লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু

এক.
রাত দশটা পনের। রানার মোবাইলে মুরাদের নাম্বার ভেসে উঠল। সাথে সাথে বাজখাই গলায় চিৎকার করে উঠল মোবাইলটা। “পেয়ার কিয়া তো ডারনা ক্যায়া, যাব পেয়ার কিয়া তো ডারনা ক্যায়া” । গানটা রানার খুব পছন্দের। বাট বর্তমানে খুবই বিরক্তিকর লাগছে। কারণ তার বিশাল রানা প্লাজার তিন তলায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলে বলেছে – “সমস্যা নাই, বেশি কিসু হয় নাই। খালি প্লাস্টার খসছে! ” আর রানাও তা খুব বড় গলায় সাংবাদিকদের একই কথা বলেছে। কিন্তু তার কেন জানি খুব ভয় হচ্ছে। কয়েকবার রিং পরার পর রানা কল রিসিভ করল।

–হ্যালো, মুরাদ ভাই। আসসালামু আলাইকুম।
–ওয়ালাইকুম আসসালাম। কাহিনী কি? হ্যা? বিল্ডিং এ নাকি ফাটল ধরসে? সত্য নাকি?
–মনে হয়।
–মনে হয় মানে কি? জান এই বিল্ডিং এ কিসু হইলে তোমার আর আমার ক্যারিয়ার শেষ?
–ভাই সব আন্ডার কন্ট্রোলে আছে। আপনি টেন্সড হইয়েন না। কিসু হইলেও সমস্যা নাই। কয়েক জন মানুষ মরবে। আর কিছু না। ভারতে যাব গা। পরে একটাটা সেটেলমেন্ট করা যাবে। দেখলেন না, কি সুন্দর করে তাজরিনের টা সামাল দিসে লোকে?
–তোমার কাছে এতো সোজা লাগতেসে? শুন দায় দ্বায়ীত্ব কিন্তু আমার না। এইবার কিসু হইলে আমি সামাল দিতে পারব না।

বলেই খট করে কল কেটে দিলেন মুরাদ জং। রানা কিছু বলার সুযোগ পেল না। আসলেই তার এখন চিন্তা হচ্ছে। যদি কিছু হয়? নাহ, এই মাসে কাজ শেষ করেই বন্ধ করে দিতে হবে। আর কোন উপায় নাই। রানা কথা বলল তার ম্যানেজারের সাথে। ম্যানেজার বলল যে সমস্যা নাই। কাল সবাইকে আসতে বলে দিয়েছে গার্মেন্টস এর ম্যানেজাররা আর কিছু হইলে কথা বলা আছে আপনাকে পার করে দিয়ে আসবে। টেন্সন নিয়েন না। রানা আপ্রান চেস্টা করল টেন্সন না করার জন্য। কিন্তু টেন্সন বাড়তেই থাকল।ঘুমাল।

সকালে রানার ঘুম ভাংল বউ এর চিল্লা চিল্লতে। বউ খালি বিলাপ করছে –
“এইডা কি হইল, এইডা কি হইল !!!!!” টিভিতে রানা প্লাজার ভেঙে পড়ার চিত্র।

সাথে সাথে কর্কশকন্ঠে বেজে উঠল মোবাইলটা। মুরাদ জং এর কল। রানা কল কেটে দিল। কারণ তাকে নিজেকেই এখন কেটে পড়তে হবে। মুরাদ যশোরের দিকে রওনা দিল। সাথে একজন গাইড। সাথে মোবাইলটাও বেজেই চলেছে, “পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া, যাব পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া?”

দুই.
ঘন্টা দুই আগে সাইফুল রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় যাবার জন্য রানা প্লাজার ভিতরে ঢুকল। কাল ফাটলের পর আশা করেছিল এখানে আজ কাজ করতে হবে না। পরে বিল্ডিং ঠিক করা হয়ে গেলে তারপর কাজ শুরু করবে। আসলে মনে মনে ঠিক করেছিল এখানে আর কাজ করবে না। কিন্তু ম্যানেজার বলে দিয়েছে যে এই মাসে কাজ শেষ না করলে বেতন মিলবে না। বেতন না পেলে তার একমাত্র ছেলের স্কুলের ফি দেয়া হবে না। গ্রামে বৃদ্ধ মা আছেন। এখানে আবার নিজেদের পেট চালাতে হবে। জীবন অনেক কস্ট। তার স্ত্রী রাহেলাও আরেকটা গার্মেন্টস এ চাকরি করে। দুজনের আয়ে মোটামুটি চলে যায় মাস।

সাইফুল তৃতীয় তলায় তার কাজের স্থানে ঢুক পরপরই চোখে পড়ল বিরাট ফাটলটা। একেবারে লিকলিকে সাপের জিভের মত। এখনি ছোবল মারবে। সে তার কাজে লেগে গেল। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। তারা জেনারেটরের আশায় থাকে সবসময়। কিন্তু এবারের অপেক্ষাটা অনেক দীর্ঘ মনে হতে লাগল তার কাছে। হঠাৎ সম্পুর্ন বিল্ডিং দুলে উঠল। সাইফুলের কাছে মনে হল তার মাথা ঘুরছে। তারপর একটু কোলাহল। তারপর বিরাট এক শব্দ। হঠাৎ সব নিস্তব্ধ। কতক্ষন এভাবে ছিল বলতে পারবে না। হঠাৎ হুশ ফিরল। নড়ার চেস্টা করল। বুঝতে পারল না কি হয়েছে। হঠাৎ করে তার পিঠের ওপর ভারী কিছুর অনুভব পেল। যতক্ষনে বুঝেছে যে কি হয়েছে আর কি হতে চলেছে ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। চোখের নিচ দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে কাদছে না। পরে বুঝতে পারল যে রক্ত। কেন যেন তার একটু হাসি পেল। কিন্তু পরক্ষনেই কান্নায় চোখ ভিজে গেল। মরে যাবে তার কস্টে নয়, তার সুন্দর ছেলেকে আর দেখবে না সে জন্য, তার ভালবাসার মানুষের হাত আর ধরতে পারবে না সেজন্য, গ্রামের বাড়িতে গেলে বৃদ্ধা মায়ের হাসি দেখতে পারবে না সেজন্য।
কি দোষ ছিল তার, যে তাকে এভাবে মরতে হবে?

একটি সুন্দর জীবনের তাগীদে তারা কাজ করে। কাজ করে নিজ সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। আর প্রতিদানে পায় মৃত্যু!!! তাও আবার রানার মত মানুষের কারনে। আসলেই লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তারা লোভ করেছিল তাদের সন্তানের মুখের এক ফোটা হাসির, লোভ করে ছিল তাদের বৃদ্ধা পিতা-মাতার চেহারা দেখার, লোভ করেছিল একটা কস্টহীন জীবনের। আর জীবন সকল কস্ট থেকেই তাদের চিরতরে মুক্তি দিয়ে দিল। সাইফুল আর কিছু চিন্তা করতে পারল না। সব ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।হঠাৎ করে আগরবাতি আর লোবানের গন্ধ পেল। তার পর আর কিছুই মনে নেই তার। চিরতরে এই পৃথিবীরর মায়া ত্যাগ করল সে।
আসলেই লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

সকল এস.এস.সি পরীক্ষার্থী দের জন্য শুভ কামনা রইল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু

  1. গল্পাকারে ভালোই লিখেছেন। তবে
    গল্পাকারে ভালোই লিখেছেন। তবে কুলাঙ্গার রানা সেদিন রানা প্লাজাতেই ছিল ঘটনার সময়। মুরাদ জং এসেই তাকে উদ্ধার করে বের করে নিয়ে এসে পগার পার করিয়ে দিয়েছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7