২১শের বাংলাই হচ্ছে সম্প্রীতি রক্ষার সব চাইতে বড় সেতু বন্ধন

আমাদের উপমহাদেশে সম্প্রীতি বোধের সবচাইতে বৃহৎ সেতু বন্ধন হচ্ছে বাংলা ভাষা, শত শত বছর বাংলা ভাষা জাত, ধম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সম্প্রীতি বোধ রক্ষা করে চলেছে , আমি এই ভাষাকে আজ বঙ্গ ভাষা বললে নিশ্চয়ই কোনও ভুল হবে না, কারণ আমাদের উপমহাদেশের একটি বিশাল বঙ্গীয় অঞ্চলেই এই ভাষা ব্যবহৃত হয়ে আসছে |


আমাদের উপমহাদেশে সম্প্রীতি বোধের সবচাইতে বৃহৎ সেতু বন্ধন হচ্ছে বাংলা ভাষা, শত শত বছর বাংলা ভাষা জাত, ধম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সম্প্রীতি বোধ রক্ষা করে চলেছে , আমি এই ভাষাকে আজ বঙ্গ ভাষা বললে নিশ্চয়ই কোনও ভুল হবে না, কারণ আমাদের উপমহাদেশের একটি বিশাল বঙ্গীয় অঞ্চলেই এই ভাষা ব্যবহৃত হয়ে আসছে | বাংলাদেশ, ভারত তো আছেই বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশেই বঙ্গীয় ভাষার মানুষ বসবাসরত কাজেই এক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্ব জুড়েই এই বাংলা ভাষার প্রচলন আছে, তা ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও আন্দামান দীপপুঞ্জেও বঙ্গীয় ভাষার প্রচলন আছে | আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা যে পৃথিবীতে প্রায় ২০ কোটির অধিক মানুষ বাংলা ভাষাতে কথা বলে আর এই ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করে এখন জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা |

বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত, এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্র বা জাতীয় সংগীত এই ভাষাতেই রচিত (সংস্কৃত ও আংশিক বাংলার মিশ্রণে) এবং তা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব বোঝা যায় |

যুগে যুগে এই বাংলা ভাষার উপর অত্যাচার নিপীড়নও হয়েছে অনেক, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ সমুন্নত রাখতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি সর্বশ্রেষ্ঠ উদহারণ | এক কথায় বলতে গেলে পৃথিবীর বিকশিত সমৃদ্ধ সমাজেই এই ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে যেখানে জন্ম নিয়েছে শত শত দার্শনিক, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ | অনেক বড় বড় বাঙালী বীরদের নাম আজ না হয় উল্ল্যাখ নাই করলাম তবে এই ভাষার উৎপত্তি স্থল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনুসন্ধান ও গবেষণায় দেখা গেছে এই ভাষার আদি সূত্র পালি, যেটাকে আমরা পালিত হিসাবেও বলে থাকি, পালি ভাষার খুবই প্রাচীন তত্ত্ব হচ্ছে বৈদিক, সংস্কৃত ও বিভিন্ন প্রাকৃত মাগধী, মহারাষ্ট্রী, পৈশাচী, শৌরসেনী ভাষাগুলোর মত পালি ভাষাকেই বাংলা ভাষার আদি সূত্রই ধরা হয়ে থাকে, আমাদের উপমহাদেশে গৌতম বুদ্ধ দেবের সময়কালে শিক্ষা-নিবেশ গুলোতে পালিত ভাষার প্রচলন খুঁজে পাওয়া যায় কারণ দেখা গেছে সেই সময়ে সাহিত্যের মূল ভাষাই ছিল পালি তাই এই ভাষাতেই রচিত হয়েছিল ত্রিপিটক, টিকা, অনুটিকা এক কথায় বলতে গেলে গৌতম বুদ্ধ ও তার ধর্ম প্রচারের মূল ভাষাই ছিল পালি যা আমাদের বাংলা ভাষার আদি উৎপত্তিস্থল |

একজন উপনিবেশ শাসক সমাজের বিলাতি মিলিটারি বাবু বলেছিলেন – what bengal thinks today whole India thinks tomorrow বাবুদের মত আমাদের ঠাট বাট হয়তো ছিল না তবে আমরা যে মেধাবী ছিলাম এ কথায় সেটাই বোঝা যায়, ইতিহাস ঘটলে প্রমাণিত হবে বা অস্বীকার করার উপায় থাকবেনা যে পাক-ভারত কংগ্রেসেও বাংলা ভাষার উপর অত্যাচার হয়েছে অনেক | ইতিহাসের পাতা ঘটলে আরও দেখা যাবে যে বাংলা ভাষা ভাষী মানুষের উপর আমাদের উপমহাদেশে নজিরবিহীন অত্যাচার হয়েছে, ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা ছিল বঙ্গীয় সমাজের এক বর্বরোচিত ঘটনা , এধরনে ঘটনা যে কতটা অহেতুক তা আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, লজ্জায় আমাদের মাথা হেট্ হয়ে আসে, হাজার বছরের বঙ্গীয় অসাম্প্রদায়িক সমাজে এ ধরনের ঘটনা আমাদের বিবেককে আজ তাড়া করে বেড়ায় | বি বি সির একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে ১৯৫১ সালের পর শুধু বাংলাদেশে থেকেই বাংলা ভাষা ভাষী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন কারণে বিতাড়িত হয়েছে প্রায় ৪৯ মিলিয়নের মত এর প্রধান কারণই ধর্মীয় সাপ্রদায়িকতা যা আজও আমাদের দেশে বা সমাজে বিদ্যমান, তাদের একটাই অপরাধ তারা বঙ্গীয় সমাজের মানুষ হয়েও অন্য ধর্মাবলম্বী | আজ সমগ্র বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ভাষী শুধু মাত্র ৮% হিন্দু বসবাস করে | ইদানিং কালে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর অত্যাচার, জায়গা জমি দখল এমন কি ধর্ষণের মত বিভত্স ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে | আমার কি আজও মাথা তুলে গর্ব করে বলতে পারব না- “আমরা বাংলায় কথা কই, আমরা বাংলায় গান গাই ?”

বাংলাদেশে কত বিশাল সব মহা মানবদের জন্ম হয়েছে সেটা কি আজ শুধুই ইতিহাস ?

এ ক্ষেত্রে একজন মহামানবের উদহারণ দিতেই হয়, যার নাম রাজা রাম মোহন | তিনি ছিলেন আমাদের উপমহাদেশের এক অগ্রজ অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব । ১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন এক সম্ভ্রান্ত কুলীন (বন্দোপাধ্যায়) ব্রাক্ষ্মণ বংশে। । তার বংশে অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত ফারুখশিয়ারের আমলে বাংলার সুবেদারের পক্ষে আমিনের কাজ করতেন। সেই সূত্রেই বোধ করি এদের ‘রায়’ পদবীর ব্যবহার । আমাদের বৃহৎ ভারতবর্ষে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে যে মানুষটির অবদান আমাদের ইতিহাস থেকে কোনদিনই মুছে ফেলা যাবে না তিনি হচ্ছেন এই সমাজ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করণে শ্রেষ্ঠ পুরুষ | রাজা রাম মোহনের মেধা আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে অন্ধকার জগত থেকে আলোতে নিয়ে আসে , দুঃখ হয় আজ সেই বাংলার মাটিতে দাড়িয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মত সংগঠনগুলো বড় বড় কথা বলে পার পেয়ে যায় |

রাজা রাম মোহন রায় এক জন বাঙালি দার্শনিক ও বাংলার পূনর্জাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন । তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য । তখন হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে বা আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হত। তাঁর জীবন ও কর্মের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় যা ধর্ম, জাতি, বর্ণের উর্ধে এসে এই জঘন্য ধর্মীয় রীতি সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করেছিলেন, আমি মনে করি এই মানুষটি বঙ্গীয় সমাজের সর্বকালের আধুনিক মানুষ |

পরিশেষে জোর গলায় বলতে চাই বাংলাই হচ্ছে এই উপমহাদেশের সম্প্রীতি রক্ষার সব চাইতে বড় সেতু বন্ধন আর বাংলাদেশই হচ্ছে বঙ্গীয় সমাজের তীর্থ স্থান ।
==মাহবুব আরিফ (কিন্তু)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 74 = 78