গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের আন্দোলন যৌক্তিকঃপুরো সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের কলেজ কে ইন্সটিটিউট করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।তাদের দাবি গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ ইন্সটিটিউট করতে হবে।সাথে তারা এটাও দাবি করছেন যে গার্হস্থ্য অর্থনীতি শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও পড়বে।এটা খুবই যৌক্তিক এবং সঠিক দাবি।

আমাদের দেশে ছোট বেলা থেকেই ছেলে মেয়েদের পার্থক্যকরণ করে দেয়া হয়।প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু হয় এই প্রক্রিয়া।ছেলেরা কোন পাশে বসবে আর মেয়েরা কোন পাশে বসবে এটা নির্ধারণ করা হয়।মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও তাই।বালক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয় এই ভাবে ছেলেমেয়েদের সহশিক্ষাকে বাতিল করে আলাদা আলাদা ভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা এই রাষ্ট্র করে আসছে।নারীদের প্রতি মধ্যযুগীয় বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজে জেঁকে বসে আছে।যাকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পেলেপুশে টিকিয়ে রাখছে আমাদের দেশের ধনীক শ্রেনীর শাসকরা।তারা নারীদেরকে ভোগ্যবস্তু ও বাড়ির কাজ, সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের কাজের বস্তু বলে মনে করেন।নারীদের মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পুরো সমাজের সংখ্যাগুরু অংশের মধ্যেই এমন।নারীর প্রতি সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে।এ সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার ভেতর দিয়েই নারীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার অর্জন হতে পারে।

সহশিক্ষা নারী দৃষ্টিভঙ্গিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে।সহশিক্ষা নারী পুরুষের পার্থক্যকরণকে এক ধাপ হলেও কমিয়ে দেয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন শিক্ষা কে গ্রহণ করবে এটা রাষ্ট্র ঠিক করে দিতে পারে না।আর গার্হস্থ অর্থনীতির সাব্জেক্ট গুলো শুধু মেয়েরা পড়বে বিষয়টি নারী দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা থেকেই আসে।শিক্ষার কোন নারীপুরুষ ভেদ হয় না।নারীদের জন্য আলাদা পুরুষদের জন্য আলাদা এভাবে ভাবাটা বা কোনভাবে এর পক্ষ নেয়া এই সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতিকেই মেনে নেয়া বা তাকে টিকিয়ে রাখা।তাই শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে সহশিক্ষা চালু করতে হবে।

আজকে যখন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক মেয়েরা এই আন্দোলনের বিরোধীতা করছে।কিন্তু এই “বিজ্ঞ” জনেরা এতটুকু বোঝার মত ক্ষমতা নেই যে এটা তাদের মানে নারীদের বিপরীতেই তাদেরকে দাড় করাচ্ছে।অবশ্য দোষ টা তাদের নয় দোষটা এই রাষ্ট্রের।রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত তার নাগরিকদের সেভাবেই গড়ে তুলছে।রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষ হিসেবে নয় অমানুষ হিসেবে অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা নিয়ে বড় হতে শিক্ষা দেয়।এই শিক্ষাব্যবস্থা সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে নয় প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ককে উৎসাহিত করে।

এবার আসা যাক ইন্সটিটিউশন এর দাবির ব্যাপারে।পৃথিবীর সব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথেই ইন্সটিটিউট থাকে। সেখানে তারা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই সার্টিফিকেট পায়।এতে বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীদের জাত চলে যায় না।এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে যে একজন সুস্থ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার জন্য অসুস্থ মানুষের মত করে পাগলের মত করে তথ্য ও উপাত্ত মূখস্থ করতে হয়।যাকে কোনভাবেই জ্ঞানার্জনের খাতায় ফেলা যায় না। এটা একেবারেই অযোগ্য একটা ব্যবস্থা।ইন্সটিটিউট করা হলে হয়তো কলেজের শিক্ষার্থীরা কিছু সুবিধা পাবেন।এটা তারা চাইতেই পারেন।তাদের নিজেদের পূর্ণ অধিকার আছে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানানোর ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার।কেউ কেউ বলছেন যে, তাদের দাবি মেনে নিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সক্ষমতা নাই যে তাদের বাড়তি সু্যোগ দেবে।এই কথা যারা বলছেন তারা হয় অন্ধ নয় বিভ্রান্ত।দেশের অর্থমন্ত্রী ৮০০০ কোটি টাকাকে হাতের তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দেন।এখানে দিনে রাতে জনগনের টাকা চুরি করে নেতারা।এতসব দূর্নীতি তাদের চোখে পড়ে না।বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক নিয়োগে লোক নিয়োগে দূর্নীতি তাদের চোখে পড়ে না।তারা শুধু দেশের দূরাবস্থা দেখতে পান।কিন্তু এর পেছনে যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন লোকগুলো দায়ী তা বোঝেন না।

এতসব কথা বলতে হচ্ছে কারণ, এই রাষ্ট্র আমাদের নয়, এই সমাজ নারীদের অধিকার দেয় না।নারীদের পেছনে ফেলে রাখতে চায়।তাই এই সমাজ না বদলানো পর্যন্ত স্থায়ী কোন সমাধান হতে পারে না।সমাজের আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে ফেলা ছাড়া মুক্তির দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =