ পৃষ্ঠায় কাঁপা কাঁপা হাতে কয়েকটা লাইন লিখা ছিলঃ
“আজকে সে প্রথম এবং শেষবারের মত আমার হাত ছেড়ে দিলো … আমি কষ্ট পাচ্ছি … ভীষণ কষ্ট … এই অবস্থায় একটা মেয়ে আত্মহত্যা করে, ঘুমের ওষুধ খায় কিংবা হাত কাটে … আমি এগুলার কিছু করবো না … আমি স্বাভাবিক থাকবো … ভীষণ স্বাভাবিক … কেউ কিচ্ছু জানবে না … কেউ কিচ্ছু বুঝবে না … শুধু আমি ভেতরে ভেতরে পুড়বো !!
খুব শীঘ্রই আমার বিয়ে হবে … তার সাথে না … অন্য কারো সাথে … আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে … আমাকে অন্য কোন একজন এর হাত ধরে বেঁচে থাকতে হবে … অন্য কোন একজন পাশের বালিশটায় জায়গা করে নিবে … আমার একটা সন্তান হবে, সে অন্য কোন একজনকে বাবা বলে ডাকবে … আমি হাসিমুখে থাকবো !!
শুধু আমিই জানবো, কেউ একজন আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল … কেউ একজন আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজেছিল … কেউ একজন আমার কপালের টিপ ঠিক করে দিতো … কেউ একজন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো … কেউ একজন খুব সকালে ফোন করে আমার ঘুম ভাঙ্গাতো … কেউ একজন ফিশফিশ করে রাতে কথা বলতো !!
প্রত্যেকের জীবনে এই “কেউ একজন” থাকে … কারো কারো ভাগ্য হয় ঐ “কেউ একজন” এর সাথে সারা জীবন থাকার … আর কারো কারো ভাগ্য হয় “অন্য কোন একজন” এর সাথে সারা জীবন থাকার !!
তবুও জীবন থেমে থাকে না … আমি, তুমি, “কেউ একজন”, “অন্য কোন একজন” সবাই চলতে থাকে … একদম নিজের মত !!
অনেকে অবাক হয়ে প্রশ্ন করবে, “কীভাবে তার জায়গাটা তুমি আরেকজনকে দিলা ??”
পৃথিবীতে কেউ কাউকে কারো জায়গা দেয় না … কেউ কাউকে REPLACE করতে পারে না … ভাগ্যের দোষে হয়তোবা অন্য কারো হাত ধরতে হয়, কিন্তু হাতের ভেতরটা আর আগের মত উষ্ণ লাগে না … ভাগ্যের দোষে অন্য কারো সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, কিন্তু নিজের ভেতরটা আর আগের মত সিক্ত হয় না !!
… … …
মিলির ডায়রির শেষ লাইনটা পড়া যাচ্ছিল না … লেখার উপর পানি পড়েছিল সম্ভবত … কলমের কালি ছড়িয়ে গেছে … খুব সম্ভবত লেখাটা ছিলঃ
“পৃথিবীর যে কেউ আমার চোখের জলের কারণ হতে পারে … কিন্তু ঐ “টুপ করে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু” টা কিন্তু একজনই, একজনের জন্যই … ওটা কখনোই কেউ হতে পারে না, পারবে না … “টুপ করে গড়িয়ে পড়া অশ্রুটার” কথা কেউ জানে না … কেউ না !!”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 + = 75