“মাস্টার্স” পাশের বোঝা!

“মাস্টার্স” পাশের বোঝা

আমি আর আমার বন্ধু সম্রাট ( ছদ্মনাম)২০০৬ সালে এস এস সি পাশ করেছি। দুইজনই জিপিএ ৫ পেয়ে পাশ করেছি। স্টুডেন্ট হিসাবে দুই জনেরই সমান নাম ডাক। পাস করার পর দুইজনই যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ব্যাবসা শিক্ষা শাখায় ভর্তি হলাম।
একদিন দেখি সম্রাট নোটিশ বোর্ডের সামনে দাড়িয়ে ‘সেনাবাহিনীর লোক নিয়োগের’ বিজ্ঞপ্তি পড়ছে।
আমাকে বললো, দাড়াবি নাকি?
আমি বললাম, বাবার কাছে শুনতে হবে।
বাড়ি এসে বাবাকে বললাম, বাবা সম্রাট আর্মিতে দাড়াচ্ছে।
আমি কি দাড়াবো?
বাবা বললেন, না, তোমার এসএসসি পাসের এই ছোট চাকরির দরকার নেই।
তুমি অানার্স মাস্টার্স পাস করবা।
বড় চাকরি করবা।
আমি বাধ্য ছেলের মতো বাবার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে চলে গেলাম।
কিছু দিন পর দেখি সম্রাটের মা আমাদের বাসায় মিস্টি নিয়ে হাজির।
এসে বললো, আমার সম্রাটের আর্মির চাকরি হয়ে গেছে।
আমার বাবা বললো,আমার ছেলেলে দাড়ালেও চাকরি হয়ে যেতো।
কিন্তু ওকে আমি উচ্চ শিক্ষিত বানাবো।
মিস্টি দিয়ে সম্রাটের মা চলে গেলো।
কিছু দিন পর সম্রাটের সাথে দেখা।
বললো, তোরে বললাম দাড়াতে।
দাড়ালি না। এখন তো চাকরি এমনি হচ্ছে।
কিছু দিন পর ১৫ লাখ টাকা দিয়েও চাকরি হবে না।
কালকে আমি ঢাকায় যাচ্ছি ট্রেনিং এ।
ভালো থাকিস।
সম্রাট চলে গেলো ঢাকা ট্রেনিং এ।
আর আমি মন দিলাম অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের কাজে।
সম্রাট এখন অনেক সুখি। কিছুদিন আগে ৪ বছরের জন্য সাইবেরিয়া থেকে মিশন করে এসেছে।
যশোর আরবপুর বিমান বন্দর রোডে তার এখন ৬ কাঠা জমির উপর চার তলা বাড়ি।
লাল একটা পালসার কিনেছে।
২ মাস হলো বিয়ে করেছে ধনীর একমাত্র দুলালিকে।
আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলো।
কিন্তুু আমি যাইনি।
এখন আমি মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য সারকুলার অফিসে দৌড়াদোড়ি করি।
সেদিন দেখলাম সম্রাট তার লাল পালসারে তার বৌকে নিয়ে সাই সাই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সম্রাট যখন তার লাল পালসারে তার বৌকে চড়িয়ে রঙিন স্বপ্ন বুনছে তখন আমি মাস্টার্স পাশের বোঝা মাথায় নিয়ে ভাঙা সাইকেলে করে টিউশনি করিয়ে বেড়াই।
মা শুধু বলে বাবা তোর কবে চাকরি হবে আর কবে বিয়ে শাদি করবি।
সম্রাট দেখো চাকরি বাকরি করে বাড়ি গাড়ি করে ফেলেছে।
আমি বলি মা দোয়া করো হয়ে যাবে।
আর মনে মনে বলি মা, সম্রাট তো এসএসসি পাসের ছোট চাকরি করছে।
আর আমি তো মাস্টার্স পাসের বোঝা মাথায় নিয়ে এখনো চাকরি খুজছি।
মা তুমি তো জানো না,,এই বোঝা সবাই বইতে পারে না।
এটা তো মাস্টার্স পাশের বোঝা।
ছোট বোনটা সেদিন বলছে, সম্রাট ভাইয়া তিতলির ( সম্রাটের ছোট বোন) জন্মদিনে সুন্দর একটা সোনার চেইন গিফট করেছে।
এটা শুনে আমি আর চোখে পানি আটকে রাখতে পারিনি। দরজা বন্ধ করে সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম।
কি করবো রে বোন,,,,আমি তো তোর জন্মদিনে একটা চকলেটও দিতে পারি না। আমি যে তোর অথর্ব মাস্টার্স পাস ভাই। আমার মাথায় মাস্টার্স পাসের বোঝা।
পাড়ার মুরব্বীরা দেখলে বলে কি বাবা চাকরির কি খবর।
তোমার বাবা তো বৃদ্ধ হয়ে গেছে তাকে
এখন একটু বিশ্রাম দাও।
আমি বলি,, জি চাচা।
সেদিন এক প্রতিবেশি চাচা তার পালবাড়ি বাজারে চাউলের আড়ত আছে।
তিনি বলছেন, অনেকদিন ধরে তো চাকরির চেস্টা করছো তা কি খবর?
আমি বললাম, চাচা হয়ে যাবে।
তিনি বললেন,,এক কাজ করো, আমার দোকানের ছেলেটা অনেক দিন ধরে দোকানে আসছে না।
তুমি বরং তার যায়গায় কাজটা করতে পারো। তারপরে চাকরি হলে চলে যেও। মাসে ৪ হাজার টাকা পাবা।
আমি বললাম, চাচা চিন্তা করেরে দেখি।
তারপরে মনে মনে ভাবলাম, কোথায় ৪০ হাজার টাকার বেতনের স্বপ্ন দেখেছিলাম সেখানে আজ মাত্র ৪ হাজার টাকার বেতনের চাকরির অফার আসছে।
সবই মাস্টার্স পাসের বোঝা।
অানার্সের পরে মাস্টার্স পড়াতে দেড় বছর লেগেছে।
এই দেড়ড় বছরে কমপক্ষে দেড়শ চাকরির পরিক্ষা দিয়েছি।
৮০ টার উপরে রিটেন পরিক্ষায় টিকেছি।কিন্তুু ভাইবায় যেয়ে ঠেকে গেছি। কারন ভাইবা বোর্ডে সরাসরি আমাকে বলা হয় কত দিতে পারবেন।
আমার বাবা গরিব কৃষক সে তার শরিরের শ্রম ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না। এটা তো আমি জানতাম।
একদিন ভাইবা দিতে গিয়েছি। বাইরে এক লোক বলছে ১৫ লাখ দিবেন।
তা হলে ভাইবা দিতে এক দরজা দিয়ে ঢুকবেন আর অন্য দরজা দিয়ে চাকরির ইয়েস কার্ড নিয়ে বের হবেন।
সম্রাটের কথায় আজ সত্যি হয়ে গেলো।
বাবাকে এসে বললাম, বাবা চাকরি করতে হলে ১৫ লাখ টাকা লাগবে।
বাবা বললেন, সারা জীবনন টাকা খরচ করে লেখাপড়া শিখালাম।
এখন আবার চাকরি করতে ১৫ লাখ টাকা লাগবে কেনো?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার জানা নাই। মনে মনে ভাবলাম বাবা তুমি তো জানো না, এখন মাস্টার্স পাসের কোনো মুল্য নাই। টাকা দিলেই চাকরি হবে। এখন তো টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি হয়।
কি আর করার বাবা।
আমি তো তোমার মাস্টার্স পাশ ছেলে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 38 = 45