ভালো নবী মুহাম্মদ, মন্দ নবী মুহাম্মদ!

নবী মুহাম্মদকে আমি ভালো মানুষ বলি। তিনি বেশকিছু মন্দ কাজ করেছেন, তারপরও ভালো বলি। মন্দ কাজ তো সকলেই কমবেশী করে। আমার ধারণা, পৃথিবীর সব মানুষ আসলে সাধারণ মানুষ। এখানে কোন অসাধারণ বা অস্বাভাবিক বা নিখুঁত মানুষ বসবাস করে না। নবী মুহাম্মদও ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে কিছু ভুল কিংবা কিছু অপরাধ করবেন না, তা কী করে সম্ভব? তবে তার পাপের পরিমাণ সম্ভবত তার পূণ্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। যদিও আমি পাপপুণ্যে সর্বোচ্চ অবিশ্বাস করি।

নবী মুহাম্মদ বেঁচে ছিলেন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি হয়তো তার সময়ের শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন না। এখন ২০১৭ সাল। এই সালে অবস্থান করে এর সমসাময়িক মূল্যবোধ দিয়ে এখন আমরা যদি ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের সবচেয়ে প্রগতিশীল মানুষটিকে মূল্যায়ণ করতে চাই, এর ফলাফল হবে বিব্রতকর। নিজের সময়ে তখনকার শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল মানুষটি এখনকার মানদণ্ডে কোনরকমেও পাশ করবেন বলে মনে হয় না। তাই প্রতিটি মানুষকে মূল্যায়ণ করা উচিত তার সমসাময়িক মূল্যবোধ দিয়ে, এবং অবশ্যই তার নিজের সামাজিক স্থবিরতাকে তিনি কতোটা অতিক্রম করেছেন, তা দিয়ে। আমাদের বর্তমান দিয়ে নয়।

এটা মাথায় রেখে আমার মতামত হলো, নবী মুহাম্মদ ছিলেন একজন আরব জাতীয়তাবাদী নেতা। তার সময়ে আরবের উত্তরাঞ্চল সরাসরি রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে, পশ্চিমাঞ্চল পারস্য সম্রাটের কর্তৃত্বে এবং অবশিষ্টাঞ্চল এদেরসহ আবিসিনিয়ার রাজার হুমকিতে ছিল। এক্ষেত্রে একজন খাঁটি আরব হিশেবে নবী মুহাম্মদ আরবদের জন্য যা কিছু ভালো বলে মনে করেছেন, বাছবিচার না করে তারই বৈধতা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি আরব গোত্রগুলোকে একত্রিত করতে চেয়েছেন এবং করতে সক্ষম হয়েছেন। পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের আগেও নিজের জীবদ্দশায় তিনি উত্তর আরবকে রোমানদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন। তার মৃত্যুর কিছুদিন পর খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলমানরা আরব ভূখণ্ড থেকে রোমান ও পারসিকদের তাড়িয়ে দেয়। তাই অখণ্ড আরবের স্বপ্নদ্রষ্টা হিশেবে মূল্যায়ণ করা যেতে পারে নবী মুহাম্মদকে।

নবী মুহাম্মদ জীবনভর সাম্যের বাণী প্রচার করেছেন। তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করতে চেয়েছেন। একজন ক্রীতদাস/প্রতিবন্ধীও যে স্বাধীন মুসলমানদের ইমাম বা শাসক হতে পারে, এই ব্যপারটা তিনি স্পষ্ট করেছেন। এছাড়া ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এবং সম্মানের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র বা শাসক-শাসিত বা গোত্র-উপগোত্রের মধ্যে ব্যবধান রাখতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

দাসপ্রথা উচ্ছেদের জন্য নবী মুহাম্মদ স্পষ্ট করে কোন ঘোষনা দেননি। তবে তিনি ব্যপারটার ক্ষেত্র ছোট করে এনেছেন। যুদ্ধবন্দী ছাড়া অন্য কোনভাবে জোর করে কাউকে দাসত্বের অধীনে নিয়ে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। জীবিত থাকাকালে তিনি ৬০-৬৫ জন দাসকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এছাড়া যাকাতের অর্থ দিয়ে মুসলমান দাসদাসীকে মুক্ত করার আবশ্যিক বিধানও তিনি চালু করেছেন। ক্রীতদাসী দিয়ে পতিতাবৃত্তির প্রাচীণ রীতি তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। অবশ্য ইসলামে অধীনস্ত যুদ্ধবন্দী নারী বা ক্রীতদাসীর সাথে সেক্স করা বৈধ।

নবী মুহাম্মদ যাকাতের প্রচলন করেছেন। যদিও কেউ কেউ বলে থাকেন, এর সূচনাকারী ছিল ইহুদিগণ। সে যা-ই হোক, তিনি একে ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যাকাতের বিধানের মাঝে অনেক সমস্যা আছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে এটি দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকরী বলেই প্রতীয়মান হয়। আর সুদের চক্রবৃদ্ধি হারও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তিনি সুদ তুলে দিয়েছেন। তবে বর্তমান ব্যাংকিং খাতে প্রচলিত সুদকে এখন সম্ভবত চক্রবৃদ্ধি সুদ বলা চলে না।

নবী মুহাম্মদ উত্তরাধিকারে মেয়েদের অংশ রেখেছেন, তা পুরুষের তুলনায় অর্ধেক হলেও। এর পূর্বে আরব মেয়েরা ভ্রাতার বর্তমানে পৈতৃকসূত্রে সাধারণত কোন সম্পদ লাভ করতো না। আর মেয়েদের স্বাক্ষ্যকেও আরবে অগ্রাহ্য করা হতো। প্রথম আরব হিশেবে তিনি মেয়েদের স্বাক্ষ্যকে বিধিবদ্ধ গুরুত্ব দিয়েছেন। অবশ্য এই স্বাক্ষ্যকে তিনি পুরুষের স্বাক্ষ্যের অর্ধেক হিশেবে বিবেচনা করেছেন। এতদসত্ত্বেও একে অগ্রগতির সূচনা বলে কল্পণা করা যেতে পারে।

মোহরানা তথা বিবাহ প্রাক্কালে স্ত্রীধন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে থাকেন। মুখে যা-ই বলুন, অর্থকরী কর্মযজ্ঞ থেকে পৃথক আরব নারীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মোহরানা যে বিশেষ কিছু, সেটা তারা মনে মনে নিশ্চয়ই স্বীকার করেন। আর বহুবিবাহ নিষিদ্ধ না করলেও তিনি স্ত্রীর সংখ্যাকে বেঁধে দিয়েছেন। এটা পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি না ঘটালেও লাগামহীন সংখ্যায় স্ত্রী গ্রহণের চেয়ে সামান্য ভালো বলেই বোধ হয়।

তখনকার আরব অর্থনীতিতে এতিমের সম্পদ ছিল অন্যতম আলোচিত একটা বিষয়। মানুষের গড় আয়ু ছিল কম এবং অকালে তাদের মৃত্যুর ফলে সমাজে প্রচুর এতিম শিশু বসবাস করতো। এদের সম্পদ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আত্মসাৎ করা হতো। পরিশেষে এরা সর্বশান্ত হতো কিংবা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়তো। এতিমের অধিকার নিয়ে নবী মুহাম্মদ সুস্পষ্ট বিধান প্রবর্তন করেছেন, যার ফলাফল হিশেবে পরিস্থিতির আশাপ্রদ উন্নতি ঘটে।

প্রাচীণ আরব ছিল পুরোপুরি গোত্রনির্ভর। কিছু কিছু গোত্রের মানুষজন অধিক কন্যাশিশু জন্মালে এদের মধ্যে কয়েকটিকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে আসতো। অধিকাংশ গোত্র অবশ্য এই অমানবিক প্রথাটি অনুশীলন করতো না। পরবর্তীতে নবী মুহাম্মদ এসে একে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নজরদারির আওতায় নিয়ে আসেন। যার ফলাফল হিশেবে এখন মুসলমানদের মধ্যে কন্যাসন্তানের ভ্রুণ হত্যার হার বেশ কম এবং ছেলে-মেয়ের অনুপাত স্থিতিশীল।

প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস আমাদেরকে এটাই বলে যে, যুদ্ধ মানে গণহত্যা। নবী মুহাম্মদ যুদ্ধকে ছোটখাট লাগাম পরিয়ে দিয়েছেন। নিজের সেনাদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, যোদ্ধা ব্যতীত শত্রুপক্ষের আর কাউকে হত্যা করা যাবে না। তিনি ঘন ঘন যুদ্ধ করেছেন তথা শত্রুর সর্বাংশ লুট করেছেন, কিন্তু রক্ত ঝরিয়েছেন খুবই কম। বনু কুরাইজার গণহত্যা অবশ্য এক্ষেত্রে নিন্দনীয় ব্যতিক্রম। এই গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিলো। তবে ব্যপারটির সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নবী মুহাম্মদের হাতে ছিল বললে ভুল বলা হবে। বনু কুরাইজার নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ একজন আনসার সাহাবীকে বিচারক হিশেবে মেনে নেয়। এই সাহাবী সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে তার প্রাচীণ মিত্রদের সমূলে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নবী মুহাম্মদও নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে এই অন্যায় বিচারকে স্বাগত জানান।

নবী মুহাম্মদের চরিত্র ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যে সমস্ত হাদিস বা গল্প প্রচলিত আছে, তার কিয়দংশও যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে, তিনি যথেষ্ঠ ভালো মানুষই ছিলেন। বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ করেছেন – শুধু এটাই একজন আরবের সামগ্রিক ব্যক্তিজীবনের সারকথা নয়। এ নিয়ে পরবর্তীতে লেখার ইচ্ছা আছে।

২০১৭ সালের হিশেবে নবী মুহাম্মদের কাজকর্মকে আমরা মানবিক বলতে পারি না। কিন্তু তিনি তার সময়ের মূল্যায়ণে শ্রেষ্ঠ না হলেও নিঃসন্দেহে যথেষ্ঠ প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। তবে আমি আফসোস করি এটা ভেবে যে, প্রচণ্ড শ্রম দিয়ে ও অবিশ্বাস্য মাথা খাঁটিয়ে তিনি যে ক্ষমতা হস্তগত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা দিয়ে যদি মানবকল্যাণে আরেকটু মনোযোগী হতেন!

যাই হোক, মুসলমানদের উপলব্ধি করা উচিত, সপ্তম শতাব্দীর নবী মুহাম্মদের আদর্শ দিয়ে পরিচালিত হতে গেলে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে। একবিংশ শতাব্দীর মানুষজন তার ভুল, তার অপরাধ ও তার সাহসী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জেনে তা থেকে শিক্ষা নেবে। এর বেশী কিছু না। তিনি দাসীর সাথে ঘুমিয়েছেন, বারবার যুদ্ধের তাগাদা দিয়েছেন, যুদ্ধবন্দী মেয়েদের সাথে সেক্স করার বৈধতা দিয়েছেন, ক্রমাগত মিথ্যা ও অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তা বলেছেন – এসব অপরাধ দেখে আমাদের শুধু এটাই শেখার আছে যে, এই কাজগুলো নিতান্তই অমানবিক।

শেষ কথাঃ
কয়েকজন জ্ঞানীগুণী সেক্যুলার লেখক ইতোমধ্যে আমাকে অশুদ্ধ নাস্তিক হিশেবে চিহ্নিত করেছেন। ধারণা করছি, আজকের পর থেকে তারা আমাকে মুসলমান হিশেবে সাব্যস্ত করবেন। ব্যপারটা স্বাভাবিক নাকি লজ্জার – বুঝতে পারছি না। তবে এটা হয়তো ঠিক যে, সেক্যুলার লেখকদের কেউ কেউ নবী মুহাম্মদকে নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা ও নোংড়া গালিগালাজ করেছেন বলে আমি এই অনর্থক স্ট্যাটাসটি পোস্ট করেছি। এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তিতেও আমার কোন আপত্তি নেই, সত্যিই।

আর ইদানীং আমি বুঝতে চেষ্টা করছি, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হলো কেনো। এর পেছনে কি অকারন আস্ফালন, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা কিংবা ঔদ্ধত্ব’র কোন ভূমিকা ছিল? যদি থেকে থাকে, একই প্রভাবকগুলো কি চলমান মুক্তচিন্তা আন্দোলনকেও ব্যর্থ করে দিতে পারে? আমি আরও বুঝতে চেষ্টা করছি, দশকের পর দশক ধরে লেখালেখির পরও সেক্যুলার লেখকগণ কেন মানুষের মননকে স্পর্শ করতে পারছেন না। কিংবা কেন আমাদের দেশে সেক্যুলার মনোভাবাপন্ন মানুষের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে স্থির রয়েছে।

আমি আরো অনেক কিছু বুঝতে চাই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ভালো নবী মুহাম্মদ, মন্দ নবী মুহাম্মদ!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − = 30