হোলির সামান্য রঙে তোমাদের কলজে জ্বলে যায়! আর মানুষের রক্ত দেখে আসে জিহাদী-জোশ!

আমাদের মনে রাখতে হবে: আমরা যদি কারও রঙের হোলিকে মন্দ ভেবে নানারকম আজেবাজে মন্তব্য করি—তাহলে, এর পাল্টা-ব্যবস্থা হিসাবে অন্যরা আমাদের কুরবানির গোরু-জবাইয়ের প্রক্রিয়াকে নানামন্তব্যে আক্রমণ করতে পারে। আমাদের গোরু-জবাইয়ের প্রক্রিয়া যদি আমরা ধর্ম বলে মানি— তাহলে, অন্যের রঙের হোলিকেও আমাদের মান্য করতে হবে। ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে, অন্যের হস্তক্ষেপ একেবারেই বেমানান ও অনধিকারচর্চা। এইরকম ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামি থেকে আমাদের আজ-এক্ষুনি বেরিয়ে আসতে হবে।

হোলির সামান্য রঙে তোমাদের কলজে জ্বলে যায়! আর মানুষের রক্ত দেখে আসে জিহাদী-জোশ!
সাইয়িদ রফিকুল হক

হিন্দুসম্প্রদায়ের হোলি-উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের ভিতরে একটি সাম্প্রদায়িক-অপশক্তি বেশ আঁটঘাঁট বেঁধে অপপ্রচারে নেমেছে। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য: হিন্দুসম্প্রদায়ের এই উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার প্রতি জনমনে ঘৃণাসৃষ্টির অপচেষ্টা। দেশের সবকিছুতে এখন সাম্প্রদায়িক-অপশক্তির কালোথাবা। এদের কাছে হোলি, রথযাত্রা, পূজা-পার্বণ কোনোকিছুই ঠিক নয়। আর অন্য কোনো ধর্মের লোক তাদের অনুষ্ঠান করতে পারবে না! এরা এমনটিই চায়। আর এই পশুগুলোই বর্তমানে শত-শত বছরের পুরানোপ্রথা হোলি-উৎসবকে আক্রমণ করে নানারকম অশালীন-মন্তব্য করছে, এবং এরাই ইউটিউবে হোলি-উৎসবের বিভিন্ন ছবিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে। যেমন, এরা যেকোনো মৃত-লাশকে রোহিঙ্গানির্যাতনের ছবি বলে প্রচার করে থাকে। এখানেও তারা যেকোনো অশ্লীল-ভিডিওকে আজ হোলি বলে অপপ্রচার করছে। আর এই অপকর্মবাদীদের মূলহোতা ভাড়াটিয়া টকশো-চাপাবাজ-গলাবাজ একটা শয়তানপুত্র তুহিন মালিক। বর্তমানে সে হোলি-উৎসবকে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের ইস্যু হিসাবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছে। আর তার ফেসবুক-স্ট্যাটাসে হোলি-উৎসবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য তুলে ধরেছে। এই নরপশু দেশের ভিতরে দীর্ঘদিন-যাবৎ সাম্প্রদায়িক-বিষবাষ্প ছড়ানোর অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।

এই দেশে একটি শ্রেণী আছে—এদের কাছে ইসলামধর্ম ব্যতীত আর কোনো ধর্ম সহ্য হয় না। এরা জাতিগতভাবে চরম অসহিষ্ণু আর সাম্প্রদায়িক। এরা ইসলাম থেকে বহুদূরে। কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রিক স্বার্থআদায়ের জন্য এরা একেকটা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। ইসলামের কোথাও অপরের ধর্মকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও এরা এখন আমাদের ধর্মের স্বঘোষিত-মোড়ল।

হোলি-উৎসব রঙের খেলা। এখানে, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমায়েত হয়ে নাচানাচি করে থাকে। আমার ইচ্ছে না করলে আমি এটি দেখবো না—কিংবা পালন করবো না। এখানে কোনোপ্রকার জোরজবরদস্তি নাই। তবুও একটি শ্রেণী সবসময় সংখ্যালঘুসম্প্রদায়ের ধর্মপালনের বিরোধিতা করে থাকে। আর এদের বুকের ভিতরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়। তাই, হোলির সামান্য রঙ দেখে এদের কলিজা পুড়তে থাকে। আবার কারও-কারও একনিমিষে কলজে জ্বলে যায়। কিন্তু মানুষের রক্ত দেখে এদের কারও মনে কখনও কোনো মায়া-দয়া জন্মে না। এরা এমনই অমানুষ আর নরপশু। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুসম্প্রদায় বাহারি-রঙের সমন্বয়ে হোলি-উৎসবপালন করে থাকে। এটি তাদের ধর্মীয় রেওয়াজও বটে। কিন্তু এসব দেখে আমাদের দেশের একশ্রেণীর অমানুষের গা-জ্বলে। আর এদের গায়ে বিছুটিপাতার চুলকানি শুরু হয়ে যায়। এরা অহেতুক অপরের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে থাকে। এরা এই বাংলার আজন্ম হীনমানসিকতার অধিকারী। আর এই সাম্প্রদায়িক-নরপশুগুলোই হোলির বাহারি-রঙ সহ্য করতে পারে না। এরা আমৃত্যু মানসিক-রোগী।

হোলি-উৎসব আসলে আনন্দের সঙ্গে রঙের খেলা। এখানে, আর–কিছু নাই। কিন্তু এই রঙই এখন অনেকের কাছে সহ্য হয় না। অথচ, এদের পিতৃভূমি পাকিস্তানে নিয়মিত চলছে রক্তের হোলি খেলা! সেখানে তালেবান-নরপশুরা মানুষহত্যা করে প্রতিনিয়ত উৎসব করছে। এরা মানুষের রক্ত দেখে উল্লসিত হয়। সিরিয়ায় চলছে রক্তের হোলি। সেখানে মানুষ মারছে সৌদিআরব পর্যন্ত! সৌদিআরবের জালিম-শাসকগোষ্ঠী স্বার্থের ধান্দায়, গায়ের জোরে, আর অর্থের দাপটে আজ রক্তের হোলি খেলছে সিরিয়ায় ও ইয়েমেনে। আর রক্তের হোলিখেলা চলছে ইরাকেও। সেখানেও আইএস-জঙ্গিরা সমানে মানুষ মারছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কারও কোনো কথা নাই। মাথাব্যথা নাই। শুধু বাংলাদেশে কিংবা ভারতে শান্তিপূর্ণ হোলি-উৎসব হলে তার বিরুদ্ধে নেমে পড়ে একদল ফতোয়াবাজ। এই জানোয়ারগুলো পাকিস্তানী-বীজের নাপাক ফসল। এরা অপরের ধর্মকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চায়। তাই, এদের রঙের হোলি দেখে কলজে জ্বলে যায়! কিন্তু মানুষের রক্ত দেখে এদের মনে জিহাদের জোশ আসে! আর মানুষের রক্ত দেখে এরা আনন্দিত হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে: আমরা যদি কারও রঙের হোলিকে মন্দ ভেবে নানারকম আজেবাজে মন্তব্য করি—তাহলে, এর পাল্টা-ব্যবস্থা হিসাবে অন্যরা আমাদের কুরবানির গোরু-জবাইয়ের প্রক্রিয়াকে নানামন্তব্যে আক্রমণ করতে পারে। আমাদের গোরু-জবাইয়ের প্রক্রিয়া যদি আমরা ধর্ম বলে মানি— তাহলে, অন্যের রঙের হোলিকেও আমাদের মান্য করতে হবে। ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে, অন্যের হস্তক্ষেপ একেবারেই বেমানান ও অনধিকারচর্চা। এইরকম ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামি থেকে আমাদের আজ-এক্ষুনি বেরিয়ে আসতে হবে।

অতিসম্প্রতি ইউটিউবে প্রচারিত সিঙ্গাপুরের একটি হোলি-উৎসবের ভিডিওচিত্রটি দেখে আমাদের দেশের কিছুসংখ্যক অমানুষের অস্থিরতা বেড়ে গেছে। এরা এই হোলি-উৎসবকে অশ্লীল বলে মন্তব্য করে এর বিরুদ্ধে সীমাহীন বিষোদগার করছে। একটা ব্যক্তি নিচের এই ভিডিওটি আমার নিকটে প্রেরণ করে বলেছিলো এটি নাকি অসভ্যতা!

ভিডিওটির লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=wyqe_lkBVM4

এর জবাবে আমি বলেছি:

আপনি জেনে রাখুন: এটি সিঙ্গাপুরের মতো একটি সভ্য-রাষ্ট্রে উদযাপিত হোলি-উৎসব। আর সিঙ্গাপুর বর্তমানে একটি সভ্যরাষ্ট্র। এখানে, অবস্থানগ্রহণকারী হিন্দুধর্মাবলম্বীসহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বহু মানুষের সম্মিলনে আর স্বতঃস্ফূর্ততায় এই হোলি-উৎসব উদযাপিত হয়েছে। আর এখানে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আজকালকারদিনের একদল তরুণ-তরুণী হোলি-উৎসব-পালন করেছে। সবার আগে এদের ধন্যবাদ জানাই। এরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে-সুশৃঙ্খলভাবে হোলি-উৎসব-পালন করেছে। আমি খুব সতর্কতার সঙ্গে ভিডিওটি দেখেছি, আর পর্যালোচনা করেছি: এখানে প্রায় অসংখ্য ছেলে-মেয়ে কী সুন্দরভাবে হোলি-উৎসব-পালন করেছে। এখানে, ছেলেরা-মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোলি-উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এরা কত সভ্য। এরা কেউই কোনো মেয়ের শরীরস্পর্শ করেনি কিংবা কোনো মেয়ের শরীরস্পর্শ করার কোনোপ্রকার চেষ্টাও করেনি। বিশেষতঃ এখানে অনেক মেয়ে ছিল দেখতে অসামান্য রূপসী, সুন্দরী কিংবা অপূর্বা। তবুও এই হোলি-উৎসবে আগত কোনো যুবকই কোনো মেয়ের শরীরস্পর্শ করার সামান্যতম চেষ্টাও করেনি। এখানে, আগত অনেক মেয়ের স্তন খুবই আকর্ষণীয়, নিতম্বদেশ লোভনীয়, তবুও এই যুবকরা কোনো মেয়ের বুকে কিংবা নিতম্বে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেনি। এদের সুস্থমানসিকতাকে আজ প্রাণখুলে ধন্যবাদ দিতেই হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে: ইউরোপের অনেক দেশে আজকাল রমণীরা শুধু ব্রা-প্যান্টি পরে চলাফেরা করছে। আর ইউরোপ-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়ার অনেক জায়গায় (সী-বীচে বা বিশেষ সংরক্ষিত এলাকায়) নারী-পুরুষ সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে চলাফেরা করছে। কিন্তু এরা সে তুলনায় যে ধরনের পোশাক পরেছে তা মানানসই।

আসুন, আমরা দেখি ভারতীয় উপমহাদেশে রঙের ব্যবহার শুধু হোলিকেন্দ্রিক নয়। আমাদের দেশে একসময় (শত-শত বছর আগে থেকে) বিয়ে, পূজা, মুসলমানী (মুসলমানদের ‘সুন্নতে খাতনা’ বা লিঙ্গত্বকছেদ-অনুষ্ঠানে) নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে রঙের ব্যবহার হতো। এসময় যে যাকে যেমনভাবে পারতো তার শরীরে রঙ মেখে দিতো। গ্রাম-বাংলায় একসময় মানুষ (হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে) রঙের পরিবর্তে গোবর ব্যবহার করেছে। হয়তো বলবেন, তারা নিম্নশ্রেণীর মানুষ। কিন্তু তারা অবাধে ভালোবেসে একে অপরের গায়ে গোবর ঢেলে দিয়েছে। তখন মানুষে-মানুষে সম্প্রতি ছিল। আর এখন ধর্মের নামে মানুষ উগ্রবাদী, হিংস্র, জঙ্গি, জংলী হচ্ছে। এইসব অমানুষ ধর্মের মাহাত্ম্য না-বুঝেই ধর্মপালন শুরু করায় আজ ধর্মের এই দুরবস্থা।
তাই, বলতে হচ্ছে বাঙালি-জনসমাজে রঙের ব্যবহার নতুনকিছু নয়। হিন্দুরা হোলি-উৎসবে রঙ-ব্যবহার করে বলে তাকে হীনমানসিকতার দ্বারা ‘অসভ্য ও অসুস্থ’ মানুষের অনুষ্ঠান বলার কোনো যৌক্তিকতা নাই। কারও ধর্মবিশ্বাস বা উৎসবে নেতিবাচক মন্তব্য পরিহার করা সকলের দায়িত্ব।

বাঙালি হন। আর একজন খাঁটি বাঙালি কখনওই কারও ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে পারে না। আর
তুহিন মালিকরা এই বাংলার কুলাঙ্গার আর পতিতা। এরা অর্থ-ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির লোভে দিশেহারা হয়ে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি-বিনষ্টের দুরাশায় এসব আবোলতাবোল ও লাগামহীন কথাবার্তা বলে তাদের প্রভুদের খুশি করার কাজে ব্যস্ত। এরা বেশ্যা। তাই, এরা সবখানে নিজেদের নোংরা-রাজনীতি খুঁজে বেড়ায়। আর কোনো বাঙালি, কোনো ভদ্রলোক, আর কোনো মুসলমান কখনওই তুহিন মালিকদের মতো পতিতাদের সমর্থন করতে পারে না।

ভুল মানুষই করে আর ভুল থেকে বেরিয়ে আসাও মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আসুন, আমরা বাঙালি হই। আর মানুষের উৎসবকে মানুষের চোখে দেখি।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৭/০৩/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1