বাঙালি বুদ্ধিজীবীর দাসত্বের সন্ধানে :ইতিহাসের পাতায় এক ঝলক

ইতিহাস রচনা শুধুই দিন তারিখ আর রাজা বাদশার বংশানুক্রমিক শাসনের ধারাবাহিক কাহিনী লিখে যাওয়ার ব্যাপার না। ইতিহাস গভীর অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণের ব্যাপার। ইতিহাসের বিশ্লেষণ সবসময়ই অবজেক্টিভ হয়না। তবুও অবজেক্টিভিটির কাছে পৌছানোটাই একজন ইতিহাসকারের আরাধ্য। বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়টা হচ্ছে বিশ্লেষনকারীর দৃষ্টিভঙ্গি, তার আইডিওলোজি। একই ঘটনা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষকের বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হতে দেখা যায়। যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একজন বাংলাদেশী বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে যেমন, একজন পাকিস্তানির কাছে একেবারেই বিপরীত। আমাদের মধ্যযুগের ইতিহাসকে আমাদের বাঙালি ইতিহাসকারেরা কী চোখে দেখেছেন এবং পাঠ্য বইয়ে কীরূপে উপস্থাপন করেছেন তার সামান্য কিছু আলোকপাত করতে চাই। এই আলোচনা থেকে কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় কিনা সেটাও বিবেচনা করবো।



ইতিহাস রচনা শুধুই দিন তারিখ আর রাজা বাদশার বংশানুক্রমিক শাসনের ধারাবাহিক কাহিনী লিখে যাওয়ার ব্যাপার না। ইতিহাস গভীর অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণের ব্যাপার। ইতিহাসের বিশ্লেষণ সবসময়ই অবজেক্টিভ হয়না। তবুও অবজেক্টিভিটির কাছে পৌছানোটাই একজন ইতিহাসকারের আরাধ্য। বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়টা হচ্ছে বিশ্লেষনকারীর দৃষ্টিভঙ্গি, তার আইডিওলোজি। একই ঘটনা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষকের বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হতে দেখা যায়। যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একজন বাংলাদেশী বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে যেমন, একজন পাকিস্তানির কাছে একেবারেই বিপরীত। আমাদের মধ্যযুগের ইতিহাসকে আমাদের বাঙালি ইতিহাসকারেরা কী চোখে দেখেছেন এবং পাঠ্য বইয়ে কীরূপে উপস্থাপন করেছেন তার সামান্য কিছু আলোকপাত করতে চাই। এই আলোচনা থেকে কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় কিনা সেটাও বিবেচনা করবো।

ইতিহাসে মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীনতা বিষয়টা অত্যন্ত গোলমেলে। ১৩৩৮ সালে ফকরুদ্দিন মোবারক শাহ দিল্লির তুঘলক সম্রাটের অধীন সোনারগাঁও এর একজন রাজকর্মচারী ছিলেন এবং সোনারগাঁও এর শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা দিয়ে বসলেন মুহম্মদ তুঘলককে অমান্য করে। ইতিহাসের বইতে সেটাকে বলছে “বাংলার প্রথম স্বাধীন মুসলিম সালতানাত”। কিন্তুু কোন যুক্তিতে? ফকরুদ্দিন জাতিতে তুর্কি। তার শাসন কিভাবে স্বাধীন বাংলার সালতানাত হয়? আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার যদি বাঙালির হাতে না থাকে তাহলে সেটা স্বাধীন বাংলা শাসনামল হয় কী করে? ভীনদেশী কোন জাতি যদি এখন এসে বলে যে ‘বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা আমাদের হাতে তুলে দাও, আমরা তোমাদের শনৈঃশনৈঃ উন্নতি করে দেব’ আমরা কী তখন দেশকে তাদের হাতে তুলে দিব? আর যদি দিই তাহলে তখন কী আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন বাঙালি জাতি বলতে পারবো?

ইতিহাস লেখকদের একটা জাতির স্বাধীনতা সম্পর্কে জ্ঞানের কি ভয়ানক নিম্নমান! ওই ঘটনার কিছুদিন পরে ১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ লখনৌতি থেকে এসে সোনারগাঁ দখল করলে ইতিহাসে ইলিয়াস শাহকে বলা হয়েছে শাহ -ই-বাঙালা এবং তিনিই নাকি প্রকৃত স্বাধীন বাংলার প্রতিষ্ঠাতা। মাত্র চৌদ্দ বছর আগেই বলল যে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা হয়েছে ,১৪ বছর পরে যখন আরেক দখলদার সেই সালতানাত উল্টিয়ে দিয়ে নতুন রেজিম প্রতিষ্ঠা করলো তখন তাকেও কিভাবে স্বাধীনতার সূচনা বলে উল্লেখ করলো আমাদের ইতিহাস লেখকেরা? আবার বলছে যে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে হোসেনশাহী বংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহের পতনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সালতানাতের সমাপ্তি ঘটে। কেন বলছে সমাপ্তি? হোসেন শাহীরা তো ছিলো আরবের লোক, মক্কা থেকে ভাগ্যান্বেষণে বাংলায় এসেছিলেন। আরবের লোকদের পতন কী করে ‘স্বাধীন বাংলার’ পতন হয়? কারন কি তবে এই যে তখন মোঘল সম্রাট হুমায়ুন রাজধানী গৌড় অধিকার করে নেন এবং বাংলা মোঘলদের প্রত্যক্ষ শাসনে চলে যায়?

পরবর্তীতে ১৫৩৯ সালে আফগান শের শাহ যখন হুমায়ুনের মোঘল শাসনকে বাংলা থেকে বিদায় দিয়ে নিজে ক্ষমতা নেন তখন বলছে বাংলা আফগানদের আধিপত্যে চলে গেছে । আবার অারেক আফগান তাজ খান কররানী ১৫৬৩ সালে যখন বাংলায় আগে থেকেই বিরাজমান আফগান শাসনকে পরাভূত করে ক্ষমতা দখল করলো তখন বলছে বাংলা আবার স্বাধীনতা ফিরে পেলো। পুনরায় ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মোঘলদের হাতে কররানী শাসনের অবসান হলে বাংলা আবার মোগলদের হাতে গেলে বলছে যে বাংলার স্বাধীনতা শেষ হলো। কেন? আফগান শাসন কিভাবে বাংলার স্বাধীনতার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়? একই ঘটনা ইংরেজদের হাতে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ক্ষেত্রেও। সিরাজউদ্দৌলার পতনে কিভাবে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়? সিরাজ কি বাঙালি ছিলো? বাংলায় কথা বলতো? বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে? আচ্ছা মীরজাফর, উমিচাদেরা না হয় সিরাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের জিতিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তুু মীরজাফরের জামাতা মীর কাশিম তো খুব আন্তরিকতা নিয়েই ইংরেজদের সাথে লড়েছিলো ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে। সাথে ছিলো অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা আর মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম। তখন তো কোন জগৎশেঠ, রাজবল্লভের মতো ষড়যন্ত্রকারী ছিলো না। সেই যুদ্ধে হারলো কেন?

একটা জিনিস পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে বঙ্গের ইতিহাস লেখকেরা, বাংলাকে তখনই পরাধীন বলছেন যখন বাংলা ভারতের দিল্লি থেকে শাসিত হচ্ছে বা দিল্লির নিয়োজিত সুবাদারদের অধীনে শাসিত হচ্ছে। দিল্লির আনুগত্য ত্যাগ করে কোন আফগান, তুর্কী, পশতু যেই হোক নিজেকে যখন বাংলার সুলতান বা নবাব ঘোষণা করেছে তখন তাকে বলছেন বাংলার স্বাধীন সুলতান, বাংলার স্বাধীনতা। আমাদের ইতিহাস লেখকদের আর ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাদের স্বাধীনতার কি চেতনা, কি বোধ! বাংলার কর্তৃত্ব দিল্লির মোঘলদের হাতে গেলে বাংলা পরাধীন হয়ে যায়, অথচ অন্যত্র আবার এই মোঘলদের নিয়েই আদিখ্যেতার শেষ নেই।

দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করে কোন তুর্কি, আফগান, হাবসী, আরবীয় যেই হোক বাংলা ভূখন্ডে স্বাধীন শাসন কায়েম করলে আমাদের এতো আনন্দিত হওয়ার কী আছে বুঝিনা। ওগুলোতে তো আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। কোথা থেকে কোন দস্যু দখলদার এসে বাঙালির ভূখন্ড শাসন করে গেছে শতশত বছর আর আমরা তাদের স্বাধীন শাসকের বরমাল্য পরিয়ে দিচ্ছি ইতিহাসের পাতায়। নিজেদের দুর্ভেদ্য দুর্বলতা, অপদার্থতা আর বীরত্বহীনতার জন্য যেখানে আমাদের মুখ লজ্জায় রক্তিম হওয়ার কথা, মাথা হেট হতে হতে মাটিতে নেম আসার কথা সেখানে আমরা ভীনদেশী মুসলমান শাসকদের বিজয়ে উল্লসিত হয়েছি।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তির জন্য কংগ্রেসের প্রথম দিকের আন্দোলন ছিলো দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী।আমাদের হীনম্মন্যতার শিকড়, আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খল বহু বহু গভীর এবং সুদূরবিস্তারী। আমরা ব্রিটিশকে গালি দিই অহরহ, অথচ ব্রিটিশ শাসনকে সারা ভারতে পোক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যেসব লোভী মোঘল সম্রাট আর তাদের নিয়োজিত সুবাহদারেরা তাদেরকে আমরা “গ্রেট মোঘল” অভিহিত করে গদগদ হয়। কোথায় কোন মসজিদ বানিয়েছে, কোন পুকুর খনন করেছে, কোন দুর্গ বানিয়েছে, এসব উল্লেখ করে তাদের বাহবা দিই। ইতিহাস রচনায় কি বীভৎস দৃষ্টিভঙ্গি!কোন আত্মসম্মান নেই, আত্মপ্রতিষ্ঠার চিন্তা নেই, লজ্জা ঘৃণা কিচ্ছু নেই। মনের ভেতর ঘাপটি মেরে আছে দাস মনোবৃত্তি আর সাম্প্রদায়িকতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বাঙালি বুদ্ধিজীবীর দাসত্বের সন্ধানে :ইতিহাসের পাতায় এক ঝলক

  1. বাহ চমৎকার !
    বাহ চমৎকার !
    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 5 =