হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০৭

যদিও বলা হয় হিন্দুদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ কিন্তু জীবন ধারনের সকল পদ্ধতি যেমন প্রতিমাপূজা , উপসনা, ব্রতাচারণ,বিবাহের নিয়মাবলী,শ্রাদ্ধবিধি,খাদ্য বিধি,বর্ণাশ্রম বিধি,সম্পত্তি বন্টন যাবতীয় সব কিছুই ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’র নিয়ম মেনে করা হয়। একজন হিন্দু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কী করলে ইহলোকে ও পরলোকে পুরুষ্কৃত হবেন এবং কী না করলে দুনিয়া আখেরাতে শাস্তি ভোগ করবেন তার বিষদ বর্ণনা আছে ভগবান মনুর এই মনুসংহিতায়। এটাই হিন্দুদের জীবন বিধান তথা কোড অফ লাইফ। বেদে কী আছে আর কী নাই তাতে কিছুই যায় আসেনা বাস্তবে কী আইন মানা হয় সেটাই আসল কথা। আমরা নারীদের প্রতি মনুর দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি এবার কিছুটা ফিডব্যাক করা যাক।



যদিও বলা হয় হিন্দুদের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ কিন্তু জীবন ধারনের সকল পদ্ধতি যেমন প্রতিমাপূজা , উপসনা, ব্রতাচারণ,বিবাহের নিয়মাবলী,শ্রাদ্ধবিধি,খাদ্য বিধি,বর্ণাশ্রম বিধি,সম্পত্তি বন্টন যাবতীয় সব কিছুই ‘মনুসংহিতা’ বা ‘মনুস্মৃতি’র নিয়ম মেনে করা হয়। একজন হিন্দু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কী করলে ইহলোকে ও পরলোকে পুরুষ্কৃত হবেন এবং কী না করলে দুনিয়া আখেরাতে শাস্তি ভোগ করবেন তার বিষদ বর্ণনা আছে ভগবান মনুর এই মনুসংহিতায়। এটাই হিন্দুদের জীবন বিধান তথা কোড অফ লাইফ। বেদে কী আছে আর কী নাই তাতে কিছুই যায় আসেনা বাস্তবে কী আইন মানা হয় সেটাই আসল কথা। আমরা নারীদের প্রতি মনুর দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি এবার কিছুটা ফিডব্যাক করা যাক।

মনুর বিধান অনুযায়ী;

(ক) স্ত্রীলোক পতিসেবা করবে। তাঁর স্বাধীন কোনো সত্তা নেই।

(খ) নারীকে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী, ও বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করবে।

(গ) স্ত্রীলোকের পৃথক কোনো যজ্ঞ, ব্রত বা উপবাস বিধান নেই।

(ঘ) স্ত্রীলোকের সাক্ষী হওয়ার বা স্বাধীনভাবে ঋণ করার অধিকার নেই।

(ঙ) স্ত্রী, অপরাধ করলে সূক্ষ্ম দড়ির দ্বারা কিংবা বেতের দ্বারা শাসনের জন্য প্রহার করবে।

(চ) রজ্জু প্রভৃতির দ্বারা প্রহার যদি করতে হয়, তাহলে শরীরের পশ্চাদ্ভাগে প্রহার কর্তব্য; কখনো উত্তমাঙ্গে বা মাথায় যেন প্রহার করা না হয়।

(ছ) টাকাকড়ি ঠিকমতো হিসাব করে জমা রাখা এবং খরচ করা, গৃহ ও গৃহস্থালী শুদ্ধ রাখা, ধর্ম-কর্ম সমূহের আয়োজন করা, অন্নপাক করা এবং শয্যাসনাদির তত্ত্বাবধান করা- এই সব কাজে স্ত্রীলোকদের নিযুক্ত করে অন্যমনস্ক রাখবে।
(জ) স্ত্রীলোকগণকে প্রথমে যে বাগদান করা হয়, তার দ্বারাই স্ত্রীলোকের উপর পতির স্বামিত্ব জন্মায়; অতএব বাগদান থেকে আরম্ভ করেই স্ত্রীলোকদের স্বামীর সেবা করা কর্তব্য।

(ঝ) বিবাহ-যোগ্য সময়ে অর্থাৎ ঋতুদর্শনের আগে পিতা যদি কন্যাকে পাত্রস্থ না করেন, তাহলে তিনি লোকমধ্যে নিন্দনীয় হন; স্বামী যদি ঋতুকালে পত্নীর সাথে সঙ্গম না করেন, তবে তিনি লোকসমাজে নিন্দার ভাজন হন।
(ঞ ) উৎকৃষ্ট অভিরূপ এবং সজাতীয় বর পাওয়া গেলে কন্যা বিবাহের বয়স প্রাপ্ত না হলেও তাকে যথাবিধি সম্প্রদান করবে।

(ট) ত্রিশ বৎসর বয়সের পুরুষ বারো বৎসর বয়সের মনোমত কন্যাকে বিবাহ করবে, অথবা, চব্বিশ বছর বয়সের পুরুষ আট বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। এর দ্বারা বিবাহযোগ্য কাল প্রদর্শিত হলো মাত্র। তিনগুণের বেশি বয়সের পুরুষ একগুণ বয়স্কা কন্যাকে বিবাহ করবে, এর কমবেশি বয়সে বিবাহ করলে ধর্ম নষ্ট হয়।

(ঠ) বরের নিকট থেকে পণ নেওয়ার সময়ে একটি কন্যাকে দেখিয়ে বিবাহের সময়ে যদি বরকে অন্য একটি মেয়ে দেওয়া হয়, তা হলে সেই বরটি ঐ একই শুল্কে দুইটি কন্যাকেই পাবে।

(ড) যার উদ্দেশ্যে কন্যা বাগদত্তা হবে, তার মৃত্যুর পরও বিচক্ষণ ব্যক্তি নিজের ঐ বাগদত্তা কন্যাকে আবার অন্য পুরুষকে সমর্পণ করবে না।

এবার সংক্ষেপে শূদ্র জনজাতির প্রতি ব্রাহ্মণ মনুর নির্দয়তা নিষ্ঠুরতার কিছু নমুনা দেখা যাক;

(ক) শূদ্রদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই।

(খ) দাস ও শূদ্রের ধন ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবেন।

(গ) শূদ্র অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তাঁর সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে।

(ঘ) প্রভু কর্তৃক পরিত্যক্ত বস্ত্র, ছত্র, পাদুকা ও তোষক প্রভৃতি শূদ্র ব্যবহার করবে।

(ঙ) প্রভুর উচ্ছিষ্ট শূদ্রের ভক্ষ্য।

(চ) দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোনো মুক্তি নেই।

(ছ) যজ্ঞের কোনো দ্রব্য শূদ্র পাবে না।

(জ) ব্রাহ্মণের নিন্দা করলে শূদ্রের জিহ্বাছেদন বিধেয়।

(ঝ) ব্রাহ্মণ শূদ্রের নিন্দা করলে যৎসামান্য জরিমানা দেয়।

(ঞ) ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্রহত্যা সামান্য পাপ।

(ট) শূদ্র কর্তৃক ব্রাহ্মণ হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

(ঠ) শূদ্র সত্য কথা বলছে কি না তাঁর প্রমাণ হিসাবে তাকে দিব্যের আশ্রয় নিতে হবে। এতে তাকে জলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হাঁটতে হয় অথবা জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। অদগ্ধ অবস্থায় অথবা জলমগ্ন না-হয়ে ফিরলে তাঁর কথা সত্য বলে বিবেচিত হবে।

(ড) (ব্রাহ্মণকে প্রহার করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলা বিধেয়।

(ঢ) ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে বসলে তাঁর কটিদেশে তপ্তলৌহ দ্বারা চিহ্ন একে তাকে নির্বাসিত করা হবে অথবা তাঁর নিতম্ব এমনভাবে ছেদন করা হবে যাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

(ণ) ব্রাহ্মণের ন্যায় উপবীত বা অন্যান্য চিহ্ন ধারণ করলে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ড বিধেয়।

(ত) যে পথ দিয়ে উচ্চ বর্ণের লোকেরা যাতায়াত করেন, সেই পথে শূদ্রের মৃতদেহও বহন করা যাবে না।

(থ) ব্রাহ্মণের গায়ে থুথু দিলে শূদ্রের ওষ্ঠছেদন হবে।

(দ) ব্রাহ্মণের প্রতি মূত্র নিক্ষেপ করলে শূদ্রের যৌনাঙ্গ ছেদন করা হবে এবং অধোবায়ু ত্যাগ করলে গুহ্যদেশ ছেদন করা হবে।

(ধ) শূদ্র যদি হিংসার বশবর্তী হয়ে ব্রাহ্মণের চুল, চিবুক, পা, দাড়ি, ঘাড় এবং অণ্ডকোষে হাত দেয় তাহলে নির্বিচারে তাঁর দুটি হাতই কেটে দেওয়া হবে।

(ন) সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধোগতি প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন।

(প) কোনও দ্বিজাতি-নারী (অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য নারী) স্বামীর দ্বারা রক্ষিত হোক বা না-ই হোক, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে, আর যদি স্বামীর দ্বারা রক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ওই শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মরণদণ্ড হবে।

মনুঃস্মৃতি, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, পুরাণ সহ হিন্দুদের সকল ধর্মগ্রন্থের মূল গ্রন্থ হলো ‘বেদ’। এবার আমরা দৃষ্টিপাত করবো হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ ‘বেদ’ এর উপর।

—————–

“সদা-সর্বত্র বিরাজমান তন্দ্রা-নিদ্রাহীন সদা সজাগ প্রতিনিয়ত করূণা বর্ষণকারী সর্বশক্তিমান হে প্রভূ ! আমরা শূধু তোমারই মহিমা স্বরণ করি, তোমারই জয়গান গাই । প্রভূ হে ! আমাদের সর্বোত্তম আত্নিক পথে,আলোকিত পথে পরিচালনা করো । আমরা যেন সব-সময় সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকে অনূধাবন করতে পারি”।

না,এটি কোরানের সুরা ফাতিহার বঙ্গানুবাদ নয়। সুরা ফাতিহা যেমন প্রার্থনা এটিও একটি প্রার্থনা তবে এগুলো ঋগবেদ এর আয়াত। [ঋগবেদঃ ৩.৬২.১০]

হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ হলো ‘বেদ’। এটি প্রায় শতাধিক গ্রন্থের সমষ্টি। বেদ চার ভাগে বিভক্ত যথা; (১) ঋগ্বেদ, (২) সামবেদ, (৩) যজুর্বেদ (৪) অথর্ববেদ। এই চারটি বেদের প্রতিটি আবার চারটি করে অংশে বিভক্ত। এগুলি হল (১) সংহিতা (২) ব্রাহ্মণ (৩) আরণ্যক (৪) উপনিষদ্‌। ‘সংহিতা’ অংশে লিপিবদ্ধ হয়েছে ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, বিষ্ণু, রুদ্র প্রমুখ বৈদিক দেবতার বিভিন্ন মন্ত্র ও স্তবস্তুতি। ‘ব্রাহ্মণ’ অংশে রয়েছে মন্ত্রের ব্যাখ্যা ও যাগযজ্ঞের নিয়মকানুন। ‘আরণ্যক’ অংশে রয়েছে বনবাসী তপস্বীদের যজ্ঞভিত্তিক বিভিন্ন ধ্যানের বর্ণনা। ঋক্‌ মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে দেবতাদের আহ্বান করা হয়, যজুর্মন্ত্রের দ্বারা তাঁদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হয় এবং সামমন্ত্রের দ্বারা তাঁদের স্তুতি করা হয়।

বৈদিক মন্ত্র পড়ে ইন্দ্র,অগ্নি, বরুণ, বিষ্ণু, রুদ্র প্রমুখ দেবতাদের উপর দরুদ পড়া হয় তাদের প্রশংসা করা হয় আর দেবতাদের কাছে দোয়া করা হয় বালা মুসিবত থেকে রক্ষা করার জন্যে, শত্রুর উপর জয় লাভ করানোর জন্যে এবং প্রচুর ধন সম্পদ দান করার জন্যে। মুসলমানদের দোয়া-দরুদের কিতাবে যা কিছু আছে বেদেও তার সবটুকুই আছে। অসংখ্য দোয়া দরুদ আছে এই বেদে। তবে কি এটি শুধু দেবস্তুতি আর প্রার্থনার কিতাব? বেদের কিছু আয়াত তেলাওত করা যাক;

“হে ঈশ্বর,যারা দোষারোপ করে বেদ ও ঈশ্বরের তাদের উপর তোমার রাগ বর্ষণ কর।” (ঋগবেদ ২।২৩।৫)

“যে লোক ঈশ্বরের আরাধনা করে না এবং যার মনে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ নেই,তাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করতে হবে।” (ঋগবেদ ১।৮৪।৮)

“গবাদিপশুগুলো কি করছে নাস্তিকদের এলাকায়,যাদের বৈদিক রীতিতে বিশ্বাস নেই? যারা সোমার সাথে দুধ মিলিয়ে উতসর্গ করে না এবং গরুর ঘি প্রদান করে যজ্ঞও করে না? ছিনিয়ে আনো তাদের ধনসম্পদ আমাদের কাছে”। (ঋগবেদ ৩।৫৩।১৪)

“কীকটবাসী [বেদের বাহিরের লোক] তাহারা গাভীর কি উপযোগ নেয়, না পানযোগ্য দুধ আদি দোহন করে, এবং না ঘৃতকে উত্তপ্ত করে। হে ঐশ্বর্যবান! নিজ ধন আমোদ প্রমোদে ব্যয়কারী পুরুষের ধনকে আমাদের প্রাপ্ত করাও আমাদের মধ্যে কুপ্রবৃত্তিবান লোক কে দমন করো “। (ঋগবেদ ৩/৫৩/১৪, জয়দেব শর্মা)

“তাদেরকে হত্যা করো,যারা বেদ ও উপাসনার বিপরীত”। (অথর্ববেদ ২০।৯৩।১)

” এবং যজুর্বেদ ৭/৪৪ তাদের যুদ্ধের মাধ্যম বশ্যতা স্বীকার করাতে হবে”।
“সেনাপ্রধান হিংস্র ও নির্দয়ভাবে শত্রুদের পরিবারের সদস্যদের সাথেও যুদ্ধ করবে।”(যজুর্বেদ ১৭।৩৯)

“শত্রূদের পরিবারকে হত্যা করো,তাদের জমি ধংস করো”। (যজুর্বেদ ১৭/৩৮)

“হে সেনাপ্রধান,আমাদের আশা পুর্ণ করো। হে ধনসম্পদের বাদশা,তোমার সহায়তায় আমরা যেন সম্পদশালী হতে পারি এবং যুদ্ধে জয় লাভ করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হতে পারি।” (যজুর্বেদ ১৮/৭৪)

এই গুলো বেদের শেখানো দোয়া। কিন্তু কথা হলো বেদের শত্রু কারা? যারা বেদের বাহিরে বা বেদে যাদের বিশ্বাস নেই তারা। এক কথায় বৈদিক ধর্মের বাহিরে যারা। ঠিক যেমন কোরানের ভেতরে যারা তারা ইমানদার মুসলমান আর যারা এর বাহিরে তারা অমুসলিম কাফির। এবার আমাদেরকে জানতে হবে ‘বেদ’ এর জন্মদাতা কে বা কারা। মুক্তমনা লেখক রণদীপম বসু তার একটি প্রবন্ধে লিখেন;

“ধর্মীয় অমানবিকতার আদিম ধারাটির নাম বৈদিকসংস্কৃতি। জগত জুড়ে ধর্মীয় সংস্কৃতির যে ক’টি প্রধান ধারার অস্তিত্ব এখনো বহাল রয়েছে তার মধ্যে সম্ভবত বৈদিক সংস্কৃতিই প্রাচীনতম। তার উৎস হচ্ছে বেদ (Veda),যা বর্তমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। অথচ বহিরাগত একদল লিপিহীন বর্বর আক্রমণকারী শিকারি আর্য গোষ্ঠির দ্বারা এককালের আদিনিবাসী জনগোষ্ঠির মাধ্যমে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ প্রাচীন হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংস হওয়া এবং এই ধ্বংসাবশেষের উপর ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা আর্য সংস্কৃতির বিকাশের আর্যাবর্ত ধারাক্রমই মূলত এই বৈদিক সংস্কৃতি। যেখানে আর্যরা (Aryan) হয়ে ওঠে মহান শাসক আর আদিনিবাসী জনগোষ্ঠিটাই হয়ে যায় তাদের কাছে অনার্য বা শাসিত অধম,নামান্তরে দাস বা শূদ্র (Sudra)। তাই এই বৈদিক সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের মধ্যেই একটি সভ্যতার উন্মেষ ও পর্যায়ক্রমে তার মাধ্যমে ধর্ম নামের একটি শাসনতান্ত্রিক ধারণার জন্ম ও আধিপত্য কায়েমের মধ্য দিয়ে এ ব্যবস্থার পরিণতি পর্যবেক্ষণ করলেই ধর্ম কী ও কেন- এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় বলে বিদ্বানেরা মনে করেন। আর প্রতিটা ধর্মেরই যেহেতু অন্যতম প্রধান শিকার হচ্ছে নারী, তাই আধিপত্যবাদী পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক এই ধর্মের প্রত্যক্ষ আক্রমণে কিভাবে সামাজিক নারী তার পূর্ণ মানব সত্তা থেকে সমূলে বিতাড়িত হয়ে কেবলই এক ভোগ্যপণ্য চেতনবস্তুতে পরিণত হয়ে যায় তারও উৎকৃষ্ট নমুনা-দলিল এই প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রই। বয়সে প্রবীণ এই শাস্ত্রের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ও সাফল্য থেকেই সম্ভবত পরবর্তী নবীন ধর্মশাস্ত্রগুলো তাদের পুরুষতান্ত্রিক শোষণের হাতিয়ারটাকে আরেকটু আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় করে তার শাসন-দক্ষতাকেই সুচারু করেছে কেবল,খুব স্বাভাবিকভাবেই কোন মৌলিক মানবিক উন্নতি ঘটেনি একটুও”।

ঠিক এ ভাবে একদিন মুসলিম খলিফারা পারস্য আক্রমন করে তাদের সহস্র বছরের কৃষ্টি সংস্কৃতি ধংস করেছিলেন। সেদিন মরুদস্যুদের হাতে ছিল কোরান আর সিন্ধুসভ্যতা ধংসকালে আর্যদের হাতে ছিল বেদ। অনার্যদের শাসন-শোষণ করার জন্যে ভারতীয়দের পদানত করে রাখার লক্ষ্যে বহিরাগত লুটেরা ডাকাত আর্যদের একখানি ধর্মগ্রন্থের প্রয়োজন ছিল। সেই ধর্মগ্রন্থটির নাম ‘বেদ’। কালের পরিবর্তনে যুগের প্রয়োজনে ‘বেদ’এর রূপের আকারের অনেক পরিবর্তন পরিমার্জন পরিবর্ধন, সংযোজন হয়েছে। প্রকৃতির কার্য-কারণ নির্ধারণে ব্যর্থ কিছু অসহায় অশিক্ষিত মানুষের কল্পনা থেকে সৃষ্ট এই গ্রন্থখানি এক সময় ধুরন্দর রাজনীতিবিদ আর শাসকদের প্রজা নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক যুগে এসে কী ভাবে সে গ্রন্থখানি বিজ্ঞানময় কিতাব হয়ে গেলো আমরা এবার সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করবো।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে হলে এখানে ক্লিক করুন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 69 = 75