শিক্ষাঃ মনুষ্যত্বের ধারক না চাকরির বাহক?

শিক্ষা, শিক্ষিত, সচেতন নাগরিক এসব এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি শিশুর কাছেও পরিষ্কার বিষয়। ইউনেস্কোর ঢাকা শাখার হিসেব মতে এদেশে ২০০৪ সালে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিচ্ছিল এবং একই সময়ে প্রায় আট কোটি মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা নিচ্ছিল। এখন ২০১৭ সাল। উক্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের পর কম হলেও তেরো বছর পেরিয়েছে। এই এক যুগেরও বেশি সময়ে এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষিতের (তথাকথিত) হার বেড়েছে, শিক্ষার্থী তো কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ প্রতিটি পদক্ষেপে দেখতে পাওয়া অনিয়ম, গোঁড়ামি, কুসংস্কার দেখলে সেটা খুব বেশি মনে হয়না।

“দুর্নীতি আমার কৃষক-শ্রমিকরা করেনা।
দুর্নীতি করে আপনার শিক্ষিত লোকেরা।”
-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

শিক্ষা, শিক্ষিত, সচেতন নাগরিক এসব এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি শিশুর কাছেও পরিষ্কার বিষয়। ইউনেস্কোর ঢাকা শাখার হিসেব মতে এদেশে ২০০৪ সালে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিচ্ছিল এবং একই সময়ে প্রায় আট কোটি মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা নিচ্ছিল। এখন ২০১৭ সাল। উক্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের পর কম হলেও তেরো বছর পেরিয়েছে। এই এক যুগেরও বেশি সময়ে এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষিতের (তথাকথিত) হার বেড়েছে, শিক্ষার্থী তো কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ প্রতিটি পদক্ষেপে দেখতে পাওয়া অনিয়ম, গোঁড়ামি, কুসংস্কার দেখলে সেটা খুব বেশি মনে হয়না।

আমি যখন ক্লাস এইটে তখন কাজী মোতাহার হোসেনের একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম, ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’। আমি হলফ করে বলতে পারি পরীক্ষায় জি.পি.এ-৫ পাওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী এটাই মনে করতে পারবেন না যে সেই প্রবন্ধে মানবজীবনকে দু’তলা বাড়ি হিসেবে ধরা হয়েছিল। যারা বলতে পারবেন তাঁদের অধিকাংশই জানেন না যে নিচের তলায় কি ছিল।এরপরও কে কে এর মর্মে পৌঁছাতে পেরেছে সে সংখ্যা বের করার পর এক শতাংশ মানুষও টিকে থাকে কিনা আমি জানিনা। আর এজন্যই নিচের তলার মনুষ্যত্ব কখন যে ইসরাফিলের ফুঁ শুনে উপর তলায় যায় আর নিচের তলায় সার্টিফিকেট ঠায় বসে এক অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র হয় সে এক বড় প্রশ্ন। অবশ্য এ প্রশ্ন কেউ করেনা।

আজ একজন অভিভাবক যখন তাঁর সন্তানকে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে যান তখন ভাবেন এখান থেকে পড়ে তাঁর সন্তান ভারী সার্টিফিকেট লাভ করে শিক্ষিত হবে এবং ভাল চাকরি করে পকেট ভারী করবে। আর এই ভারী সার্টিফিকেটের নেশায় মনুষ্যত্ব যে কোথায় উড়ে যায় তার খবর কেউ রাখেনা, রাখতেও চায়না। আজ মেধা কে কতটা জানে সেটা না বরং কে কত মার্কস পায় সেটা, যেটা কিনা গণ্ডির ভেতরের পড়া মুখস্থ করলেই পাওয়া যায়। কে কতটা শিক্ষিত সেটা নির্ণয়েরও বেশ ভাল পদ্ধতি বর্তমানে দেশব্যাপী চালু আছে, সার্টিফিকেট। যার সার্টিফিকেটে দশমিক ধারণকারী সংখ্যা যত বড় সে ততো বেশি শিক্ষিত। আমরা আধুনিক হয়েছি, তাই শিক্ষিত লোক যাচাইয়ের এই অভিনব পদ্ধতি সত্যিই হাততালি পাবার যোগ্য আর এ পদ্ধতির পরিচালকদের আমি স্যালুট ঠুকি।

সমস্যাটা যতটা না শিক্ষা উপকরণের তার চেয়ে বেশি শিক্ষাদান পদ্ধতির। আর এর পক্ষেই যেন প্রমাণ হিসেবে গর্বের সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবণ্টন দাঁড়িয়ে আছে। এখানে শিক্ষার্থীদের লেকচারে আকৃষ্ট করে ক্লাসে আনা হয়না বরং পার্সেন্টেজ কমে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়। আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিটা এতই আধুনিক যে সে দু-একটি ভেড়ার পরিবর্তে একপাল ভেড়া উৎপাদন করছে আর এর সাথে বর্জ্য হিসেবে দু-একটি মানুষ যা উৎপাদন হচ্ছে তারা একা একা ঘুরে বেড়ায় এ বিশাল তৃণভূমিতে। এরা ঘাস খেতেও পারেনা আবার না খেয়ে বাঁচতেও পারেনা। তাই সময়ের সাথে এদের অধিকাংশকেও বিবর্তিত হয়ে যেতে দেখা যায়। এটা অবশ্য বর্তমান সমাজের জন্য শুভ বার্তা বৈ অন্য কিছু নয়! আমাদের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আদ্যোপান্তে এটাই বুঝানো হয় ‘শিক্ষালাভ’ করে চাকরি করতে হবে। হ্যাঁ চাকরি অবশ্যই পেতে হবে। কারণ কথায় আছে, “পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি।” কিন্তু পেট শান্ত করাই যখন শিক্ষার মূখ্য কর্ম হয় তখন চারপাশ অশান্ত হওয়া ছাড়া আর কিছু দেখিনা। শিক্ষা যখন চাকরি দানের গুরু(!) দায়িত্ব নেয় তখন ‘হৈমন্তী’ গল্পে যে যৌতুক বিরোধী কথাটা প্রচার হয়েছে সেটা মাথা থেকে পরীক্ষার হল পর্যন্তই যাতায়াত করে। মনের মাঝে এর যাতায়াত কতটুকু আমার সন্দেহ হয়। যাতায়াত থাকলেও এর পথ ভেড়ার উৎফুল্লতার সাথে বন্ধ করে দেয়। এরা অবশ্য এই শিক্ষাটা এমনি এমনি পায়নি। আমাদের গড়ে তোলাই হয়েছে এভাবে। যখন একজন ছাত্র বা ছাত্রী স্কুলে ভর্তি হয় তখন অভিভাবক হোক আর শিক্ষক হোক সবাই তাকে এটা বুঝিয়ে দেয় অমুককে পেছনে ফেলতে হবে, তমুককে পেছনে ফেলতে হবে। কিন্তু এটা তাকে কেউ বুঝায় না “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে,” এই কথাটির অর্থ কি। তাই শিক্ষাজীবন শেষে একজন শিক্ষার্থীর মগজের ঝোলায় মনুষ্যত্ব এক কোণে ময়লা হয়ে জমে থাকলেও চাকরি আর মার্কসের জন্য জ্ঞানটা সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে থাকে। আর ঝোলা ভরে দেয়ার এই গুরু দায়িত্বটা আমাদের সম্মানিত শিক্ষক ও অভিভাবকরা নিষ্ঠার সহিত পালন করেন।

এ সমস্যার সমাধান বলা হয়ত আমার জন্য খাটেনা। আমি একজন অধম শিক্ষার্থী মাত্র। সত্য কথা বলতে সমস্যাগুলো তুলে ধরাও আমাকে মানায় না। তবু এই শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ে ঘাস গিলতে গিলতে যখন বদহজমের উপক্রম তখন না বলেও পারিনা। হয়ত ডাক্তার সাহেবদের চোখে কখনো পড়বে। এ অবস্থার পরিবর্তন খুব বেশি কঠিন নয়। একটু মানসিকতার পরিবর্তন ঘটলেই আসতে পারে সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। একটা কথা আমরা বন্ধু মহলে খুব বলে থাকি, “Think out of the box.” একটু গণ্ডির বাইরে চিন্তা করলেই আমি চোখের সামনে দেখতে পাই এক সুন্দর সমাজ। কেউ একজন যদি শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে একজন শিক্ষার্থীকে বুঝাতো শিক্ষা আলো, সে মনের আলো, পকেটের নয়। তাহলে এই কিছু ‘কেউ একজন’ থেকে কি লক্ষ-কোটি ‘কেউ একজন’ একদিন সৃষ্টি হত না? খুব বেশি কিছুর তো আমি প্রয়োজন দেখিনা। একটি বাচ্চাকে শুধু বুঝাই শিক্ষা মনুষ্যত্বের হাতিয়ার। শিক্ষার ঘাড় থেকে চাকরিদানের দায়িত্বটা নামাই। সমাজটা বদলে যাবে। একটু লোভ কমালেই সমাজটা বদলে যাবে।

আমি আগের প্রবন্ধ ‘বাঙালি নাকি মুসলমান’- এ বলেছিলাম আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। তাই আমি স্বপ্ন দেখি এদেশ একদিন ভেড়ার পালে নয়, মানুষে ভরে উঠবে। দেশটি তৃণভূমি নয় বরং সবুজ প্রান্তর হবে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন, সুন্দর দিন, কেউ নিজের জন্য নয়, সবাই সবার জন্য হবে। আমি স্বপ্ন দেখি চারপাশে টাকার ছড়াছড়ি নয়, হবে মনুষ্যত্বের ছড়াছড়ি। আমি স্বপ্ন দেখি আমি একদিন ব্লগপোস্টে সমস্যা লিখবো না। আমি হয়ে তাকিয়ে থাকবো একটি শিক্ষিত জাতির দিকে। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকবো। আমি স্বপ্ন দেখি, আমি স্বপ্ন দেখি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − = 9