শব মিছিলের যাত্রীরা…

‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি অভিজিৎ রায় উৎসর্গ করেছিলেন ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুন হওয়া ব্লগার রাজীব হায়দারকে(থাবা বাবা)। উৎসর্গের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন;-
“শহীদ রাজীব হায়দার শোভন(থাবা বাবা)
শাহবাগ আন্দোলনে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’-এর প্রথম শিকার।”

দুই বছর পর ২০১৫ সালে ওই একই ফেব্রুয়ারি মাসে একই ধরনের বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারান অভিজিৎ রায়। ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো ‘জাগৃতি’ প্রকাশনী থেকে এবং প্রকাশক ছিলেন ফয়সাল আরেফিন দীপন। একই বছরের অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখ মৌলবাদীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হলেন তিনিও।
ওয়াশিকুর বাবুর ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারটিতে এখনো শোভা পাচ্ছে অভিজিৎ রায় হত্যার প্রতিবাদে দেওয়া কালো হ্যাশট্যাগের ছবি #IamAvijit। ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায় যেদিক ঘাতকের আঘাতে প্রাণ হারালেন তখন বাবুর দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসটা ছিলো;-
“অভিজিৎ দাকে হত্যা করা হলো টিএসসিতে কুপিয়ে!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!
বাবু কি জানতো প্রায় মাসখানেক পর(৩০ মার্চ) তাকে নিয়েও আমাদেরকে স্ট্যাটাস দিতে হবে? তার আইডিটাকে’ও রিমেম্বারিং করতে হবে?

ফেব্রুয়ারিতে মৌলবাদীদের হাতে অকালে প্রাণ হারালেন ব্লগার রাজীব হায়দার ও সুলেখক এবং ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। এই ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ ওয়াশিকুর বাবুর জন্মদিন ছিলো। ফেব্রুয়ারি মাসটা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের জন্য দীর্ঘশ্বাসের মাস হয়েই থাকলো।

একই বছরের মে মাসের ১২ তারিখ(২০১৫) সিলেটের সুদিবাজার এলাকায় নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে। অনন্ত বিজয় দাস হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত একটা মানববন্ধনে ১৩ মে অনুসরণ করা হয়েছিলো নীলয় নীলকে। পুলিশের সহায়তা চাইতে গেলে পুলিশ নীলয়কে দেশ ছাড়তে জানিয়ে দেয়। পরে আগস্টের ৭ তারিখ নিজ বাসায় মর্মান্তিকভাবে খুন হলেন নীলয় নীল।
নিজের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি ব্লগার রাজীব হায়দারকে উৎসর্গ করেছিলেন ড.অভিজিৎ রায়। দুই বছর পর তিনি নিজেই প্রাণ হারালেন মৌলবাদীদের হাতে। ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইয়ের প্রকাশক দীপন’ও খুন হলেন। অভিজিৎ রায় খুন হওয়ার পর তিনি মেডিকেলে গিয়েছিলেন। মর্গের দায়োয়ান জিজ্ঞাসা,’করলেন স্যার ভিতরে গিয়ে দেখবেন?’
বছরের শেষে সেই লাশঘরে শুয়ে রইলেন তিনিও।
ওয়াশিকুর বাবুর প্রোফাইল পিকচারে এখনো রয়েছে ‘আই এম অভিজিৎ’ হ্যাশট্যাগ। অনন্ত বিজয় দাসের হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধনে অনুসরণ করা হলো নীলয় নীল’কে। প্রায় ৩ মাস পর খুন হলেন নীলয়’ও।
মৃত্যুগুলো কেমন এক নির্মম এবং অসহ্য বেদনার সুরে একই তাল আর লয়ে গাঁথা। যেন হাত ধরাধরি করে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলে আলো জ্বালাতে গিয়ে একইসাথে হারিয়ে গেছেন আলোর পথের যাত্রীরা।

এরপর মৌলবাদীরা একই কায়দায় খুন করে বাংলাদেশের প্রথম এলজিবিটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক জুলহাস মান্নান এবং তাঁর বন্ধুও সাংস্কৃতিক কর্মী মাহবুব তনয়কে। খুন করা হয় ব্লগার এবং গণজাগরণ মঞ্চের একটিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকেও। মৌলবাদীদের হাতে প্রাণ হারান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রগতিশীল শিক্ষক; সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর এ কে এম শফিউল ইসলাম এবং ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। অধ্যাপক শফিউল ইসলাম ছিলেন লালন দর্শনের অনুসারী, বাসায় গান বাজনার আসরও বসাতেন। আরেক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীও সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন, তানপুরা বাজাতে ভালোবাসতেন।

বিচারের জন্য হাহাকারঃ-
অভিজিৎ হত্যার বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় ওয়াশিকুর বাবু ২৩ মার্চ ২০১৫ সালে ফেসবুকে লিখেছিলেন,’ইস্যু আসে ইস্যু যায়, অভিদা’র খুনিরা রক্ষা পায়।’
অনন্ত বিজয়ও অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। ১৫ মার্চ ২০১৫ সালে তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন;-
“খুনিদের বিচার না হলে তারা যে আরেকটি চাপাতিতে শান দিবে আরেকটি কোপ দেওয়ার জন্য তা তো বুঝাই যায়।”
অনন্ত বিজয়ের আশঙ্কা নিজের খুনের মাধ্যমেই সত্যি প্রমাণিত হলো। সত্য প্রমাণিত হয়েছে ওয়াশিকুর বাবু, নীলয় নীল, ফয়সাল আরেফিন দীপন, মাহবুব তনয়, নাজিমুদ্দিন সামাদ, অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীদের হত্যার মধ্যে দিয়ে। মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিলে প্রশ্রয় দিলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি না ভাঙলে লাশের মিছিল যে আরো দীর্ঘ হবে অকালে প্রাণ হারানো ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসের সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে পুরোহিত, দর্জি, খৃষ্টান ব্যবসায়ী, ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা, বৌদ্ধ ভিক্ষু-সহ বিভিন্ন নিরীহ মানুষের হত্যার মধ্যে দিয়ে।
এখনো আমরা প্রহর গুনি, আতঙ্কে থাকি প্রতিদিন-ই কারো অকাল মৃত্যুর সংবাদ শোনবার ভয়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

70 + = 78