শুধু বর্বর আইন কেন, মিসাইল বোমা মেরেও কখনো মানুষের মুখ বন্ধ রাখা যায়নি

যুক্তি, তর্ক, ভিন্নমত, সমালোচনা, মুক্তালোচনা, এগুলো থাকা খুবই জুরুরী। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের এই অধিকারগুলোকে যথাযথ সুরক্ষা করা। এই মুক্তচিন্তা যদি নাই থাকে, ভুলের, অপরাধের সমালোচনা যদি নাই থাকে, তাহলে রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ শিক্ষা নিবে কিভাবে? কিভাবে শোধরাবে রাষ্ট্র, সমাজ আর মানুষ? যেখানে যুক্তি, তর্ক, ভিন্নমত, সমালোচনা, মুক্তালোচনা নেই, সেই সমাজ, সেই রাষ্ট্র, কখনো সভ্য হয়না। সেই সমাজে সভ্য ও সুস্থচিন্তার মানুষ জম্ম নিতে ভয় পায়। কোনো মানব এমনকি মহামানব ও সমালোচনার উর্ধে নয়। সেই মানবদের সৃষ্ট ১৫০০, ২০০০, ৪০০০, ৫০০০, বছরের পুরোনো নিয়ম কানুন শৃঙ্খলা বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার সাথে যে মিলবে না এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের পুরোনো নিয়ম তাদের ‘সাথে চলে গেছে। যুগে যুগে সভ্য ও সুস্থচিন্তার মানুষরা, যতসব ধর্মীয় বর্বর প্রথা ও রাষ্ট্রের অন্যায় দমনীয় আইনের সমালোচনা করে এসেছে। তাঁরা থেমে থাকেনি। যেখানে মানুষের কথা বলার, সমালোচনা করার অধিকার থাকেনা, সেখানে অপরাধ, অন্যায়, অযাচার, স্বেচ্ছাচার বাড়বেই বৈ কমবে না।

তেমনি শেখ মুজিব নির্ভুল কোনো মানুষ নয়। তাঁর রাষ্ট্র প্রকল্পের প্রতিটি নীতি যে সবাই একবাক্যে সহমত পোষন করবে, এমনটা ভাবা মুর্খের পরিচয়। শেখ মুজিব যে এই বঙ্গের সকলের আস্থাভাজন ছিল, এমনটা মনে করা আরো বেশি মুর্খতার পরিচয়। শেখ মুজিবের এই দেশকে মুসলিম রাষ্ট হিসেবে ঘোষনা করা, ওয়াইসিতে (বিশ্ব মুসলিম নেতাদের সম্মেলনে) যোগ দেয়া, এটা তো আমারও পছন্দ নয়। তাই বলে ৩০ লক্ষ শহীদের লাশের উপর দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তা কি আমি মুখ ফুটে বলতে পারবো না? তাঁর মুসলিম প্রীতির সমালোচনা কি আমি করতে পারবো না? আমাকে কি সবসময় মুখে হাসির রেখা ঝুলিয়ে রেখে শেখ মুজিবের স্তুতি করে যেতে হবে? তাহলে আমি এক চাটুকার সুবিধাবাদী মুজিব পক্ষের দালালই হয়ে গেলাম! তাহলে তো আমি একজন নেতান্ধই রয়ে গেলাম! আমার নিজস্বতা বলে থাকল কি? হ্যাঁ শেখ মুজিবকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করি, তার নির্ভীক ভাষনের জন্য, তাঁকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করি পুরো বাঙ্গালী জাতিকে পাকিস্তানের দুঃশানের বিরুদ্ধে একাত্ন করার জন্য। তাই বলে কি তিনি আমার চিন্তার স্বাধীনতা, সমালোচনা করার স্বাধীনতা কিনে নিয়েছেন? গত ২৩ই আগষ্ট শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভা যে “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন” পাশ করেছে তা অত্যন্ত জগন্য অসভ্য আইন। তাতে বলা হয়েছে জাতির পিতার সমালোচনা করা যাবেনা। কোনো ব্যক্তির সমালোচনা করা যাবেনা। এমনকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া যাবেনা! যেই না সমালোচনা করবে তাঁকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড দেয়া হবে। এমনকি এক কোটি টাকার উভয় দন্ড দেয়া হবে। এই আইন পাশ দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি এখনো হাজার বছরের পুরোনো মধ্য যুগীয় বর্বর সময়ে বাস করছি? রাষ্ট্রচালকরা নিজেদের সুবিধা মত যাচ্ছেতাই আইন পাশ করবে, তা আমাদের মুখ বুজে মেনে নিতে হবে? এমন রাষ্ট্রের দুর্দমনীয় শাসন তো মধ্য যুগীয় বর্বর মুর্খ সমাজেই মানায়। যেখানে প্রজারা হিরোক রাজার দেশের মতো রাজার অন্ধ ভক্ত থাকবে। হিরোক রাজার অন্ধ ভক্ত হয়ে শুধু প্রশংসা করবে।

ভাবতে অবাক লাগে যে, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর রাষ্ট্রনীতি যখন তাদের জনগনের মৌলিক অধিকার রক্ষায় দিন দিন সচেষ্ট হচ্ছে, মানুষের মানবাধিকার যাতে এতোটুকু ক্ষুন্ন না হয় তার জন্য রাষ্টীয় দমন নীতিগুলোকে পাল্টাচ্ছে, তখন আমাদের রাষ্ট্রচালকরা একে একে আইন পাশ করছে মানুষের মুখ কিভাবে চেপে রাখা যায়, তার কথা বলার অধিকার কিভাবে হরণ করা যায় তার সবরকম চেষ্টা তারা করে যাচ্ছে।

-শুধু বর্বর আইন পাশ কেন, মিশাইল বোমা মেরেও কখনো মানুষের মুখ বন্ধ রাখা যায়নি। কোনো সুস্থ সভ্য মানুষ সভ্যতার এতোটুকু হানি দেখলে সেই মানুষ চিৎকার করবেই, সেই যতই দমনীয় আইন হোক না কেন। আমি স্বজ্ঞানে সুস্থ মস্তিষ্কে “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন” আধুনিক সভ্যযুগে একটা বর্বর আইন। আমি এই আইনের বাতিল চাই!

২৬–৮–১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − 79 =