অভিজিতের মৃত্যুতে মোটেও শোকার্ত নই, তাঁর রক্তাক্ত মৃত্যু দ্বিগুন শক্তিতে জ্বলে উঠার প্রেরণা দেয়!

অভিজিৎ রায় নেই এটা মনে হলে আমার পায়ের মাটিও সরে যায়! শরীরে এক ধরনের শুন্যতা আর হাহাকারের কাঁপন উঠে! অজানা এক শংকা এসে চেপে ধরে আমাকে! এক অভিজিৎ রায় হল আমাদের অস্তিত্ব ও আদর্শের বিস্তীর্ণ একটা প্রান্তর। যেই সুদুর এক দৃষ্টিতে দেখা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে যেমন খুশি তেমন বিচরণ করা যেত। নেই কোনো কড়া শাসনের জারি। সেখানে ছিল শুধু মানুষ আর মনুষ্যত্বের জোয়াড়ে ভাসার উদ্ধাও এক আহ্বান। নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন, সহিংস বর্বরতার ধর্মহীন এক সহিষ্ণু মানববাদের পৃথিবী গড়ার আবেদন। আমি চাইলেও ভুলতে পারিনা ২৬–২–১৫ইংরেজির সময় রাত দশটার সেই তারিখের কথা। আমাকে নিয়ে যায় এক বিভীষিকাময় অন্ধকার সময়ে। যেখানে ধর্মান্ধ ইসলামিস্টদের নাঙ্গা ছুড়ি আর চাপাতির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে চলছে বাংলাদেশ! বাংলাদেশের মুক্তচিন্তকরা। যেখানে চলছে ধর্মান্ধদের ব্লগার হত্যার পৈচাশিক উল্লাস! অভিজিৎ দার ক্ষত বিক্ষত মুমুর্ষ দেহ পড়ে আছে টিএসসি রাস্তার ধারে। পরকালে বিশ্বাসী ইসলামিস্টরা মাথায় কুপিয়ে কুপিয়ে তাঁর মাথা থেঁতলে দিয়েছে। থেঁতলানো মাথা আর তাঁর বিরল মস্তিষ্কের ঘিলু পড়ে আছে টিএসসির এক অপরিস্কার রাস্তার ধারে। এই দেশের ৯০%এর কোটি কোটি মুসলমানদের মাথার ঘিলু এক করলেও এটা অভিজিৎ রায়ের মাথার ঘিলুর এক কণার সমান জ্ঞাণীও হবেনা! হায়রে ধর্মান্ধ আঁধারের জীব, তোমরা অভিজিৎ রায়কে চিনলে না! আর তাঁর পাশে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত জীবন সঙ্গী রাফিদা আহম্মেদ বন্যা কাঁটা আঙ্গুলের হাত বাড়িয়ে খুব করুণ করে মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করছেন অভিজিৎ রায়কে বাঁচানোর জন্য। আশেপাশের মানুষগুলো দায়িত্ব জ্ঞাণহীন নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। যেন সেদিন পুরো বাংলাদেশ অপদার্থের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অভিজিতের মৃত্যু উপভোগ করছিল।

কেন আমি অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুতে এতোটা বিহ্বল হয়েছিলাম? কি ছিল অভিজিৎ রায়ের মধ্যে? কেন সেই সময় তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে গোটা সপ্তাহ জুড়ে আমি গোপনে গোপনে চোখের অশ্রু ফেলেছিলাম? তাঁর সাথে আমার আত্নীয়তার কোনো সম্পর্ক তো ছিল না? কেন তাঁর মৃত্যু আজো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়? হ্যাঁ হ্যাঁ তার যথার্থ কারণ আছে। একজন নীরিহ ন্যায় কথার মানুষ সক্রেটিসকে বিষপাণে বাধ্য করে তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া আমাকে আজো তাড়িয়ে বেড়ায়। ধর্মদ্রৌহিতার অভিযোগে একজন গ্যালিলিওকে অত্যাচার করে জোরপুর্বক তাঁর মতামতকে মিথ্যা প্রমাণ করার বর্বরোচিত চেষ্টা আমাকে আজো তাড়িয়ে বেড়ায়! একজন হাইপেশিয়াকে টুকরো টুকরো করে কেটে আগুনে পোড়ার ইতিহাস আজো আমাকে আজো তাড়িয়ে বেড়ায়! এঁরা কি কারো ক্ষতি করেছিল? কারো মতামত সহ্য করতে না পেরে কাউকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছিল? না করেনি। এঁরা খুব দৃঢ়তা ও সততার সাথে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। যেসব ধর্মান্ধ বর্বর মুহম্মদবাদী ইসলামিস্টরা অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারা কি ভাবছে এটা তাদের বিজয়? কখনো নয়। ব্যক্তিকে হত্যা করা যায়, কিন্তু ব্যক্তির চিন্তা আর আদর্শকে কখনো হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। এখানে আগামীর ইতিহাসে মুহম্মদবাদীরা খুব তুচ্ছ ও ঘৃণিত হয়ে থাকবে।

অভিজিৎ রায় শুধু একজন অসাধারন বিজ্ঞান লেখক ছিলেন না, তিনি মুক্তাচিন্তার লেখক গড়ার কারিগরও ছিলেন। মুক্তামনা ব্লগে লেখার জন্য ফেসবুকের উঠতি নবীন লেখকদের সব সময় প্রেরণা দিতেন। পারলে তিনি ব্লগাইডিও বানিয়ে দিতেন। তিনি একাই মুক্তচিন্তার জগৎটাকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বেঁচে থাকলে আরো অনেকখানি এগিয়ে নিতেন। অভিজিৎ রায় ছিল নিকষ কালো আঁধারের বুকে এক জলন্ত মশাল! ২৬এ ফেব্রুয়ারি মুহম্মদবাদীরা এমন একটা মানুষকে হত্যা করল, যেখানে আমাদের মুক্তিচিন্তার গতি অনেকটা রোধ হয়ে যায়। তারপরও কি ধর্মীয় অন্ধতা আর গৌঁড়ামি বিরূদ্ধে ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নীল নীলয়দের কলম থেমে ছিল? না থামেনি। ধর্মের বিরূদ্ধে আরো দুর্ণিবার গতিতে চলেছিল তাদের কলম। ওয়াশিকুর তো তার প্রোফাইল ছবিতে লাগিয়ে ছিল আমিই অভিজিৎ! যে মুহম্মদবাদীরা আজ ইসলাম ধর্মের আফিম খেয়ে ভিন্নমতাবলম্বী, ভিনধর্মালম্বীদের হত্যার নেশায় মেতেছে, তা কতোটা যৌক্তিক? কতোটা ন্যায়-সঙ্গত? ১৪০০ বছর আগে এক নারীলোভী, কর্তৃতবাদী নেতৃত্বলোভী, ভণ্ড উম্মাদ নিজেকে আল্লাহর প্রিয় রসুল দাবী করেছে, তার কথা আমাদের কোনো যুক্তি ছাড়া বিশ্বাস করতে হবে? সেই বলেছে কোরাণ আল্লাহর বাণী, আল্লাহ কোরানকে জিব্রাইলের মাধ্যমে আমার কাছে নাজিল করেছেন, তা আমাদের দ্বিধাহীনচিত্তে বিশ্বাস করতে হবে? ১৪০০ আগের ইসলামের নীতির সাথে বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা যায় কি? মুহম্মদ ও কি তৎকালীন আইয়ামে জাহেলিয়ার সমাজ ব্যবস্থার উপর আঘাত হানেনি? সেই মক্কার কাবায় কোরাইশদের ৩৬০ টি মুর্তি ভেঙ্গে দিয়ে তাঁদের অনুভুতিতে আঘাত দেয়নি? তবে কেন আপনারা নিজের ধর্মানুভূতি আহত হলে বর্বর হচ্ছেন?

২০০৯- ১০ সালের দিকে অনলাইনে হাতে গোনা কয়েকজন নাস্তিক অবিশ্বাসী দেখা যেতো। আজ অনলাইনে লক্ষ লক্ষ সাম্প্রদায়িকহীন, পরকালের লোভহীন, জাতিহীন, ধর্মহীন, ঈশ্বরাবিশ্বাসী মানুষ দেখা যায়। এই থেকে বোঝা যায় অভিজিৎ রায়দের লেখা বৃথা যায়নি। তাঁর দুটো রচিত বই (অবিশ্বাসীর ও বিশ্বাসের ভাইরাস) যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কার, অন্ধতা আর কুপমণ্ডপতার শেকড়ে আঘাত হেনেছিল, তা রীতিমত ধর্মজীবিদের অস্তিত্বে কাঁপন তুলেছিল। ধর্মের বিরূদ্ধে লেখা তাঁর ব্লগগুলো ছিল অজ্ঞাণতা আর অন্ধকারের বুকে তীরের মতো বিদ্ধ করা একেকটি আলোর কণিকা। যারা পরকালের বেহেস্তের লোভে, বেহেস্তের ৭২টি হুর আর অফুরন্ত শরাবের লোভে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে, তাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনো রাগ নেই। কোনো ক্ষোভ নেই। রাগ হয় তাদের ধর্মের প্রতি। যে ধর্ম তাদেরকে মানুষ না করে একেকজন বর্বর মুসলমান বানিয়েছে। যে ধর্ম পরকালের জান্নাতের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে একেকটা হিংস্র বর্বর বানিয়েছে। কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রক্ত ছাড়া, জীবন দান ছাড়া এমনি এমনি প্রতিষ্ঠিত হয়না। একটা নতুন চিন্তা, নতুন মতবাদ গ্রহন করার ক্ষমতা প্রচলিত নিয়মের দাসদের থাকেনা। এটা খুব স্বাভাবিক। সক্রেটিস আমলেও যারা সক্রেটিসকে বিষ খাইয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও, দেখেও মনে মনে পৈচাশিক আনন্দ করেছিলেন, তাদের মধ্যে যদি নুন্যতম ন্যায় অন্যায়ের বিবেচনাবোধও থাকতো, তাহলে তারা সক্রেটিসের মৃত্যুতে অনুতপ্ত হতেন।

-যে ধর্মান্ধ ইসলামিস্ট বর্বর মুহম্মদবাদীরা ভাবছে, অভিজিৎ রায়কে হত্যা করে তাদের বিজয় অর্জন হয়েছে। এটা তাদের চরম ভুল ধারণা। অভিজিৎ রায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যে মুক্তমনার বীজগুলো রোপন করে গিয়েছিলেন। তা আজ দিকে দিকে বড় হয়ে কিষলয়ের মতো প্রস্ফুটিত হচ্ছে। এক অভিজিতের আর্দশে গড়ে উঠছে লক্ষ লক্ষ নতুন কুঁড়ির অভিজিৎ রায়। যেখানে এক অভিজিতের লেখায় ইসলামের স্তম্ভ ভেঙ্গে পড়ে, সেখানে লক্ষ লক্ষ অভিজিৎ কে ইসলামিস্টরা সামাল দেবে কি করে? ধর্মান্ধ কাপুরুষ ইসলামিস্টদের বলছি, যারা ইসলাম ধর্মের আফিম খেয়ে উম্মাতাল নেশাগ্রস্থ হয়ে আছো। অভিজিতের মৃত্যুতে মোটেও শোকার্ত নই, তাঁর রক্তাক্ত মৃত্যু দ্বিগুন শক্তিতে জেগে উঠার প্রেরণা দেয়। আবার নতুন উদ্যমে জ্বলে উঠার প্রেরণা দেয়। যেখানে এসে অভিজিৎ রায় থেমে ছিল, সেখানে থেকে শুরু করব আমাদের অগ্রযাত্রা…..

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “অভিজিতের মৃত্যুতে মোটেও শোকার্ত নই, তাঁর রক্তাক্ত মৃত্যু দ্বিগুন শক্তিতে জ্বলে উঠার প্রেরণা দেয়!

  1. তাঁর দুটো রচিত বই

    তাঁর দুটো রচিত বই (অবিশ্বাসীর ও বিশ্বাসের ভাইরাস) যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কার, অন্ধতা আর কুপমণ্ডপতার শেকড়ে আঘাত হেনেছিল, তা রীতিমত ধর্মজীবিদের অস্তিত্বে কাঁপন তুলেছিল।

    ** অবিশ্বাসের দর্শন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 6 =