চা-পাতির আড়ালের কাহিনী

বন্ধুত্বের গভীরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে সুমন আর শাওনকে যারা চিনেন তারা তাদের উদাহরণ টেনে ধরেন।
ভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্ট আর একই হলে থাকে সুমন আর শাওন;এমনকি দুজন ঘুমায় একই বালিশে!

খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা,ঘুরাঘুরিতে কেউ কোনোদিন শাওন কিংবা সুমনকে একা দেখেনি।
এমনকি গ্রীষ্মকালীন ছুটি কিংবা রমজান মাসের বন্ধের সময় একজন আরেকজনের বাড়িতে গিয়ে কাটায়।

সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ ছিলো সুমনের জন্মদিন।
শাওন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছে, “তোর মতো বন্ধু থাকলে গার্লফ্রেন্ডের দরকার নাই, শুভ জন্মদিন আরেকটা ‘আমি’!”

দেখতে দেখতে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝি সময়,সুমন একটা একাডেমীক কোচিং এ ক্লাস নেয়ার সুযোগ পেলো।
একটা সময় ডিপার্টমেন্টের ক্লাস করার চেয়ে ঐ কোচিং এ ক্লাস নেয়ার প্রতি সুমনের উৎসাহ, আগ্রহ,উদ্দীপনা সবই বাড়তে থাকলো।

কোচিংএ ক্লাস করানোর সম্মানীর চেয়ে কোচিং এর সুন্দরী মেয়ে উর্মির প্রতি দূর্বলতাটা তার এ আগ্রহের মূল কারণ!

ক্লাস শেষে যখন সুমন বাইরে বের হয় মাঝে মাঝে তখন ঐ দিনের ক্লাসের কয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয় উর্মি।

কোচিং এর নিয়ম অনুযায়ী যখন উর্মি ‘সুমন ভাইয়া’ বলে ডাক দেয় তখন সুমন ভূত দেখার মতো উর্মির দিকে একপলক তাকিয়ে থাকে।
এক সময় হাতে-পায়ের কাঁপুনি ও শুরু হয় পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে হৃদকম্পন বাড়তে থাকে।
ভালোমতো প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে সুমন যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে।

উত্তর জেনে চলে যাবার সময় উর্মির মুচকি হাসির মধ্যে সুমন খুঁজে পায় এক চিরচেনা ভাষা।

সে মনে করে, উর্মির এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা উত্তর জানার জন্য নয় বরং সুমনের সাথে কথা বলার জন্য।

বন্ধু সুমনের মধ্যে এই আকস্মিক পরিবর্তন খুব সহজে ধরা পরে শাওনের চোখে।
শাওন লক্ষণ বুঝতে পারে,কিন্ত সুমন বলতে লজ্জাবোধ করে।
শাওনের চাপের মুখে পড়ে একসময় সুমন সবকিছু খুলে বলে।

বন্ধুর সিরিয়াসনেস দেখে শাওন কয়েকটা ‘টিপস’ দিলো সুমনকে।
মাষ্টারমশাই সুমন ক্লাস শেষের প্রশ্নোত্তর পর্বে আকারে- ইংগিতে গল্পের ভঙ্গিতে উর্মিকে তার মনের চাহিদা বুঝানোর চেষ্টা করে।

একসময় চাহিদা আর যোগান একটা ভারসাম্য অবস্থায় পৌঁছায়।
সূচনা হয় সুমন-উর্মি জুটির।

সময় চলে যাচ্ছে তার বহমান গতিতে,সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে গভীরতা পাচ্ছে সুমন-উর্মি জুটির।
উর্মি মাঝে মাঝে সুমনের জন্য বাসা থেকে রান্না করে নিয়ে আসতো।
খাবার হলে নিয়ে গিয়ে সুমন-শাওন ভাগাভাগি করে খেতো।

মাঝে মাঝে শাওন তার ‘ভাবীর’ হাতের রান্না নিয়ে রসিকতাও করতো।সুমন উর্মিকে শাওনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।

একদিন সুমন ওয়াশরুমে থাকাবস্থায় উর্মি ফোন করলো।
তখন শাওন ফোন রিসিভ করে তার ভাবীর সাথে একটু হাসি-তামাসা করলো।

Call duration চেক করতে গিয়ে সুমন যখন দেখলো ৭ মিনিট ২৪ সেকেন্ড তখন কেনো জানি সুমনের ঈর্শ্বা হলো।কিন্ত কিছু বললো না।

এভাবে আরো কয়েকদিন শাওন উর্মির ফোন রিসিভ করে কথা বললো।কিন্ত তাদের কথা বলাবলির মধ্যে কোনো রকম বিশ্বাসঘাতকতা ছিলোনা। এমনি কথা বলা আর কী….

একদিন এভাবে কথা বলতে দেখে সুমন শাওনের প্রতি প্রচন্ড রাগান্বিত ভাষায় কথা বললো।
কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি পর্যন্ত লেগে গেলো। সময়মতো তাদের রুমমেট শরিফ না আসলে কোনো একটা অঘটন ঘটে যেতো ঐখানে।

দুবন্ধুর ইস্পাত কঠিন বন্ধুত্বের মাঝখানে কাল হয়ে দাঁড়ালো একটা মেয়েকে মিয়ে ভুল বুঝাবুঝি।

কঠোর পরিশ্রমে গড়া ইমারত, ভূমিকম্পের ফলে মুহূর্তের মধ্যে যেনো ভূমিসাৎ হয়ে গেলো!

ঐদিকে উর্মির এইচএসসি পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসলো, পরীক্ষার প্রস্ততির জন্য সুমন নিজেই প্রস্তাবনা করলো তাদের কথাবার্তা একটু কমিয়ে দেয়া উচিত।উর্মি হাজারবার বারণ করা স্বত্তেও সুমনের অনুরোধের ফলে কথাবার্তা কমানো এবং পরীক্ষার প্রস্ততির দিকে মন দিতে সাব্যস্ত হলো।

এই কয়েকদিন যেনো সুমনের কাছে কয়েক বছরের সমতূল্য মনে হতে লাগলো।
প্রতিদিন উর্মির সাথে হাতেগুণা ৫-৭ মিনিট ফোনে কথা বলা আর অন্যদিকে শাওনের সাথে ভুল বোঝাবুঝির ফলে তার ব্যক্তিগত রুটিনে আনতে হলো পরিবর্তন।
এ যেনো বন্ধুহীন, নিঃসঙ্গ জীবনচলা…।

উর্মির এইচএসসি পরীক্ষা শেষ, ঐদিকে তার চাচা আসছেন আমেরিকা থেকে পরিবার নিয়ে ছেলেকে বিয়ে দেবেন।

ভার্সিটি কোচিং এর সময় শফিক নামের একজন সুদর্শন স্যারের সাথে উর্মির পরিচয়।
মাঝে মাঝে ক্লাস শেষে ঐ ক্লাসের কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো,তারপর মুচকি হেসে চলে যেতো…..।

অনার্স ফাইনাল ইয়ারে যখন পড়ালেখা নিয়ে সুমন ব্যস্ত,আগের মতো উর্মিকে সময় দিতে পারছেনা, তখন শফিক স্যারের সাথে উর্মির সম্পর্ক ঠিক সুমন-উর্মি জুটির মতো শফিক-উর্মি জুটি হিসেবে চলতে লাগলো।

দূর্ভাগ্যক্রমে শফিক ছিলো তখনকার সুমনের ‘শত্রু’ শাওনের বন্ধু।
শাওন যখন শফিকের কাছ থেকে উর্মির ব্যাপারে জানলো তখন সে সুমনকে লেলিয়ে দিলো।

চুপিসারে একদিন সুমন ঐ কোচিং সেন্টারে গিয়ে শফিক-উর্মি জুটিকে হাতেনাতে ধরলো!

সুমনকে উর্মি চিনেনা বলে জানালো।
যখনই সুমন রিয়েক্ট করতে গেলো শফিক বাধা দিলো।

বেধে গেলো সুমন-শফিক নতুন দ্বন্দ্ব!

এই হাতাহাতি কেবল ঐখানেই সীমাবদ্ধ ছিলো না,ভার্সিটি রাজনীতিতে সুমন-শফিক ছিলো দুই গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।

একসময় ঐ দ্বন্দ্ব ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে’ রূপ নিলো।
চা-পাতির আঘাতে আহতও হলো বেশ কয়েকজন!

দুইসপ্তাহ পর উর্মি বিশেষ কয়েকটি চিঠি তার কয়েকজন স্যারকে পাঠালো।
তন্মধ্যে ছিলেন তার গৃহশিক্ষক দুজন শামিম এবং শাহিন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক, কলেজের ১জন আর কোচিং এর ঐ দুই শিক্ষক সুমন আর শফিক।
তাছাড়া আরেকটা চিঠিও পাঠিয়েছিলো সুমনের সাবেক বন্ধু শাওনকে।

চিঠির খাম খুলে সবাই দেখে ছাপার অক্ষরে সেখানে লেখা, “Urme weeds Siam”
প্রবসী চাচাতো ভাইয়ের সাথে উর্মির বিয়ে..!

উর্মির সাথে সবার সম্পর্ক এক,কিন্ত সবার সাথে উর্মির সম্পর্ক তো এক না।

উর্মির সম্পর্ক তো সিয়ামের সাথে সেই বাল্যকাল থেকে,যখন তাদের উভয়ের বাবা তাদের বিয়ে দেবে বলে সংকল্প করে!

জীবনে ধূমপায়ী বন্ধুদের সাথে মেশা থেকে বিরত থাকা সুমন আজ মদ,গাঁজা,ইয়াবা ছাড়া দিনযাপন করতে পারেনা।

এমনি একদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো তখন দেখতে পেলো উর্মি বিয়ের কেনাকাটা শেষ করে সিয়ামের সাথে খিলখিল করে হেসে রাস্তা পার হয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলো।

উর্মির সেই মায়াবী হাসির মধ্যে সুমন আজ আর কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেনা।
রাগে-অভিমানে,হিংসায় মাতাল সুমন দৌড়ে গিয়ে রাস্তার ঐ পাশের মাংস বিক্রেতার চা-পাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বন্য পশুর মতো উর্মির উপর!

উর্মি কুপোকাত!!!

সুমন আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তার মতো আরো ৪-৫ জন চা-পাতির নিয়ে আসছিলো, সুমনকে চা-পাতি দিয়ে আঘাত করতে দেখে তারা থেমে যায় এবং উল্টো দিকে হাটা শুরু করে।
তাদের একজনকে সুমন চিনে,সে হলো শফিক!

অবলা নারীর উপর বর্বরোচিত আক্রমণের জন্য বিক্ষোভের ঝড় বয়ে উঠলো!
উর্মি হত্যাকারীর ফাঁশির দাবি তুললো বিক্ষুব্ধ জনতার শতভাগ আন্দোলনকারী।

‘ধোয়া তুলসীপাতা’ উর্মি হত্যাকারীর ফাঁশির রায়ে উর্মির পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বিচারদাবী করা জনতা আঙ্গুল দিয়ে V চিহ্ন দেখাচ্ছে সেরকম একটা ছবি রায়ের পরেরদিনের সবগুলো দৈনিক পত্রিকায় ছেপেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “চা-পাতির আড়ালের কাহিনী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1