চলচ্চিত্র “ভুবন মাঝি” এবং বাংলাসিনেমার রুচিশীলতার উত্থান


ভুবন মাঝি” চলচ্চিত্রের পোস্টার সিলেট নগরীর দেয়ালে দেয়ালে রাজত্ব দেখে সিনেমাটি দেখার ইচ্ছা হলো।সিনেমাবোদ্ধা হওয়াটা হয়ে উঠেনি।একজন আমজনতা হিসেবে সুলভদর্শন দৃষ্টি থেকে সিনেমাটি বিবেচনা করলে ‘অসাধারণ’ উপাধি দেওয়াটা ছাড়া মগজে আর কোনো শব্দ নেই।মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রফেশনাল ও সিনেম্যাটোগ্রাফিক মুভি যদি বাংলাদেশে পাঁচটি থেকে থাকে সেই লিস্টে “ভুবন মাঝি”র নাম উঠে আসতে বাধ্য।ওপার বাংলার সুদর্শন নায়ক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় আর বাংলাদেশের প্রতিভাবান অভিনেত্রী অপর্ণাঘোষ দুজনেই যেন তাদের নামের যথেষ্ট সুবিচার করেছেন।

সিনেমার প্লট মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক।তবে ১৯৭১ আর ২০১৩ এর দুইটা সময়কেন্দ্রিক দৃশ্যপট চিত্রায়িত হয়েছে।গুগল ঘেটে জানলাম, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নন লিনিয়ার স্টোরিলাইনের কনসেপ্ট খুঁজে পাওয়া মারাত্বক মুশকিল।মুক্তিযুদ্ধ এবং বর্তমানের সংমিশ্রণে তৈরী নন লিনিয়াল কনসেপচুয়াল স্ক্রিপ্টের ভাল মূল্যায়নই দেখা গেছে মুভির সর্বাংশে।তবে এই ধরণের কনসেপ্টের অবতরণে প্রোফেশনালিজমের অভাব বোধ করেছি কিছুটা।১৯৭১ ও বর্তমান সময়ের দৃশ্যধারণে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল।কেমন একটা খাপছাড়া লেগেছে ব্যাপারগুলো।

মুভির শুরুর দিকটা কেন্দ্রীভূত হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মফস্বল শহরে বাস করা ‘নহির’ ও ‘ফরিদা’ চরিত্র নিয়ে।নহির চরিত্রে অভিনয়কৃত পরমব্রত ছিলেন শান্তশিষ্ট-চশমাবিশিষ্ট থিয়েটার পাগল তরুণ যার মাথায় সারাক্ষণ বইপোকায় ঘুণে কাটত।নদীর তীর ও রেললাইনকে স্বাক্ষী রেখে নহির ও ফরিদা চরিত্রের সুমিষ্ট রসায়ন ছিলো উপভোগ করার মত।তবে একতরফা উপভোগ বললে ভুল হবে।ফরিদা চরিত্রে অভিনীত অপর্ণা পরমব্রতের সরল মস্তিষ্কে প্রেমে প্রেমে রাজনীতির ও দেশপ্রেমের চেতনাবোধটা সুণিপুণ শ্রেষ্ঠত্বে সঞ্চালন করতে পেরেছিলেন।ব্যক্তি মানুষ থেকে ব্যক্তিমুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠাটা তখন সময়ের দাবি থাকলেও অপর্ণা ছাড়া সেটা হয়ে উঠা নহির চরিত্রের পক্ষে দুঃসাধ্যই ছিল।ছবিটির শেষের অংশে অচিন্তনীয় টুইস্টটা ছবির উপভোগ্যতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিন্যামেটিক দৃশ্যধারণ ও মুভির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বিবেচনার দিক থেকে ছবিটি ভালমাত্রায় এগিয়ে থাকবে।বিশেষত সিনেমার গানগুলো ছিল অনেক অর্থপূর্ণ ও শৈল্পিকমন রক্ষার ধারক।

গুণী অভিনেতা পরব্রতের সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখেনা।তবে প্রতিভাধর অভিনেত্রী অপর্ণা ঘোষ বাংলাদেশের মূলধারার একজন নায়িকা হন সেই প্রত্যাশা রাখি।

উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ফিল্মইন্ডাস্টিগুলোর প্রভাবে আমরা সাধারণত নায়িকা বলতে স্বচ্ছবসনা এক মাংস দেহ বুঝি যার ভাঁজে ভাঁজে থাকবে গ্ল্যামারের ঘ্রাণ।সেই কুদৃষ্টি থেকে অপর্ণা অনেকখানি মুক্ত ও ব্যর্থ।

অপর্ণার দেহবিবেচনায় উপমহাদেশীয় উপভোগের ফ্যাক্টরগুলো আসেনা।পুরুষার্থ মনোভাব তাই অপর্ণার অভিনয়েরই দৃষ্টিক্ষেত্র।অথচ অভিনয়দক্ষতা ও শৈল্পিকতার রুচিতে তরুণী অভিনেত্রী অপর্ণা বরাবরই এগিয়ে থাকবেন সমসাময়িকদের থেকে।

মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ছবি সবসময়ই অনন্যসাধারণ।আজকের সময়ে প্রকৃত ন্যাশনালিজম প্রমোট করতে রুচিশীল ধাঁচের সিনেমা অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।শুনেছি ছবিটির পরিচালক ইতিমধ্যেই এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রগুলোর চোখের বালি হয়ে গেছেন।আক্রমণাত্মক হুমকিও নাকি পেয়েছেন।উনার সাহসিকতার সম্মান জানাই।

এই ধরণের চলচিত্র হলে গিয়ে দেখা ও অনুভব করা আমাদের অলিখিত দায়িত্বে পড়ে যায়।রুচিশীলতার পক্ষ টেনে সাজেশন দিতে গেলে স্বভাবতই “ভুবন মাঝি” সিনেমার দেখার অনুরোধ চলে আসে।বাংলা সিনেমা মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক,সফলতা পাক সেই কামনা।কালেভদ্রে কোন ছবিতেই প্রেমিকাকে এরকম চিঠিতে লিখা হয় “রাজনীতিতে অস্থিরতা বেশি,তবে আনন্দও আছে।এই প্রথম মনে হলো বাংলা আমার দেশ। এই পতাকা আমার। যেমনটা তুমিও”?
অপর্ণার প্রেমে পড়াটা স্বার্থক মনে হয়ে উঠে মাঝে মাঝে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 1