মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১১

আল্লাহর নবীর তমশাচ্ছন্ন ইতিবৃত্তকে উজ্জল ইতিহাসের আলোকে নিয়ে আসার কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তিনি হলেন মুহম্মদের সর্বপ্রথম জীবনীকার মুহম্মদ ইবনে ইশাক ইবনে ইয়াসার- যিনি মূলত ইবনে ইশাক নামেই পরিচিত। তার রচিত গ্রন্থটি প্রথম সিরাত গ্রন্থ এবং পরবর্তী সব ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থের উৎস। প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার ইবনে ইশাক মুহম্মদের (মৃত্যু ৬৩২ খৃষ্টাব্দ) একেবারে প্রথম বারের মত জীবনী রচনা করলেও তিনি মু্হম্মদের সমসাময়ীক ছিলেন না, এমনকি তার পরের প্রজন্মের মানুষও ছিলেন না।
?resize=430%2C203″ width=”512″ />

ইবনে ইসাক: মু্হম্মদের ইতিহাস না ইতিহাসে মুহম্মদ

আল্লাহর নবীর তমশাচ্ছন্ন ইতিবৃত্তকে উজ্জল ইতিহাসের আলোকে নিয়ে আসার কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তিনি হলেন মুহম্মদের সর্বপ্রথম জীবনীকার মুহম্মদ ইবনে ইশাক ইবনে ইয়াসার- যিনি মূলত ইবনে ইশাক নামেই পরিচিত। তার রচিত গ্রন্থটি প্রথম সিরাত গ্রন্থ এবং পরবর্তী সব ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থের উৎস। প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার ইবনে ইশাক মুহম্মদের (মৃত্যু ৬৩২ খৃষ্টাব্দ) একেবারে প্রথম বারের মত জীবনী রচনা করলেও তিনি মু্হম্মদের সমসাময়ীক ছিলেন না, এমনকি তার পরের প্রজন্মের মানুষও ছিলেন না। তার মৃত্যু হয় ৭৭৩ খৃষ্টাব্দে, অর্থ্যাৎ মুহম্মদের মৃত্যুর প্রায় দেড় শতাব্দী পরে। তার থেকেও বড় কথা হল তার রচিত সিরাতের মূল সংস্করণ পাওয়া যায় না। সিরাত রসুলউল্লাহ নামে যেটা আমাদের হাতে এসেছে তা হল ইবনে হিশাম সম্পাদিত (ব্যাপকভাবে সংক্ষেপিত) সংস্করণ। ইবনে হিশামের মৃত্যু হয় ৮৩৪ খৃষ্টাব্দে অর্থ্যাৎ ইবনে ইশাকের ষাট বছর পরে। এ ছাড়াও আল-তাবারীর মতো অনান্য সিরাত লেখকরা বিচ্ছিন্নভাবে ইবনে ইসাককে উদ্ধৃত করেছেন।
?resize=430%2C203″ width=”512″ />

সম্পাদিত গ্রণ্থের ভূমিকায় তার কৃত কাটছাটের ব্যাখ্যায় ইবনে হিশাম লেখেন যে তিনি সেই সমস্ত বিষয়গুলি বাদ দিয়েছেন ১. যেগুলীর আলোচনা অত্যন্ত লজ্জাজনক ২. যেসমস্ত বিষয় নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে ৩. কিছু বক্তব্য যা আল-বাক্কাই (ইবনে ইশাকের ছাত্র) নির্ভরযোগ্য নয় বলে তাকে জানিয়েছেন। মনে রাখা দরকার ঠিক এই সময়েই আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে একের পর এক সহী হাদিস গ্রন্থগুলি রচিত হতে থাকে। দেখা যাচ্ছে ইবনে হিশামের কাছেই সিরাতের এক বড় অংশ গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হয় নি। অনান্য ইসলামিক ধর্মতাত্বিকরা ইবনে ইশাকের বিষয়ে আরো কঠোর ধারণা পোষন করতেন। হাদিস সংগ্রাহক আবদুল্লাহ ইবনে নুমায়ির, ৮১৪ খৃষ্টাব্দে যার মৃত্যু হয়, বলেছেন ইবনে ইশাকের সিরাতের অধিকাংশ উপাদান খাঁটি হলেও বহু ‘ফালতু বক্তব্য’ রয়েছে যেগুলী তিনি অজানা মানুষজনের থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। হাদিস বিশেষজ্ঞ আ্হমেদ ইবনে হানবাল (৮৩৪ খৃষ্টাব্দ) ইবনে ইশাকের সিরাতকে ইসলামী আইনের উৎস হিসাবে গন্য করতেন না, তবে একান্তভাবে মুহম্মদের জীবনের সাথে যুক্ত ঘটনা জানার জন্য নির্ভরযোগ্য বলে মনে করতেন। প্রথম হাদিস সংকলক মালিক ইবনে আনাস যার কথা ষষ্ঠ পর্বে আলোচিত হয়েছে ( যে সমস্ত হাদিস আমাদের হাতে এসেছে তার মধ্যে মালিক ইবনে আনাস রচিত মুয়েত্তাই সর্বপ্রথম) সরাসরি ইবনে ইসাককে মিথ্যাবাদী ও ঈশ্বরদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করেছেন।

এর অর্থ এই নয় যে সব মুসলিম ধর্মবেত্তা ইবনে ইশাককে বাতিল করে দিয়েছেন। বরং প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি ইবনে ইসাক ও আল তাবারি দুজনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মুসলিমদের মধ্যেই যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। পরবর্তী সিরাত রচয়িতারা না হয় ইবনে ইসাককে উৎস হিসাবে ব্যাবহার করেছেন। কিন্তু ইবনে ইসাক কোথা থেকে তথ্য পেলেন? তিনি হাদিসের মতোই লোকমুথে প্রচলিত কাহিনীর উপর নির্ভর করেছিলেন। হাদিসের মতোই প্রতিটি ঘটনার উৎস উল্লেখ করেছেন বর্ননাকারীদের শৃঙ্খল অর্থ্যাৎ সনদ হিসাবে। সহজ কথায় হাদিসকে যে কারণে আমরা গ্রহনযোগ্য বলে মনে করছি না সেই কারণে ইবনে ইসাককেও বাতিল করা যায়। কারন সিরাতে উল্লিখিত কোন ঘটনাই ঐতিহাসিকভাবে প্রমানিত নয়। মনে করুন বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রমান কি? অবধারিতভাবে আপনাকে সিরাত হাদিসের শরণাপন্ন হতে হবে। বস্তুত সিরাত হাদিসে উল্লিখিত ঘটনাবলীর কোন ভাবেই সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না। আমি আগেই বলেছি সৌদি আরবে ব্যাপক প্রত্নতাত্বিক খননকার্য চালাতে পারলে হয়ত এই কানাগলির মুখ খুলে যেতে পারত, কিন্তু তার কোন সুযোগই দেওয়া হয়নি।ইবনে ইশাক তার সিরাতে শুধুমাত্র মুহম্মদের জীবনের প্রতিটা গুরুত্বপূর্ন ঘটনা বর্ননা করেননি, তার সাথে কোন মাসে ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তার উল্লেখ করেছেন। মূলত এই কারণে এখনও ইবনে ইসাকের বিবরণ সাধারণভাবে ইতিহাস গ্রন্থের মর্যাদা পায়। ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবরা ইসলামিক যুগের মতোই চান্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যাবহার করত। এতে বছর ছিল ৩৫৪ দিনের, সৌরবছরের মতো ৩৬৫ দিনের নয়। প্রতি তিন বছর অন্তর একটি অধিমাস (leap Month) যোগ করে নেওয়া হত। এই ব্যাবস্থা ৬২৯ পর্যন্ত্য চলেছিল। তারপর কোরানের আল্লা নাকি বিরক্ত হয়ে আয়াত নাজিল দ্বারা এই পদ্ধতি রদ করেন।
এই মাস পিছিয়ে দেয়ার কাজ কেবল কুফরীর মাত্রা বৃদ্ধি করে, যার ফলে কাফেরগণ গোমরাহীতে পতিত হয়” [সূরা আত তাওবা, ৩৭]

এখন ৬২৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত্য মুহম্মদের নবয়ুতির প্রায় ২০ বছর হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে অতি অবশ্যই অন্তত ষটি অধিমাস মুহম্মদের জীবনে এসেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হল সিরাতে এর কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটা কি সম্ভব মুহম্মদের জীবনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটিও অধিমাসে সংঘটিত হয় নি। তাহলে তিনি সেই সময়টায় কি করতেন? পাঠকরা জানেন যে মুহম্মদের মদিনা পর্ব বিপুল ঘটনাবহুল। মাত্র দশ বছরের মধ্যে তিনি বিভিন্ন মতানুসারে ৬৭-১০০ টি যুদ্ধযাত্রা করেন। অর্থ্যাৎ গড়ে প্রতি দু-এক মাসে একটি হামলা বাঁধা ছিল। এমনকি যে মাসগুলিতে তিনি মদিনায় অবস্থান করেছেন সেই সময়েরও বিস্তারিত উল্লেখ আছে। মু্হম্মদের জীবনের এই ৬ মাস বিলকুল গায়েব হয়ে যাবার কোনই ব্যাখ্যা হয় না। অবশ্য এটা যদি কোন কুদরতি ক্রিয়া হয় তাহলে আলাদা কথা। সবদিক বিচার করে গবেষক জোহানস জেমসন বলেছেন – ইবনে ইসাকের জীবনী সেই সময়কেই নির্দেশ করে যখন মানুষজন ভূলেই গিয়েছিল একসময়ে অধিমাসের অস্তিত্ত ছিল। জেমসন সিদ্ধান্ত করেছেন “ ইবনে ইসাকের এই সমস্ত কাহিনী আদৌ অতীতের ঘটনাবহুল স্মৃতি তুলে ধরার কোন উদ্যোগ নয়, বরং সেগুলী পাঠককে বিশ্বাস করাতে চায় যে এইসমস্ত গাল-গল্পের নায়ক, মুহম্মদ, প্রকৃতপক্ষেই ঈশ্বরের দূত”

ইবনে ইসাকের সিরাতে বিপুল সংখ্যায় আলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে। উহুদ যুদ্ধে এক সাহাবীর চোখে আঘাত লাগে, অক্ষিকোঠরের বাইরে এসে ঝুলতে থাকে।মুহম্মদ নিজের হাতে সেটাকে সস্থানে বসিয়ে দেন এবং তারপর থেকে সেটাই হয় তার সবচেয়ে শক্তিশালী চোখ। আরেকটি অনুরুপ ঘটনা পাওয়া যায়- খন্দক যুদ্ধের সময় মুহম্মদের জনৈক অনুসারী একটি ছোট্ট দুম্বা রান্না করে মু্হম্মদকে খেতে ডাকে। মুহম্মদ কর্তাকে আশ্চর্য করে যতজন তার সাথে পরিখা খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ছিল তাদের সবাইকে নিমন্ত্রন করেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন তার পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। আল্লার কুদরতে মুহম্মদ যতখানি খেলেন ততখানি খাবার সবারই জুটল। সবাই তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত্য খাদ্য শেষ হল না। যীশুর ‘ফিডিং দ্য মালটিচিউুড’ ঘটনার সাথে মিল পাচ্ছেন কি? সমস্যা হল কোরান তো বারবার দাবী করছে আল্লার রাসুলের কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই, তিনি সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তি মাত্র (২:১১৮, ৬:৩৭, ১০:২০, ১৩:৭, ১৩:২৭)। খোদ আল্লা অভিযোগ করেন,

তারা বলে, তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার প্রতি কিছু নিদর্শন অবতীর্ণ হল না কেন? বলুন, নিদর্শন তো আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।

এটাকি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়। এতে অবশ্যই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ আছে” [সুরা আনকাবুত, ৫০-৫১]।
কুরাইশরা বারবার অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে মুহম্মদকে তার নবয়ুতির প্রমান দিতে বলছিল তার উত্তরে আল্লা (বা বকলমে মুহম্মদ) জানান যে মুহম্মদের কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই, তিনি একজন বার্তাবাহক মাত্র। এই আয়াতের বক্তব্যকে যদি সত্যি বলে ধরে নেই সেক্ষেত্রে সিরাত কোরানের সাথে সুস্পষ্ট সংঘাতে অবতীর্ণ হয়।

মুহম্মদ বালক বয়সে সিরিয়ায় গিয়ে পাদ্রী বাহিরার সম্মুখীন হন। পাদ্রী বাহিরা বিভিন্ন আলৌকিক লক্ষ্যণ দেখে মু্হম্মদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি জিজ্ঞেস করেন – “হে বৎস, আমি তোমাক লাত ও উয্যার দোহাই দিয়ে অনুরোধ করছি, আমি যা জিজ্ঞেস করবো তুমি তার জবাব দেবে।” বাহীরা লাত ও উয্যার দোহাই দিলেন এই জন্য যে, তিনি কুরাইশদেরকে পরস্পর কথাবার্তা বলার সময় ঐ দুই মূর্তির শপথ করতে শুনেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমাকে লাত-উয্যার দোহাই দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহর শপথ, আমি ঐ দুই দেবতাকে সর্বাধিক ঘৃণা করি।” বাহীরা বললেন, “আচ্ছা তবে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যা জিজ্ঞেস করবো তার জবাব দেবে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “বেশ, কি কি জানতে চান বলুন।” অতঃপর বাহীরা তাঁকে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। তাঁর ঘুমন্ত অবস্থার কথা, তাঁর দেহের গঠন-প্রকৃতি ও অন্যান্য অবস্থার কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সব প্রশ্নের যা জবাব দিলেন, তা বাহীরার জানা তথ্যের সাথে হুবহু মিলে গেল। তারপর তিনি তাঁর পিঠ দেখলেন। পিঠে দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানে নবুওয়াতের মোহর অংকিত দেখতে পেলেন। মোহর অবিকল সেই জায়গায় দেখতে পেলেন যেখানে বাহীরার পড়া আসমানী কিতাবের বর্ণনা অনুসারে থাকার কথা ছিল”-

খৃষ্টান ধর্মবেত্তারা যদি বুঝেই থাকবেন যে মুহম্মদ স্বর্গীয় নবী তাহলে তারা ইসলাম গ্রহন করেননি কেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে খৃষ্টানরা ওই সময় আরবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। খৃষ্টানরা মুহম্মদকে অনুসরণ করলে এত কষ্ট করার প্রয়োজনই হত না। অনুরুপভাবে মদীনায় ইহুদী রাব্বী আবদুল্লাহ বিন সালাম মুহম্মদকে নবী হিসাবে স্বীকার করেন। ইবনে ইসাক আবদুল্লাহর জবানীতে লিখেছেন- “যখন আমি নবীর বিষয়ে শুনতে পেলাম, আমি তার বর্ননা, নাম এবং তার আবির্ভূাবের সময় থেকে জানতাম যে তিনিই সেই ব্যক্তি যার জন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি”। ইমান বুখারী আরো বিস্তৃত বর্ননা দিয়েছেন-
আবদুল্লাহ ইবনু সালামের নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদিনায় আগমনের খবর পৌঁছল, তখন তিনি তাঁর নিকট আসলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই যার উত্তর নবী ব্যতীত আর কেউ জানে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
১. কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন কী?
২. আর সর্বপ্রথম খাবার কী, যা জান্নাতবাসী খাবে?
৩. আর কী কারণে সন্তান তার পিতার মত হয়? আর কী কারণে (কোন কোন সময়) তার মামাদের মত হয়?
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই মাত্র জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। …… রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো আগুন যা মানুষকে পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে তাড়িয়ে নিয়ে একত্রিত করবে। আর প্রথম খাবার যা জান্নাতবাসীরা খাবেন তা হলো মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান সদৃশ হবার ব্যাপার এই যে পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম করে তখন যদি পুরুষের বীর্য প্রথমে স্খলিত হয় তবে সন্তান তার সদৃশ হবে আর যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের পূর্বে স্খলিত হয় তখন সন্তান তার সদৃশ হয়। তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল
” (বুখারী, ৩৩২৯)

যদি এই প্রশ্নগুলির উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ নাই জেনে থাকে তাহলে তিনি মুহম্মদের দেওয়া উত্তরের সত্যতা বিচার করলেন কি করে। মু্হম্মদকে নাহয় জিব্রাইল এসে উত্তর বলে দিয়ে গেল। কিন্তু আবদুল্লাহ কিভাবে উত্তর জানলেন। তাহলে কি তিনিও আরেকজন নবী? মুমিন ভাইদের গবেষনার জন্য বিষয়টা ছেড়ে দিলাম। মুহম্মদের সমসাময়িক আরেকজন নবী পেলে মন্দ হয় না।

বস্তুত, যেকোন চিন্তাশীল মানুষের কাছে একটা মাত্র সিদ্ধান্ত পরে থাকে। তা হল পুরোটাই কল্পকাহিনী, মু্হম্মদকে নবী হিসাবে প্রমান করাই এর উদ্দেশ্য। ইবনে ইসাকের পরে বহু সিরাত গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আল তাবারি (839–923 AD) ও আল ওয়াকিদির (747 – 823 AD) রচনা তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ইবনে ইসাকের ঠিক পরবর্তী ঐতিহাসিক আল ওয়াকিদি অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় বেশী জানেন। যেমন খাররার অভিযানের বর্ননায় ইবনে ইসাক লিখেছেন- “এরমধ্যে আল্লাহর নবী সাদ বিন আবি আক্কাসকে আটজন মুজাহিদ সহ পাঠালেন। তিনি হিজাজের খাররার পর্যন্ত্য গিয়েছিলেন, তারপর ফিরে আসেন শত্রুর সাথে কোন সংঘর্ষ ছাড়াই

এই একই অভিযানের বর্ননা ওয়াকিদি দিয়েছেন-
এই বছর (হিজরতের প্রথম বর্ষ)জিল-হজ মাসে আল্লাহর নবী সা’দ বিন আবি ওয়াককাসকে একটি সাদাব্যানারসহ আল খহাররার অভিযানে পাঠান। সা’দের দলের সবাই ছিল মুহাজির।
আবু বকর বিন ইসমাইল < তার পিতা < আমির বিন সা'দ < তার পিতা (সা'দ বিন আবি ওয়াককাস) হতেবর্ণিত: আমি ২০-২১ জনের একটি দলকে নিয়ে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছিলাম। যাত্রার পঞ্চম দিন সকালে আল খাররার পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আমরা দিনের বেলায় আত্মগোপন করে থাকতাম এবং রাত্রি বেলা পুনরায় যাত্রা শুরু করাতাম। আল্লাহর নবী আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন আমি যেন আল খাররার অতিক্রম না করি। কিন্তু আমাদের আল খাররার পৌঁছার এক দিন আগেই বাণিজ্য কাফেলা টি আল খাররার অতিক্রম করে। সেই কাফেলার দলে ৬০ জন লোক ছিল

ঐতিহাসিক পাট্রিশিয়া ক্রোন লক্ষ্য করেছেন যে, শুধুমাত্র বিস্তারিত বর্ননাই নয় তিনি অভিযানের নেতার বরাত দিয়ে পুরো ঘটনা বর্ননা করেছেন। ওয়াকিদি খায়বার হামলার এত বিস্তৃত বর্ননা দিয়েছেন যে আপনি আমি খায়বারে হাজির থাকলেও এত জানতে পারতাম কিনা সন্দেহ। যদিও তত্বগতভাবে এটা সম্ভব যে ওয়াকিদি হয়ত কোন মৌখিক উৎস পেয়েছিলেন যেটা ইবনে ইসাকের কাছে অপরিচিত ছিল। যৌক্তিক বিচারে ওয়াকিদির বর্ননাকে পৌরাণিক কাহিনীর স্বাভাবিক সম্প্রসারণ বলেই মনে হয়। ইবনে ইসাক থেকে আল ওয়াকিদি এই স্বল্প সময়ে যদি গল্পের গরু এই পরিমান গাছে উঠতে পারে, তাহলে সহজেই অনুমেয় মুহম্মদের কথিত জীবদ্দশা থেকে ইবনে ইসাকের সিরাত- এই সুবিশাল দেড় শতাব্দী সময়কালে কাহিনী চাঁদে পৌছে যাওয়ার কথা। আর হয়েছেও তাই।

তা সত্বেও বিংশ শতাব্দীর ইসলামিক স্টাডিসের স্কলার মন্টগোমারী ওয়াট (১৯০৯-২০০৬) পৌরাণিক কল্পকাহিনী থেকে ঐতিহাসিক সত্য বার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি অতি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তা হল অলৌকিক ঘটনা বাদ দিয়ে সিরাতের বাকিটাকে ঐতিহাসিক সত্য হিসাবে মেনে করা। বাংলা অন্তর্জালের অধিকাংশ ব্লগার এই একই পদ্ধতি কমবেশী অনুসরণ করেন। ব্যাপারটা দাঁড়ায় মু্হম্মদ উম্মে হানীর ঘরে যেতেন এটা সত্য, কিন্তু উম হানীর ঘর থেকে মেরাজে যাওয়ার গল্প মিথ্যা। অথচ মূলত এই মেরাজ প্রসঙ্গেই উম্মে হানীর উল্লেখ আছে। অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধ ঐতিহাসিক ঘটনা, কিন্তু বদরে ফিরিস্তারা এসে লড়াই করেছিলেন এটা কল্পকাহিনী। বদর যুদ্ধ বা ফিরিস্তা দুটোর কোনটারই ঐতিহাসিক প্রমান নেই। ফলে দুটোরই ঐতিহাসিক মূল্য সমান, অর্থ্যাৎ শূন্য। লৌকিক বাস্তবতা ইতিহাসের মাপকাঠি নয়। ফলে এই পদ্ধতি একেবারে যদৃচ্ছ হযে দাঁড়ায়, কারণ তথাকথিত অলৌকিক ঘটনারও লৌকিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। মুহম্মদের বিষয়ে জানতে গিয়ে একই বিবরণকে উভয়দিক থেকে ব্যাবহার করা চলতে পারে না। আর আমরা যদি ইবনে ইসাকের সিরাতকে বাতিল করে দেই, মু্হম্মদের ঐতিহাসিক জীবনী আর কতটুকু থাকে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১১

  1. দারুন লিখেছেন.. তবে হিজরি
    দারুন লিখেছেন.. তবে হিজরি বর্ষ গননার একটি লুপহোল অাছে, সেটি অাপনার লেখাতেও বিদ্যমান;অামার অবাক লাগে এবিষয়টি কেনো কারও চোখে পড়ে না! কুইজ রইল:বলুনতো সেটা কী?

    1. এই রে লজ্জায় ফেলে দিলেন যে,
      এই রে লজ্জায় ফেলে দিলেন যে, আরো পড়াশোনা করতে হবে। তবে আপনার প্রশ্ন পুরোপুরি বোধগম্য হল না। হিজরী সন নিয়ে এখানে কিছুই বলা হয় নি। আমারা বক্তব্য পুরোটাই ইসলাম পূর্ব আরবে প্রচলিত ক্যালেন্ডার নিয়ে। আপনার মন্তব্যের পরে কিঞ্চিত ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। দেখলাম, আমি যা জানতাম বিষযটা তার থেকে অনেক বেশী জটিল। স্কলাররা কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন নি।

      হিজরী সন নিয়ে আমারও বহু প্রশ্ন আছে। এই বিষয়ে আপনার থেকে লেখা তো আশা করতেই পারি? কি বলেন? *smile*

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =