থিওরেটিক্যাল মুসলিম

আমি সেইসব হুযুর-মাওলানাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ইসলাম সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে ব্যবহারিক শিখানোর দায়িত্ব আপনাদের কারণ আপনারা সামান্য হলেও আমাদের থেকে এ সম্পর্কে বেশি জানেন। আপনারা শুধু মুখে বলেন কাজে দেখান না কেনো? হুযুররা শুধু বলেনই আগে সালাম দিবেন অথচ আপনারা কতজনকে আগে সালাম দেন, একবার ভেবে দেখবেন?

১.
রাসূল (সা.) এর অন্যতম এবং গুরূত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো সালাম প্রদান করা। সালাম দেয়া যদিও সুন্নত কিন্তু সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। সালাম প্রদানে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সেই যে আগে সালাম প্রদান করে। ছোটবেলায় যখন গ্রামের মক্তবে যেতাম তখন প্রায়ই একটি গল্প শুনতাম। মুসলিম বিশ্বের পথিকৃৎ রাসূল (সাঃ) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সন্তান। অত্যন্ত প্রগাঢ় বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এই মানুষটি সকল কে সালাম দিতেন, চেষ্টা করতেন বরং অপর ব্যক্তিটি সালাম দেয়ার আগেই সালাম দিতে। তিনি সালাম দিতেন দুটি কারণে, প্রথমত, ইসলামে নেকি অর্জনের একটি রাস্তা হলো সালাম দেয়া বা সালামের প্রত্যুত্তরে তার জওয়াব দেয়া এবং দ্বিতীয়টি, ইসলামে কুশলাদি বিনিময়ের প্রধান উপায় হলো সালাম আদান-প্রদান। সালাম আদান প্রদানের সময় তিনি অপর ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে জেনে যেতেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার সকল খোঁজ-খবর পেয়ে যেতেন। রাসূল (সাঃ) আগে সালাম প্রদান করতেন এই কারণে যে ইসলামে সালামের জওয়াব দেয়ার চেয়ে সালাম দেয়া উত্তম বলে। রাসূল (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও সাহাবিদের আগে সালাম দিতেন বলে তারা অনেক সময় লজ্জায় পড়ে যেতেন। এ জন্য সাহাবিরা উনাকে আগে সালাম দেয়ার জন্য তার আগমনের সময় গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়তেন, শুধুমাত্র আগে সালাম দিবেন বলে।

২.
কয়েকদিন আগে কলেজ শেষে বন্ধুদের সাথে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ ই কিছু বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন জায়গা হতে আগত মুষ্টিমেয় কিছু মাওলানা এবং তাদের সাগরেদরা আমাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় কেমন জানি একটা অহংকার চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলল। কিন্তু আমরা যখন একজন বন্ধুও তাদের সালাম দিলাম না তখন স্পষ্টতই তাদের চোখে মুখে অহংকারের পরিবর্তে বিস্ময় ফুটে উঠল। আশ্চর্যজনকভাবে তারা এতজন ধার্মিক মানুষের মধ্যে কেউই আমাদের সালাম দেয় নি।

এবারে মূল বিষয়ে আসা যাক। আমাদের সমাজের সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ হলেন আমাদের শিক্ষাগুরু, মসজিদ-মাদ্রাসাদ্বয়ের ইমাম-মুয়াজ্জিন কিংবা মাওলানা-মুফতিগণ। আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা তাদের নিকট যাই। তারাই আমাদের শেখান আমরা যেনো সর্বপ্রথমে সালাম প্রদান করি। ছোট বেলায় মক্তবে, প্রাইমারি স্কুলে এমনকি রাস্তায় মুরুব্বিরা পর্যন্ত আমাদের এ সালাম দেয়া শিখাতেন, বাবা-মা তো আছেনই। তারা আমাদের এও শিখিয়েছেন যেনো আগে সালাম দেয়া হয়। আচ্ছা আপনি কতজন মাওলানাকে পেয়েছেন যিনি আপনাকে আগে সালাম দিয়েছেন? আমি গুটিকতক কয়েকজন ব্যতিত আর কাউকে পাইনি যিনি আমাকে আগে সালাম দিয়েছেন। আমার বাবা একজন ডিফেন্স অফিসার। আশ্চর্যের ব্যাপার এই আজ এত বড় হয়ে গেলাম উনি ছাড়া আমাকে কেউ বলেন না আমি কেনো সালাম দেই না? (যদিও আমার সালাম দেয়ার অভ্যাস আছে।) আচ্ছা মাওলানাবৃন্দ, আমরা না হয় ধার্মিক নই এ কারণে সালাম দেই না, তাই বলে আপনারা ধার্মিক হয়েও তো সালাম দেন না। কিসের এত অহংকার আপনাদের? রাসূল (সা.) যদি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হয়ে আগে সালাম দিতে পারেন তবে আপনারা মানে হুযুর-মাওলানাগণ কেনো পারবেন না? আরে বাবারা আপনাদের কাছ থেকেই তো আমরা শিখব! তাই না?

আরেকটা কথা বলি লেবাস লাগিয়ে, দাঁড়ি রাখলেই যে আপনি সর্বোত্তম তা কিন্তু নয়! কেউ আপনাকে আগে সালাম দিলেই যে আপনি সম্মানিত এমনটা ভাববেন না। আপনি আপনার ক্ষমতার জোড়ে সম্মানীয় বলে আপনি সালাম দিবেন না কিন্তু আপনাকে সালাম দিতে হবে এর কি কোনো ভিত্তি আছে? আসলে সালাম পাওয়া নয় সালাম দেয়াটাই সম্মানের। যা রাসূল (সা.) স্পষ্টত তাঁর হাদীসের মাধ্যমে আলোকপাত করেছেন। তিরমিযি শরীফের ২৬৯৪ নং হাদীসে উল্লেখ আছে: আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা.) বলেন, ” আল্লাহ্‌-র নিকট ঐ ব্যক্তি অধিক উত্তম যে ব্যক্তি সবার আগে সালাম প্রদান করেন।”

অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান স্যারের একটা টকশো দেখছিলাম, উনি একটা কথা বলেছিলেন। কথাটা আমার মন কেড়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমরা থিওরেটিকাল মুসলিম; প্র‍্যাকটিক্যালি নই।” আসলেই তো তাই, আমরা শুধুই সালাম দেয়ার কথা বলে যাচ্ছি নিজে কতজনকে এটা শিখাচ্ছি?

আমি সেইসব হুযুর-মাওলানাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ইসলাম সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে ব্যবহারিক শিখানোর দায়িত্ব আপনাদের কারণ আপনারা সামান্য হলেও আমাদের থেকে এ সম্পর্কে বেশি জানেন। আপনারা শুধু মুখে বলেন কাজে দেখান না কেনো? হুযুররা শুধু বলেনই আগে সালাম দিবেন অথচ আপনারা কতজনকে আগে সালাম দেন, একবার ভেবে দেখবেন?

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমি হুযুর-মাওলানা কিংবা ইসলামের বিরোধিতা করছি না শুধু সমাজের বাস্তবটা তোলে ধরলাম।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 4 =