অভিজিৎ রায়ের জন্ম হয়েছিলো মৃত্যুর জন্য

?oh=5e4be557a0d83f3141ace43b548dbd3f&oe=592B309D” width=”500″ />।

অভিজিৎ রায়ের জীবনপঞ্জিকা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার জ্ঞানের বিশালতা সুদূরপ্রসারী। তিনি বেঁচেছিলেন বিস্তৃত সীমাহীন আকাশে, তার জ্ঞানের পরিধি ছুটে চলছিল এক মহাদেশ থেকে অন্যমহাদেশে। পৃথিবীতে অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে সীমাহীন জ্ঞানের কাছে মাথা ঝুঁকিয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশ এবং গ্রহণ করেছে অগণিত জ্ঞানীর সৃষ্টিশীলতা। ঠিক তেমনই, পৃথিবীতে অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে সীমাহীন জ্ঞানের অধিকারী মনীষীকে সহ্য করতে হয়েছিলো অসহ্য যন্ত্রণা। কখনো সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ সঙ্গমে মনিষীকে আগুনে পুড়িয়ে, কখনো বা শরীর থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে নিঃশেষ করেছিলো সৃষ্টিশীল মানুষকে। এমন মনীষীদের জন্ম হয়েই থাকে নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য; সেক্ষেত্রে অভিজিৎ রায় ব্যতিক্রম নন।

জীবিত অভিজিৎ রায়’কে স্পর্শ করি নি। কিন্তু মৃত্যু অভিজিৎ রায়’কে স্পর্শ করেছিলাম। তার মৃত দেহটি ঢাকা মেডিকেলে নিষ্পাপ শিশুর মতোই ঘুমিয়ে ছিল। চারিদিকে কোলাহল, মানুষের উচ্চবাচ্য অথচ অভিজিৎ রায়ের কোন সাড়াশব্দ ছিল না। যে মগজের কারণে তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ; সেই মগজ মাথা থেকে উপচে পড়েছে কখনো টিএসসি’র ফুটপাতে, কখনো সিএনজি’তে, কখনো বা ঢাকা মেডিকেলের স্টেচারে। অভিজিতের মাথা, ঘাড়, পিঠ ও বুকে লেগে ছিল ফুটন্ত রক্তের ছাপ। তার মুখমণ্ডলটি বীভৎস হ্য় নি; যেমনটা পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্লগারের মৃত্যুতে দেখা গিয়েছিল!স্বভাবে শান্ত অভিজিৎ রায় শান্তির ইসলামী চাপাতি’তে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যার লেখনী নিয়ে আলোচনা হয়, যার নামে রাস্তার নামকরণ হয়- সেই মানুষটি নিজ দেশেই আক্রান্ত, নিহত। মৃত্যুর পরও সে নির্বাসিত! তার লেখনী, তার সৃষ্টিশীলতা নির্বাসনে পাঠিয়েছে রাষ্ট্র। অভিজিৎ রায় ভুল সময়ে জন্মায় নি, ভুল সমাজের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিহত, সৃষ্টিশীলতা নির্বাসিত।

উল্লেখ্য,
অভিজিৎ রায় ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ – ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী-মার্কিন প্রকৌশলী, লেখক ও ব্লগার। বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে সরকারের সেন্সরশিপ এবং ব্লগারদের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের সমন্বয়কারক ছিলেন। তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও তার স্ব-প্রতিষ্ঠিত সাইট মুক্তমনায় লেখালেখির জন্য অধিক পরিচিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় মুসলমান জঙ্গিদের দ্বারা নিহত হন ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা আহত হন। — (উইকিপিডিয়া)

লেখক অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা’গ্রন্থের অংশবিশেষ তুলে ধরা হল। যেহেতু সংগ্রহীত, সুতরাং প্যারা এদিকওদিক হতে পারে। ক্ষমাপ্রার্থী।


সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“সমাজের বিবর্তনের এক বিশেষ পর্যায়ে এলো রাষ্ট্র। ধর্মও ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিল। যে অন্যায় ও অবিচার শোষিত মানুষ অসহায়ভাবে ভোগ করে, তার পরিপূরক হিসেবে স্বর্গ, নরক, পারলৌকিক বিচার প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষের আশা এবং আকাঙ্ক্ষাকে শাসক শ্রেণি কাজে লাগাল স্বীয় স্বার্থে। সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিকতা এবং কল্পনাকে রাষ্ট্রযন্ত্র বিভিন্নভাবে বিশ্বাসযোগ্য এবং স্থায়ী করে রাখার প্রয়াস পায়। এক সময় মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা এবং অজানাকে ব্যাখ্যা করার যে উদগ্র আগ্রহ থেকে যে ধর্মের জন্ম হয়েছিল, সেই ধর্মই ধীরে ধীরে প্রচলিত সামাজিক অনুশাসন ও পশ্চাৎপদ রীতিনীতিকে নীতি নৈতিকতার মোড়কে পুরে পরিবেশন শুরু করে। ধর্ম পরিণত হয় পুরুষতন্ত্র এবং শোষক শ্রেণির এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল হাতিয়ারে। রক্ষণশীল মানুষ ধর্ম রক্ষার নামে তৈরি করে নানা রকমের ট্যাবু। নারী অধিকার অবদমন, সমকামীদের প্রতি বিদ্বেষ, জাতিভেদ, বর্ণবাদ, সতীদাহ, জিহাদ ইত্যাদি নানা ধরনের ধর্মীয় সংস্কার এসে প্রগতিশীলতার চাকাকে পেছনের দিকে পরিচালিত করে”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“যৌনতার শারীরবৃত্তীয় বিভাজন মেনে নিয়েও বলা যায়, সামাজিক অবস্থার (চাপের) মধ্য দিয়েই আসলে এখানে একজন নারী “নারী” হয়ে ওঠে, আর পুরুষ হয়ে ওঠে “পুরুষ”। আমাদের রক্ষণশীল সমাজ নারী আর পুরুষের জন্য জন্মের পর থেকেই দুই ধরনের দাওয়াই বাৎলে দেয়। নানা রকম বিধি-নিষেধ ও অনুশাসন আরোপ করে। পোশাক থেকে শুরু করে কথা বলার ভঙ্গি পর্যন্ত সবকিছুই এখানে জেন্ডারগত বৈষম্যে নির্ধারিত হয়। এর বাইরে পা ফেলা মানেই যেন নিজ লিঙ্গের অমর্যাদা। কোনো ছেলে একটু নরমভাবে কথা বললেই তাকে খোঁটা দেয়া হয় “মেয়েলি” বলে, আর নারীর উপর হাজারো রকমের বিধি-নিষেধ আর নিয়মের পাহাড় তো আছেই। ফলে দুই লিঙ্গকে আশ্রয় করে তৈরি হয় দুটি ভিন্ন বলয়”।


সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“উভকামীরা অনেক সময়ই শুধু প্রথাগত সমাজ নয়, সমকামী এবং বিষমকামী- দু’দল থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়। বিষমকামী তো বটেই এমনকি সমকামী মানুষদেরও এমন ধারণাই বদ্ধমূল যে, বিষমকামিতার বাইরে ‘সমান্তরাল যৌন-প্রবৃত্তি’ বলতে কেবল সমকামিতাকেই বোঝায়। তাদের অনেকের কথা হলো- উভকামী বলে কিছু নেই; আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের বিখ্যাত উক্তির মতো উক্তি উভকামীদের প্রতিনিয়ত হজম করতে হয়, “স্টে আইদার উইথ আস অর উইথ দেম”। আর কোনো তৃতীয় সত্তাকে কোনো দলই গ্রহণ করতে চায় না। ব্যাঙ্গালোরের ‘পিপলস ইউনিয়ন অব সিভিল লিবার্টি’র ক্ষেত্র-সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে সমকামীরা উভকামীদের শুধু প্রত্যাখ্যানই করে না, ঘৃণাও করে। ফলে প্রান্তিকায়িত যৌন-প্রবৃত্তির সদস্যদের মধ্যেও উভকামীরা দ্বিতীয়বার প্রান্তিক হিসেবে চিহ্নিত হয়। তারা হয়ে ওঠে সত্যিকার সংখ্যালঘু। এদের জীবন-যন্ত্রণা হয় আরো মর্মান্তিক, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“কোনো ব্যক্তি যখন একই সাথে সমলিঙ্গ ও বিষমলিঙ্গের প্রতি যুগপৎ যৌনাকর্ষণ অনুভব করেন, তখন তাঁকে উভকামী (Bisexual) বলা হয়। উভকামী ব্যক্তির যৌনজীবন খণ্ডিতভাবে দেখা হলে কখনো তাঁকে বিষমকামী কখনো বা সমকামী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আধুনিক গবেষকেরা উভকামিতাকে আলাদা একটি যৌন-প্রবৃত্তি হিসেবে গণ্য করারই পক্ষপাতী। এটা নিশ্চিত যে, ব্যক্তির যৌনজীবনের সামগ্রিকরূপটি যদি উন্মোচিত হয়, তবে তাকে উভকামিতার পর্যায়ে ফেলাই হবে সঙ্গত। কিন্তু মুশকিল হলো, উভকামিতাকে স্বীকৃতি দিতে গেলে নারী-পুরুষের ‘স্বাভাবিক’ প্রথাসিদ্ধ জীবন অনেক সময়ই ভেঙে পড়ে। কারণ উভকামিতা নামক প্রবৃত্তিটি বিষমকামী সম্পর্কের সনাতন ‘মনোগামিতার মিথ’টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“আজকের দিনের মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যৌন-প্রবৃত্তির ক্যানভাস আসলে সুবিশাল। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ (বিষমকামিতা) যেমন দৃষ্ট হয়, তেমনিভাবেই দেখা যায় সমলিঙ্গের মানুষের মধ্যে প্রেম এবং যৌনাকর্ষণ। এই দ্বিতীয় ধারার মানুষেরা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি কোনো যৌন-আকর্ষণ বোধ করে না, বরং নিজ লিঙ্গের মানুষের প্রতি এরা আকর্ষণ বোধ করে। এদের যৌনরুচি এবং যৌন আচরণ এগুতে থাকে ভিন্ন ধারায়। ব্যাপারটি অস্বাভাবিক নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরে অথচ স্বাভাবিক এবং সমান্তরাল ধারায় অবস্থানের কারণে এ ধরনের যৌনতাকে অনেক সময় সমান্তরাল যৌনতা (parallel sex) নামেও অভিহিত করা হয়। সমান্তরাল যৌনতার ক্ষেত্র কিন্তু খুবই বিস্তৃত। এতে সমকামিতা যেমন আছে তেমনি আছে উভকামিতা, কিংবা দুটোই, এমনকি কখনো রূপান্তরকামিতাও”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“গবেষণায় উঠে এসেছে দুই ধরনের রূপান্তরকামিতার কথা। শৈশবের প্রথমাবস্থা থেকে যাদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হবার সুতীব্র বাসনা থাকে তাদের মুখ্য রূপান্তরকামী বলা হয়। অন্যদিকে যারা দীর্ঘদিন সমকামিতায় অভ্যস্ত হয়েও নানারকম সমস্যায় পড়ে মাঝে মধ্যে নারীসুলভ ভাব অনুকরণ করার চেষ্টা করে তাদের বলে গৌণ রূপান্তরকামী।
রূপান্তরকামিতার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ট্রান্সেক্সুয়ালিটি (Transexuality)। ট্রান্সেক্সুয়াল মানুষেরা ছেলে হয়ে (বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে) জন্মানো সত্ত্বেও মনমানসিকতায় নিজেকে নারী ভাবেন (কিংবা কখনো আবার উল্টোটি- নারী হিসেবে জন্মানোর পরও মানসিক জগতে থাকেন পুরুষসুলভ)। এদের কেউ কেউ বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করেন, এই ব্যাপারটিকে বলা হয় ট্রান্সভেস্টিজম / ক্রসড্রেস, আবার কেউ সেক্স রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির মাধ্যমে রূপান্তরিত মানবে (Transexual) পরিণত হন। এরা সকলেই বৃহৎ রূপান্তরপ্রবণ্টন সম্প্রদায়ের (Transgender) অংশ হিসেবে বিবেচিত”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“দুনিয়া জুড়ে সমকামী মানবাধিকারকর্মীরা ডাক্তার এবং মনোবিজ্ঞানীদের মনে গেঁথে যাওয়া ‘বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার’ ভেঙেছেন, তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সমকামী হয়েও স্বাস্থ্যকর এবং সুখী জীবন যাপন করা যায়। তারপরেও সমকামিতাকে এখনো অনেকেই ভুলভাবে এক ধরনের ‘রোগ’ বলে মনে করে থাকেন। তারা ভাবেন চিকিৎসার মাধ্যমে এই ধরনের রোগ আসলেই ভালো করে ফেলা সম্ভব। সত্যই কি তাই? ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদের ‘রোগ’ বা ‘ডিজিস’ জিনিসটা কী সেটা ভালো করে বুঝতে হবে।

মেডিকেলের অভিধানে রোগের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে তা হচ্ছে –
Disease is an impairment of the normal state of the body that interrupts function, causes pain, and has identifiable characteristics.
এই সংজ্ঞানুযায়ী সমকামিতা কোনোভাবেই রোগ নয়, কারণ এটি শরীরে কোনো ব্যথা বেদনা ঘটাচ্ছে না, কিংবা শরীরের কোনো ‘ফাংশন’ বিনষ্ট করছে না। একটি ব্যাপার এক্ষেত্রে পরিষ্কার করে বলা দরকার যে, সমকামিতা আসলে একটি যৌন-প্রবৃত্তি। আর যৌন-প্রবৃত্তি জিনিসটা কোনো রোগ নয়, যেটা ‘চিকিৎসা’ করে নিরাময় করা যেতে পারে”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়


“ধর্মের উৎপত্তির একটা ইতিহাস আছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে আদিম মানুষ ছিলো অসহায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হিংস্র পশুর দাপাদাপি সব কিছু মিলিয়ে সে ছিল সত্যিকার অর্থেই নিরাশ্রয়। সেই সাথে খাদ্যের অপর্যাপ্ততা, রোগ ব্যাধি ও মহামারী ছিল নিত্যসঙ্গী। জীবন রক্ষার প্রয়োজনেই একটা সময় সূর্য, ঝড়, ঝঞ্ঝা, আগুন, বিদ্যুৎ, পর্বত, পশু ইত্যাদিকে বশ করার উপায়ের কথা মানুষ চিন্তা করে। হয়তো কখনো দাবানলে জঙ্গলে গাছের পর গাছ ধ্বংস হতে থাকল, আগুনের এই শক্তি দেখে হতবিহ্বল হয়ে মানুষ আগুনের উপাসনা শুরু করল, যাতে অগ্নিদেব সন্তুষ্ট থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় এড়ানো যায়। এভাবেই মানুষের অসহায়ত্ব এবং প্রয়োজনের তাগিদে ধর্মের প্রাথমিক রূপ হিসেবে প্রকৃতি এবং প্রতীকের ওপর অলৌকিক শক্তি আরোপ করে তাদের পূজা অর্চনা শুরু হয়। মায়াবী কৌশল বা ইন্দ্রজালের মাধ্যমে অশরীরী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ বা বশ করার চেষ্টা চলে। ক্রমশ আসে স্তব, স্তুতি, পূজা ও প্রার্থনা। এইভাবেই ঐন্দ্রজালিক কাজকর্মকে আশ্রয় করে গড়ে উঠতে থাকে মানুষের ধর্মবিশ্বাস। নিশ্চিন্ত ও নিরুপদ্রব জীবনের আকুতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতে থাকে নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। এইসব অনুষ্ঠান ও পূজা-পার্বণকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য আবার গড়ে উঠল পুরোহিত শ্রেণি। পুরোহিত শ্রেণি আবার নিজেদের কায়েমী স্বার্থ সুকৌশলে রক্ষা করতে আশ্রয় নিল ধর্মের”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“বিজ্ঞানীরা আজ মেনে নিয়েছেন যে, শুধু মানুষের মধ্যে নয় সব প্রাণীর মধ্যেই সমকামিতার অস্তিত্ব আছে। কাজেই সমকামিতা প্রকৃতিজগতের একটি বাস্তবতা। আরো জানা গিয়েছে যে, সমকামিতার ব্যাপারটা কোনো জেনেটিক ডিফেক্ট নয়। একটা সময় সমকামিতাকে কেবল মনোরোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হত। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন থেরাপি দিয়ে তাদের চিকিৎসা করতেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, শক থেরাপি, বমি থেরাপি সব কিছুই ছিল, কিছু ক্ষেত্রে জোর করে এদের আচরণ পরিবর্তন করলেও দেখা গেছে অধিকাংশই আবার সমকামিতায় ফিরে যায়। এ ধরনের অসংখ্য প্রমাণ আছে। আসলে বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাবার পর ডাক্তাররা এবং অন্যান্য অনেকেই আজ মেনে নিয়েছেন, সমকামিতা যৌনতার একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সেজন্যই কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে একমত হন যে সমকামিতা কোনো নোংরা ব্যাপার নয়, নয় কোনো মানসিক ব্যাধি। এ হলো যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

” মানব সভ্যতাকে অনেকে শিশুদের মানসজগতের সাথে তুলনা করেন। শিশুদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই একটা সময় পর্যন্ত অভিভাবকদের সমস্ত কথা নির্দ্বিধায় মেনে চলতে হয়- এ আমরা জানি। ধরা যাক একটা শিশু চুলায় হাত দিতে গেল, ওমনি তার মা বলে উঠল- চুলায় হাত দেয় না- ওটা গরম! শিশুটা সেটা শুনে আর হাত দিল না, বরং সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিল। মার কথা শুনতে হবে- এই বিশ্বাস পরম্পরায় আমরা বহন করি- নইলে যে আমরা টিকে থাকতে পারব না, পারতাম না। এখন কথা হচ্ছে- সেই ভালো মা-ই যখন অসংখ্য ভালো উপদেশের পাশাপাশি আবার কিছু মন্দ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন উপদেশও দেয়- “শনিবার ছাগল বলি না দিলে অমঙ্গল হবে”, কিংবা “রসগোল্লা খেয়ে অঙ্ক পরীক্ষা দিতে যেও না- গেলে গোল্লা পাবে” জাতীয়- তখন শিশুর পক্ষে সম্ভব হয় না সেই মন্দ বিশ্বাসকে অন্য দশটা বিশ্বাস কিংবা ভালো উপদেশ থেকে আলাদা করার। সেই মন্দ বিশ্বাসও বংশপরম্পরায় সে বহন করতে থাকে অবলীলায়। সব বিশ্বাস খারাপ নয়, তবে অসংখ্য মন্দ বিশ্বাস হয়তো অনেক সময় জন্ম দেয় “বিশ্বাসের ভাইরাস”এর। এগুলো একটা সময় প্রগতিকে থামাতে চায়, সভ্যতাকে ধ্বংস করে। যেমন, ডাইনি পোড়ানো, সতীদাহ, বিধর্মী এবং কাফেরদের প্রতি ঘৃণা, মুরতাদদের হত্যা এগুলোর কথা বলা যায়”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা আর কলমজীবী বুদ্ধিজীবীরা যেমন যৌন-প্রবৃত্তি হিসেবে সমকামিতার স্বীকৃতি নিয়ে ভাবিত নয়, তেমনি ভাবিত নয় “হিজড়া” নামে কথিত বাংলাদেশের উভলিঙ্গ মানবদের সমস্যা কিংবা তাদের অধিকার নিয়ে। উভলিঙ্গ মানবরা সমাজে অপাংক্তেয়, পরিত্যক্ত। বাংলাদেশে উভলিঙ্গ মানবদের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ বলে অনুমিত হয়। তবে এই সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ অপ্রকাশিত উভলিঙ্গ মানবদের সংখ্যা বের করা কঠিন। আর্থিক সঙ্গতি যে সমস্ত পরিবারে আছে তাদের অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে এই পরিচিতি সযত্নে ঢেকে রাখতে পারেন বলে বাইরের মানুষ তা অনেক সময়ই জানতে পারে না। যে সমস্ত জায়গায় লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে পরিচিতি আর ঢেকে রাখা যায় না কিংবা বাইরে থেকে প্রকাশিত হয়ে পড়ে, তখন তাদের সামনে আর কোনো উপায় খোলা থাকে না। কেবল তখনই তারা “হিজড়া” হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হয় এবং পরিবার থেকে বের হয়ে যেতে হয়। রাজধানী ঢাকাতে উভলিঙ্গ মানবের সংখ্যা প্রায় পনের হাজার বলে মনে করা হয়।
* “হিজড়া” শব্দটি আমাদের দেশে খুব তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয় বলে আমি তাদের বোঝাতে এই.বইয়ে “উভলিঙ্গ মানব” শব্দটি চয়ন করেছি। তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূল শব্দটিই বহাল রেখেছি বাস্তবতা বিবেচনায়। যেমন হিজড়া-পল্লী, হিজড়া সমাজ ইত্যাদি। তবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, হিজড়াদের সবাই বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে “উভলিঙ্গ” নাও হতে পারে, অনেকেই হয়তো কেবল মানসিকভাবে রূপান্তরকামী”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“সমকামিতা বিষয়টি কারো পছন্দ বা চয়েসের ব্যাপার নয়। গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামী প্রবৃত্তিটি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই তৈরি হয়ে যায়, এবং সম্ভবত তৈরি হয় জন্মেরও আগে। জনসংখ্যার প্রায় দশভাগ অংশ সমকামী, এবং এটি সংস্কৃতি নির্বিশেষে একই রকম থাকে, এমনকি নৈতিকতার ভিন্নতা এবং মাপকাঠিতে বিস্তর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। কেউ কেউ অন্যথা ভাবলেও, নতুন নৈতিকতা আরোপ করে জনসমষ্টির সমকামী প্রবৃত্তি পরিবর্তন করা যায় না। গবেষণা থেকে আরো বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামিতাকে “সংশোধন” এর চেষ্টা আসলে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কুসংস্কার ভিন্ন আর কিছু নয়”।

সমকামিতা- অভিজিৎ রায়

“সামাজিক নির্যাতন এবং নিপীড়নের পাশাপাশি যে কয়েকটি বিষয় সমকামীদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তা হলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্ণতা এবং আত্মহনন। ব্যাপারটি সব দেশের জন্যই কমবেশি প্রযোজ্য। আমাদের মতো দেশগুলোতে এটি আরো বেশি। সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা এবং সর্বোপরি জেন্ডার ইস্যু নিয়ে আমাদের সমাজে কোনো স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় সমকামীদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। কৈশোরের গোড়া থেকেই সমস্যা শুরু হয়। এ সময় সে লক্ষ্য করে যে, সমবয়সী অন্য বন্ধুদের মতো সে নারীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না, করে ছেলেদের প্রতি। অপরদিকে একজন রূপান্তরকামী ছেলের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের আচরণ অনুকরণ করার তীব্র স্পৃহা জাগে। ছেলের আচরণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের ভাব ফুটে ওঠায় মা-বাবা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েন, নানাভাবে তাকে বিরত রাখতে চান। সমগ্র আচরণের মধ্যে মেয়েলি ভাব প্রকট হয়ে ওঠায় সহপাঠী এবং সহযোগীদের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে আসতে থাকে নানারকমের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং লাঞ্ছনা। পরবর্তীকালে এর থেকে তৈরি হয় নানা ধরনের ট্রমা। এই ট্রমাই তৈরি করে নানা ধরনের মানসিক সংকটের বীজ। ধীরে ধীরে তারা অন্তর্মুখী হতে থাকে। তারপর একটা সময় যখন শরীরে এবং মনে যৌনতার উন্মেষ ঘটতে থাকে তখন মানসিক পরিস্থিতি হয় আরো ভয়াবহ। এই সময় তার সমলিঙ্গের মানুষের সাথে মিলিত হবার বাসনা জাগে। সংখ্যাগরিষ্ঠরা যেখানে বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের প্রতি আসক্ত এবং আকর্ষিত হয়ে চলেছে, সেখানে নিজেকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখে মুষড়ে পড়ে। ভাবে, তার নিশ্চয়ই শরীরে বড় কোনো অসুখ আছে, যার ফলে তার যৌন চাহিদা আর দশটা মানুষের মতো নয়। জন্ম হয় সংশয়ের, তারপরে হীনম্মন্যতার। মূল স্রোতের বিষমকামী জীবনে অভ্যস্ত সকলের থেকে অনেক সময়ই কথা চেপে যেতে বাধ্য হয়”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 10 = 14