যুক্তি ও মুক্তি তে অমর আজাদ-অভিজিৎ রা

২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সভা, সেমিনার, মিছিলে অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার চাইতে হলো রাষ্ট্রের কাছে ; তবুও ক্লান্ত হইনি। ২ বছর হয়ে গেল অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের। এরই মাঝে ১৬ বার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ বাড়িয়েছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, আমরা তবুও ক্লান্ত হইনি।

ভাবতেই অবাক লাগে আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি; ১ যুগ পেরিয়ে ১৩ বছর হলো বহুমাত্রিক দার্শনিক, লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হিংস্র হামলার। হুমায়ুন আজাদও মারা গেলেন, ১৩ বছর ধরে বিচার চেয়েও আমরা ক্লান্ত হইনি।

একজন হুমায়ুন আজাদ বা অভিজিৎ রায়কে হারানো বর্তমান কাল থেকে যে কতটা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়া তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

২০০৪ সালের ১১ আগস্ট রাতে একটি পার্টি থেকে ফেরার পর জার্মানির মিউনিখে নিজের ঘরে আকস্মিকভাবে (আমার মতো অনেকেই যাকে আকস্মিক নয় বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড মনে করেন) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বিচার তো পরের কথা মৃত্যুর কারণই এখনো পর্যন্ত ধোঁয়াশা।

২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন সংসদ সদস্য কুখ্যাত রাজাকার দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৩) বইটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে এক লম্বা বক্তব্য দেন এবং এ ধরনের লেখকদের লেখা বন্ধ করতে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

এরপর কোনো একটা সভায় সে হুমায়ুন আজাদের তথাকথিত আকস্মিক মৃত্যু প্রসঙ্গে বলে, ‘এক মুরতাদ ছিল। আমরা তাকে সরিয়ে দিয়েছি। এদেশে সরিয়ে দিলে নানা ঝামেলা হতো। তাই বিদেশে নিয়ে সরিয়ে দিয়েছি।

মজার বিষয় হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার দীর্ঘ ২৪ দিন পর যখন তার জ্ঞান ফিরলো, আক্রমণকারীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকেই প্রশ্ন করতে বলেছিলেন সন্তান অনন্য আজাদকে।

এছাড়া হামলার ২৪ দিন পর ২৩ মার্চ জ্ঞান ফিরলে ড. আজাদ এক সংবাদ সম্মেলনে দুটি ডানপন্থী সংবাদপত্র ও সাঈদীকে তাঁর ওপর হামলার জন্য দায়ী করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তখন বলেছিলেন, ‘যেভাবে দৈনিক ইনকিলাব ও দৈনিক সংগ্রাম আমার বিরুদ্ধে লিখছিল এবং সাঈদী সংসদে আমার বিরুদ্ধে যা বলেছেন তা এই হামলার সঙ্গে তাদের সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। জানিনা রাষ্ট্র এ বিষয়ে সংগ্রাম, ইনকিলাব বা সাঈদীর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

২৭ ফেব্রুয়ারির পর করা হত্যা চেষ্টার মামলা ১২ অগাস্ট এর পর গিয়ে রূপ নেয় হত্যা মামলায়। গঠন হয় অভিযোগ পত্র। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন, জেএমবির সুরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগ্নে শহিদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন, হাফিজ মাহমুদ ও নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। এদের মধ্যে আসামি নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবু পলাতক।

২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে মামলার দুই আসামি সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন এবং রাকিবুল হাসান ওরফে হাফিজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেয় কথিত দুর্বৃত্তরা। পরে এদের মধ্যে রাকিব ওইদিন রাতেই ধরা পড়েন এবং পরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান! এরপর পার হয়ে যায় ১৩ বছর বিচারের আর কোনো হদিস মেলে না! আর অভিজিত দার তো মাত্র ২ বছর হলো!

২৭ ফেব্রুয়ারির পর ২৬ ফেব্রুয়ারি এলো, ৩০ মার্চ এলো, ১২ মে এলো, ৭ অগাস্ট, ৩১ অক্টোবর এলো আমরা কোনো হত্যাকাণ্ডের ই বিচার পাইনি। এরমাঝে রাষ্ট্র আমাদের একেবারে হতাশ করেছে তা কিন্তু নয়।

২০১৫ সালের বছর শেষ দিন গণজাগরণ মঞ্চের শহীদ সহযোদ্ধা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভন হত্যার বিচারের নামে একখণ্ড প্রহসন দিয়েছে আমাদের। সত্য কথা প্রকাশের দায়ে বন্ধ করে দিয়েছে প্রকাশনী, গ্রেফতার করেছে প্রকাশককে, ৫৭ ধারার নামে কেড়ে নিয়েছে শতশত তরুণ প্রথাবিরোধী লেখকের কলম, দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে লেখকদের।

দিন যত এগোচ্ছে আমাদের রাষ্ট্র পেছাচ্ছে ততটাই। প্রতি মুহূর্তে মৌলবাদ, ফ্যাসিবাদ এর দিকে আরো এক কদম করে এগোচ্ছে আমাদের রাষ্ট্র।

এখন আমরা যদি বিচার আদায় করে না নিতে পারি তবে পরে কোনো একসময় বিচার চাওয়ার জন্য আমাদেরই বিচারের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে হতে পারে।

তবে আজাদ বা অভিজিত এরা নিজের দেহে যতটা জীবিত ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি জীবিত আছেন কোটি মানুষের মনে, শ্রদ্ধায়, বিজ্ঞানে, যুক্তি ও মুক্তিতে।

চাপাতি দিয়ে কলম হয়তো বন্ধ করা যেতে পারে তবে মননকে নয়।

“পৃথিবীতে যতোদিন অন্তত একজনও প্রথাবিরোধী মানুষ থাকবে, ততো দিন পৃথিবী মানুষের”

ততদিন কলম চলবে।

হুমায়ুন আজাদ হত্যা নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সংশ্লিষ্ট সকলে সর্বোচ্চ শাস্তি পাক; মুক্তচিন্তা ছড়িয়ে যাক!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “যুক্তি ও মুক্তি তে অমর আজাদ-অভিজিৎ রা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 4 =