একজন অভিজিৎ রায় ও অনেক প্রশ্নঃ ৩

বোরখা পরা খুনি চাপাতি দিয়ে অভিজিৎদার মাথা বরাবর উপর্যুপরি কোপাতে থাকলে তিনি ফুটপাতেই লুটিয়ে পরেন। রক্তে ভেসে যেতে থাকে এলাকা। এ সময় বন্যাদি চাপাতির কোপ থেকে অভিজিৎদাকে বাঁচাতে গেলে খুনি তার হাতেও কোপ মারে। এতে করে তার হাতের একটি আঙুল কেটে রাস্তায় পড়ে যায়।

পুরো ঘটনাটি খুব কাছ থেকে দেখে তুলি নামের এক নারী (পুরো নাম দেওয়া যাবেনা)।

পরের পর কোপের আঘাত দেখে সে প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসে ও চাপাতিসহ বোরখা পরা খুনিকে হাত চেপে জাপটে ধরে কিন্ত খুনি তাকেও কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেয় ও তলপেটে লাথি মেরে তাকে রাস্তায় ফেলে দেয়। এরপর খুনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট দিয়ে পালিয়ে যায়!

এ ঘটনার পর পরই অভিজিৎদাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেদিন রাতেই তিনি মারা যান।

এদিকে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তুলি অন্তরের জ্বালায় থাকতে না পেরে পরদিন সকালে (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫) অভিজিৎদাকে যেখানে কোপানো হয়েছিল, সেখানে ছুটে আসে আর উদভ্রান্তের মতো শুধু বলতে থাকে, ‘এত রক্ত আর কখনো আমি দেখিনি। এত রক্ত আর কখনো আমি দেখিনি!’

ছবি দেখে বোঝা যায়, তুলি (৪০) শিক্ষিত নারী। বার বার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল সে। জড়ো হওয়া সব মানুষের পাশাপাশি সংবাদকর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিল।
তুলিকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং সংবাদকর্মীদের কাছেও তুলি অভিজিৎদার হত্যার ঘটনার বর্ণনা দেয় ।

অভিজিৎদার হত্যা রহস্য উদঘাটনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশে এসেছিল। অভিজিৎদাকে যেখানে হত্যা করা হয়, সেই জায়গাটাও দেখে তারা। ওই সময় কিছু নমুনাও সংগ্রহ করে এফবিআই ।

বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় এফবিআই সদস্যরা জানতে পারে যে, অভিজিৎদাকে হত্যার সময় এক নারী খুব কাছাকাছি থেকে ঘটনাটা দেখেছে। তারা তুলির সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু পুলিশ তাদেরকে জানায় যে , পুলিশ তুলির সন্ধান আর পাচ্ছেন না!!

একজন সংবাদকর্মী হিমু সকালে বুয়েটের একটা অ্যাসাইনমেন্ট কভার করার জন্য ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অভিজিৎদার হত্যাকাণ্ডের জায়গায় লোকজন দেখে সেখানে যায় ও তুলির সাথে কথা বলে। তুলির দেওয়া সমস্ত বর্ণনা নিউজরুমে ফোনে জানানো হয়েছিল।

হিমু তুলির কয়েকটি ছবি তুলে নিউজরুমে পাঠিয়ে দেয়। ওই ছবিতে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও ওয়াকিটকি হাতে তুলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

এবারে প্রশ্ন, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো, তাকে কীভাবে খুঁজে পাবেন না, সেটা তো বোঝা গেল না? একথা আপনারা সকলে বিশ্বাস করেন?

পরে তুলির নিরাপত্তা ও আরো বিভিন্ন দিক চিন্তা করে সংবাদটা আর প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে বেশি তথ্য পুলিশের কাছে থাকার কথা কারণ, পুলিশ তুলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে; ছবিই তার প্রমাণ। তাহলে তুলি কি কর্পুরের মত উবে গেল!

সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাছে তুলির ছবি, নাম ও সে কোথায় থাকে, সে তথ্য আছে। তাহলে পুলিশের কাছে থাকবেনা, এটা কেউ কি মেনে নেবে?

হিমু জানিয়েছিল, পরের দিন (২৭ ফেব্রুয়ারি) মোটামুটি সকাল সকাল সাড়ে নটার দিকে তুলি অভিজিৎদার হত্যার বর্ণনা দেয়। অভিজিৎদার হত্যার বর্ণনা দিয়ে তুলি বলে, ‘আমি এত রক্ত কখনো দেখিনি। চাপাতি দিয়ে প্রথমে ভাইকে (অভিজিৎ রায়) কোপায়। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গেলে বৌদির (বন্যা) গলায় কোপ দেয় তারা।’

তুলির কথায়: তাদের (অভিজিৎ ও বন্যা) ওপর হামলাকারী খুনি বোরখা পরে ছিল। পিঠে একটি ব্যাগ ছিল। খুনির ঠিক পেছনেই অন্য একজন পুরো ব্যাপারটার উপর নজর রাখছিল!

হামলার পর লোকজন জড়ো হলে হামলাকারীরা চলে যায়।

হামলা চলাকালে একটু দূরেই ছিল তুলি: ‘বোরখা পরা ওই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করলে আমি তার হাত চেপে জাপটে ধরি। এতে আততায়ী ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পেটে লাথি মেরে ফেলে দেয়। এতে আমি পড়ে গেলে তারা পালিয়ে যায়।’

বার বার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণে তুলি কিছুই ঠিকভাবে বলতে পারছিল না।জ্ঞান ফিরলে কথা হারিয়ে ফেলছিল। সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল।
তুলি বলে: অভিজিৎদার ওপর হামলার সময় বন্যাদি হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করলে চাপাতির কোপে তার হাতের আঙুল কেটে মাটিতে পড়ে যায়। অন্যদিকে, অভিজিৎদাকে মাথার পেছনে চাপাতি দিয়ে কোপ দিলে তার মাথার মগজ ফুটপাতে ছিটকে পড়ে।

এফবিআই সদস্যরা তুলির সন্ধান জানতে চাইলে তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী!! যে তথ্য সংবাদকর্মীরা জানতে পেরেছিল, সে তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাও জেনেছিল। তাহলে কেন তুলিকে খুঁজে পায়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশ্নটা কিন্তু ঠিক এখানেই!!!

এত তথ্য থাকার পরেও অভিজিৎদার খুনিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে না আমরা কোন উদ্যোগ নেব?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “একজন অভিজিৎ রায় ও অনেক প্রশ্নঃ ৩

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 + = 77