মুরতাদ ড. আহমেদ শরীফ

বাংলাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে আহমদ শরীফ এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি সবার কাছে প্রিয় হওয়ার দুর্বলতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন। আহমদ শরীফ চট্টগ্রামের পটিয়ার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৯২১ সালে জন্মেছিলেন এবং ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ সালে ঢাকায় মারা যান। কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে পেশাগত জীবন শুরু। এরপরে এক বছরের কিছু বেশি সময় রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠান সহকারী হিসেবে থাকার পর ১৯৫০-এর শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দিয়ে একটানা ৩৪ বছর অধ্যাপনা করে ১৯৮৩ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবনে তিনি বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সিন্ডিকেট সদস্য, সেনেট সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি, শিক্ষকদের ক্লাবের সভাপতি ও কলা অনুষদের চারবার নির্বাচিত ডিন ছিলেন।

আহমদ শরীফ কে উপেক্ষা করা যায় তবে কোন অবস্থাতেই তার বিশাল কীর্তি অস্বীকার করা যায় না। নিজস্ব দর্শন, চিন্তা ও বিশেষত্বের কারণে তিনি বোদ্ধাসমাজের কাছে ছিলেন বহুল আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত ! তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে এখানে লেখাপড়া জানা মানুষের মাঝে না পড়া এবং না জানার প্রবণতা গড়ে উঠেছে, তাই কেউ নিজে থেকে কোন বইয়ের বা পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে দেখার গরজ কতটা অনুভব করে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়!

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে বা বিভিন্ন জাতীয় পর্ষদগুলোতে কিংবা জাতীয় প্রচার মাধ্যমে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে ঘুরে-ফিরে যারা সব সময় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়ে থাকে তারাই কেবল দেশে শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পায় | সরকারি বা রাজনৈতিক চামচা ব্যক্তিদের রচনাশৈলী যা-ই হোক না কেন, তার গুণগত মান সম্পর্কে যত কম বলা যায় ততই ভালো!

বাংলাদেশে ড. আহমদ শরীফের মতো হাতেগোনা চার থেকে পাঁচজন লিখিয়ে পাওয়া যাবে যারা কোন সময়ই সরকারি বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বেড়াজালে নিজেদের জড়ায়নি!! আর তাই তাদের চিন্তাসমৃদ্ধ গ্রন্থগুলো লেখাপড়া জানা মানুষের কাছে অদ্যাবধি অজ্ঞাত ও অপঠিত থেকে যাচ্ছে! দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে মৃত্যুর পরের বছর পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দুটো করে ড. আহমদ শরীফের মৌলিক রচনা সংবলিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অথচ তার বহু লেখাই শুধু অপঠিতই নয়, অগোচরেও থেকে গেছে !!

রাষ্ট্র ও সমাজের প্রথাগত সংস্কার পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সমাজতন্ত্রের প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আগ্রহ এবং তা প্রতিফলিত হয়েছিল তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণে, বক্তব্যে ও লেখনীতে। তিনি অত্যন্ত জোড়াল যুক্তি দিয়ে পরিত্যাগ করেছিলেন প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, বিশ্বাস ও সংস্কার এবং আন্তরিকভাবে আশা পোষণ করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য। প্রতিবাদী সমাজ পরিবর্তনকর্মীদের কাছে তার লেখা অসম্ভব জনপ্রিয়! তিনি মধ্যযুগের সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বলে গেছেন যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক সকল সময় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

দুই বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য জ্ঞানী, বিদ্রোহী, অসাম্প্রদায়িক, যুক্তিবাদী ও দার্শনিক, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, আহমদ শরীফকে ধর্মান্ধরা শাস্ত্র ও প্রথা বিরোধিতার কারণে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়েছিল। কথা ও কর্মে অবিচল, অটল ও দৃঢ় মনোভাবের এই নাস্তিক মানুষটি সব রকমের প্রথাসংস্কার শৃঙ্খল ছিন্ন করে ১৯৯৫ সালে মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করার উইল করে যান। উইলে বলা ছিল ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক। কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কিটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাই তো বাঞ্ছনীয়’।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 25 = 32