ছোটগল্পঃগন্ধপোকা

গন্ধপোকা

(ছোটগল্প)
যিযাম এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে,পিতা রহমত মিয়া মধ্যবিত্ত চাষী।যিযামের সপ্ন বিরাট বড় লোক হওয়া।তার থাকবে একটি বিশাল বাড়ি।সুস্মিতা নামক একটা হিন্দু মেয়ে কে পছন্দ যিযামের।সেই সুস্মিতা হবে ওর অর্ধাঙ্গীনি।বাড়িতে সুস্মিতা আর আব্বা আম্মাকে নিয়ে থাকবে।নিজের আর সুস্মিতার জন্য থাকবে দুটো লাল গাড়ি, আব্বা আম্মার জন্য স্পেশাল একটা নীলা গাড়ি।বাড়িতে আরো থাকবে কাজের লোক যারা সর্বদা ওর হাত পা টিপে দিবে।যা ফরমায়েশ দিবে সাথে সাথে সেগুলো এনে সামনে হাজির করবে।এক পাশে থাকবে আব্বা আম্মার এসি রুম,তাদের জন্য দুজন লোক রাখা হবে যারা সর্বদা আব্বা আম্মার সেবা করবে।তবে বড় লোক হতে যিযাম কে তো শিক্ষিত হতে হবে মা বলেন।বিএ,এমএ পাশ করে ভাল চাকুরী নিতে হবে তারপর না হয় টাকা আসবে।ও সবে মাত্র ক্লাশ নাইনের ছাত্র,ক্লাশেও তেমন একটা ভাল ছাত্র না। দুই তিনটা সাবজেক্টে দুর্বল ইংরেজী,গনিত,হিসাব বিজ্ঞান ঐ তিনটার কথা ভাবতেই পড়ালেখা ছেড়ে ঢাকা চাকুরীে যেতে ইচ্ছে হয়!সেবার ইংরেজীতে পেয়েছিলো মোটে ১২ আর অংকে ডাবল শূণ্য!অংক খাতায় হিকমত স্যার বড় বড় করে দুটো আন্ডা দিয়ে নিচে লিখে দিয়েছিলো “উহা যিযামের প্রাপ্ত আন্ডা!দয়া করিয়া যিযামের মা তাহাকে দুবেলা ভাত খাইবার আগে ভাজিয়া দিবেন!” সেবার সবাইকে ওর আন্ডা দুটো দেখিয়েছিলেন হিকমত স্যার! সে কি লজ্জার!সুস্মিতা তো হেসে চোখে জল এনে ফেলেছিল!অপমানের সেখানেই শেষ নয়,খাতাটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আব্বা আম্মার সাইন পর্যন্ত নিয়ে আসতে হয়েছিলো।তখন তাদের প্রতিক্রিয়া কি ছিলো সেটা না হয় গোপনই থাক।

যাইহোক, পড়ালেখায় একেবারে কাচা যিযাম। পড়ালেখার কথা কখনো ভাবতেই ইচ্ছাই হয়না তার।মাঝে মাঝে মনে হয় মাষ্টারদের মেরে তক্তা বানিয়ে দিতে পারতাম।নিজ মন থেকে প্রশ্ন জাগে, পড়ালেখা কে আবিষ্কার করলো? তারে যদি পেতাম….ইত্যাদি ইত্যাদি।

জীবনের ঝামেলাকর অধ্যায় পড়ালেখাকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চায় যিযাম কিন্তু ঐ বিরাট বড় সপ্নটার জন্য তার পড়ালেখার জন্য মায়া লেগে যায় “পড়ালেখা না করলে আমি কি ধনী হতে পারবো নাকি? মা যখন বলছেন তখন না কখনো না পড়ালেখা ছাড়া ধনী হওয়া যাবেনা।”

সামনের কচুরিপানা ওয়ালা পুকুরে হুমরি দিয়ে পরে গোসলটা সেড়ে নেয় যিযাম,গোসল করে মাকে ভাত দিতে বলে।”খাড়া বাপ হাত ধুইয়া ভাত দিতাছি” গোবর দিয়ে ঘর লিপতে থাকা মা বলেন।যিযাম মাথায় খাঁটি শুরেষ সরিষার তৈল দিলো চুল আছড়ালো আধা ময়লা ইস্কুলের জামাটা পরে ভাত খেয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা দিলো।মেইন রোড এর পাশ ধরে প্রায় আধাকিলো দূরে জামিনা মহম্মদ ইস্কুল।সাড়ে নয়টায় ইস্কুলে পৌঁছলো।সামনে কোন সিট নেই, পিছনে একটা সিট খালি দেখা যাচ্ছে।ওহ আল্লাহ্ ওখানে আবার মেম্বরের ছেলে ইদ্রিস বসেছে!আশেপাশে তাকালো,কোন সিট নেই। যে সিট গুলো আছে সেগুলো আবার একেকজন তাদের প্রিয় বন্ধুদের জন্য দখল করে রেখেছে। বাধ্য হয়ে মেম্বরের বেটা ইদ্রিসের পাসে বসতে হবে এখন!মুখ ছোট হয়ে গেলো যিযামের। এই ইদ্রিস যিযাম কে দুচোক্ষে দেখতে পারে না! এর মূলত কারণ হিসাবে ধরা যায় যিযামের বাবার দরিদ্রতা আর ইদ্রিসের বাবার সচ্ছলতা।যিযাম কি করবে ভেবে পায়না।এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেল্ল “আজ ইদ্রিস এর পাশে বসব কিছু তো আর করার নেই!” মুখ কালো করেই ইদ্রিসের বেঞ্চির দিকে এগিয়ে গেল যিযাম।ইদ্রিসের পাশে বসতে না বসতেই ইদ্রিস লাফ দিয়ে উঠে গেল তার পাশ দিয়ে! চিত্কার দিয়ে বল্ল “কিরে জামা কাছস না কয় বছর ধরে হুঁ?ক্ষ্যাত যেন কমতের!” যিযাম প্রচন্ড রকমের ধাক্কা খেলো!ঐ পাশে মেয়েদের সাড়ি থেকে বিশাল চক্ষু নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে সুস্মিতা।

যিযাম নির্বাক ওর চোখে জল ছলছল করছে!যিযাম প্রথম খেয়ালই করেনি মিল্টন স্যার ক্লাশে এসেছেন।স্যারের চোখে চোখ পরলো।স্যার চেয়ে আছেন।যিযাম স্যারের চোখে চোখ পরায় নিচের দিক তাকিয়ে রইলো।কিছুক্ষণ পর স্যার বল্ল “ঐ যিযাইম্মা এই দিকে আয়।” যিযাম মাথা নিচু করে ইতস্তত বোধ নিয়ে স্যারের দিকে এগিয়ে গেলো।স্যার সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে যিযামের শার্ট শুকলো।ওয়াক ওয়াক করে বমি দেয়ার মত করে উঠলেন তিনি।ফাঁকে বাইরে গিয়ে মুখ ভর্তি থুথু ও ফেলে আসলেন!যিযামের দিক কেমন যেন দৃষ্টি দিলো “যেমন দৃষ্টি আমরা গুয়ের দিকে দেই”।স্যার হুঙ্কার ছাড়লেন,”কতদিন গতরে সাবান লোবান মাহোনা?এই ভাবে কেউ গন্ধওয়ালা শার্ট নিয়ে ইচকুলে আহে? মনে হইতেছিলো পাদগুড়া পোক ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ!এমন গন্ধ তো পোকেও থাহেনা বাবা ইয়াক!”

স্যারের এমন আচরণে বাকি সহপাঠীরাও তার দিকে গু দেখার মত চোখে তাকিয়ে আছে।ঐ চোখে তাকিয়ে আছে সুস্মিতা ও।যিযাম কেঁদেই ফেল্ল,হনহন করে বের হয়ে চলে আসল স্কুল থেকে।

পরদিন আবার আসলো স্কুলে।ক্লাশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মেম্বরের ছেলে ইদ্রিস বল্ল “ঐ দ্যাখো গন্ধপোকা আসছে হ্যাঁহ্যাঁহ্যাঁ! আইজকা সাবান দিছোতো যিযামপোক?”

অমনি সবাই ভ্যাক ভ্যাক করে হেসে উঠল বাকি সহপাঠীরা।আর তখন থেকে তাকে সবাই গন্ধপোকা ডাকা শুরু করল।যিযাম স্যারদের কাছে বল্ল কাজ হলনা স্যারেরা এসবের জন্য ইস্কুলে আসে নাকি? তারা তো আসেন ঠ্যাঙাতে।

স্কুলেই তার নাম উঠে গেল গন্ধপোকা।প্রিয় বন্ধুরাও তাকে ডাকে ঐ নামে,এমন কি স্যাররা পর্যন্ত ঐ নামেই ডাকতে শুরু করলো!যিযাম খুব কাঁদল।রহমত মিয়া কারণ জিজ্ঞেস করল,কিন্তু যিযাম কাউকে কিছু বল্লনা।সন্ধ্যায় পড়তে বসলো কিন্তু মন বসছেনা।মা ভাত খেতে ডেকেছেন খিদে নেই বলে খায়নি।না খেয়েই ঘুমোতে গেলো। ঘুমের মধ্যে যিযাম স্বপ্ন দেখছে “সুস্মিতা ওকে বলছে “গন্ধপোকা,ওরে গন্ধ পোপোকারে..পোপোকাআরে…সুস্মিতা তুমিও? সহপাঠীরা একত্র হয়ে তালিয়া বাজিয়ে বলছে,ওরে গন্ধ পোপোকাআআরে….”

লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে হাউমাউ করে উঠল যিযাম “ক্ষাণকির পোলারা আমি গন্ধপোকা না!আমি গন্ধপোকা না!” হুহু করে বিছানায় মুখ থুবড়ে কাঁদলো কিছুক্ষণ।রাতে ভাল ঘুম হলনা তার।সকালে গোসল করে স্কুলে গেল কিছু খেলোও না,আম্মা জোড় করেও কিছু খাওয়াতে পারেনি।ইস্কুলে যখন পৌঁছলো তখন হিকমত স্যারের গনিতের ক্লাশ চলছে,কাল হিকমত স্যার বাড়ির কাজ দিয়েছিলো,সবাই খাতা জমা দিছে,কিন্তু যিযাম দেয়নি।হিকমত স্যার রাগে ফায়ার,স্যার বল্লেন “ঐ গন্ধপোকা বেঞ্চির উপরে ওঠ!”

“স্যার আফনেও!” যিযাম ভাবতেও পারেনি স্যার ও এই নামেই ডাকবেন।স্যার বল্লেন “তোরে যা বলছি তা কর বিয়াদ্দপ!” ছলছল চোখ নিয়ে যিযাম দাঁড়ালো।স্যার বল্লেন কান ধর।যিযাম একটু ইতস্তত বোধ করল তবুও ধরলো।সহপাঠীরা ভ্যাক ভ্যাক করে হাসছে।স্যার ধমক দদিয়ে সবাইকে থামালেন।তারপর যিযামের দিকে তাকিয়ে বল্ল “এইরাম হাঙ্গা পিরিয়ড নীলডাউন থাকবি”।”জ্বী স্যার” যিযাম মাথা নাড়লো। সারা পিরিয়ডই তার কান ধরে থাকতে হল।ছুটির ঘন্টা বাজল।যিযাম আগে আগেই দৌঁড়ে মেইন রোডে গেল।ওদের সাথে গেলে সারাটা পথ যিযাম ককে ওরা খোঁচাবে।যিযাম মেইন রোড ধরছে।যিযাম আনমনে হাটছে,স্যার-সহপাঠীদের কথা ভাবছে।আর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে,এখনো ওকে সুস্মিতা ঐ নামে ডাকেনি।যেদিন সুস্মিতা ডাকবে সেদিন থেকে আর স্কুলেই পা রাখবেনা ঠিক করেছে।হঠাৎ কে যেন বলে উঠল ‘কিরে গন্ধপোকা কই হাটস? গাড়ির তলে পইরা তো মরবি’ যিযাম পেছনে চাইলো,মেস্বরের ছেলে ইদ্রিস এর এর গলা!যিযামের খুব মনকষ্ট হলো।যিযাম আনমনে হাটতে হাটতে রাস্তার মধ্যে কখন যে চলে গেলো তা আর মনে নেই।পরক্ষণে প্যাট্টাত করে একটা শব্দ হলো সাথে ‘ও মাগো’ বলে একটা চিৎকার।চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলো!লোকজন দৌড় আসতে দেখা গেলো রাস্তার দিকে।একটা লোকাল বাস প্রাণপণে ছুটছে ।ঘিলু গুলো রাস্তায় লেগে আছে।মুন্ডু থেৎলে যাওয়া একটা বডি ধরফর ধরফর করে লাফাচ্ছে,ঘোৎ ঘোৎ শব্দ হচ্ছে আর কোৎ কোৎ করে ফিনকি দিয়ে লাল লাল হিমোগ্লোবিন মিশ্রিত রক্ত বেরুচ্ছে ধরের নিচ থেকে! রক্তে রাস্তা একাকার!

ইদ্রিস ভির ঠেলে মধ্যে গেলো।ইদ্রিস নির্বাক!মুখ দিয়ে কথা সড়ছেনা ওর!জড়ো কন্ঠে একবার ডাকলো “ভাই যিযাম!”

যিযামের বডি তখনো লাফাচ্ছে হালকা হালকা!ইদ্রিস খেয়াল করলো, পরে থাকা ঘিলু গুলো হাসছে আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ইদ্রিসকে বলছে,”ডাকছিস কেন? তুই না গন্ধপোকারে ঘেণ্যা করস? গন্ধপোকা আমি, আমি গন্ধপোকা!’
ইদ্রিস লাশটার দিকে বাকরূদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
(২০১৩ সালের লেখা ছোটগল্প/পরিমার্জিত)
-সজল আহমেদ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 1