চক্ষু-কর্নিয়া সম্পর্কে কিছু কথা,গঠন,পর্ব-২৩(৩)

চক্ষু-কর্নিয়া সম্পর্কে কিছু কথা,গঠন,পর্ব-২৩(৩)

আপনারা ইতিপূর্বে জানতে পেরেছেন, আলোক রশ্মী চক্ষু অভ্যন্তরে ভ্রমন করতে যে অর্গানকে সর্বপ্রথম অতিক্রম করতে হয়, সেইটাই “কর্ণিয়া”, এটা যেন একটি গৃহের একটা গ্লাস লাগানো জানালা। শরীরের অন্যান্য অর্গানের তুলনায় এর যথেষ্ঠ বৈশিষ্ট রয়েছে।

চোখের দুইটি পাতা এর Shutter হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে একে নিরাপত্তা ও বিশ্রাম দেয়। আবার পাতা দুইটি প্রয়োজন মত সরে গিয়ে বহির্জগতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, আর তখন বহির্জগত হতে আলোক রশ্মী এর অভ্যন্তরে পবেশ করে।

আমাদের সর্ব শরীর চর্ম দ্বারা আচ্ছাদিত। এই কর্ণিয়াটাও যদি চর্মের মত একটি অসচ্ছ পদার্থের অংস বিশেষ দ্বারা তৈরী হত, তাহলে চক্ষুর অভ্যন্তরে সব কিছু সঠিক থাকা সত্বেও আমাদেরকে আজীবন অন্ধ ভাবে থাকিতে হইত।

অর্থাৎ কর্ণিয়াটাকে সব সময় বা আজীবন থাকতে হবে একটি জানালার গ্লাসের ন্যায় একেবারেই স্বচ্ছ, কিন্তু একই সংগে জীবন্ত ও।

কিন্তু শরীরের একটি জৈব অংশকে কী করে এভাবে সচ্ছ রাখা সম্ভব? এটাতো আর জানালার গ্লাসের ন্যায় জড় পদার্থ নয়, যে একবার গ্লাসটি লাগিয়ে দিলেই সমস্ত ল্যাঠা চুকে গেল? আর মাঝে মধ্যে একটু পরিস্কার করলেই হয়ে গেল?

না,না, কর্ণিয়াটা গ্লাসের মত একটা প্রানহীন জড় পদার্থ নয়।

কর্নিয়া একটি জীবন্ত পদার্থ। এর একদিকে যেমন আছে বৃদ্ধি, একে বেচে থাকার জন্য গ্রহন করতে হয় অক্সিজেন ও খাদ্য, আবার অনুভূতি ও ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ার জন্য থাকতে হবে স্নায়ূ সরবরাহ।(চিত্র-১)

আবার একই সংগে আলোক রশ্মিকে ভিতরে Refraction করিয়ে প্রবেশ করানোর জন্য নিজেকে একেবারেই একটা জড় পদার্থ গ্লাসের ন্যায় স্বচ্ছতাও বজায় রাখতে হবে।
এভাবে উভয়কুল বজায় রাখাটা একেবারে সহজ কথা নয়।

তা হলে কী ভাবে কর্ণিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয় একটু দেখা যাক-
১) কর্ণিয়ার পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহের জন্য শরীরের অন্য সমগ্র অংশের ন্যায়, রক্ত সরবরাহ করা হয়না, কারণ রক্ত অসচ্ছ পদার্থ। রক্ত সরবরাহ করা হলে কর্ণিয়া অসচ্ছ হয়ে যেত। তাহলে আমরা আর দেখতে পারতামনা।\

২) কর্ণিয়ার পুষ্টি সরবরাহ করা হয় Aqueous Humor নামক একটি স্বচ্ছ তরল পদার্থের মাধ্যমে ও অক্সিজেন গ্রহন করে সরাসরি বায়ুমন্ডল হতে।

৩) কর্ণিয়ার স্নায়ু ফাইবার গুলী Non Myelin Sheath বা স্নায়ু কভারিং ছাড়া সরবরাহ করা হয়েছে। কারণ Myelin Sheath (স্নায়ূ আচ্ছাদন) একটি অসচ্ছ পদার্থ, যা থাকলে আলোক রশ্মীর প্রবেশ বাধা গ্রস্থ হয়ে যেত।

আবার এই স্নায়ু ফাইবার গুলীও কর্ণিয়াকে Nutrophin নামক এক ধরনের পুস্টি সরবরাহ করে।(৫)
৪) কিছু কিছু gene আছে, যারা কর্ণিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে থাকে।যেমন ধরুন ১২ নং ক্রোমোজোমের q 31.33 অবস্থানে DCN নামে একটি gene আছে, কর্ণিয়ার সবচেয়ে পুরু Stroma নামক স্তরের কোষ গুলীকে এমন ইঞ্জিনীয়ারিং ও রাসায়নিক পদ্ধতির সম্মেলন ঘটিয়ে সাজিয়ে রেখেছে যাতে কর্ণিয়ার স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

কারো জন্ম কালে এই জ্বীন এর Mutation হয়ে গেলে, সে অসচ্ছ কর্ণিয়া লয়ে জন্মায়। এ পর্যন্ত এরুপ খুব অল্প ক্ষেত্রে ঘটেছে।চিত্র-২ (৬)
৫) কর্ণিয়া-কোষের আর একটি মস্তবড় বৈশিষ্ট বিদ্যমান।

শরীরের অন্যান্য কোষের DNA এর Telomerase এনজাইম দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় কোষের দ্রুত বার্ধক্য আগমন ও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু কর্ণিয়া কোষে যথেষ্ঠ পরিমান Telomerase থাকার কারণে শরীরের অন্যান্য কোষের তুলনায় এর বার্ধক্য ও মৃত্যু বিলম্বিত হয়ে দীর্ঘদিন বেচে থাকার ক্ষমতা রাখে।

Corneal Cell এ যথেষ্ঠ পরিমান Telomerase বিদ্যমান থাকে। এবং প্রয়োজনের সময় এরা কার্যকরি হয়ে উঠে, ৫ম পর্বে Telomerase এর বিস্তারিত দেখুন (৬)।
আবার কর্ণিয়াকে কখনো প্রয়োজনে সরাসরি বহির্বিশ্বের সংস্পর্ষে আসবার যোগ্যতা থাকতে হবে, আবার বিশ্রামের সময় শরীরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।
এজন্য চক্ষুর দুই পাতা উঠা নামা করতে হবে। এজন্য কর্ণিয়াকে জানালার গ্লাস এর ন্যায় শুস্ক অবস্থায় থাকলে চলবেনা। তাহলে চোখের পাতার সংগে অনবরত ঘর্ষনে ঘর্ষনে অল্পদিনেই কর্ণিয়া ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে অকেজো হয়ে পড়বে।

হ্যাঁ, তার জন্য কর্ণিয়াকে অনবরত আর্দ্র বা ও পিচ্ছিল অবস্থায় রাখতে হবে।
এই কাজটি করার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে Tear বা চক্ষু জল (Lacrimal Secretion) এর। Tear অনবরত সরবরাহিত হয়ে কর্ণিয়াকে আর্দ্র ও মসৃন ও পিচ্ছিল রাখিয়া অক্ষয় ও সুস্থ রাখিতেছে। (৫) (Video 1 দেখুন)

Source of figure-

চিত্র-১ চক্ষু গোলক ও কর্ণিয়া।

Source of figure- https://ghr.nlm.nih.gov/gene/DCN#location

চিত্র-২। ১২ নং ক্রোমোজোমে DCN জ্বীন এর অবস্থান।(৬)

DCN জ্বীন ১২ নং ক্রোমোজোমের (q) 21.33 অবস্থানে অবস্থিত.
আরো সঠিক ভাবে , DCN জ্বীন বেজ পেয়ার 91,539,034 হতে 91,576,805 পর্যন্ত ক্রোমোজোমম ১২ নং এ অবস্থিত।
Chromosome কী তা জানতে ৯ম পর্ব পড়ুন।(৭)
কর্ণিয়ার আকার- আকৃতি-

এটা গোলাকৃতির। এর ব্যাস ১১.৫ মিমি, পূরত্ব কেন্দ্রে-০.৫-০.৬ মিমি, পার্শে-০৬-০.৮ মিমি
এতে কতটা কোষের স্তর আছে?

এতে মোট ৬টি কোষের স্তর আছে। নীচে তাদের বর্ননা দেওয়া হল।

(বাহির হতে যথাক্রমে ভিতরে) (৫)

১)Corneal Epithelium-এই লেয়ারকে Lacrimal Secretion বা অশ্রু মসৃন ও আর্দ্র রাখিতেছে। এখানে ৬টি লেয়ারের কোষ রয়েছে। বাহিরের লেয়ার অনবরত ঝরে পড়তেছে, একই সংগে আবার পিছনের Basal Layer এ নূতন কোষ জন্ম নিচ্ছে।
২) Bowman’s Membrane-এটা Collagen Fiber দ্বারা গঠিত একটা ১৪ মাইক্রোমিটার পুরু স্তর

৩) Stroma,এটা কর্ণিয়ার ৯০% পুরুত্ব দখল করেছে।এটা Collagen Fiber দ্বারা অত্যন্ত সুসজ্জিত ভাবে ২০০ স্তরে( যার প্রতি স্তরের পুরুত্ব ১.৫-২.৫ মাইক্রোমিটার পুরু) সজ্জিত।

৪) Dua’s Layer, ১৫ মাইক্রোন পুরু। ২০১৩ সালে আবিস্কৃত
৫)Descemet’s Membrane এটাও Collagen Fiber দ্বারা ৫-২০ মাইক্রোমিটার পুরু একটি স্তর
৬)Corneal Endothelium-এটা ৫ মাইক্রোমিটার পুরু। এই লেয়ার টা Aquous Humor হতে পুষ্টি সংগ্রহ করে কর্নিয়ার সমগ্র লেয়ারকে সরবরাহ করে।
চিত্র-৩ দেখুন।

চিত্র- ৩ কর্ণিয়ার লেয়ার।
Source of figure– http://www.newvisionindia.com/the-cornea/
পূর্বে ৫টি লেয়ার পর্যন্ত জানা গিয়েছিল। জুন ১৪,২০১৩,SCIENTIST.COM এ প্রকাশিত হয়, বিজ্ঞানীরা Stroma ও Descemet’s Membrane এর মধ্য খানে একটি লেয়ার পাওয়া গিয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে DUA’S লেয়ার।(২)
চলবে-

Updated on- 2/20/2017

অন্যান্য পর্ব গুলী এখানে দেখুন- http://www.chkdr02.wordpress.com

Video
1) 12) LACRIMAL SYSTEM-

২৩ তম পর্বের সূত্র সমুহ-
Cornea
1) http://wuphysicians.wustl.edu/dept.aspx?pageID=17&ID=6
New structure in cornea
2) http://www.the-scientist.com/?articles.view/articleNo/36027/title/New-Structure-Found-in-Human-Cornea/

3) protrusion of cytoplasm of anterior layer
http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0014483562800128
4) In detail
http://en.wikipedia.org/wiki/Cornea
5) Relation to gene-
http://ghr.nlm.nih.gov/gene/DCN

6) পঞ্চম পর্ব Telomerase
৫ম পর্ব ডিএনএ কী” – TELOMERE ও TELOMERASE এর উপর নিয়ন্ত্রন আনতে পারলে “দীর্ঘ-যৌবনা জীবন” ও “ক্যানসার নিরাময়” সম্ভব।
7) ৯ম পর্ব CHROMOSOME কী?
ডিএনএ কী?৯ম পর্ব,ক্রোমোজোম,জীবনের ব্লুপ্রিন্ট, যেখানে আমাদের পিতা মাতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

23 + = 24