জীবন গল্পের এক পৃষ্ঠা

অমাবস্যার রাত। এই রাতে পৃথিবী এক ভয়ংকর রুপের মধ্য বেঁধে ফেলে জগতে সমস্ত কিছু। পূর্ণিমার রাতে যেমন পৃথিবী ভাসতে থাকে অদম্য জোছনার মায়ার টানে।তেমনি অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে মানুষের মনের ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য ধুলায় মোড়ানো পথটাকে ভীষণভাবে নারিয়ে দেয়। সমস্ত জগতকে মনে হয় যেন এক ঘাতিনী দৈত্য। সেই দৈত্য তার ইয়া বড় দাঁত বের করে হাসছে। আর তার মুখের কোনে জমা হয়ে আছে অনেক বছরের পুরনো দৈত্যের বিভীষিকার জ্বলন্ত লাভা।তাই এই নিকস কালো অন্ধকার রাতে অনেকে বাইরে বের হওয়াটা নির্ঘাত বকামি ছাড়া কিছুই ভাবে না। কিন্তু কিছু মানুষ এই অন্ধকারের মধ্য জীবনের আলো খুজতে থাকে।

প্রভাত রায় সেই সব মানুষের একজন যারা রাতের আঁধারে জীবনের গল্প তৈরি করে।প্রভাতের প্রথম আলো যখন সমস্ত দুনিয়ার অনির্বাণ আধার দূর করে আলোয় ভাসিয়ে দেয়, তেমনি কোন এক প্রভাতে সন্তান সম্ভাবা মায়ের কোলে জন্মে ছিলেন প্রভাত। দিনের প্রথম প্রহরে জন্ম হয়েছিল বলে তার দাদু শখের বসে নাম রেখেছিল প্রভাত। তিনি সব সময় বলতেন প্রভাত একদিন আমাদের সংসারের সমস্ত অন্ধকার দূর করে প্রভতের প্রথম আলো গায়ে মাখাবে।

আজও প্রভাত তার নিজের জীবনের প্রভাত দেখতে পেলনা। সামান্য লেখাপড়া শিখে চাকরি পেয়েছে উপজেলার নৈশ্য প্রহরীতে। তার দীর্ঘ ২২ বছরের চাকরি জীবনে এমন কোন দিন নেই প্রভাতের সতর্কীকরণ বাঁশির সুর শোনেনি বদ্দিপাড়ার লোক।এই পাড়ার লোকজন প্রভাতকে অনেক ভালোবাসে। প্রভাতের কাছে দিনের আলোর চেয়ে রাতের অন্ধকার অনেক বেশি ভালো লাগে।রাতের একটা আলাদা রুপ আছে। সেই রুপ প্রভাতের কাছে অনেকটা জীবনের গল্পের মত। জীবনে যেমন সুখ আছে দুঃখ আছে,তেমনি রাতের আছে জোছনার উৎছলতা আর কালোর দুরহতা। প্রভাত বলে রাতের মন খারাপ হলে আঁধারে ডুবতে থাকে দুনিয়া আর মন ভালো তো জোছনার সিন্ধতায় ভেসে যায় চারপাশ।

প্রভাতের বাড়ি থেকে উপজেলার দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন পাঁচ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে সন্ধ্যার অনেক আগেই হাজির হয় প্রভাত। তার নিজের হাতেই প্রতিদিন আলো জ্বেলে উপজেলার অন্ধকার দূর করে। তারপর তার নির্দিষ্ট পোশাক পড়ে নেয়। হাতে একটি লাঠি থাকে আর গলায় ঝুলানো থাকে বাঁশি। গেটের কাছে একটি চেয়ার রাখা আছে সেখানেই প্রভাত বসে তার রাতের জীবনের গল্প লেখে। প্রতিদিন সে তার জীবনের একএক পৃষ্ঠা করে লেখে চলে জীবনের গল্প। তার জীবনের রাতের গল্পের সাথে নতুন একটি চরিত্র যোগ হয়েছে। একটি মাগী কুকুর। প্রভাত সেই কুকুরের নাম দিয়েছে লালুর মা। লালুর মা প্রভাতের কাছে খুব সাহায্য করে।লালুর মা প্রভাতের চেয়ারের পাশেই শুয়ে থাকে। প্রভাত যখনই বাঁশিতে ফু দেয় অমনি লালুর মা লেজ নাড়াতে নাড়াতে ছুটে দেখে আসে চারিপাশ। কখনও যদি অন্য প্রাণীকে দেখতে পায় ওমনি শুরু করে ডাকা ডাকি। তখন প্রভাত লাঠি নিয়ে ছুটে যায় সেই দিকে।

লালুর মায়ের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেছে প্রভাতের। প্রভাত বাড়ি থকে রাতের খাবার বেঁধে নিয়ে আসে। সেই খাবারের কিছু অংশ আজকাল রোজকার খাবারে একটা অংশ হয়ে গেছে লালুর মার।রাতের সঙ্গীর কাজে বেজায় খুশি প্রভাত। তেমনি কুকুরটাও তার প্রভুর কাজে করে মনের খুশিতে। মাঝেমাঝে রাত বাড়লে প্রভাতের চোখে ঘুম হানা দেয়।তখন সজাগ দৃষ্টি রাখে লালুর মা। এই ভাবে রাতের প্রহর ফুরিরে যেতে থাকে,তেমনি ফুরাতে থাকে প্রভাতের জীবনের গল্প লেখার পৃষ্ঠা। অন্ধকারের বিদায় নিতে বাধ্য করে ভোরের আলো। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে শুরু হয় পাখির কলতান। পাখির কিচিরমিচিরে মুখোর হয়ে ওঠে চারপাশ।ভোর হতে না হতে শুরু হয় পাখির জীবন যুদ্ধ।সেই যুদ্ধ অনেকটা মানুষের মত বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

প্রভাতের মন খুসেতে ভোরে ওঠে সকালের মৃদু আলোয়।সারারাতের ক্লান্তি দূর করে দেয় ভোরের বাতাস। ভোরের সৌন্দর্যের মুগ্ধ হয়ে যায় প্রভাত। তাই প্রতিদিন এই কুসুমিত ভোরে প্রভাতের মনে পড়ে ছোটবেলায় পড়া একটি কবিতা “ পাখি সব করে রব রাত্রি পোহাইল কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল”।

সকাল হলেই মানুষ বেড়িয়ে পরে যে যার কাজে। তখন প্রভাত ফিরে আসে নিজের ঘরে। সে ফেলে রেখে আসে প্রতিদিনের জীবনের গল্প লেখা সেই প্রিয় জীবন খাতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জীবন গল্পের এক পৃষ্ঠা

  1. আর একটু ডিটেইলসহ লেখার চেষ্টা
    আর একটু ডিটেইলসহ লেখার চেষ্টা করলে ভাল হয়। গল্পটা তাহলে অনুগল্প থেকে গল্পের কাতারে উঠে আসতে পারে।

    ওভার অল, ভাল লিখেছেন…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 89 = 91