শ্রাবণের পানিচক্র

গল্পটা আমি তোমাকে বলব। জানি এই গল্পটা শোনার কোন ইচ্ছে তোমার নেই। তুমি শুনবেও না। তবুও তোমাকে বলব। গল্পটা আমার জীবনের নয়। গল্পটা তোমার জীবনের। অবশ্য তোমার জীবনের অংশ হয়ে আমি গল্পটার মাঝে নেই। আমার চরিত্রটা তোমার বিপরীতে। আমি গল্পের কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র নই। নিতান্ত সাদামাটা একটা চরিত্র আমাকে দেয়া হয়েছে। আমার ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত ছিল। আমি হই নি। যদি হতাম তাহলে এই গল্পটা তোমাকে আবার কখনও শোনাতাম না।

গল্পটার শুরুটা ঠিক কখন আমার জানা নেই। জানার চেষ্টাও কখনও করি নি। কিন্তু, একটা গল্প যে রচিত হতে যাচ্ছে, সেটা আমি প্রথম জেনেছিলাম খিলগাঁও রেল-গেটে। গল্পের নায়কের মুখেই আমি শুনেছিলাম। নায়কের একটা নাম দেয়া দরকার। তুহিন কেমন? নাহ! এই নামটা তিন-চারটা গল্পে ব্যবহার করে ফেলেছি। অন্য কিছু দরকার। শ্রাবণ? হ্যাঁ, এটা ভাল একটা নাম। তাহলে, তোমার নাম শ্রাবণী। হা হা হা! আশা করি, বুঝে গেছ তুমি গল্পের নায়িকা।

অবশ্য তুমি যে একটা চরিত্র সেটাই আমি প্রথম জানতে পেরেছি সেদিন খিলগাঁও রেল-গেটে। ‘তুমি প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটায় বাসাবো মাঠের কাছে অপেক্ষা করতে শ্রাবণের জন্য। ভাবটা এমন তুমি কোচিংয়ে যাচ্ছ। কিন্তু, ধরা পড়ে গিয়েছিলে ওর কাছে।’ অবশ্য, শ্রাবণকে তখন পর্যন্ত আমি একটা ছাগল হিসেবেই জানতাম। ওর কথা গুরুত্ব দেবার মত কোন বিষয় নয়। আবার সরাসরি ওর কথা আমি ফেলেও দিতে পারি না। যদি বুঝতে পারে, ওর কথা আমি অগ্রাহ্য করছি, তাহলে মনে কষ্ট পাবে। ওকে বললাম, ‘পরদিন যখন দেখা হবে, তখন একদৃষ্টিতে শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবি। এক বারের জন্যেও চোখের পাপড়ি ফেলবি না।’ এই একটা কাজের জন্য আমাদের সেই কতশত পরিকল্পনা। শ্রাবণকে প্রতিটি কাজ আমি কতভাবে বোঝাই। প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য আমার সেই কতশত উপদেশ। প্রেমে পড়ল ও আর প্রেম-বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলাম আমি।

হ্যাঁ, তোমার চোখে চোখ ও রেখেছিলে। তুমিও চোখ ফেলেছিলে ওর দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ও পারে নি। তোমার দৃষ্টিতে কি ছিল আমি জানি না। হয়তো তুমি নিজেও জানো না। শুধু জানে, যে স্রষ্টা তোমাকে সৃষ্টি করেছে। আর দ্বিতীয়ত জেনেছিল শ্রাবণ। দিনের পর দিন আমাদের তৈরি করা পরিকল্পনা বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল এক মুহূর্তের এক দৃষ্টিতে। এবং আমি বুঝেছিলাম, ‘তুমি খল বা নিখাদ যাই হও না কেন, শ্রাবণের ভালবাসা নিখাদ। তার মাঝে কোন কলুষতা ছিল না।’

আমাদের দু’জনের প্রতিটি সেকেন্ড কাটত বাসাবো মাঠে বসে থেকে। কখন তুমি আসবে। চোখের দেখার এক দৃষ্টি এতটা আকাঙ্ক্ষিত হতে পারে, কে ভাবতে পেরেছিল? আমি প্রতিটি বিকেলে সেই অপেক্ষা নিজের চোখে দেখতাম। কিন্তু, শ্রাবণের অনুভূতির কণামাত্র অনুভব করতে পারতাম না। আমি একটি ক্ষণের জন্যেও বুঝতে পারি নি, তোমার ওই বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে এমন মহনীয় কি ছিল যার জন্যে হন্যে হয়ে একটি ছেলে, তার প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করতে পারে।

ওর মাঝে কোন সন্দেহ ছিল না, তুমিও ওকে ভালবাস। ও বিশ্বাস করত, ও তোমাকে যতটা ভালবাসে তুমি ওকে তার চাইতেও বেশি ভালবাস। আমি বিশ্বাস করতাম না। শ্রাবণ তোমাকে যতটা ভালবাসে তার চেয়ে বেশি কেউ কাউকে কখনও ভালবাসতে পারে, এটা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। আমি জানি, ওর ভালবাসাটা ছিল শ্রাবণের আকাশে বিস্তৃত মেঘের মতই বিশাল। যারা কোন শেষ নেই। কখনও থাকেও না। এর চেয়ে বিশাল কিছু হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করতাম না।

আমি সবসময় ওকে তাড়া দিতাম, তোর ভালবাসার কথা শ্রাবণীকে জানা। ও বলত, কোন প্রয়োজন নেই। আমরা দু’জনেই দু’জনকে জানি। আমরা জানি আমাদের হৃদয়ে কি আছে? পবিত্র হৃদয়ে সৃষ্টি হওয়া ভালবাসাকে অপবিত্র মুখে আনলে তাকে অসম্মান করা হয়। আমি হাসতাম। ভালবাসা না’কি সবাইকে কবি করে দেয়। আর সবার কথা জানি না। কিন্তু, ওকে দেখে সত্যিই মনে হত ও কবি হয়ে গেছে। অনুভূতির কালিগুলো নিবের ডগায় এলোমেলো ছোটাছুটি করে। এবার স্রেফ কবিতার জন্য অপেক্ষা।

কবিতার পথে কবির প্রতিটি মুহূর্তে আমি তার সাথে ছিলাম। শুধু ছিলাম না সেই মহনীয় কিংবা দুঃস্বপ্নের ক্ষণে। শ্রাবণের সদা রৌদ্রজ্জ্বল আকাশে আমি সেদিন প্রথমবারের মত মেঘ দেখেছিলাম। সেই থেকেই বোধ হয় শ্রাবণের আকাশ ছেয়ে থাকে বিষাদ-মাখা একরাশ মেঘে। কবি কবিতাকে ধরতে চেয়েছিল সাদা-খাতায়। নিয়তির পাশাখেলায়, কলমের নিব ভেঙ্গে পুরো খাতায় ছড়িয়ে গিয়েছিল কালি। সাদা-খাতা আচ্ছন্ন হয়েছিল কালির কালিমায়। সেই থেকেই বোধ হয় শ্রাবণের মেঘের রং ধূসর। এবং তীব্র কলুষতা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

সত্যি করে আমায় বল তো, ওর অনুভূতির তিলসমও কি তুমি অনুভব করতে পার নি? সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ অনুভূতিকে কিভাবে তুমি অবহেলা করেছিলে? আমি বুঝি নি। আমি জানি না। এবং জানতেও চাই না।
____________________________________________________________________

তোমার সেদিনের অনুভূতি আমি বুঝি নি। ঠিক যেমন বুঝি নি, তোমার তারপরের অনুভূতিগুলোকে। আমার ছাগলটা ততদিনে মানুষ হয়ে গেছে। যেই ভালবাসা ও তোমার মাঝে পায় নি, সেটাই ও খুঁজে পেয়েছে পথের কোণায় অনাদরে পড়ে থাকা শিশুগুলোর মাঝে। এবং আমরা দু’জনেই ততদিনে বুঝে গেছি, ওদেরকে ভালবাসলে হারানোর ভয় থাকে না। ওদের ভালবাসলে স্বপ্ন দেখা যায়। স্বপ্নবাজ হওয়া যায়। ওদেরকে যতটা ভালবাসা দেবে, তার বহুগুণ ভালবাসা ওরা ফিরিয়ে দেবে। ওদের মাঝে কোন কুটিলতা নেই, কোন কলুষতা নেই, আছে স্রেফ এক সমুদ্র নিখাদ ভালবাসা। তোমার চেয়ে তা সহস্রাংশে উত্তম।

ওর নামটা বোধহয় এখন বদলে দেয়া দরকার। নতুন কিছু প্রয়োজন। ‘বৈশাখ’ কেমন? জানি, নাম হিসেবে বৈশাখ খুব বেশি উন্নতমানের নয়। তবু, সেই ওর সাথে এই শব্দটারই সাযুজ্য সবথেকে বেশি। সবকিছু ভেঙ্গেচুরে ও তখন আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করেছে। বৈশাখ তো বারবার শুরুই করে, তাই না?

বৈশাখ তখন ওর নিখাদ অসামাজিক ভালবাসাটুকু উজাড় করে দিয়েছে, একরাশ পান্থ-কুড়ির মাঝে। অজস্র সভাসমিতি, সংগঠনের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে, যেন তোমার দুঃসহ স্মৃতি থেকে ও মুক্তি পেতে পারে। ও নিজেকে মুক্ত করেছিল। কিন্তু, তুমি ওকে মুক্তি দাও নি। আমি আজ পর্যন্ত কোনদিন তোমার অনুভূতি বুঝতে পারি নি। সেদিনও নয়, যেদিন তুমিই বৈশাখকে জানিয়েছিলে, তুমি বৈশাখকে ভালবাস। আমি হতভম্ব হয় ওর কাছ থেকে শুনেছিলাম সবকিছু। সত্যি বলছি, আমি বুঝতে পারি নি, ভালবাসাকে তুমি কি ভাবে? গোলক? যতবার ফিরে আসবে ততবারই তাকে ফিরে পাবে! আমি বুঝতে পারি নি, তুমি বৈশাখকে ঠিক কি ভাব? মাটির পুতুল? না’কি রাতে গলির কোণায় পড়ে থাকা অভুক্ত কুকুর। যাকে একটু ভালবাসার পরশ বুলালে তোমার ভৃত্য হয়ে যাবে, একটা লাথি দিয়ে দুরে সরিয়ে দিলে তোমার কাছ থেকে সরে যাবে, আবার এক টুকরো রুটি তার দিকে ছুড়ে দিলে দৌড়ে তোমার কাছে ছুটে আসবে!

আমি শ্রাবণের মেঘ দেখিনি। আমি চৈত্রের খরতাপ দেখিনি। আমি ফাগুনের পলাশ দেখিনি। দেখিনি, আশ্বিনের কাশফুল, কার্তিকের সোনালী ধান কিংবা পৌষের কুয়াশা। কিন্তু, সেদিন আমি বৈশাখের কালবৈশাখী দেখেছিলাম। ভালবাসাটুকু বিধ্বস্ত হবার পর আমি সমুদ্রটাকে দেখেছিলাম অস্বাভাবিক শান্ত, নিস্তরঙ্গ, অনুভূতিহীন। কিন্তু, সেদিন আমি সেই সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস দেখেছিলাম। শহুরে চার-দেয়ালে আবদ্ধ হয়ে কালবৈশাখী না দেখার আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল। সেদিন আমি বৈশাখের মাঝে কালবৈশাখী দেখেছিলাম। সেখানে আর কোন ভালবাসা অবশিষ্ট ছিল না। সেখানে আর কোন ভালোলাগা অবশিষ্ট ছিল না। আমি সেখানে, ‘অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা’ আর তার সুনিবিড় ব্যথা দেখেছিলাম। আমি সেখানে লাঞ্ছিত বুকের বিষ-জ্বালা দেখেছিলাম।

বৈশাখের আকাশে পানিচক্রের ফেরে আসা কোন জলকণার জায়গা নেই। সত্যি করে বলছি, বৈশাখের মাঝে তোমার জন্য আর কোন ভালবাসা অবশিষ্ট ছিল না। সেটা ছড়িয়ে গিয়েছিল নির্দয় শহরের একরাশ নির্লোভ হৃদয়ের মাঝে। যারা ভালবাসাকে সম্মান করতে জানে, যার ভালবাসার মূল্য বোঝে। এবং জানে, ভালবাসার লাল যতটা তীব্র হয়, তাকে না পাওয়ার বেদনা ঠিক ততটাই নীল হয়। নিশ্চয় তুমি তা জানতে না।

ফেসবুক নোট পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

একই কাহিনী নিয়ে রচিত গল্প: গোলক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “শ্রাবণের পানিচক্র

  1. খুব সাধারণ একটা গল্প
    খুব সাধারণ একটা গল্প শুধুমাত্র আপনার ভাষার মাধুর্যের কারনে অসামান্য হয়ে উঠেছে। দারুন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. (No subject)
      :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. (No subject)
      :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 88 = 90