এই গল্পটি আমাদের কয়েকজনের ।।

আব্বার বদলির চাকুরীর কারণে আমরা বেশ অভ্যস্তই ছিলাম এক উপজেলা থেকে আর এক উপজেলায় স্থানান্তরিত হতে। যদিও বলছি বটে অভ্যস্ত কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ানক ভাংচুর হতো ! নতুন পরিবেশ, নতুন স্কুল, পুরনো বন্ধুদের ছেড়ে আসা সব মিলিয়ে বেশ সময় লাগতো মানিয়ে নিতে।

আশির দশকের শেষ সময়টা আব্বা বদলি হয়ে আসেন ঝিনাইদহ জেলার ছোট্ট একটি উপজেলা মহেশপুরে । ছিমছাম নিরিবিলি একটি উপজেলা, ভালোই মনে ধরেছিল। সারাটি দিন সাইকেল চালিয়ে উপজেলার প্রতিটি অলিগলি ছুটে বেড়াতাম, বলতেই হয় তখন আমার একটি সাইকেল ছিল! সাইকেলের পিছে সেকি যত্ন ছিল তখন, প্রতিদিন সাইকেলটিকে সুন্দর করে মোছা ছিল প্রতিদিনের কাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ।

গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা শহরে তরুণদের সাইকেলর প্রতি আগ্রহ দেখে বেশ লাগে, ভাবি সব কিছুই বোধহয় ফিরে ফিরে আসে শুধু সময়টা পাল্টে যায় আর পাল্টে যায় চরিত্র গুলো ।

অন্য অনেক সব স্মৃতির ভিড়ে মহেশপুরের সেই দিন গুলো মনে হয় যেন এই কিছুদিন আগের । অথচ সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় ২৮-২৯টি বছর।

আসলে ঐ সময়কাল টা ছিল আমার জন্যে স্বতন্ত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ ভাগে এসে ভর্তি হই ওখানে, পরে প্রাইমারীর পাট-চুকিয়ে হাইস্কুলে গমন। নির্ভার এক অনাবিল আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর সৃতি ভাসে মহেশপুরের ।

খুব সামান্য কিছুতেই ভালো লাগার কমতি ছিলোনা তখন, গাছপালা, পাখি, ফুল, নদী আর পীচ ঢালা কিংবা মেঠো পথে সাইকেল।

নবই দশকের শুরুর দিকে আব্বা মারা যান তাই হটাতই আমারা একটু ছিটকে পড়ি ! আস্তে আস্তে নির্ভার থেকে ভার বাড়ে অনাবিল আনন্দ আবিল হতে থাকে ।

সব মিলিয়ে তাই মহেশপুরের ঐ সময়কাল টা আমার জন্যে স্বতন্ত্র।

একে একে দৃশ্যপটে চরিত্র গুলো আসে, প্রথমে পরিচয় হয় প্রিন্স এর সাথে। প্রিন্সরা আমাদের প্রতিবেশী মানে একই বাড়ীর এপাশ ওপাশ তাই স্বভাবতই ওর সাথে পরিচয় হয় আগে। তার পর টমাস, পিকুল ও চঞ্চলের সাথে। বন্ধুত্ব জমে ওঠে, গল্পের পর গল্প এদিক সেদিক ছোটাছুটি কতো স্মৃতি !

পিকুলদের গাছের কুল বরই এবং পেয়ারার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ছিল আমাদের সকলের। অসাধারণ ছিল তার স্বাদ !

রোড স্টার নামের কালো রঙের একটা হাই কেডস, প্যান্ট-সার্ট ইন করে ‘স্মার্ট বয়’ টমাস লাল রঙের সাইকেল নিয়ে দুর্দান্ত গতিতে ছুটে বেড়াত, পেছনের আসনে পিকুলই বেশি থাকতো। পরে অবশ্য আমারও জায়গা হয়েছিল !

সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা এবং হোটেলে গিয়ে খাসি অথবা গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার ঝোঁক ছিল তখন। আমার সহযোগী ছিল চঞ্চল । প্রায়শই আমরা হোটেলে গিয়ে খেতাম আর ছবি দেখতাম তিনটার শো ! বলবার অপেক্ষা রাখে না যে হল এবং হোটেল, দুটোরই টাকা বেশীরভাগ সময় চঞ্চলেরই পকেট থেকেই যেত।

আমাদের উপজেলা কোয়ার্টারের সামনে একটা হোটেল ছিল। হোটেল বয় মোস্তফা ভাই বয়সে বড় হলেও ছিল বন্ধুর মতো, একটা মাংসের অর্ডার দিলে লুকিয়ে দিতো দুটো। অনেক অনেক বার ফ্রি তে লুকিয়ে রসগোল্লা খাইয়েছে মোস্তফা ভাই ।

সারাদিন কাজ সেরে মোস্তফা ভাই বিকেলে আসতো আমাদের সাথে গল্প করতে, তার গল্প গুলো ছিল একটু কামজ প্রকৃতির । আমি পিকুল ও চঞ্চল ছিল তার প্রধান স্রোতা । সেকি কৌতূহল জাগত আমাদের!

উপজেলা বাজার পার হয়ে কোন একদিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল গাছগাছালির বাগান ও পানের বরজ, লোকেরা বলতো ছোট বাগান, বড় বাগান। কতবার যে সেই বাগানে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে ফেলেছি নিজেদের, আবার বড় রাস্তা ধরে ফিরেছি এসেছি ।

তারপর একদিন সেই বড় রাস্তা ধরেই আবার যেতে হয়। আব্বা বদলি হয়ে যান,আমরা চলে যাই যশোরে।

বন্ধুদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি কখনো । অনেক বছর পর টমাসের সাথে দেখা হয় ঢাকায়। পিকুল, চঞ্চল, প্রিন্সের সঙ্গে আজ অবধি দেখা হয়নি । ভবিষ্যতই জানে যদি দেখা হয় পিকুল, চঞ্চলের সাথে ! কিন্তু প্রিন্সের সঙ্গে দেখা হওয়ার জো নেই, ২০০৫ কি ২০০৬ সনে প্রিন্স রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় ।

এই গল্পটি আমাদের কয়েকজনের, টমাস, পিকুল, চঞ্চল এবং প্রিন্সের ~~

ঢাকা।
৪ মার্চ, ২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

98 − 89 =