পুরোনো বইয়ের নতুন গন্ধ

বইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক জন্মের পর থেকেই বলতে গ্যালে। আমার একদম প্রথম জন্মদিন থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আমার আম্মু আমাকে বই উপহার দিয়ে আসছেন। প্রথম প্রথম উপহার পাওয়া চাচাচৌধুরীর বইগুলা ছিড়ে খুবই মজা পেতাম। কিন্তু আমার দাদীমা আমাকে অনেক বুঝাতো, বই গুলো নিয়ে পড়ে শুনাতো। তারপর একটা সময় আমিই কান্নাকাটি করে হরেক রকম টিনটিন, চাচাচৌধুরীর কমিক্স কিনে দাদীমার কাছে নিয়ে যেতাম পড়ে শোনানোর জন্য। স্কুলে ভর্তির আগেই একসময় বুঝলাম আমি পড়তে পারি! বিভিন্ন কমিক্স, সত্যজিৎ, জাফর ইকবালের বইয়ের মধ্যে দিয়েই শৈশব কাটালাম। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য আমি জীবনে মাসুদ রানা বা তিন গোয়েন্দা কখনো পড়ি নাই। ক্যানো জানি টিফিনের টাকা মাসুদ রানার চেয়ে চাচা চৌধুরী-টিনটিন- নন্টে-ফন্টে-বাঁটুল দি গ্রেটের পেছনে খরচ করেই মজা পেতাম। এখনো আগের মতো আকর্ষন রয়েছে কমিক্স গুলোর প্রতি, এখনো মাঝে মাঝে উল্টাই পাতা পুরোনো আর্কাইভ থেকে। জীবনে প্রথম চোখ ধাঁধালো যখন প্রথমবারের মত নীলক্ষেত পুরোনো বইয়ের মার্কেটে গেলাম ক্লাস ৬ এ পড়াকালীন সময়ে। চারপাশে কতোরকম বই! সব পুরানো, কি সুন্দর মাদকতা মেশানো গন্ধ! প্রান ভরে আর্চি কমিক্স কিনলাম। ইতোমধ্যে পাশাপাশি কিছু বন্ধুর খোঁচাখুঁচিতে উঠতি বয়সে নেয়া শুরু করে দিয়েছিলাম নিষিদ্ধ দৈহিক প্রেমের চিকন উপাখ্যান গুলোর মজা ক্লাস ৭ থেকেই। চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের সামনের ফুটপাথে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যেতো, নতুন পুরোনো নানা রকম নিষিদ্ধ আনন্দের চটি বইগুলো। একবার এরকম এক দোকানেই পেয়ে গেলাম নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা সমগ্র। কি মনে করে কিনলাম। শুরু হলো নতুন নেশা। ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ বইয়ের জগৎ থেকে ফিরে আসলাম আলোর জগতে।ক্লাস ৮ এ উঠার পর থেকে কমিক্সের নেশা কমতে থাকলো, মজে থাকা শুরু করলাম শরৎবাবুর বইয়ে, রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছে,টেনিদা, ঘনাদায়। সঙ্গে নতুন যোগ হলো ব্যোমক্যেশ বক্সী, ফেলুদা আর হোমস। বুভুক্ষের মতো পরতাম ডিটেকটিভ কাহিনীগুলো। ক্লাস ১১ পর্যন্ত মোটামুটিভাবে নতুন বইয়ের মধ্যেই কাটিয়েছে, ক্লাস ১২ এ পড়তে চকবাজারে সন্ধান পেলাম পুরোনো বইয়ের এক ডিপোর। কয়েকটা দোকান, প্রায়ই পুরোনো বই। কয়েকদিন বই কিনে ভাব হয়ে যাওয়ার পরে আর কেনা লাগতো না, এমনিই বসে পড়তে পারতাম। ঐখানেই সন্ধান পাই সব ক্ল্যাসিক অনুবাদের। যদিও অনুবাদ পড়তে আমার ভালো লাগে না, তবুও ভাষা জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে বাধ্য হয়েই পড়তে হতো। এভাবেই দিন কাটে, নতুন বইয়ের জগৎ থেকে ডুব মারি পুরোনো বইয়ের জগতে। একটু খুজলেই দেখি অমূল্য সব বই পাওয়া যায়। তবে এখনো বুঝে উঠতে পারি না, এতো অমূল্য সব বই মানুষ ক্যানো ‘রদ্দি মাল’ হিসেবে বেচে দেয়। এখন পর্যন্ত পুরোনো বইয়ের প্রতি আমার আকর্ষন কমেনি, যেখানেই দেখি কেউ পুরোনো বই নিয়ে বসে আছে সেখানেই হানা দেই। যেখানেই যাই, আনাচে কানাচে নীলক্ষেত খুঁজে বেড়াই। পেয়েও যাই অমূল্য সব রত্ন……

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “পুরোনো বইয়ের নতুন গন্ধ

  1. নিউ মার্কেটের সামনে থেকেই
    নিউ মার্কেটের সামনে থেকেই আমার প্রথম ‘ঐ সিডি’ কেনা ক্লাস সেভেনে। চিকন বই অবশ্য বেশ দেরিতেই পড়েছিলাম। ক্লাস নাইনে উঠে।
    _________________________________________________
    বইয়ের নেশার মত নেশা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা আছে বলে মনে করি না। বইয়ের সাথে ছিলাম, আছি, থাকব…

    1. হ ভাই! একদম হাচা কথা! সব দোষ
      হ ভাই! একদম হাচা কথা! সব দোষ ইন্টারনেটের! এই যুগের সবচেয়ে আসক্তিপূর্ণ নেশা……. :কানতেছি: :কানতেছি:

  2. একসময় প্রচুর বই পড়া হতো।
    একসময় প্রচুর বই পড়া হতো। ইন্টারনেট এসে বই বই পড়ার সময়টুকু খেয়ে ফেলছে। :ভেংচি:

  3. একটা সময়ে গল্পের বইয়ের গন্ধ
    একটা সময়ে গল্পের বইয়ের গন্ধ আর ঈদে নতুন জামার গন্ধ একরকম লাগতো !!

    দিন বদলায় গেছে ! কতদিন হয়া গেল নীলক্ষেত যাই না … 🙁

    লেখায় কিঞ্চিত বাস্তবধর্মী লুল !
    পিলাচ ! ++
    😉 😀

    1. খালি অপেক্ষায় থাকি, কখন ঢাকায়
      😀 😀

      খালি অপেক্ষায় থাকি, কখন ঢাকায় গিয়া আগে নীলক্ষেত যামু!!!

      শুভকামনা সতত………… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 − = 48