চিতোর (ধারাবাহিক উপন্যাস) দ্বিতীয় পর্ব

#আলাউদ্দিন খিলজীঃ

তিন।

দিল্লীর উপকন্ঠে্র জংগলে তখন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী দলবল সমেত শিকারে এসেছেন।এখানে কিছু কথা না বললেই নয়।দিল্লীর মসনদে আসীন তূর্কি বংশোদ্ভূত খিলজী বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী; ১২৯০ সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুড় সুলতান জালালুদ্দিন খিলজীকে হত্যা করে এবং রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসন দখল করেন। আলাউদ্দিন অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক, দূর্ধষ সেনানায়ক; রাজ্য বিস্তার তার অন্যতম ধ্যানজ্ঞান, রাজ্যজয়ে শুধু শক্তিই নয়, সাথে নিপুন কূটনৈতিক খেলা খেলায়ও দক্ষ। নিজেকে তিনি দিগবিজয়ী আলেক্সান্ডারের সমতূল্য মনে করতেন।আর আলাঊদ্দিনের নিজেকে বিবেচনা করতেন ইসলামের ইতিহাসের মহাবীর খালিদ-বিন-ওয়ালিদের সাথে।ভারতীয় উপমহাদেশের মাটি থেকে হিন্দু সংস্কৃতির শেষ নিশানাটুকুও মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি।যদিও ব্যক্তিজীবনে ছিলেন প্রচণ্ড ভোগবাদী আর বিলাস ব্যসনে থাকতেন মত্ত।মদ আর মদিরা ছিলো তার নিত্যসাথী।ছিলো অসংখ্য পত্নী আর উপপত্নী সম্মৃদ্ধ হেরেম।কিন্তু তাতেও সন্তুস্ট ছিলেননা তিনি। যখনই কোন রূপসী নারীর সংবাদ তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করতো, তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত মন ভরতোনা সুলতানের।যেমন একবার শুধু লোকমুখে রূপের প্রশংসা শুনেই তিনি গুজরাটে রক্তবন্যা বয়ে দেন শুধুমাত্র গুজরাটের রাণী কর্ণাবতীকে অধিকারের জন্য। এতোটাই নারীলিপ্সু এই সুলতান।

এই কাহিনী জানা ছিলো রাঘবের।রতন সিং এর রাজসভা থেকে অপমানিত হুয়ে বিতাড়িত হওয়ায় রাঘব তখন রাগ আর ক্ষোভে উন্মত্ত।প্রতিহিংসার জ্বালা তার সর্বাঙ্গ।প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে সেই হিংসার আগুনের প্রজ্জ্বোলিত নরকাগ্নি।বুদ্ধিমান রাঘব এ কদিনে বুঝতে পেরেছে তার প্রতিশোধের আশা পূর্ণ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সুলতানকে রতন সিং এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা। কিন্তু রতন সিং এর বিরুদ্ধে যেনতেন অভিযোগ যে তেমন কাজ দেবেনা তা ভালোমতোই জানে রাঘব। কি করবে যখন ভেবে পাচ্ছিলোনা ঠিক ঠিক তখনই মনে পড়ে গেলো গুজরাটের রাণী কমলাদেবীর কাহিনী।ক্রুর হাসি দেখা দিলো দিলো রাঘবের ঠোঁটের কোণে।নিজের কর্তব্য বুঝে নেয় সে। বারাণসের দিকে যাত্রা শুরু করবে ভেবেছিলো সে, কিন্তু এবার পরিবর্তন করে গতিপঠ।ঘোড়ার মুখ দিল্লীর দিকে ফেরায় সে।

চার।

খুব খোশ মেজাজে আছেন সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী।গত কমাস ধরে ব্যস্ততা একটু বেশীই ছিলো বলা চলে। সালতানাতের দক্ষিণদিকের কাফেরগুলো সব হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। সহজে হার মানতে চায়না কিছুতেই। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার সব। নামেমাত্র সৈন্যবল, নেই তেমন উন্নত হাতিয়ারও। কিন্তু তবুও হার যেন মানতেই চায়না বেটারা। সামান্য শক্তি নিয়েই অর্ধ দুনিয়া হাসিলকারী তৌহিদি শমসেরের মুকাবিলা করার গোস্তাফী করে শুধু। আর ঝাঁকে ঝাঁকে কচুকাটা হয় বকরির মতো।এমনই হাড়ে হাড়ে বজ্জাত এগুলো।হাড়মাস একেবারে জ্বালিয়ে দিলে বেটারা।এখন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত।তাই কিঞ্চিৎ বনবিহারের আয়োজন। তবে দূরে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।বলাতো যায়না, কখন কোথায় আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে কাফেরগুলো। তাই চোখে চোকে রাখতে হয় সবসময়ই। আড়াল করলেই আবার দূর্ঘটনার সম্ভাবনা।যতদিন না এই হিন্দুস্তানের জমিনের আনাচে কানাচে সুলতানী হুকুমতের ঝাণ্ডা ওড়ানো যাবেনা, যদ্দিন না সম্ভব হবে “দারুস সালাম” প্রতিষ্ঠা, ততদিন শান্তি পাবেননা সুলতান। তিনি নিশ্চিত যে একদিন না একদিন তাঁর স্বপ্নের “দারুসসালাম” এই জমিনে প্রতিষ্ঠিত হবেই। আর ইসলামের ইতিহাসে “সাইফুল্লাহ” হিসেবে খালিদ বিন ওয়ালিদ আর সালাউদ্দিনের পাশাপাশি চিরকাল উচ্চারিত হবে তার নামটিও। আর সেই লক্ষেই আহারনিদ্রা জলাঞ্জলি দিয়ে দিবানিশি খেটে চলেছেন তিনি।

তবে আপাতত বিশ্রাম প্রয়োজন কিছুদিনের জন্য। খুব বেশী তাগড়া ঘোড়াও তো আর একনাগাড়ে ছুটতে পারেনা অনন্তকাল।আর তাই এই বনবিহারের শাহী আয়োজন।আর জমেছেও বটে এই শিকারোতসব। বেশ মৌজেই আছেন তিনি।সকালে শিকার ও জুটেছে বেশ ভালোই। দুটো বাঘ আর ষোলোটা হরিণ একদিনের জন্যতো যথেষ্ঠই। নিজ তাঁবুতে তাই বেশ জোশেই আছেন তিনি। আজকের সুরাটাও বেশ খানদানী গোত্রের। ভালোই নেশসা ধরিয়েছে। এছাড়া রাতে একান্তে সেবা করার জন্য হেরেমের নতুন সংযোজন ইরানীয় উপপত্নী তো আছেই। বেশ স্বপ্নীল একটা ঘোরের মাঝেই সময় কাটছে তাঁর। এরকম সময়ে সবকিছুই রঙিন আর স্বপ্নীল বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।নূপুরের নিক্কণে রোশনী বাই এর মুজরো আরো শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে যেন। হঠাত কানে ভেসে এল্লো বাঁশীর সুরধ্বনি। সুরতো নয় যেন জাদুর মূর্ছনা।রীতিমতো চমকে উঠলেন সুলতান।
……… জাফর বেগ।

………… হুকুম করুন আলামপনা।

…………… বাঁশী বাজাচ্ছে কে?

…………… এক কাফির বাজনাদার হুজুর।জাঁহাপনার শিবিরের উত্তরদিকে একটি গাছতলায় বসে বাজাচ্ছে একা একা।

……………… উসকো বুলাও জলদি।

পাঁচঃ

সুলতানের তাঁবুতে উপবীস্ট রাঘব। সামনের আরামকেদারায় আয়েশী ভঙ্গীতে সুলতান। আশেওপাশে তাঁর ইয়ার স্যাঙাৎ এর দল। প্রত্যেকের চোখেমুখে ঈষৎ লালচে আভা আর ঢুলুঢুলু ভাব। বোঝাই যাচ্ছে, আকণ্ঠ সুরাপানে মদমত্ত সবাই।এই সুবর্ণ সূযোগটার জন্যই অপেক্ষা করে ছিলো রাঘব। আজ অমাবস্যার চাঁদের মতোই ইপ্সিত মূহুর্তটি এসে ধরা দিয়েছে সামনে।সবার মুখের দিকে আড়চোখে একবার তাকালো রাঘব। তারপর ফুঁ দিলো বাঁশীতে। সুরের জাদু মণত্রমুগ্ধতা ছড়িয়ে দিলো চারদিকে।মদের নেশা ছুটে গেছে সুলতানের।সুরের নেশায় পুরোপুরি নিমজ্জিত তিনি। এ কি আসলেই বাঁশীর সুর? নাকি কোন ঐন্দ্রজালিক জাদু? মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে সুরের ধারা। আর রাঘবের কন্ঠে ভেসে আসছে এক অপরূপা রমণীর রূপের প্রশস্তি।এতো জীবন্ত, এতো মনোহর সে প্রশস্তি যে নেশাতুর চোখে সুলতান যেন তাঁকে স্পস্ট দেখতে পেলেন চোখের সামনে। আর প্রশশ্তির ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারিত হচ্ছিলো সেই অপরূপার নামটি।

পদ্মাবতী

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “চিতোর (ধারাবাহিক উপন্যাস) দ্বিতীয় পর্ব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 7 =