চিতোর (ধারাবাহিক উপন্যাস) চতুর্থ পর্ব

আট

খাড়া টিলাটার উপর থেকে এক দৃষ্টিতে দূর্গটার দিকে তাকিয়ে আছেন সুলতান।মুখের তাঁর চিন্তার বলিরেখা। কপালে বিন্দু বিন্দু স্বেতবিন্দু। যতোই রিপু তাড়নায় তাড়িত হউন না কেন, লড়াই এর ব্যাপারে সবসময়ই চরম সাবধানী এই অভিজ্ঞ যোদ্ধা।তাঁর মতোই রণকৌশলে শাণিত জ্ঞানের অধিকারী তাঁর সাথে আসা ফৌজদার আর রিসালদাররাও।তারাই এর যুদ্ধে পৃত্থিরাজকে নাস্তানাবুদ করে দিল্লীর মসনদে হুকুমতের ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেয়ার লড়াইয়ে এরা সবাই ছিলেন অগ্রপথিক। কিন্তু আজ সবার মুখেই দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।

উতলা সম্রাট, জাফর বেগের কুমণত্রণা

সাত।

বেশ ঠান্ডাই পড়েছে আজ।পৌষের আগমনী বার্তা হিমেল আবেশ ছড়িয়েছে প্রকৃতিতে।শিবিরের প্রহরীরা চাদর জড়িয়ে করে যাচ্ছে দায়িত্ব পালন। শিবিরের মাঝখানে গোলাকার করে জ্বালানো হয়েছে অগ্নিকুণ্ড। তার চারপাশে বসে হাল্কা উত্তাপ আস্বাদনের প্রচেস্টা চালাচ্ছে কেউ কেউ।প্রকৃতি আজ রক্ত শীতল করে দিয়েছে সবার রক্ত।একটু ভুল হলো। সবার নয়, প্রকৃতির শীতলতা পারেনি একজনকে স্বস্তি এনে দিতে।তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি।গতকাল রাঘবের বাঁশী যে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিলো তাঁর রক্তকোষে তা এখনো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাঁকে। অস্থিরভাবে তাঁবুর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পায়চারী করছেন তিনি।এই শীতের মাঝেও রীতিমতো ঘেমে উঠেছেন ; সেই সাথে কপালে দেখা দিয়েছে বলিরেখা। আকন্ঠ মদ্যপানও আজ শান্ত করতে পারছেনা তাঁর উতলা চিত্তকে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভুগছেন তিনি। বুঝে উঠতে পারছেন না কি হবে তাঁর কর্তব্য। ভয়াবহ উথাল পাতাল চলছে ভেতরে। অবশেষে চরম সিদ্ধান্তটাই নিয়েই ফেললেন।পদ্মিনীর রূপের বিবরণ তাঁকে পাগল করে তুলেছে।এমন খুবসুরত জেনানা কেবলমাত্র সুলতানের হেরেমেই শোভা পায়। কোন মামুলি কাফের রাজার প্রাসাদে নয়।কালই ফজরের নামাজের পরপরই সুলতানী ফৌজ যাত্রা করবে মেবারের উদ্দেশ্যে। যে করেই হউক পদ্মিণীকে অধিকার তাঁর করতেই হবে। নইলে মিটবেনা তাঁর অন্তরজ্বালা। সিপাহশালার কুদরত খাঁকে ফরমান পাঠালেন তিনি।

আট

খাড়া টিলাটার উপর থেকে এক দৃষ্টিতে দূর্গটার দিকে তাকিয়ে আছেন সুলতান।মুখের তাঁর চিন্তার বলিরেখা। কপালে বিন্দু বিন্দু স্বেতবিন্দু। যতোই রিপু তাড়নায় তাড়িত হউন না কেন, লড়াই এর ব্যাপারে সবসময়ই চরম সাবধানী এই অভিজ্ঞ যোদ্ধা।তাঁর মতোই রণকৌশলে শাণিত জ্ঞানের অধিকারী তাঁর সাথে আসা ফৌজদার আর রিসালদাররাও।তারাই এর যুদ্ধে পৃত্থিরাজকে নাস্তানাবুদ করে দিল্লীর মসনদে হুকুমতের ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেয়ার লড়াইয়ে এরা সবাই ছিলেন অগ্রপথিক। কিন্তু আজ সবার মুখেই দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।

সুলতানের ইচ্ছে পূরণের নিমিত্তে সসৈন্যে চিতোর দখলের জন্যই ছুটে এসেছিলেন তারা। কিন্তু চিতোরের কাছে এসে সুলতান বুঝতে পারলেন কাজটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলেন আদতে ততটা সহজ নয়। ছোটখাট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ৭ম শতকে নি চিতোরগড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ, সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা সোজা কথা নয়। বিস্তৃত চিতোর দূর্গ। চারদিকে খনন করা আছে বিশাল পরিখা। রয়েছে মজবুত খাড়া দেয়ালের টেকসই আড়াল। এতোই কঠিন আর দূর্ভেদ্য সে দেয়াল, সরাসরি আক্রমণে তা উপেক্ষা করা অসম্ভব সুলতানের অজেয় বাহিনীর পক্ষেও। তীরন্দাজীতে সারা হিন্দুস্থানে রয়েছে রয়েছে এদের সুখ্যাতি। দূর্গ প্রাচীরে রয়েছে তাদের সদা সতর্ক পাহারা।এই শ্যান দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়া স্রেফ আকাশ কুসুম কল্পনা। বিশাল বাহিনী সঙ্গে এনেছেন বটে, কিন্ত ভরসা পাচ্ছেন না মোটেই সুলতান। কুশলী যোদ্ধা তিনি, যুদ্ধই তাঁর ধ্যান জ্ঞান। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যবল আর হাতিয়ার খুব সহায়ক হয় বটে, কিন্তু সত্যিকারের লড়াইয়ে যে হিম্মতের কোন বিকল্প নেই, এই সত্যটি খুব ভালোমতোই জানা আছে তাঁর। আর সেই হিম্মতের যে কমতি নেই এই কাফেরগুলোর সেই সত্যটিও ভালোই জানেন তিনি। আর নিজেদের জমিনের মর্যাদা রাখতে এরা যে জান কোরবান করতেও পেছপা হবেনা তাও ভালোমতোই জানেন তিনি।

তাঁবুতে ফিরে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে লাগলেন সুলতান। কিছুতেই শান্ত করতে পারছেননা নিজেকে। তবে কি তিনি ব্যর্থ হতে চলেছেন? তিনি কি পারবেননা পদ্মিণীকে তাঁর হেরেমের রাণী বানাতে? পারবেন না এই কাফের জমিনে হুকুমতের ঝাণ্ডা ওড়াতে? সকল আশা ভরসা কি এভাবেই দরিয়ায় ভেসে যাবে? এখান থেকেই ফিরে যেতে হবে তাঁকে দিল্লীতে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে?

………… আলামপনা।

কন্ঠস্বরে চমকে উঠলেন সুলতান। চিন্তার জিগতে ছেদ পড়লো তাঁর।। মাথা ঘুরাতেই দেখতে পেলেন জাফর বেগকে। কখন যে প্রবেশ করেছেন তাঁবুতে টেরই পাননি সুলতান।

……… ও উজিরে আজম!

……………একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি জাঁহাপনা?

……… নিঃসংকোচে

………… আলামপনাকে আজ এতো পেরেশান লাগছে কেন জানতে পারি?

অন্য কেউ হলে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়োজনই বোধ করতেননা সুলতান। কিন্তু জাফর বেগের ব্যাপার ভিন্ন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এই জাফর বেগ। বয়োবৃদ্ধ হলেও তাঁর বুদ্ধির ধারের কাছে হার মানতে বাধ্য যেকোন নওজওয়ানের তলোয়ার। আর বুদ্ধির ধারই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এতোদূর। হতে পেরেছেন শাহী দরবারের উজিরে আজম। তাঁর বুদ্ধিমত্তার উপরে অগাধ বিশ্বাস রাখেন সুলতান। অসংখ্যবার জাফর বেগের বুদ্ধির জোড়েই অনেক বড় মুশকিল আহসান হয়েছে তাঁর। আর তাই কোনরকম রাখঢাক ছাড়াই অকপটে সব সমস্যা উজাড় করে দিলেন সুলতান।

শুনে কিছুক্ষণ থুতনিতে ভর দিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইলেন জাফর বেগ। এরকমই কিছু একটা আশা করেছিলেন তিনি। আর তাই আগেভাগেই সমাধানের উপায়টাও ভেবে রেখেছিলেন নিজ উদ্যোগেই।মুখ তুলে সুলতানের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকালেন জাফর বেগ। শ্বেত শ্বশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলে অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি খেলে গেলো যেন। বলা শুরু করলেন তাঁর পরিকল্পনা। চুপচাপ শুনে যেতে থাকলেন সুলতান। ক্রমশঃই উদ্বেগ কেটে যেতে লাগলো তাঁর। আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে থাকলেন দ্রুতই। এই পদ্ধতিতেই চিরকালের জন্য কুপোকাত করে ফেলা যাবে এই রাজপুত কাফেরগুলোকে। সাপ ও মরবে, ভাঙবেনা লাঠিও। ক্রুর হাসি হেসে গেলো তাঁর মুখে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 59