চিতোর (ধারাবাহিক উপন্যাস) তৃতীয় পর্ব

পদ্মাবতীঃ

ছয়ঃ

মদিরার নেশা পুরোপুরি কেটে গেছে সুলতানের। কিন্তু আমেজ রয়ে গেছে এখনো। সেই আমেজে চকচক করছে তাঁর চোখের মণি। যেন অন্ধকারে জ্বলতে থাকা কোন হিংস্র শ্বাপদের চোখ যেন ওগুলো। যে শ্বাপদ পেয়ে গেছে নরমাংসের আস্বাদন। রাঘবের প্রশস্তি গীতি রীতিমতো উদ্বেলিত করে তুলেছে সুলতানকে।জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে উৎফুল্ল রাঘব। উদ্দেশ্য তার আজ সফল হয়েছে পুরোপুরি। আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সে নারীলিপ্সু সুলতানের দেহমনে। বাকি কাজ নিয়ে আর চিন্তা নেই। নিজ দায়িত্ব্বেই তা করে নেবেন সুলতান। যেমনটা করেছেন গুজরাটে। মনে মনে নিজেই নিজের বুদ্ধিওমত্তার তারিফ না করে পারলোনা রাঘব।

………… বাজনাদার।

সুলতানের নেশা জড়ানো চরম উৎসাহী কন্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে পেলো রাঘব।

…………… হুকুম করুন মালিক।

…………… যে আওরাতের গীত গাইলে কে এই আওরাত? নিবাস কোথায় তার? জলদি বাতাও।

………… জাঁহাপনা , এই রমণীর নাম পদ্মাবতী সংক্ষেপে পদ্মিণী। মেবারের রাজা রতন সিং এর রাণী। রূপে গুণে সারা হিন্দুস্তানে সে অদ্বিতীয়া।

চকচক করে উঠলো সুলতানের লোভাতুর চোখ। যেন আর তর সইছেনা তাঁর এক মূহুর্তও।

……………তার ব্যাপারে আর যা যা জানো সব এখনই বাতাও এই কাফির রতন সিং আর পদ্মিনী বাই এর ব্যাপারে।

………………… আলামপনা, দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্য।রাজপুতদের বাস সেখানে। দিল্লী থেকে কয়েকসপ্তাহের পথ মাত্র। তাদের রাজা রতন সিং। রাজার প্রথম রানী নাগমতি। পার্শ্ববর্তি সিংঘাল রাজ্যের রাজকুমারী পদ্মাবতির সৌন্দর্্যথ তখন কিংবদন্তীতূল্য। সেই পদ্মাবতি সেকালের হিন্দু রাজবংশের ধারা অনুযায়ী স্বয়ংবরা পদ্ধুতিতে বিবাহ করবেন ঘোষনা করেছেন। স্বয়ংবরা পদ্ধুতিতে রাজা রাজকুমারীর বিয়ের ঘোষনা দিতেন, এরপর রীতিমত প্রতিযোগীতার মাধ্যমে রাজকুমারীর কাছে নিজ যোগ্যতা প্রমান করতে হত প্রতিযোগী রাজপুত্র, রাজা মহারাজাদের। তার ভিত্তিতে রাজকুমারী নিজে বর বেছে নিতেন। প্রথম রানী নাগমতি এবং নিজ মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও রতন সিং স্বয়ংবরা প্রতিযোগীতায় আরেক রাজাকে পরাজিত করে রাজকুমারী পদ্মাবতিকে জিতে নেন, রানী হবার পর পদ্মাবতির নাম হয় পদ্মিনী।এই পদ্মিনীর ন্যায় সুন্দরী নারী শুধু রাজপুতানা নয়, সারা হিন্দুস্থানে আর দুটো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তাঁর মাটি পর্যন্ত লম্বিত রেশমী কেশরাশির সামনে মেঘেরাও লজ্জিত হয়। রক্ত লাল দুটি ঠোঁটে লুকিয়ে আছে রাজ্যের বিস্ময়। উন্নত স্তনযুগল যেন উপহাস করে জগতের আর সকল নারীকে। শুভ্র গাত্রবর্ণ যেন হিমালয়ের তুষারের বর্ণকেও হার মানায়। চোখের মণিতে যেন কামনার ইশারা……………

———- তুমি আরাম কর বাজনাদার। কাল তোমার ইনাম জরুর মিলেগা।

বলেই মাঝপথে রাঘবকে থামিয়ে দিলেন সুলতান। দ্রুত নিজের শাহী শয়নতাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। পদ্মিনীর রূপের বর্ণণা তাঁর শরীরের প্রতিটি কোণে তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। কামনায় রীতিমতো উন্মত্ত হয়ে গেছেন তিনি। শয়নলক্ষে তাঁর জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে শাহী হারেমের নতুন সংযোজন ইরানীয় দাসীটি।মেয়েটি এর আগে একবার পালানোর চেস্টা করেছিলো বিধায় সুলতানের খাটের সাথে রেশমী কাপড় দিয়ে বাঁধা রয়েছে তার হাত পা। তাঁর খেদমতগার রোশনী বাই অনেক কস্টে জোগাড় করেছে তাকে। একেবারেই আনকোরা কুমারী। শিকারউতসবের আনন্দের অংশ হিসেবেই আনা হয়েছে তাকে।কামনায় উন্মত্ত অবস্থায় তাঁবুতে প্রবেশ করেই হিংস্র বাঘের মতো মেয়েটির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুলতান।যেন ক্ষুধার্ত কোন হায়েনা ঝাঁপিয়ে পড়েছে কোন ভয়ার্ত অসহায় হরিণীর উপরে। রীতিমতো হায়েনার মতোই ছিড়েছিড়ে খেতে লাগলেন তাকে। একবার, দুবার, বারবার। মাত্র একবারই আর্তচিতকার করেছিলো সে। তারপরই নিথর হয়ে যায় পুরোপুরি। রক্তে ভেসে যায় শাহী বিছানা।একসময় চরম ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন সুলতান। আর এক হিংস্র শ্বাপদের মধুচন্দ্রিমার আলিঙ্গনের আতিশয়তা ইরানীয় দাসীটিকে দিয়ে গেছে সকল জাগতিক যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি। আর কখনো কোন জানোয়ারের শিকারে পরিণত হতে হবেনা তাকে কোনোদিন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 + = 73