নির্জন সাক্ষর – ।১।২।৩।

১.

লালমাটিয়ায় একজন সাবেক সচিবের বাসায় উঠলাম আমরা। কয়েক মাসের জন্য। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাই, কৈশোর কাটিয়েছি যে মফস্বলে সেখান থেকে ঢাকায় এসে কোচিং করা কঠিন। লালমাটিয়া থেকে ওমেগা কাছেই, এই কারণেই স্থানান্তর। বাসাটা বাবার বন্ধুর, তিনি অবশ্য অনেক বছর আগেই মরে গেছেন, সেখানে তাঁর স্ত্রী থাকেন তাঁর দুই কন্যাসহ। ভদ্রমহিলার পুত্রসন্তান নেই, কন্যাদের একজন বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়ো আর অন্যজন অনেক ছোটো, তাই তিনি নিশ্চিন্তে একটি আঠারো-বছর-বয়সী ছেলে আর তার মাকে আশ্রয় দিয়ে চিরকৃতজ্ঞ করেছেন। আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে বাসার একটি ঘর।

ওমেগায় যাওয়া আসা শুরু করলাম আগ্রহ নিয়ে। দুইদিনেই চিড় ধরলো আগ্রহে, লেকচার বুঝি না, যেসব বইপত্র দিয়েছে সেসবের জটিল সব সমীকরণ দেখে মাথা ঘোরে। আমার রুহে কেউ ফিসফিস করে বলতে লাগলো, তোমারে দিয়া হবে না, তুমি কোনোদিনও ইঞ্জিনিয়ার হইতে পারবা না। আমি চেষ্টা করলাম ফিসফিসানি পাত্তা না দিতে, আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার, আমাকেও তাই তাঁর মতন ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। জোর করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পড়তে থাকলাম। কিন্তু, সময় যায়, পড়া আর আগায় না। বুঝতে পারলাম আসলেই আমাকে দিয়ে হবে না।

যেতে হয়, তাই যাই, আস্তে আস্তে ওমেগার সাথে এই সম্পর্ক তৈরি হল আমার। এই সময়ে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেলো। আমি প্রেমে পড়লাম।

লিলিয়ার সাথে আমার প্রথম দ্যাখা হয়েছিল সাভারেই। কলেজে সে আমার এক বছরের জুনিয়র ছিল। আমি জীবনের প্রথম আঠারোটা বছর কাটিয়ে দিয়েছি রক্তসম্পর্কহীন মেয়েদের সাথে কথা না বলে, আসলে, লজ্জা লাগতো আমার। সহপাঠিনীরাও তাই আমাকে দেখতো খানিকটা কৌতূহল নিয়ে, আর খানিকটা করুণা, কারো কারো চোখে অবশ্য চাপা বিদ্রুপও থাকতো। লিলিয়াকে প্রথম দেখি কলেজ বিল্ডিংয়ের বারান্দা থেকে, সায়েন্স আর কমার্স সেকশনের বিল্ডিং ছিল আলাদা, আমি সায়েন্সের ছাত্র হলেও অধিকাংশ সময় কমার্স বিল্ডিংএই কাটাতাম। এর কারণ ছিল, মেয়েদের সাথে কথা বলতে আমার লজ্জা লাগলেও, রূপসী মেয়েদের দেখতে একটুও লজ্জা লাগতো না। ওকে অবশ্য ঠিক রূপসীও বলা যাবে না, বেশ গাতুমগুতুম মেয়ে, দেখলে প্রথম মাথায় বেরালের কথা মনে আসে।

লিলিয়াকে অনেকদিন পরে দ্বিতীয়বার দেখি এক সন্ধ্যায়, শাহবাগ আন্দোলনের বছরে, একটা মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধুবান্ধবের সাথে। ততোদিনে সে সত্যিকার অর্থে রূপসী হয়ে উঠেছে। আর বিয়েও হয়ে গেছে ওর, পারিবারিকভাবেই একটা হিন্দু ছেলের সাথে, ছেলেও সম্ভবত মানিকগঞ্জেরই। কালীগঙ্গা নামে নদী আছে একটা মানিকগঞ্জে, খুব সুন্দর নদী, যেদিন ওর শুভ বিবাহের সংবাদটা পাই ইচ্ছে করছিলো অই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরে যেতে। মরে যাই নি, কবিতা লিখেছি ওকে নিয়ে। কয়েকটি। তার একটি কালীগঙ্গা।

কালীগঙ্গা ব্রিজ থেকে একদিন ঝাঁপ দেবো আমি
নিখোঁজ সংবাদ হবো, রাষ্ট্র হয়ে যাবে অতঃপর
যে কিশোর চেয়েছিলো তোমার অতলে ডুব দিতে
শুধু সে হারিয়ে গেছে ফেলে রেখে বিশ্বচরাচর

কান্নার মতন নদী বুকে টেনে নেবে নির্দ্বিধায়
দাহ বা দাফন ছাড়া শেষকৃত্য হবে অন্ধকারে
লাইলাক ফুলেরই গল্প; তবুও ঈশ্বর সাক্ষী থাক;
জলের কাগজে লিখে চলি আমি জন্ম জন্মান্তরে!

কালীগঙ্গা ব্রিজ থেকে একদিন ঝাঁপ দেবো আমি
জানি তুমি খুঁজবে না মেঘের ছায়ায় মৃতদেহ
যে কিশোর চেয়েছিলো তোমার সান্নিধ্যে মরে যেতে
সে শুধু হারিয়ে যাবে রেখে অন্তহীন সন্দেহ

নীল নয়, সিঁদুরের মতো লাল মেঘের সন্ধ্যায়
তোমার কষ্ট হবে বুক ভেঙে গেলে অকারণে
তখন বৃষ্টির কাছে জেনে নিও আমার ঠিকানা
জলের কতোটা কান্না শুধু যার অন্তর্যামী জানে!

অথচ ও প্রথমে ভেবেছিলো আমি রসিকতা করছি। যেহেতু মেয়েদের সাথে মেশার অভ্যাস ছিল না, তাই নির্বোধের মতো ওকে প্রপোজ করে বসেছিলাম, তখন আমাদের দুনিয়ায় নতুন আসা ফেসবুক যে অন্তরঙ্গ পরিচয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছিলো সেটাকে গাঢ় করার কোনো চেষ্টাই করি নি। যখন বুঝতে পেরেছে আমি রসিকতা করছি না, বিনীতভাবে নাকচ করে দিয়েছে আমার প্রস্তাব, বলেছে দ্যাখেন এইটা সম্ভব না।

স্বাভাবিক, পারিবারিকভাবে পৌত্তলিক সে, আর আমি একেশ্বরবাদী। ফার্টাইল ক্রিসেন্টেও কৃষকদের সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো যাযাবরদের। এই দ্বন্দ্ব অমীমাংসেয়। তাছাড়াও আমি ছেলে হিসেবে বিশেষ আকর্ষণীয় নই। কোনো অর্থেই না। ধর্ম এক হলেও হয়তো নাকচ করে দিতো। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছি।

রাজি হলেও সম্পর্কটা পরিণতিতে নাও পৌঁছুতে পারতো। একটা আধা বাঙালি অমুসলিম মেয়ের জন্য নিজের ফ্যামিলির সাথে ঝামেলা যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার হত কিনা সন্দেহ। আচ্ছা, বলা হয় নি যেটা, ওর রুশ গ্রিক অর্থোডক্স মা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ওর বাঙালি হিন্দু বাবাকে। সোভিয়েত আমলের গল্প। মস্কোপন্থী বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত যুবকরা স্কলারশিপ নিয়ে রাশিয়ায় পড়তে যেতেন, কেউ কেউ শিক্ষাজীবন শেষ করে, একটি রুশ বৌ নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসতেন। লিলিয়ার বাবামাকেই তো অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। মা যেই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছেন, মেয়েকেই সেই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হবে, এটা তো অনিবার্য নয়।

প্রেম না করলেও বন্ধু থাকতে পারতাম আমরা। ইচ্ছাকৃতভাবেই থাকি নি। আমাদের গল্পও শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেছে।

বাবা যেহেতু সাভারেই, ইপিজেডে এক সুইডিশ মালিকের গার্মেন্টস কোম্পানিতে চাকুরিসূত্রে, তাই লালমাটিয়া থেকে মাঝে মাঝে সাভার যেতাম। যেদিন রেজাল্ট দিলো এইচএসসির সেদিন সাভারেই ছিলাম। এসএসসিতে ভালো করেছি, কলেজে উঠে পড়াশোনায় আগ্রহ অনেক কমে গেছিল, তাই খুব ভালো ফল আশা করছিলাম না।

কিন্তু যেই রেজাল্ট আসলো স্রেফ অবিশ্বাস্য সেটা। আমাদের কলেজে সায়েন্স থেকে এ প্লাস পেয়েছে সবাই, একজন বাদে, সেই একজনটা আমি। মাথায় মনে হল আস্ত আকাশ ভেঙে পড়লো।

এই রেজাল্ট নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংএ এপ্লাই করাই অর্থহীন। বাবা আর মা দুজনই আমাকে নিয়ে হতাশ। আমি নিজেই হতাশ। বাবা একবার বললো, তার বন্ধুর বাসা থেকে সাভারে চলে আসতে, শুধু শুধু আর ঢাকায় থেকে কী লাভ? মা বললো থাক, বুয়েট রুয়েটে পড়া যখন কপালে জুটলো না, তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার ট্রাই করে দেখুক। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে অবসেসড থাকায় এই দেশে যে অনেকগুলো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় আছে আর সেখানে যে ভর্তি হওয়া যায় সেটা আগে মাথায়ই আসে নি আমার। উৎসাহে বুক বেঁধে রওনা করলাম ঢাকার দিকে।

ফিজিক্সকেমিস্ট্রি পড়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না আমার। ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়লে আর সায়েন্সেই থাকবো না। এক আত্মীয় বললেন ঢাবির আইবিএ খুব ভালো। ডি ইউনিটেও দাও। মা বললো, জাহাঙ্গিরনগর ইউনিভার্সিটিও ভালো, ট্রাই কর। আমি আর কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলাম না। বললাম বাসায় পড়বো। গাইড কিনে এনে। তাই করতে লাগলাম। আইবিএতে ভর্তি হওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে লাগলাম। আর কোনো প্রিপারেশন নেয়া হল না আমার। শুনেছি ডি ইউনিটে মূল ব্যাপার জেনারেল নলেজ। ছোটোবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়ি, পত্রিকা পড়ি, সুতরাং অই জিনিশের অভাব নাই আমার।

আইবিএ পরীক্ষার সিট পড়লো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ক্লাসরুমে, সেই সময় বিভাগটা কলাভবনে ছিল, পরবর্তীতে এটা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে স্থানান্তরিত হয়। আমি যখন রুদ্ধশ্বাসে পরীক্ষা দিচ্ছি অই ক্লাসরুমে বসে, তখন জানতাম না, একদিন এখানেই নিয়মিত ক্লাস করবো আমি। বা, সত্যি কথা বললে, ক্লাস করবো অনিয়মিতভাবে।

ইঞ্জিনিয়ারিংএ পড়তে না পারার কষ্টটা ঠিকই ছিল। আমাকে তখন মানসিকভাবে ধরে রেখেছিলো একটা বই। তপন রায়চৌধুরীর বাঙালনামা। বইটা প্রায় অলৌকিক ছাপ ফেলেছে আমার ওপর, তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কিন্তু সুখপাঠ্য লেখা আমাকে অজানা কারণে ভরসা দিতো, মনে হতো বইয়ের অক্ষরগুলো আমাকে বলছে এতো হতাশ হওয়ার কিছু নাই। জীবন অনেক মূল্যবান, একটা প্রয়াসে ব্যর্থ হলে সাফল্য আসবে আরেকটায়, ধৈর্য না হারিয়ে স্রেফ লেগে থাকতে হবে। আমি তাই বইয়ের অক্ষরগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতাম। ইতিহাসের এক অদেখা অধ্যাপক সেই সংকটসময়ে আমাকে যতোটা ভরসা দিতে পেরেছেন, কোনো রক্তমাংসের ব্যক্তি, পারেন নি ততোটা।

উইথআউট এনি প্রিপারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম, ডি ইউনিটে প্রথম ১০০ জনে আমি একজন, জাহাঙ্গিরনগরেও একই কাহিনী। আইবিএতে টিকলাম না। তাতে দুঃখ নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছি এটাই বড়ো ঘটনা, যদিও মা চেয়েছিল আমাকে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে। বাবা হেসে উড়িয়ে দিল এই বিকল্প প্রস্তাব। আমাদের নিজেদের ফ্ল্যাট তখন তৈরি হচ্ছে জিগাতলায়। আর কটাদিন পরেই সেখানে গিয়ে উঠবো আমরা। বাবা অফিসের গাড়িতে করে জিগাতলা থেকে সাভারে গিয়ে কাজ করবে, তবু ছেলে পড়ুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে। মাও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। আমি তো ঢাকায় যেতে উন্মুখ হয়ে ছিলাম। কৈশোর থেকেই আজিজ মার্কেটের গল্প শুনে বড়ো হয়েছি, আর সেই আজিজ মার্কেট নাকি আমার ক্যাম্পাসের পাশেই, শাহবাগে! সাভারে তো ভালো বই পাওয়াই কঠিন ছিল, বইয়ের স্বর্গ ঢাকা, পরে আমি আবিষ্কার করবো নীলক্ষেতের বাকু শা মার্কেট শাহবাগের আজিজ মার্কেটের চেয়েও বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যার বিশাল জগৎ খুলে যাবে আমার সামনে। তাই সপরিবারে সিদ্ধান্ত হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বো।

এই সিদ্ধান্তটা জীবনের সবচে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি সবচে ভুল, সে সম্পর্কে কোনোদিনই নিশ্চিত হতে পারবো না।

২.

জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা একটু অদ্ভূত। স্কুলে থাকতে দুইজন প্রাইভেট টিউটর ছিলেন আমার, দুজনই জাবির ছাত্র, সেই সূত্রে ক্যাম্পাসে যাওয়া আসা হত নিয়মিত। ক্যাম্পাসটা খুব সুন্দর, বিশেষত শীতকালে যখন সাইবেরিয়া থেকে পাখি আসে, আমি মাঝে মাঝেই এই ক্যাম্পাসে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু ওখানে আমার কোনো আত্মীয়স্বজন পড়তো না। পড়ে আমার প্রিয়তম বন্ধু ভর্তি হয় ওখানে। আমিও হতে পারতাম। হলে আমার জীবনের গল্পটা সম্ভবত অন্যরকম হত।

দশ বছর থেকেছি ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশে, একটা নীল রঙের ভাড়া বাড়িতে, বাড়িওয়ালা তাবানি বেভারেজ লিমিটেড কোম্পানির এজেন্সি নিয়েছিলেন বলে বাসাটা এলাকায় পরিচিত ছিল কোকাকোলা বিল্ডিং নামে। আমার শৈশব কৈশোর সাবানের গন্ধে ভরে আছে, কারণ সেই বাসার পাশে সাবানের কারখানাও ছিল, সেটাও বাড়ির মালিকেরই। এমন অনেকদিন হয়েছে, আমি উপলক্ষ্য ছাড়াই ঘুরতে গেছি জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হেঁটে হেঁটে ফিরেছি বাসায়।

আর্মি স্কুলে পড়েছি। যদিও যাকে ডিসিপ্লিন বলা হয়, শিখি নাই। সত্যি কথা বলতে শেখার চেষ্টাও করি নাই। অর্ডার হায়ারার্কি এসব আমার ভালো লাগে না, কোনোদিনই লাগে নাই, যখনই সুযোগ পেয়েছি চেষ্টা করেছি আইনশৃঙ্খলা ভাঙার। কিছু ভালো শিক্ষক আর কিছু অসাধারণ বন্ধুবান্ধব। একটা ইউক্যালিপটাস গাছ। সবুজের পর সবুজ ঘাস ছড়িয়ে থাকা মাঠ। প্রতি বছর স্পোর্টসের সময়টা আসলে, যেহেতু খেলাধূলা ভালো পারি না তেমন, স্যারদের হাত থেকে গা বাঁচানোর চেষ্টা। তাহমিনা মির্জা নামের একজন শিক্ষক ছিলেন আমাদের। ক্লাসে একবার বেত নিয়ে এসেছিলেন, কেউ যদি পড়া না পারে, পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলবেন এই ভয় দ্যাখাতে। আমি আর আমার এক বন্ধু মিলে সেই বেত চুরি করে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিলাম। স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল। এসএসসির পরে আমাদের নিয়ে গেছিলেন নন্দন পার্কে। মজার মানুষ ছিলেন। একবার কি কারণে আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ওভারস্মার্ট হয়ে গেছো, এই অভিযোগটা আমার বিরুদ্ধে পরেও আসবে অনেক। ওভারস্মার্ট ছিলাম না। তবে ঘাড়ত্যাড়া ছিলাম। আর জেদি ছিলাম। বয়সের সাথে সেই জেদ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। স্কুল থেকে রাস্তা ক্রস করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, যদিও খুব শখ ছিল নটরডেম কলেজে পড়ার, কিন্তু সেই শখ পূরণ হয় নাই। পরে মনে হয়েছে না হয়ে ভালোই হয়েছে। আমার মতো ছেলে নটরডেমে পড়তে পারতো না। কলেজ লাইফ কাটিয়ে দিয়েছি গান শুনে শুনে। তখন দুইটা এফএম রেডিও নিয়ে মাতামাতি খুব। টুডে আর ফূর্তি। রাত জেগে রেডিও শুনে কানের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছি তখনই, সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা আমার অভ্যাস, অপরিবর্তনীয় অভ্যাস। কলেজে আমি দুইটা সাবজেক্ট মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। বাংলা আর ইংরেজি। এটা পরে এডমিশন টেস্টের সময় কাজে এসেছিলো। সায়েন্সের কোনো সাবজেক্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ি নাই। দুই বছরে বায়োলজি ল্যাব করেছি দুই দিন। ফাইনাল পরীক্ষার আগে মাহমুদা ম্যাম আমার প্র্যাকটিকাল খাতা সাইনই করতে চান নি প্রথমে, শেষ পর্যন্ত করেছিলেন যদিও। অশেষ বিরক্তি নিয়ে।

কবিতা লিখতাম স্কুলে থাকতেই, হত না কিছুই। এখনো হয় কিনা সেই সম্পর্কে নিশ্চিত নই। হয়তো হয়, হয়তো হয় না, জানি না। জীবনানন্দ দাশ আর আল মাহমুদের কবিতা আমাকে তিমিরবিনাশী আগুনের মতো গ্রাস করে নিয়েছিল, আব্দুল মান্নান সৈয়দের স্মৃতির নোটবুক মায়া জাগিয়েছিলো, মনে হয়েছিলো যদি জন্মাতাম ষাটের দশকে আমি। বন্ধুরা আমার কবিতা লেখাটাকে সিরিয়াসলি নিত না। তবে আমি নিতাম, কালের কন্ঠের সূচনালগ্নে শিলালিপির সংখ্যাগুলো দুর্দান্ত হত, সারা সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকতাম শিলালিপি পড়ার জন্য। আর ছিল রাজনীতি। কালের কন্ঠের আগে প্রথম আলো রাখতো বাসায়। খুব অল্পবয়সেই রাজনীতিতে তুমুল আগ্রহ ছিল আমার। যদিও প্রথম আলোর মতাদর্শ দ্বারা মিসগাইডেড ছিলাম, আসক্ত হয়ে গেছিলাম এক ধরণের উদারনীতিবাদে। এক এগারোর সময় সমর্থক ছিলাম সামরিক বাহিনীর, পরে অবশ্য সন্দেহ জন্মেছিলো ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনদের অভিপ্রায়ে। লীগ বিএনপির ভয়ংকর ভায়োলেন্ট রাজনীতি দেখতে দেখতে আমরা যারা ক্লান্ত ছিলাম, আমাদের সেই মফস্বলে বাম রাজনীতির তেমন কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতিও যেখানে ছিল না, সেখানে এক এগারো ধাঁচের সিভিল-সামরিক শাসন অথবা ইসলামপন্থী রাজনীতি ছাড়া আর কী আকর্ষণীয় মনে হতে পারতো? জামায়াতে ইসলামি যদি বৈষয়িক স্বার্থে লীগ বিএনপির লুটপাটের রাজনীতির ছোটো তরফের অংশীদার না হয়ে যেতো, আমাদের অনেকেরই ইসলামপন্থী হওয়ার কথা ছিল, আমার পরিবার অবশ্য ঐতিহ্যগতভাবেই জামায়াত বিরোধী।

সাভার একটা ছোটো শহর ছিলো আমাদের জন্য, বা আমরা যেহেতু খুব ছোট ছিলাম, শহরটাকে ছোটো মনে হতো। কিন্তু সেই ছোট শহরেই মহাপৃথিবীর সন্ধান পেয়ে গেছিলাম একটি ছোট্ট দোকানে, দোকানের নাম প্রগতি, রাস্তাঘাটে রিকশা এড়িয়ে আর কাদা পেরিয়ে অন্ধকার অলিগলি হয়ে আমি পৌঁছে যেতাম দোকানটায়। মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেতাম প্রগতিতে, গোর্কির মা থেকে শুরু করে পুশকিনের ক্যাপ্টেনের মেয়ে পর্যন্ত পড়ে ফেলেছি খুব অল্পবয়সেই, আর কিনতাম পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় সব লেখকদের বই।

আমি পড়তে ভালোবাসি আমার মা সেটা জানতো। তাই যখনই টাকা চেয়েছি মুক্তহস্তে দান করেছে। কখনোই জানতে চাই নি সংসার কিভাবে চলে, অথচ বাবার সীমিত আয়ের সংসার, একমাত্র সন্তানরা স্বার্থপর হয় সম্ভবত।

সেই স্বার্থপর আমি যাবো রাজধানি শহরের দিকে। ধূলা আর ধোঁয়ার সাথে আত্মীয়তা করার জন্য। আমার বাবামাকে নিয়ে। নিজেদের বাড়িতে থাকবো। পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। মনে হচ্ছে জীবন তো সেটেল হয়ে গেছে, কয়েক বছর মাত্র, পাশ করে ফরেন সার্ভিসের চাকুরি তো নিশ্চিত। নিয়তির মুচকি হাসি শুনতে পাই নি আমি।

৩.

ভর্তিসংক্রান্ত জটিলতা শেষ হতে না হতেই আমি একটা বেশ বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ে গেছিলাম। ফেলানির খুন হওয়ার বছর সেটা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খামোখাই ঘুরে বেড়াই, একদিন দেখি প্রপদ নামে একটা সংগঠন সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি পাঠচক্র করছে। আমার কৌতূহল জাগলো। বাম রাজনীতি সম্পর্কে একটা অস্পষ্ট ধারণা ছিল। একটু বোকাসোকা প্রকৃতির ভালোমানুষেরা করে, সুন্দর সুন্দর কথা বলে, যারা কোনোদিন ক্ষমতায় যায় না। আমার মনে হল এরাও এই ঘরানারই হবে। ফেলানির হত্যাকাণ্ড আমার রক্ত ঠাণ্ডা করে দিয়েছিলো, ঘৃণা জেগেছিলো ইন্ডিয়ার প্রতি, সেই অনুভূতি নিয়ে গেলাম সেই পাঠচক্রে।

ডাকসু ভবনের দোতালায়। একটা ছোটো কক্ষে খুব ইনফরমালি আলোচনা হচ্ছে। খয়েরি রঙের চাদর গায়ে দেয়া এক লোক, নাম শান্তনু সুমন, সিরিয়াসলি শুনছে আলাপ। আরেকজন মাসুদ খান, এমনিতে খুব হাসিখুশী মানুষ, কিন্তু বিএসএফের জান্তবতা নিয়ে কথা বলতে গেলে ন্যায়সঙ্গতভাবেই রাগে কাঁপতে থাকেন। দুজনকেই ভালো লাগলো। পরে একদিন জানতে পারবো এই লোকগুলা মাওইস্ট, সিরাজ সিকদারের অনুসারী, যাঁদের ইন্ডিয়ান কাউন্টারপার্টদেরকে সেই দেশের সব সরকার সবচে বড়ো ইন্টারনাল থ্রেট হিসেবে দ্যাখে। তখনও অবশ্য আমি চিনি না এদের কাউকেই।

আলোচনা শুরুর মিনিট দশেকের মধ্যেই, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা এসে হানা দিলেন সেখানে, পণ্ড করে দিলেন পাঠচক্র। এদের মধ্যে খুব সম্ভবত বদিউজ্জামান সোহাগও ছিলেন। তখন বুঝি নি, এখন বুঝতে পারি সেই দুইহাজারনয় থেকেই আওয়ামি লিগ সরকার ক্ষমতায় আছে ইন্ডিয়ার একক কৃপায়, তাই বাংলাদেশের যে-কোনো জায়গায় ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ছোটোখাটো কোনো রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতাও তার সহ্য হয় না। এরা আমার ভর্তির কাগজপত্রের ফাইল নিয়ে গেছিলেন। একজন আমার কোমরে পিস্তল ঠেকিয়ে বলেছিলেন আমার সাথে এদের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে কিনা, কপালগুনে বেঁচে গেছি, কারণ ওদের আরেকজন আমার হাবভাব দেখে হেসে বলেছিলো আরে এইটা একটা নতুন পোলা ছাইড়া দেন এইটারে। পরে আমার ভর্তির কাগজপত্রের ফাইল ফেরত পাই। সেদিনে একটা বিয়ের দাওয়াত ছিল, বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, অনেক কষ্টে বাসায় বাবামাকে বুঝ দেই একটা ঝামেলায় আটকে গেছিলাম এইসব বলে।

ক্যাম্পাসে আসতে না আসতেই এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হয়ে আমি হতবাক হয়ে গেছিলাম। রাজনীতির প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় ভরে উঠেছিল মন। লীগ বিএনপির ভায়োলেন্ট রাজনীতি সম্পর্কে জানতাম থিওরিটিক্যালি। কিন্তু কোমরে পিস্তল ঠেকালে যে নিঃশ্বাস দ্রুততর হয়, জিব শুকিয়ে আসে আতঙ্কে, এই অভিজ্ঞতা ছিল না আমার। আওয়ামি লিগ সরকারের ওপর প্রচণ্ড রাগ হল। রাজনীতি ব্যাপারটার ওপরই। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি মেঠো রাজনীতিতে জড়াবো না।

শাহবাগের আজিজ মার্কেটে যাতায়াত শুরু হয়েছে সবে। আহমদ ছফারা নাকি একসময় আড্ডা দিতেন এখানে, আমি তেমন কাউকে খুঁজে পাই নাই। সন্দেশ থেকে একদিনে একটা বই কিনে ফেললাম। ইয়স্তাইন গার্ডারের একটা বই সাভারে থাকতেই পড়েছিলাম, থ্রু দি গ্লাস ডার্কলি, অদ্ভূত বই। সেই ভরসাতেই কিনে ফেললাম তাঁর সোফির জগৎ। জি এইচ হাবিবের তর্জমা স্পেলবাউণ্ড করার মতো। পরে এই লেখকের সাথে জালিয়াতি করেছে সন্দেশ, আর তাঁর বইটা পুনঃপ্রকাশ করেছে সংহতি।

শাহাদুজ্জামানের আরেকটা বই, চলচ্চিত্রবিষয়ক, এই সময়েই কিনলাম। এই বইটা আমার মধ্যে ঘোর তৈরি করলো। প্রথমে মনে হলো চলচ্চিত্র পরিচালক হতে হবে। তারপর মনে হলো, না, আমি চলচ্চিত্রবোদ্ধা হব। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির অফিসে গেলাম একদিন। শেষে বুঝলাম আমাকে দিয়ে চলচ্চিত্র হবে না।

এর মধ্যেই ডিপার্টমেন্টে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। আমি ক্লাস করি। ভালো ছেলের মতো মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনি। নিয়মিত নোট নেই। একাডেমিক বইপত্র পড়তে সেমিনার রুমে যাই, সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে যাই, ইউনিভার্সিটি লাইফে খেটেখুটে পড়াশোনা করবো এই পণ করেছি। আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলে বেড়াই। তখন আমার নতুন শখ হয়েছে ছবি তোলা। শস্তা ক্যামেরা দিয়ে। রোদে ঘুরে ঘুরে। বিষ্টিতে ভিজে ভিজে। কোনোদিন চারুকলায় যাই। আর কোনোদিন কার্জনে। দুপুরে জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনে গিয়ে খাবার খাই। থাকি ফুপুর বাসায়। ক্লাসের কয়েকটা ছেলেমেয়ের সাথে আমি খাতিরও জমিয়েছি। মেয়েদের সাথে মিশতে না পারার যে স্বভাব ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেটা কেটে গেলো। কিন্তু রোদবিষ্টিতে ভিজে ছবি তোলার বাতিক শরীর নিতে পারলো না বেশিদিন, ফলাফল ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম পহেলা বৈশাখটা ক্যাম্পাসের রঙে আর ঢঙে উদযাপন করতে পারলাম না আমি, টাইফয়েড বাঁধিয়ে শয্যাশায়ী হলাম এক মাসের জন্য।

(চলবে…)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 − 49 =