কর্মক্ষমতায় যে কোনো উন্নত দেশের চেয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ

একটা দেশের অর্থনৈতিক দিক তখনই মজবুত হবে যখন সে দেশের তরুন ও কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার বেশী হবে। তারুণ্য ও কর্মক্ষম জনশক্তির দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চেয়ে এগিয়ে। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী কর্মশক্তির দিক দিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি সুবর্ণ সময় বা ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ অতিক্রম করছে, যা চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার অনেক উন্নত দেশকেও পেছনে ফেলেছে। কর্মক্ষমতায় এই বিশেষ লাভবান হওয়ার সুযোগকে ‘জনমিতির মুনাফা’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলা হচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি)এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। এ অঞ্চলের ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ হলো কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা, অর্থাৎ ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার আধিক্য। যখন এই কর্মক্ষম জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের ওপরে থাকে, তখন ওই দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাস-কালে অবস্থান করছে বলে ধরা হয়। এই জনসংখ্যা কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। ইউএনডিপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১৩ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হবে। ফলে ২০৩০ সালে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষ হবে কর্মক্ষম, যা বিশ্বের যে কোনো দেশের জন্যই সবচেয়ে সুখকর বিষয়। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার গড় বয়স ২৬ বছর। এটি অনেক উন্নত দেশের মানুষের গড় বয়সের নিচে। এর মানে হচ্ছে, আমাদের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি। ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। এসব অঞ্চলে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শুধু যে কর্মক্ষম মানুষের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তা-ই নয়, বেশি বয়সী, অর্থাৎ নির্ভরশীল মানুষের হারও চীন-জাপানের তুলনায় অর্ধেক। ইউএনডিপি বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশ, যা চীন, জাপানসহ যে কোনো উন্নত দেশের চেয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের কর্মক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ২০৩০ সালে গিয়ে আরও বাড়বে। ১৫ বছর পর যখন বুড়ো মানুষের ভারে কর্মক্ষমতা হারাবে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়া, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার মতো উৎপাদনমুখী দেশগুলো, তখন প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিনিয়োগ আর উৎপাদনে তাদের ‘টেক্কা’ দেবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কর্মক্ষম মানুষের হার বেশি থাকার এই যে সুযোগ, সেটি যখন কাজে লাগানো যাবে, তখনই এটিকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ বা জনমিতির মুনাফা বলা যাবে। আর এই মানবসম্পদ ব্যবহারের জন্য সরকারকে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সে দিন বেশী দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মজবুত অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে নাম লেখাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কর্মক্ষমতায় যে কোনো উন্নত দেশের চেয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − 28 =